২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

জোট, নির্বাচন ও রাজনীতির কথা-১

জোট, নির্বাচন ও রাজনীতির কথা-১ - ছবি : নয়া দিগন্ত

একটি মিটিংয়ের ব্যতিক্রমী গুরুত্ব
২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের মিটিং মাঝে মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়, কোনো কোনো সময় দু-তিন সপ্তাহ পরপর, কোনো কোনো সময় দু-তিন মাস পর পর, কোনো কোনো সময় এই রূপ মাঝামাঝি গ্যাপে। ঈদুল ফিতর হয়েছে ১৬ জুন ২০১৮ তারিখে। ঈদের পর ষষ্ঠ দিনে ২২ জুন বেলা ১১টায় চেয়ারপারসন কার্যালয়ে শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ছিল। এ বৈঠকটির উপস্থিতি বেশি উজ্জ্বল ছিল না। উজ্জ্বল না থাকার কারণ সম্ভবত ঈদের ছুটি ও ঈদ-পরবর্তী আধা সামাজিক, আধা রাজনৈতিক ব্যস্ততা। আমি ব্যক্তিগতভাবে ওই দিন (২২ জুন ২০১৮) উপস্থিত থাকতে পারিনি; কারণ আমি আমার নির্বাচনী এলাকায় (চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলা) ছিলাম। ওই দিন উপস্থিতি যেমন অনুজ্জ্বল ছিল, আলোচনার উপসংহারগুলোও অসমাপ্ত ছিল। এ দিন আলোচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী নির্বাচন বা প্রার্থী মনোনয়ন। ২২ জুন সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০ দলীয় শীর্ষ নেতাদের আগামী বা পরবর্তী বৈঠকে এটা স্থির করা হবে। এ প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ জোটের মেয়র প্রার্থী মনোনয়ন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনার জন্য বিগত ২৭ জুন বিকেল সোয়া ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়টিতে ঢাকার গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে এরূপ একটি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিতি উজ্জ্বল ছিল, আলোচনা প্রাণবন্ত ছিল, উপসংহার সুসংগঠিত ও সুসংহত ছিল। এ মিটিংটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল; অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে। কারণ, এমন কিছু কিছু বিষয় এই মিটিংয়ে আলোচিত হয়েছে, যেগুলো সচরাচর হয় না।

প্রার্থী ঘোষণা বনাম মিটিং
তিনটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হবে, এমন ঘোষণা নির্বাচন কমিশন দিয়েছে বেশ কয়েক দিন আগেই। অতএব, প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল খুবই স্বাভাবিকভাবে মেয়র প্রার্থী বেছে নেয়ার কাজটি সময়মতো শুরু করে দেয়। আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে যাবো না। বিএনপি, নিজস্ব প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত প্রক্রিয়ায় কাজটি শুরু করে। বরিশাল ও রাজশাহীর মেয়র প্রার্থী বেছে নেয়ার পরই নামগুলো ঘোষণা করে দেয়। কিন্তু সিলেটের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি, কারণ প্রার্থী বেছে নেয়ার কাজটি সময় নিচ্ছিল; এরূপ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজে সময় লাগাও স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে ২৬ জুন ২০১৮ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের গুণাগুণ নিয়ে এই কলামের পাঠককে নতুন করে আমার পক্ষ থেকে কিছু বলার নেই। যা বলব তা পুরনো কথা। নতুন কথা হলো, ভোটকেন্দ্র দখল, অবৈধ ভোট প্রদান, পোলিং এজেন্টকে বিতাড়িত করা ইত্যাদি কাজের কিছু নতুন ধারা বা নমুনা ২৬ তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কূটকৌশলের সৌজন্যে।

