১৭ জুন ২০১৯

সেই পথ অনুসরণ করে এ যুগে আমরাও সমাজের কালিমা দূর করতে পারব ইনশাআল্লাহ

অভেদ্য অন্ধকারে পথের দিশা - ছবি : সংগ্রহ

এ সুন্দর পৃথিবীর বাংলাদেশ নামের সুন্দর দেশটিতে আমরা সীমিত সময়ের জন্য ‘বেড়াতে এসেছি’; হানাহানি করতে নয়। কথাটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। যদি এটাই না হতো, তবে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে এত গোলযোগ হানাহানি, রক্তারক্তি ও খুনখারাবি কেন? দেশ ও সমাজ এমন ‘সাত সতীনের সংসার’ হয়ে উঠছে কেন? আমরা সমাজে ও রাষ্ট্রে নিয়মকানুন ও শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, রক্ষা ও মান্য করে চলতে ব্যর্থ হচ্ছি কী কারণে? অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির প্রতি আমাদের এত আকর্ষণ কেন? দিন দিন এটা বাড়ছে কেন? এক সময় আমাদের দেশ ও সমাজ এত উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল ছিল না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতা সব যুগেই ছিল, তবে এখন যেমনটা দেখা যাচ্ছে তেমন নৈরাজ্যকর অবস্থা আগে ছিল না। বর্তমানে মাদক সেবন করে বাবা-মাকে সন্তান খুন করছে কিংবা রাস্তায় বন্ধুকে বন্ধু প্রকাশ্যে কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে মারছে। প্রতিনিয়ত মানুষ গুম হচ্ছে, অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে, মানুষকে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে, যথেচ্ছ ব্যভিচার চলছে- এগুলো কি এতটা ব্যাপক হারে কোনো কালে আমাদের দেশে ছিল? নিশ্চয়ই নয়।

আরো বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শত চেষ্টা করেও এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বরং শোনা যায় এসব বাহিনীর কোনো কোনো বিপথগামী সদস্য এসবে জড়িয়ে যাচ্ছে। এসবই ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো কার্যকলাপ। এ জন্য আমরা কাকে দোষ দেবো, দেশের মানুষকে না সরকারকে? সরকার কি যারা দেশ পরিচালনা করে শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? বাবা-মা, সমাজপতি বা এ ধরনের যারা সমাজে আছেন; তাদের কি কোনো দায় নেই? নিশ্চয়ই আছে। দেশে যে প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতার রাজনীতি চলছে, এর দায় যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সরকার পরিচালনা করেন এবং যারা তাদের প্রধান বিরোধী পক্ষ তাদের ওপর কমবেশি বর্তায়। কারণ, রাজনৈতিক অঙ্গনেই এসব হানাহানি, বিশৃঙ্খলা ও খুনখারাবি বেশি। দেশের রাজনীতিকদের ভাষা, বক্তব্য ও কার্যকলাপ এসব করার জন্য প্রায় সবাইকে উসকে দিচ্ছে। যখন একটি রাষ্ট্র জাতীয় ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়, তখন অনিয়মের ঢল বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ছুটে আসে। কারণ, জাতীয় দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা-সমঝোতার সুযোগ তখন আর থাকে না। আমাদের দেশেও তা নেই।
ছোট্ট একটি অনুন্নত দেশ এটা। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বিশাল। রোজগারের সুযোগ-সুবিধা সীমিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিট নিয়ে ২০ থেকে ৪০ জন কাড়াকাড়ি করে। হলের সিট নিয়েও একই দশা। দলীয় রাজনৈতিক আনুগত্যের বিবেচনায় হলে স্থান পাওয়া নির্ভর করে। এ নিয়ে হানাহানি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা আজ প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। একটি পদের জন্য প্রতিযোগিতা করে বেশুমার চাকরি প্রার্থী। সুবিধাবঞ্চিত বেকার ও উপার্জনহীন লোকে দেশ ছেয়ে গেছে। কাকে রেখে কাকে সুযোগ দেয়া যায়? একজন নিয়মমাফিকও যদি সুবিধা পায়, ৩০-৫০ জন বেজার হতে হয়। বিক্ষুব্ধ হয়। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। এর ওপর আছে আগুনে ঘি ঢালার মতো নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। তাই কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না। নিয়ম মানে না।

