২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নির্বাচন : ভারতের থিংকট্যাংকের বিপদ

-

বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে বেশ বিপদেই ফেলেছে মনে হচ্ছে। তারা সাধারণ ও সোজা যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়ে অর্থপূর্ণ একটি লেখা দাঁড় করাতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। একই বিষয়ে এর আগে সাধারণভাবে ভারতের মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখকেরা, যারা মূলত থিংকট্যাংকের বাইরের, তাদের লেখায় দেখেছিলাম- সেখানে এ জাতীয় সমস্যা দেখা যায়নি। তারা স্বাধীনভাবে মনের কথাই পরিষ্কার বলেছিলেন। অর্থাৎ ভারতের সরকারি অবস্থানের ব্রিফিংয়ের সাথে মিল রেখে কথা বলার দায় তাদের ছিল না, সম্ভবত এটাই কারণ।

এমনিতেই ভারতে বিদেশের (মূলত আমেরিকা) সাথে সম্পর্কিত থিংকট্যাংক; অপর দিকে মিডিয়া (পাবলিশিং অথবা এজেন্সি)- এদেরকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা। বোঝা যায়, ভারত থেকে এগুলো প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অথবা এদের অবস্থান যেন সরকারি অবস্থানের বিপরীত হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে সম্ভবত অলিখিত কোনো শর্তে তা প্রকাশিত হতে গিয়ে এসব সমস্যা হাজির হয়েছে। যেমন- কিছু থিংকট্যাংকের দৌরাত্ম্যের প্রাবল্য এত দিন যা দিয়ে ভরপুর ছিল তা হলো চায়নাব্যাশিং বা চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা থেকে প্রকাশিত নানান প্রপাগান্ডা। অর্থাৎ তারা আর থিংকট্যাংক থাকতে চাইছিলেন না। আমেরিকার স্বার্থে চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার ‘ঘেঁটু’ হয়ে উঠতে চাইছিলেন এরা। বাক্যে মিল থাকুক আর না-ই থাকুক, অর্থপূর্ণ যুক্তি সাজানো হোক আর না-ই থাক, চীনবিরোধী প্রপাগান্ডায় সরব থাকতে হবে।

তবে এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প আমাদের স্বস্তি দিয়ে বাঁচিয়েছেন। ভারতে বসে আমেরিকান থিংকট্যাংকের চীন ঠেকানোর প্রপাগান্ডায় অর্থ ঢালা অথবা ভারতকে এর বিনিময়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া- এসবের মধ্যে তিনি আগের প্রেসিডেন্টদের মতো আর নেই- এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে ভারতের কিছু থিংকটাংকের খামাখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ইদানীং আর দেখা যায় না। বিশেষ করে, মোদি-শি জিনপিং এপ্রিল ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত য়ুহান সামিটের পরে। তবে এ ছাড়াও এর আরেক কারণ, বুদ্ধিমান মোদি সরকার চীনের সাথে ওই সুখালাপের সময় বিরূপভাব তৈরি না করতে এ ধরনের থিংকট্যাংকের তৎপরতা বন্ধ করতে অনুমতি না দেয়াকে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতি হিসেবে গ্রহণ করে। এতে এগুলোর অনেকেই তৎপরতা গুটিয়ে নিয়েছিল বা ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবুও ভারতের সরকারি নীতির পক্ষে প্রচারে থাকা কিছু থিংকট্যাংক এখনো আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লিখতে গিয়ে এরাই সমস্যায় পড়েছেন।

সাধারণভাবে লেখা ও চিন্তা করা সমান্তরাল কাজ, যা প্রায় সমার্থক। এ জন্য দরকার মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা; এ কারণে, এক দিকে ফরমায়েশি সরকারি অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে আবার নিজ মনে (ফ্রি আরগুমেন্টে) লিখতে হবে- এ দুই কাজ এক সাথে করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবুও কোনো লেখা শেষ করলেও এটা যে ফরমায়েশি, এর ছাপ লেখাতেই থেকে যাবে। এ জন্য বলা হয় চিন্তাকে বন্ধক রেখে গবেষক বা অ্যাকাডেমিক হওয়া যায় না। থিংকট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা ওআরএফের ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য আর বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন বা ভিআইএফের ফেলো রাধা দত্তের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে রচনার সেই হাল হয়েছে।