সিলেটের মেয়র প্রসঙ্গে আসি। গাজীপুর নির্বাচনের পরের দিন ২৭ তারিখ মোটামুটি দুপুরের দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন বা প্রেস ব্রিফিং করা হয় এবং সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকে সিলেটের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়- আরিফুল হক। কলামের ঠিক এ পর্যায়ে আমার পক্ষ থেকে আরিফুল হককে অভিনন্দন। কারণ, তার দল তাকে বেছে নিয়েছে এবং আমার মতে তিনি একজন সংগ্রামী জনপ্রিয় মেয়র ছিলেন। ২৭ তারিখের বিএনপির একই প্রেস ব্রিফিংয়ে গাজীপুর নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা হয়, নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা তুলে ধরা হয়; এগুলো আমাদের এবং আমারও মনের কথা। একই প্রেক্ষাপটে এটাও ঘোষণা করা হয়, বিএনপি আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করবে। এ প্রেক্ষাপটেই ২৭ জুন বিকেল সোয়া ৪টার পর ২০ দলীয় জোটের মিটিংয়ে আলোচনাটি ওঠে। আলোচনার গুরুত্বের দু’টি আঙ্গিক আছে। প্রথম আঙ্গিক এই যে, একই দিনে কয়েক ঘণ্টা আগে বিএনপির প্রেস ব্রিফিংয়ে দেয়া ঘোষণাগুলো ২০ দলীয় জোটের মিটিংয়ের পরে দিলে ভালো হতো এবং রাজনৈতিক কৌশলগতভাবে মর্যাদাপূর্ণ হতো। দ্বিতীয় আঙ্গিকটি হচ্ছে আলোচনার পর উপস্থিত ২০ দলীয় নেতৃবর্গ তিনটি সিটি করপোরেশনের জন্য বিএনপি কর্তৃক মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের অনুকূলে সর্বসম্মত সমর্থন প্রকাশ করেন। তবে একটি নোট এখানে রাখতেই হয়; ২৭ জুন বিকেলে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের এই গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি শুরুর দিকে ৫ মিনিট মাত্র উপস্থিত ছিলেন; সভাপতির অনুমতি নিয়ে বা সভাপতিকে অবগতি দিয়েই জরুরি কাজের প্রয়োজনে তিনি অব্যাহতি নেন। অতএব সর্বসম্মত সিদ্ধান্তটি হয়েছে জামায়াতের প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে। তবে সর্বসম্মতভাবে আশা প্রকাশ করা হয়, বিএনপির উচ্চতম পর্যায়ের সঙ্গে জামায়াতের উচ্চতম পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে সিলেটের মেয়র প্রার্থী নিয়ে উভয় দলের মধ্যকার বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসন করা হবে বা করা সম্ভব হবে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা
যদিও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের ২৭ জুনের বৈঠকের দু-চার ঘণ্টা আগেই জাতির উদ্দেশে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করবে। তবু শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অ্যাডভান্টেজ ও ডিসঅ্যাডভান্টেজগুলো তথা অংশগ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তিগুলো তথা অংশগ্রহণের রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধাগুলো আলোচিত হয়। ওই আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বাস করেননি বা আশাও করেননি যে, ২৭ জুন বিকেলের আলোচনার মাধ্যমে ২৭ জুন সকালের সিদ্ধান্ত রদবদল করা হবে। ২৭ তারিখ বিকেলে আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা এটুকু আশা করেছেন, বিষয়টি সম্পর্কে যেন একটা স্বচ্ছ ধারণা উপস্থাপিত হয়। এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এখানে তুলে ধরব। আলোচনার এক পর্যায়ে একটি কথা বলা হয়। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে যেমন প্রার্থী ছিল, তেমনি জামায়াতের পক্ষ থেকেও প্রার্থী ছিল। অনেক আলাপ-আলোচনার পর, মোটামুটি উদ্বেগপূর্ণ সময় পার করার পর জামায়াতের প্রার্থী তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছিলেন বিএনপি প্রার্থীর অনুকূলে। ২৭ জুন বিকেলে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে একাধিক নেতা এ কথাটি আলোচনায় আনেন এরূপভাবে : মনোয়নপত্র দাখিলের আগেই জোটের মধ্যে সিদ্ধান্ত হওয়া প্রয়োজন; এটা সম্ভব না হলে জোটের ভেতরে এবং জোটের ভোটার ও শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে উদ্বেগ ও দোদুল্যমানতা কাজ করে। অর্থাৎ গাজীপুরের মতো পরিস্থিতি যেন সিলেট, রাজশাহী বা বরিশালে না হয়; এটাই ছিল আলোচকদের কামনা। ঠিক এ সূত্র ধরেই একাধিক আলোচক জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গটি আনেন। পরের অনুচ্ছেদে কথাটি ব্যাখ্যা করছি।