বঞ্চনাবোধ তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। শুরু হয় আইন অমান্য করার আন্দোলন। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, খুনখারাবি। এসব দমনে এগিয়ে আসে সরকারের পক্ষ হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরু হয় বিক্ষোভকারী ও বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ। উভয় পক্ষে হতাহত হয়। কিন্তু সমস্যা আগের মতোই রয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে সমস্যার হয়তো সাময়িক উপশম হয় কিংবা তা-ও হয় না। চাপা আক্রোশে ফুঁসতে থাকে বঞ্চিতরা; কেউ বা হতাশায়।

তাদের সামনে কোনো আদর্শ নেই, ভবিষ্যৎ নেই। হতাশাগ্রস্তরা শরণাপন্ন হয় মাদকের কিংবা এর চেয়েও মারাত্মক অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। সমাজে স্বস্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। দেশের কর্ণধার রাজনীতিকেরা সেদিকে নজর দেন কমই। সরকার তাদের মনোযোগ ভিন্ন খাতে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। সবাই যেমন বলেন, সরকার কি তবে কেবল নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত? তা না হলে, এই দরিদ্র দেশে তাদের জীবনমান শনৈঃশনৈঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ও শ্রমিকদের দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করেও বেঁচে থাকার মতো ন্যায্য বেতন বা মজুরির দাবিতে রাস্তায় নামতে হয় কেন? কেন পুলিশের গুলি খেতে হয়? পুলিশকেই বা কেন তাদের হাতে নাস্তানাবুদ হতে হয়? এর উত্তর দেবেন কারা? নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা।

ভুললে চলবে না, এ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করে। তাদের বেশির ভাগই মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল বা কলেজ সার্টিফিকেট হাতে অথবা শ্রমিক বেশে যখন শহরে প্রবেশ করে, তারা শহরের জাঁকজমক দেখে অবাক হয়ে যায়। শহরের এই গাড়ির বহর, সুরম্য অট্টালিকা তাদের নয়- এটা তারা অনুভব করে বা তাদের অনুভব করতে দেয়া হয়। পেছনে ফেলে আসা বাবা-মা, ভাইবোন অভাবে দিনাতিপাত করছেন। তারা হতাশ হয় এতে। হতাশা থেকে তাদের মনে এক ধরনের বিদ্রোহের জন্ম নেয়। প্রায়ই শহরের রাজপথে এই দ্রোহের বিস্ফোরণ ঘটে। তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মানুষের তৈরি করা আইন বৈষম্যজনিত এই দ্রোহ দমাতে পারে না। কিন্তু সরকার বঞ্চিতের এ অনুভূতির ব্যাপারে বেখেয়াল! তাই তাদের দমাতে পুলিশ লেলিয়ে দেয়া হয়।

আসলে পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের দৈত্য বা ভূত আমাদের এই ছোট্ট এবং সব অর্থেই দরিদ্র দেশটিতে জেঁকে বসেছে। বাংলাদেশে বিত্তবান ছোট অথচ প্রবল ক্ষমতাধর একটি শ্রেণী তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এদের বিচরণ অবাধ ও নিরঙ্কুশ। শ্রম-ঘামে সিক্ত খেটেখাওয়া মানুষের উৎপন্ন দ্রব্যাদি ও সাধারণ জনগণের সেবা ঔপনিবেশিক শক্তির মতো তারাই ভোগ করছে। ওদের একমাত্র লক্ষ্য ক্ষেত্রভেদে মুনাফা লুট আর দুর্নীতি করা। কৃষক-শ্রমিককে তারা নিজেদের আত্মীয় মনে করে না। এই শ্রেণীটি প্রতিদিন যে ডলার গোনে তা যে এ দেশেরই রক্ত-ঘাম ঝরানো শ্রমিকের ও সাধারণ মানুষের সন্তানদের শ্রমেরই ফসল, তা তারা উপলব্ধি করে না। তারা কেবলই হিসাব দেখায়- দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০-৩৪ বিলিয়ন ডলার। একবারও বলে না, এটা কাদের অর্জন ও উপার্জন। কাদের শ্রমের বিনিময়ে এ প্রাপ্তি? তারা ভোগ করে, কিন্তু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।

আজ আর শ্রমিক শ্রেণী ও সাধারণ জনগণ অন্ধ বা অসচেতন নয়। তাদের ‘চোখ ফুটেছে’। স্বাভাবিক কারণেই তারা বঞ্চনার প্রতিবাদ করে, কোনো সময় ভাঙচুর করে। ঔপনিবেশিক আমলে আমরা জাতিগতভাবে অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা, নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছি। যেসব রাজনীতিক আজো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করছেন, তারা কি দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতে আন্দোলন করেননি? তা না হলে দেশটা স্বাধীন হলো কিভাবে? প্রতিনিয়তই সরকার রেডিও-টেলিভিশনে নতুন প্রজন্মকে সেসব কাহিনী শোনাচ্ছে। তারা আমাদেরই উত্তরসূরি। প্রতিবাদী বীরের রক্ত এদের ধমনিতে প্রবাহিত। আমরা এদের দোষ দেবো কিভাবে?