এমনিতেই কেউ অ্যাকাডেমিক পরিচয়ধারী কিন্তু আনক্রিটিক্যাল- এটা খুবই অযাচিত কম্বিনেশন। যে ক্রিটিক্যাল নয় অর্থাৎ আগে থেকেই জানার অজুহাতে, যেকোনো জিনিসকে পুনরায় উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখে না, যাচাই-বাছাই বা সন্দেহ করার দৃষ্টি যার তৈরি হয়নি, এদের পক্ষে অ্যাকাডেমিক শব্দের প্রতি সুবিচার করা কঠিন। কিছু অ্যাকাডেমিকের ভারতীয় সেকুলারিজম সম্পর্কিত ধারণা ও এর ব্যাখ্যার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এতই আনক্রিটিক্যাল যে, এটা পোপের বাইবেলের ওপর আস্থা-বিশ্বাসকেও হার মানায়। অনেকের ধারণা- থিওলজিতে ক্রিটিক্যালনেস বলে কিছু নেই; কিন্তু সেটিও আসলে ভিত্তিহীন। আধুনিকতাতেই শুধু ক্রিটিক্যালনেস বা উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখা ও যাচাই করা আছে, এ কথা সত্য নয়। থিওলজিতেও ক্রিটিক্যালনেস দেখা যায়। এর ভালো প্রমাণ হলো, থিওলজির ইন্টারপ্রিটেশনে ভিন্নতা। তা থেকে একই ধর্মের নানান ব্যাখ্যার উৎপত্তি, বিভিন্ন ধারা বা Seet দেখতে পাওয়া যায়, যা স্বাভাবিক। তবুও ভারতীয় সেকুলারিজম ও এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো ক্রিটিক্যাল অবস্থান নেই।

জয়িতা ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের আগে ২৬ ডিসেম্বর এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। ওই লেখার প্রথম তিন অনুচ্ছেদ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে। এর মধ্যে এক উপশিরোনাম হলো- ‘নির্বাচন কমিশনে ৭০টা রেজিস্টার্ড দলের মধ্যে ১০টাই ধর্মীয় রাজনৈতিক দল’। কিন্তু তাতে সমস্যা কী? তিনি এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন কেন? ওরা ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বলে আর এখানে ধর্মটির নাম ‘ইসলাম’ বলে?

ব্যাপার হলো, এমন চিন্তার মানে, কথিত এই সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি আসলে নিজেই ইসলামোফোবিক। এই ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতে হিন্দুত্বের দল বিজেপির ফারাক কিসে? জয়িতা বিজেপিকে সহ্য করতে পারলে বাংলাদেশের এই ১০টি ইসলামী দলকে করতে পারছেন না কেন? আর জয়িতার সম্ভাব্য আপত্তি বা বিচার করার ক্রাইটেরিয়া কী? আগে ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি ঠিক না করে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত বায়াসনেস বা ফোবিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আসল কথায় আসি। জয়িতা জানাচ্ছেন- এই ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড। আমরা নিশ্চয়ই বুঝি রেজিস্টার্ড শব্দের মানে। এর সোজা অর্থ হলো বাংলাদেশের রিপাবলিক কনস্টিটিউশন মেনে সে অনুসারে রাজনৈতিক দলের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকতে বাধ্য বলে নির্বাচন কমিশন মনে করে, সেসব শর্ত এই দলগুলো পূরণ করেছে। সে কারণে এরা রেজিস্টার্ড দল, সার্টিফায়েড। এখন এসব রেজিস্টার্ড দলের গন্ধ, চিহ্ন, শব্দ ও রঙে যতই ইসলাম প্রকাশ পাক না কেন, যেহেতু বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন মেনেই এরা রেজিস্টার্ড হয়েছে, রাজনীতি করতে চাইছে, তাতে আর সমস্যা কী? একে এরপরও সমস্যা ভাবার কারণ কী? বরং এরপরও কারো কাছে ‘সমস্যা’ মনে হলে সেটি তারই ইসলামবিদ্বেষ মানে, মনের ফোবিয়ার সমস্যা হতে পারে। যেখানে এমনকি আগামীতেও কমিশন যদি বাড়তি কিন্তু কনস্টিটিউশন কাভার করে, এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করে, সেটিও তো এসব রাজনৈতিক দল মানতে বাধ্য থাকবে। তাহলে আর আপত্তির কী আছে? আপনি আর কী চাইতে পারেন? আসলে সবার আগে আমাদেরকেই চাইতে জানতে হবে। একটা ইসলামী দল রিপাবলিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই থাকতে চাইছে, আর কী চান আপনারা? আসলে এর পরের স্তর হলো, রজনীকান্তের সেই গানের কলি- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। আসলে রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য অথবা রাষ্ট্র কী, তা জানা বোঝা, বাকি রেখে কোনো আপত্তি প্রকাশ করতে গেলে তা শেষে ‘ফোবিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।

