১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ব্রেক্সিট নিয়ে কোন পথে বরিস জনসন?

-

ইউরোপের অলিখিত মাতব্বরি নিয়ে ভালোই ছিল যুক্তরাজ্য। হঠাৎ করেই তাদের মাথায় উঁকি দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বের হয়ে যাওয়ার তথা ব্রেক্সিটের ভূত। সে জনমত যাচাই করতে গিয়ে সামান্য ব্যবধানে যে ফল উঠে আসে, তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না গণভোটের আয়োজকরাও। এর পরই শান্ত দেশটিতে যেন দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি শুরু হয়। বর্তমানে ব্রেক্সিটের পক্ষ-বিপক্ষ, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া এসব ইস্যু নিয়ে একেবারে লেজে-গোবরে অবস্থায়।

ব্রেক্সিট-কাণ্ড শুরু হওয়ার পর অসময়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন দুইজন প্রধানমন্ত্রী- ডেভিড ক্যামেরন ও থেরেসা মে। এখন ব্রেক্সিটের চূড়ান্ত টাইমলাইনের মুখে এসে ক্ষমতার জোয়াল চেপেছে বরিস জনসনের কাঁধে। এ বিষয়ে এসপার-ওসপার করতে হাতে সময় আছে দুই মাসেরও কম। এর মধ্যেই চুক্তিসহ বা চুক্তি ছাড়া যেকোনোভাবেই ব্রেক্সিট সারতে হবে।

এ দিকে চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হলে শুধু যে যুক্তরাজ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, ইইউর দ্বিতীয় বৃহৎ বাজার এই যুক্তরাজ্য। ফলে চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হলে এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই সংস্থাটির সদস্য দেশগুলো। ইইউ তাদের রফতানির ১৪ শতাংশ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্রে। আর ১২ শতাংশের বাজার যুক্তরাজ্য, যেখানে চীনে রফতানির হার মাত্র ৭ শতাংশ। ফলে ব্রেক্সিটের কারণে নিশ্চিত ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে ইউরোপের অন্য দেশগুলো।

ব্রেক্সিট ইস্যুতে দেশটি যতটা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় পড়েছে, নিকট অতীতে দেশটিতে এমন বিশৃঙ্খলা আর দেখা যায়নি। পক্ষে-বিপক্ষের সবাই তাগিদ দিচ্ছে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা বিষয়টি পার্লামেন্টে তুললেই সহযোগিতার অভাব দেখা গেছে প্রকটভাবে। কখনো কখনো ক্ষমতাসীন দলের এমপিরাও বিরোধীদের সাথে একমত হয়ে বিপক্ষে ভোট দিচ্ছে। কখনো বা কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রী একেবারে পদত্যাগ করছেন। ফলে ব্রিটিশ সরকার বলতে গেলে তার সময়মতো কোনো সমাধান বা সহযোগিতাই পায়নি পার্লামেন্ট থেকে।

এ অবস্থায় নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিসের কাছে সময় একেবারেই কম। অথচ প্রথম থেকেই ইইউ ত্যাগের পক্ষের একজন বরিস প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রতিশ্র“তি দেন, মরি-বাঁচি চুক্তিসহ বা চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবই। কিন্তু বিরোধীদলীয় বেশির ভাগ এবং ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির অনেক এমপিই চুক্তি ছাড়া ইইউ ছাড়তে নারাজ। তাদের আশঙ্কা, এমনটা হলে ব্রিটিশ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তারা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের সুযোগ বাতিল করতে আইন পাস করার হুমকি দেন। এমনকি এটা সম্ভব না হলে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ডাকার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন এমপিরা।

যদি ক্ষমতাসীনেরা এই অনাস্থা ভোটে হেরে যেত, তাহলে দেশটির ২০১১ ফিক্সড-টার্ম পার্লামেন্টস অ্যাক্ট অনুসারে ১৪ দিনের মধ্যে নতুন সরকার প্রতিস্থাপন করতে হতো। অথবা শেষ বিকল্প যেটি থাকত, সেটি হতো অনাস্থাপ্রাপ্ত ওই সরকার পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিত।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা করবিন সুযোগ পেলে নিজেকে অবশ্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তার মতে, তিনি যদি এ সুযোগ পেতেন, তাহলে সবার আগে যে কাজটি করতেন, তা হলো তিনি ব্রেক্সিটের জন্য ইইউর কাছে আরো কিছু সময় চেয়ে নিতেন। তারপর চুক্তিসহ ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়ে যেতেন তিনি। মূলত এ সবই ছিল সম্ভাবনার তালিকায়। কিন্তু সে অবস্থায় নাটকীয় এক সিদ্ধান্ত নেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি দেশটির রানী এলিজাবেথের সম্মতি নিয়ে ২৮ আগস্ট হঠাৎ করেই পার্লামেন্ট স্থগিত করার ঘোষণা দেন। এর অর্থ হচ্ছে, যখন ব্রেক্সিটের চূড়ান্ত করার বাকি আছে মাত্র আট সপ্তাহ, তখন পাঁচ সপ্তাহের জন্য ছুটিতে যাচ্ছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট।

আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর যখন ১৪ অক্টোবর পার্লামেন্ট খুলবে, তখন ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করতে ব্রিটিশ এমপিরা সময় পাবেন মাত্র ১৭ দিন! এত অল্প সময়ে চুক্তি ছাড়া যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগের বিষয়টি ঠেকানো তাদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। অবশ্য পার্লামেন্ট স্থগিতের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে জনসন জানিয়েছেন, নতুন উদ্যমে নতুন কর্মসূচি নিয়ে নতুন অধিবেশন শুরু করতে চান তিনি। তাই স্বাভাবিক তিন সপ্তাহের শরৎকালীন অবকাশের বদলে আগেভাগেই ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থগিত হয়ে যাবে চলতি পার্লামেন্ট অধিবেশন।

বরিসের এ পদক্ষেপের ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে তিনি কিন্তু আইনের বাইরে কিছু করেননি। সাধারণত একটি চলমান অধিবেশন শেষ হওয়ার পর পার্লামেন্ট স্থগিত করার নিয়ম। এভাবে হঠাৎ করে স্থগিত করে দেয়াটা অস্বাভাবিক, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু বরিস জনসনের সিদ্ধান্ত আইনত বৈধ।

জনসনের এই সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হবে, কেননা সরকার কার্যত কোনো আইন লঙ্ঘন করেনি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে। সরকার শুধু পার্লামেন্টের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। আর এ ক্ষেত্রে রানীর ভূমিকা তেমন নেই বললেই চলে। ব্রিটেনের রানীর অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে অভিমত দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা বেশ সীমিত। নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্ট স্থগিত করার জন্য সরকারকে রানীর অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এটা শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা।

ফলে বরিসের এই পদক্ষেপটিকে আইনের মারপ্যাচে ফেলে আটকানো যায়নি। তবে দেখার অপেক্ষা ছিল, হঠাৎ করেই বরিস জনসন কৌশল খাঁটিয়ে যেভাবে পরিস্থিতিতে নিজের পক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, বিরোধী পক্ষের হাতেও তেমন কিছু ছিল কি না। অপেক্ষায় বেশি সময় থাকতে হয়নি। গত মঙ্গলবারই বরিসের পদক্ষেপের মোক্ষম জবাব দিয়েছে জনসন-বিরোধীরা।

পার্লামেন্টে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট ঠেকাতে দলের প্রধানমন্ত্রী জনসনের বরখাস্ত করার হুমকি উপেক্ষা করে বিরোধীদের সাথে যোগ দেন ক্ষমতাসীন দলের ২১ জন এমপি। এতে ব্রেক্সিট বিষয়ক একটি ভোটাভুটিতে ৩২৮-৩০১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন বরিস জনসন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ভোটের পরপরই বিদ্রোহী এমপিদের বরখাস্ত করেন বরিস জনসন। তবে পার্লামেন্টে ওই প্রস্তাব তোলার আগে জনসন বলেছিলেন, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের সম্ভাবনা নাকচ হলে সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেবেন তিনি। সেক্ষেত্রে ১৪ অক্টোবর ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।

অবশ্য ভোটাভুটির আগেই বরিস জনসনের কট্টর ব্রেক্সিট কৌশলের বিরোধিতা করে ব্রেক্সিটবিরোধী লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলে যোগ দিয়েছিলেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের এমপি ফিলিপ লি। মঙ্গলবার বরিস জনসন যখন পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখছিলেন তখনই ফিলিপ লি আসন পরিবর্তন করেন। এর মধ্য দিয়ে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে বসে বরিস জনসনের সরকার। কারণ মাত্র একজনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল জনসনের সরকারের।

তবে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে, এটিই শেষ নয়। ব্রেক্সিট চূড়ান্ত হওয়ার আগে আরো অনেক কিছু দেখতে হতে পারে যুক্তরাজ্যবাসীদের। শেষ পর্যন্ত কী হবে তা জানতে অথবা ব্রেক্সিটের পরিণতি জানতে আরো দু মাস অপেক্ষা করতেই হচ্ছে বিশ্ববাসীকে।


আরো সংবাদ