আমাদের দেশ আজ শুধু শ্রেণিবিভক্তই নয়, রাজনৈতিকভাবেও বিভক্ত। এর কুফল আমরা ভোগ করছি। সামাজিক শান্তির লক্ষ্যে এ ভুল আমাদের শোধরাতে হবেই। যারা অভিভাবক তাদের একটি বড় দোষ হলো, তারা সবুর করতে বা সংযত হতে নিজেরা যেমন পারেন না, তেমনি উত্তরসূরিদেরও তা শেখান না। ন্যায়-অন্যায়ের মতো ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো সমাজ থেকে আমরা বিদায় করে দিয়েছি। আমাদের আত্মা আজ শুষ্ক, অকর্ষিত। মানবপ্রেম ও মানবতাবোধ এখন নির্বাসিত। এসব বিষয়ে পণ্ডিতদের অংশগ্রহণে বড় বড় সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হচ্ছে। কিন্তু সব মানবিকতার উৎস যে ধর্ম, তা মধ্যযুগীয় বা মৌলবাদ বলে পাশ্চাত্যের অনুকরণে উপেক্ষিত হচ্ছে। অথচ এককালে ধর্মই ছিল প্রাচ্যের সমাজে মানববন্ধনের মূলমন্ত্র। বর্তমানকালে আমরা দেখছি, দেশে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা আছে; কিন্তু এর আমল নেই বা থাকলেও খুম কম। এর ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে।

পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার অস্থিরতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের অবহেলা ও বঞ্চনার রোগটি আমদের পেয়ে বসেছে। পাশ্চাত্যের মতো আমাদের সমাজের মানুষও একে অন্যের অনাত্মীয় হয়ে সবাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। পাশ্চাত্য সমাজের মতো আমাদের সমাজের মানুষ কেবলই বস্তু আহরণের প্রতিযোগিতায় উন্মত্ত। এই প্রক্রিয়ায় জনগণ একে অন্যের ঘোষিত বা অঘোষিত শত্র“তে পরিণত হচ্ছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক গুণের পাশে এটিই বড় দোষ। পাশ্চাত্যের অগ্রসর অর্থনীতিতে এই দোষ তারা কিঞ্চিৎ সামাল দিতে পারলেও আমরা পারছি না। এই একটি আমাদের ভালোভাবে পেয়ে বসেছে। সমাজে নিখাদ ধর্মচর্চা নেই বলে ধর্ম আজ আর কাক্সিক্ষত দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। পাশ্চাত্য ধর্মকে ভয় পেতে শিখিয়েছে। প্রকৃত ধার্মিকদের ‘মৌলবাদী’ ও ‘জঙ্গিবাদী’ বলে ভয় পেতে শিখিয়েছে। আমাদের এ উচ্ছৃঙ্খল জীবনধারা কে সামাল দেবে? রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী? তা তারা পারছে না। এটা আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।

অস্ত্রব্যবসায়ী পাশ্চাত্য দেশ এবং তাদের অনুগত বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের পরামর্শ নয়, প্রাচ্যদেশীয় বিশুদ্ধ ধর্মাচারই আমাদের সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে পারে। আজ নেতাদের স্মরণ করতে হবে, ‘তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ করো না, যারা আল্লাহর অনুগ্রহের বদলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং নিজেদের জাতিকে ধ্বংসের স্তরে নামিয়ে এনেছে?’ (সূরা ইবরাহিম ১৪, আয়াত ২৮)। দেশে ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা আমাদের যা-ই শেখাতে চান না কেন, আমাদের অনুধাবন ও অনুসরণ করতে হবে, রাসূল সা:-এর অমিয় বাণী, ‘আল্লাহর শান্তির অর্থ- তাঁর ইচ্ছার কাছে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পিত করা। মানুষের শান্তির অর্থ- এমন জীবনযাপন করা, যা কোনো মানুষের শান্তি বিনষ্ট হওয়ার কারণ না হয়।’ (বুখারি ২/৩)। এই পথ অনুসরণ করে ইসলামের সুবর্ণ যুগে মুসলমানেরা রোমান ও পারস্য সমাজের ঘোর অমানিশা দূর করতে পেরেছিল; সেই পথ অনুসরণ করে এ যুগে আমরাও সমাজের কালিমা দূর করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক,
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার


আরো সংবাদ