জয়িতা ভট্টাচার্যের ওই রচনায় আর একটা উপশিরোনাম হলো তিনি বলছেন, ‘ধর্মভিত্তিক দলের ভোট-শেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নয়।’ বাস্তবে এটা ভিত্তিহীন দাবি। কারণ, গত ২০১৩ সালের ৫ মের পরে প্রথম নির্বাচন ছিল ঢাকার বাইরের কিছু শহরের ‘মেয়র নির্বাচন’। ওই নির্বাচনে সরকার গো-হারা হেরে যায়। কেন? কারণ, জামায়াত নয় এমন কিছু ধর্মীয় দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইনে নেমেছিল; মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল। তাই কেউ নিজে ভোটে দাঁড়ালে কয়টা ভোট পাবে সেটাই নয়, বরং অন্যের ভোট কত কাটতে পারবে, সেটাও এক বিরাট সক্ষমতা। এরপর থেকে ‘নির্বাচনের মা মারা যাওয়া’তে সেই শোকে সেকালের বা আগের মানের ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচন হারিয়ে গেছে; তা আর কখনো হয়নি। বুদ্ধিমান জয়িতা নিশ্চয়ই সব বোঝেন। আরো যাচাই করতে তিনি গোয়েন্দা লাগাতে বা খোঁজ নিতে পারেন। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্ক বোঝা, তা বিশেষ করে ভারতীয় সেকুলারিজমের বুঝ দিয়ে বোঝা, আরো অসম্ভব।
জয়িতা নির্বাচনের পরও একটা রচনা লিখেছেন গত ৩ জানুয়ারি। তা প্রকাশিত হয়েছিল ওআরএফের ওয়েবসাইটে।

জয়িতা ভট্টাচার্য এবং রাধা দত্তের রচনায় এক অভিন্ন ত্রুটি হলো তারা আগে বলে নিচ্ছেন না যে, তারা কেবল নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে লিখছেন। কারণ, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, তা অবাধ ছিল কি না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক দিক সম্পর্কে এরা কোনো খোঁজ নিয়েছেন, তাদের জানাশোনা আছে, তা মনে হয় না। বলা যেতে পারে, সেগুলো তাদের বিবেচনায় তারা কোনো কারণে আনতে পারেননি বা আনেননি। এ অবস্থাতেই তাদের ওই রচনা লিখিত হয়েছে।

জয়িতার লেখায়, তৃতীয় প্যারা থেকে পরের চার প্যারা মিলিয়ে তিনি একটা বয়ান সাজিয়েছেন। এর প্রথম প্যারায় বলেছেন, ‘বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেছে।’ এর পরের প্যারায় বলছেন, ‘কিন্তু নির্বাচন অবজারভারেরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেনি।’ [অর্থাৎ ইঙ্গিত হলো, বিএনপির অভিযোগ বাতিল।] পরের প্যারায় জয়িতা বলছেন, ‘১৯ জন লোক মারা গেছে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি।’ এর শেষে বলছেন, ‘নির্বাচনের আগে বিরোধীরা লীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। আর একইভাবে লীগও বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে।’ [ইঙ্গিত হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]। অথচ পরেই আবার লিখছেন, ‘নির্বাচনপূর্ব ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে মানুষের ভোট দিতে আসার ব্যাপারে আশঙ্কা ছিল।’ কিন্তু কমিশন বলেছে, ‘আশি ভাগ ভোট পড়েছে; তাই ওই ভয়-আশঙ্কা ছিল ভুয়া।’

আসলে এসব বাক্যের মাধ্যমে জয়িতা নিজের পরিচয় গবেষক থিংকট্যাংক থেকে প্রপাগান্ডিস্টের স্তরে নিজেই নামিয়েছেন। কারণ এটা কোনো গবেষকের কাজ নয়, কাজের পদ্ধতিও নয়। সাধারণ বিবেচনা হলো, দু’টি বিবদমান পক্ষের ক্ষেত্রে কার কথা গ্রহণ করা হবে, তা ঠিক করতে হয় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় ওয়াকিবহাল পক্ষের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি আগেই একটা পক্ষ বেছে নিয়েছেন। এটা গবেষকের উচিত নয়। জয়িতা অবজারভারদের বরাতে বলছেন, ভোটে কারচুপি হয়নি, কারণ অবজারভারেরা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। কিন্তু তাদের গ্রহণযোগ্যতা কী ছিল? তা কি তিনি জেনে নিয়েছিলেন?