জাতীয় নির্বাচন : ইয়েস অথবা নো
গাজীপুর নির্বাচনের শুরুতে যেমন জোটের মূল শরিকের প্রার্থী এবং জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে নিয়ে দ্বন্দ্ব, ডায়লেমা বা সঙ্কট ছিল; ওইরূপ সঙ্কট, ডায়লেমা বা দ্বন্দ্ব যেন জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনী আসনে না হয়; তার জন্য কী করা যায়, এই আলোচনা শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে উঠে আসে। আলোচকেরা বলেন, সময় থাকতেই এ বিষয়ে ২০ দলীয় জোটে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারলে ভলো। আলোচকেরা বলেন, দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলনই হলো প্রথম অগ্রাধিকার, কিন্তু যুগপৎ অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া চালু থাকতেই পারে। এ কথার পিঠে বা এ কথার সূত্র ধরেই আরো মজার কথা উঠে আসে। মজার কথা না বলে, গুরুত্বপূর্ণ কথাও বলা যায়। সেই মজার কথা বা গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, বিএনপি বা ২০ দলীয় জোট আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না, করা উচিত কি না। যদি অংশগ্রহণ করে, তাহলেই মাত্র জোটের একাধিক দলের একাধিক প্রার্থীর মধ্যে সঙ্কট বা ডায়লেমা ফুটে উঠতে পারে। যদি অংশগ্রহণ না করে, তাহলে এই সঙ্কট বা ডায়লেমা প্রসঙ্গটি অবান্তর। সম্মানিত পাঠক, আপনি নিজেকে নিজে বিগত জুন মাসের ২৭ তারিখ বিকেলবেলায় নিয়ে যান, নিজে মনে করুন ২০ দলীয় জোটের একজন অন্যতম শীর্ষ নেতা আপনি এবং আপনি আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন অথবা আলোচনা শ্রবণ করছেন।

কলামের শুরুতেই বলেছিলাম, ২৭ জুন ২০১৮ তারিখের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তথা ব্যতিক্রমীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি দু’টি শব্দ ব্যবহার করেছি ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যতিক্রমী এ জন্য যে, কয়েকজন আলোচক এবং সেই আলোচকদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা সভার সভাপতি তথা বিএনপির সংগ্রামী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৪ সালের আগে-পরের জাতীয় পর্যায়ের ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিঞ্চিত ব্যাখ্যা করেন এবং বর্তমান (২০১৮) জাতীয় পর্যায়ের ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন। একাধিক আলোচক আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা করেন এবং সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি মহাসচিব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। এ রকম কিঞ্চিত আত্মসমালোচনামূলক, কিঞ্চিত ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে সচরাচর হয়নি। আরো একটি কারণে ব্যতিক্রমী শব্দটি ব্যবহার করেছি; ওই বিকেলবেলার সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা নির্ধারিত ছিল না।

কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আলোচনা করতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গটি আসে এবং আসায় ভালো হয়েছে, আসায় লাভ হয়েছে, আসার কারণে অদূর ভবিষ্যতে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের শুভাকাক্সক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাবেন বলে আমার মনে হয়েছে। এই কলামে তথা আজকে আমি এর বেশি ব্যাখ্যা দেয়া উপযুক্ত মনে করছি না; অদূরভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ আলোচনা করব। ২৭ জুন বিকেলবেলার ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের আলোচনার প্রসঙ্গে কেউ যেন মনে করেন না যে, শুধ্ইু নির্বাচনে যাওয়া বা না যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কম হোক বেশি হোক, সরকারের বাইরে বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল বা জোটগুলোর সঙ্গে বিএনপির বা ২০ দলীয় জোটের একাত্মতার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে জেলখানা থেকে মুক্ত করার জন্য আইনি লড়াইয়ের বাইরে বা আইনি লড়াইয়ের অতিরিক্ত রাজপথের আন্দোলন সম্বন্ধেও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ২০ দলীয় জোটের বাইরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক মিত্র বা দেশনেত্রীর মুক্তির আন্দোলন নিয়ে এখানে আজ আর কিছু লিখছি না।

নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বা না করা
নির্বাচনে অংশগ্রহণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোনো কোনো সময় তথা স্থান-কাল-পাত্র মোতাবেক, নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করাও গুরুত্বপূর্ণ। ঢালাও কোনো নীতিমালা প্রযোজ্য নয়। এই অনুচ্ছেদের আলোচনা এরূপ উভয় দিকের। নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা পেতে হলে অপেক্ষা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা মানে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ডিসেম্বর ২০০৮ সালের নির্বাচনে যদি অংশ না নিতাম, তাহলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরবর্তী সুযোগ হতো ২০১৩ সালের শেষে অথবা ২০১৪ সালের শুরুতে। বাস্তবে ওই নির্বাচনটি ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়। ২০ দলীয় জোট, জোটগতভাবেই ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষমতাসীন অঙ্গন থেকে যথেষ্ট প্রত্যক্ষ ও কৌশলগত আহ্বান পাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিসহ কয়েকটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, ২০ দলীয় জোটের প্রতি আনুগত্যে অবিচল থেকেছিল এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এরা অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে যদি অংশগ্রহণ না করতাম, প্রস্তুতি নেই এই অজুহাতে- তাহলে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির জন্য কথাটা দাঁড়াত এ রকম যে, এ দলটি সাড়ে আট বছরে কোনো দিন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে পরিচিত হয়নি। লোকে বলত, এরা কাগজ-কলমে দল, মাঠে-ময়দানের দল নয়; নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে সুপরিচিত থাকার কারণে আমি বা আমার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা নির্বাচন প্রসঙ্গে কোনো আলোচনায় হাওয়ার ওপরে মন্তব্য করিনি। চাপাবাজি করতে হয় না, বাস্তবসম্মত গঠনমূলক কথা বলতে পারি এবং সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারি। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে সুপরিচিত থাকার কারণে গত তিন-চার বছরে যত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যথা- সিটি করপোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সবগুলোতেই আমরা গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পেরেছি। সেজন্য আমার একটা শিক্ষা হলো, গঠনমূলক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সুযোগ আসা মাত্রই সে সুযোগ গ্রহণ করা উচিত। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই সুযোগ বারবার আসে না।

আমার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা কী ও কেন?
আমার অবসরজীবনের বয়স ২২ বছরের অধিক। আমি পত্রিকায় কলাম লিখি প্রায় ২১ বছর ধরে। এই ২১ বছরে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কলামগুলোর মধ্য থেকে নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ কলামগুলোর সাতটি সঙ্কলন পাঁচজন ভিন্ন প্রকাশক গত ১৫ বছরে প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ আমার কলামের সঙ্কলন আছে সাতটি। অপর দিকে মোটামুটি মৌলিক বিষয়ে আমার লেখা বইয়ের সংখ্যাও সাতটি। এই মোট ১৪টি বইয়ের মধ্যে ১১তম বইয়ের নাম ‘মিশ্রকথন’; প্রকাশক অনন্যা। এই মিশ্রকথনের সর্বশেষ তিনটি অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে, আমি কেন রাজনীতিতে প্রবেশ করলাম, আমি কেন দল করলাম এবং আমার মোটামুটি রাজনৈতিক দর্শন কী? আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যক্তি, একটি ছোট দলের চেয়ারম্যান; অতএব, আমার চিন্তাভাবনা আরেকজনকে জানতেই হবে এমন কথা অবান্তর। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির মনে আগ্রহ থাকে, সে জন্যই কথাটি বলে রাখা। বাংলাদেশের অনলাইন বই বিক্রেতাদের কাছ থেকেও এ বইটি পাওয়া যাবে এবং ই-বুক হিসেবেও পড়া যাবে। রাজনীতিতে প্রবেশ তথা সূর্যোদয় বা আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল ২০০৭ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখে।

প্রতিষ্ঠালগ্নেই দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র প্রকাশ বা উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তী ৮-৯ মাস আমি সারা দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সফর করেছিলাম দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত ও বিস্তৃত করার জন্য। ৮-৯ মাসে ২৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি সফর করেছিলাম নিজের গাড়ি নিয়ে, সব সময় কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে। অতঃপর নির্বাচন কমিশনের কাছে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলাম। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আমরা নিবন্ধন পাই; নিবন্ধন নম্বর ০৩১ এবং দলীয় মার্কা হাতঘড়ি। এই মার্কা নিয়ে আমরা ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি ৩৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে। সব আসনেই আমাদের দলের প্রার্থীরা পরাজিত হন। পরাজিত হবো, এটা নির্বাচনে যাওয়ার আগেই আমরা আঁচ করেছিলাম; তার পরও খুশিমনে নির্বাচনে গিয়েছিলাম। নির্বাচনে যাওয়ার জন্য আমাদের দল পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না; তথাপি আমরা নির্বাচনে গিয়েছি। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ ছিল। কারণটি হলো, অভিজ্ঞতা অর্জন। নির্বাচন হলো, রাজনীতির প্রাণের স্পন্দনের মতো। নির্বাচনবিহীন রাজনীতি মৃতপ্রায় নদীর পানির মতো। এখন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে আমরা আবারো একটি পার্লামেন্ট নির্বাচনের মুখোমুখি। সমাগত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট বা বিএনপি বা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি অংশগ্রহণ করবে কি করবে না, সেটার উত্তর এক কথায় বা এক বাক্যে দেয়ার উপযুক্ত সময় এখন নয় বা উপযুক্ত স্থান আজকের এ কলামটি নয়।