শেষের প্যারায় তিনি ভায়োলেন্সের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে এটা ‘ডিসমিস’ করছেন। অথচ পরের বাক্যেই বলছেন, ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে (Considering the level of pre-poll violence) ভোটার আসে কি না সে শঙ্কা ছিল। এর মানে এবার জয়িতাই মেনে নিচ্ছেন যে, আসলে উল্লেখযোগ্য মাত্রারই ভায়োলেন্স সেখানে হয়েছিল। মোট কথা, তার গল্প মিলল না।

আবার ১৯ জন মারা গেছে দাবি করে তিনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এর মানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। আসলে এ কথার মানে হয় না। কারণ, ঠিক কতজন মারা গেলে কোনো নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে? এমন কোনো মাপকাঠি কি বলা আছে? আর এই মাপকাঠি কে দিয়েছে? আবার এই ১৯ জন কারা? কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে? এদের মধ্যে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু কয়জনের? সে খোঁজ কি নেয়া হয়েছে? অথচ ‘১৯ জন মরেছে- শান্তিপূর্ণ ভোট হয়নি।’ এসব মুখস্থ বলছেন যেন তিনি। কোনো সিরিয়াস মানুষ এভাবে মুখস্থ বলে দেয় না।

আবার তার লেখায় (শেষের দিক থেকে গণনায়) চতুর্থ প্যারায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে বাধা’ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি বিরোধীদের তোলা অভিযোগ নাকচ করেছিলেন জয়িতা। কেন? সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। জয়িতার লেখা পড়ে মনে হয়েছে ‘ব্রিফিং ঠিক রাখতে, ভাষ্য ব্যালেন্স করতে গিয়ে তিনি তাল হারিয়ে ফেলেছেন। কারো ভাষ্যের ব্রিফিং ঠিক রাখা, সেই তালে কথা বলা কোনো গবেষকের কাজ হতে পারে না। এভাবে তিনি নিজেই নিজের কাজের মান প্রকাশ করলেন।

রাধা দত্তের লেখা :
তার লেখার চার ভাগের তিন ভাগই হলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে তার নর্থইস্টকে করিডোর দিয়ে ভারতের কত কী উন্নতি করে দিয়েছেন এরই ফিরিস্তি। কিন্তু এর সাথে বাংলাদেশের নির্বাচন বা শেখ হাসিনার বিজয়ের সম্পর্ক কী? অথবা এটা কি বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নের গল্প? তা নয়, অর্থাৎ অপ্রাসঙ্গিক। শেষের একটা প্যারায় এক অদ্ভুত কথা আছে। লিখেছেন- ‘বিএনপি নিজেই দায়ী।’
রাধা সবচেয়ে কড়া এক বাক্য লিখেছেন। সে কথাটি হলো, আওয়ামী লীগের জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পেল আর বিএনপি জোট মাত্র সাতটি পেল; এটা '(looks unconvincing)', ‘মনে হচ্ছে আমি মানতে পারলাম না’।

কিন্তু তিনিই শেষের দিকে বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ওয়াকওভার দিয়েছে।(this time around they have none to blame for their dismal performance. Even if one accepts the allegations of executive overreach, HasinaÕs intolerance, and her increasing repressive ways towards any contrarian views, the opposition had really bound themselves into a corner.)

অর্থাৎ বলছেন- ‘এবারো খারাপ ফলাফলের জন্য অন্যকে দায়ী করতে পারে না। যদি নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, ক্রমবর্ধমান বিরোধী মত দমন এসব অভিযোগ যা-ই ঘটুক তা সত্ত্বেও বিরোধীরা নিজেই নিজেদের এক কোনায় বন্দী করেছে।’
এটি কি অর্থপূর্ণ কথা, না স্ববিরোধী? দুঃখিত, বুঝতে অপারগতা জানাচ্ছি।
এ কারণেই, শুরুতে বলেছি বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে অর্থপূর্ণ অন্তত কয়েকটা বাক্যও লিখে জানাতে বেশ বিপদেই ফেলে দিয়েছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