আমার উদ্বেগ ও আশা
একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এরূপ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে আমি উদ্বিগ্ন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং আংশিকভাবে হতাশও। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের এক জায়গায় বলেছেন, ‘লা তাকনাতু মির-রাহমাতিল্লাহ’; অর্থাৎ ‘তোমরা আমার রহমত থেকে নিরাশ হইও না।’ আমার চিন্তা জগতের গভীরে, আমার মনের নিভৃতে টিম টিম করে একটি আশা, একটি সম্ভাবনার কথা এখনো প্রজ্বলিত। আমি এখনো অনুভব করি, কোনো-না-কোনো দিন আল্লাহ তায়ালা বাংলাদেশীদের প্রতি এবং বাংলাদেশের প্রতি দয়া করবেন। এ প্রসঙ্গে দয়ার অনেকগুলো মানে হতে পারে; একটি মানে হলো সৎ, মেধাবী, সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষ রাজনীতির মাধ্যমে দেশসেবার সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশে এখন মেধাবী, সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষেরা রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হতে মোটেই আগ্রহী নয়। বিভিন্ন নিয়মে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়, বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে, রাজনীতি নামক পেশা বা কর্মযজ্ঞকে এমন দূষিত, পঙ্কিল, দুর্গন্ধময় এবং দেশের জন্য এমন অনুৎপাদনশীল করে ফেলা হয়েছে যে, সৎ বা দুর্নীতিবিরোধী, মেধাবী ও দক্ষ এবং সাহসী ব্যক্তিরা রাজনীতিকে ঘৃণা করেন। দুর্নীতিবাজেরা রাজনীতির মাধ্যমে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ছদ্মবেশে, ব্যবসার ছদ্মবেশে অথবা চাকরির ছদ্মবেশে অথবা ছদ্মবেশ ছাড়াই বাংলাদেশকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। মাদকের ছোবলে, চোরাকারবারিদের কশাঘাতে এবং অপসংস্কৃতির তুফানে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, সামাজিক নৈতিকতা এবং সৎকর্মের মূল্যবোধ এখন ত্যাজ্য বিষয় হয়ে গেছে। বাংলাদেশ শাসনকারী বর্তমান রাজনৈতিক সরকার এ প্রক্রিয়ায় যুগপৎ অংশীদার ও অনুঘটক। গত ৪৭ বছরের বিভিন্ন সরকার বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য দায়ী তথা অবদান রেখেছেন এটা যেমন নিরেট সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, এই বহুমুখী অবনতি প্রক্রিয়ায় বর্তমান রাজনৈতিক সরকার এসব নেতিবাচক বিষয়কে শীর্ষে নিয়ে গেছে।

বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের আমলে ক্রমান্বয়ে বাজেটের আকার যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, যেমন মেগা প্রজেক্টের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যেমন জিডিপি উন্নত হয়েছে- তেমনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকে অবনতিও হয়েছে অতি লক্ষণীয়। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া প্রয়োজন। মহান আল্লাহ তায়ালা দয়া করলে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার কারণে এই পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদল হতেও পারে, এটাই মনের ভেতরে আশা। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি রাজনীতিকেই পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছি। রাজনীতিই ইবাদত, যদি নিয়ত পরিষ্কার হয়। আমি সৎ, সাহসী, মেধাবী ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান ও আবেদন রাখছি, রাজনীতিতে যদি গুণগত পরিবর্তন চান, তাহলে রাজনীতিমনস্ক হোন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল করা ফরজ নয়; নফল হতে পারে। আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই জোটের রাজনীতি বা নির্বাচনমুখী রাজনীতি নিয়ে ইনশাআল্লাহ লিখব। তবে মানুষের শরীরে অ্যাপেনডিক্স এবং অ্যাপেনডিক্সের ভূমিকা ও রাজনীতিতে অ্যাপেনডিক্স এবং অ্যাপেনডিক্সের ভূমিকা এই গল্প দিয়ে শুরু করব ইনশাআল্লাহ। 
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme