১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভবিষ্যৎমুখী আদর্শ

-


ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যে আদর্শ আমরা চাই তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা একটি ভবিষ্যৎমুখী আদর্শ অর্থাৎ তা বর্তমানের মধ্যে নিজেকে সীমিত না রেখে সবসময় ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ রাখে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ইসলামি আন্দোলন ভবিষ্যতের ব্যাপারে যতœবান। কেননা তা ইসলামেরই যৌক্তিকতা এবং কুরআন ও সুন্নাহতে এ যৌক্তিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।

আল-কুরআন ও ভবিষ্যৎ
পবিত্র কুরআন মনোযোগসহকারে অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে মক্কি যুগ থেকে আল কুরআন মুসলমানদের এক উজ্জীবিত ভবিষ্যতের দিকে আকৃষ্ট করে বলেছে, বিশ্বে পরিবর্তন ঘটছে এবং পরিস্থিতিও পরিবর্তনশীল। সমকালের বিজয়ীরা বিজিত হচ্ছে, দুর্বলরা শক্তিশালী হচ্ছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রত্যেকেরই পালা থাকে।
মুসলমানদেরও নিজেদের ঘর গুছিয়ে প্রস্তুত হতে হবে পরিবর্তনের পালাকে বরণ করে নেয়ার জন্য, যা আজ হোক কাল হোক অবশ্যই আসবে, অনিবার্যভাবেই আসবে ইনশা আল্লাহ।
মক্কি সূরা আল কামারের ৪৫-৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা শক্তিশালী, অস্ত্রসজ্জিত, বিপুল সংখ্যার মুশরিকদের সম্পর্কে বলছেন : অচিরেই তারা অধিক সংখ্যায় পলায়ন করবে এবং তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। বরং কিয়ামত তাদের জন্য প্রতিশ্রুত সময় তাদের পূর্ণ প্রতিফলের জন্য এবং কিয়ামত অতি ভয়ঙ্কর ও অতি তিক্ততর।’
ইবনে কাছির তার বিখ্যাত তাফসিরে ইকরামার বরাত দিয়ে বলেছেন : ‘অচিরেই তারা অধিক সংখ্যায় পলায়ন করবে আয়াতটি যখন নাজিল হয় তখন ওমর ইবনে খাত্তাব রা: জিজ্ঞেস করলেন : কোন বিশাল বাহিনী পলায়ন করবে। বদরের দিনে আমি বর্মাচ্ছাদিত রাসূলুল্লাহ সা:-কে চলন্ত অবস্থায় দেখলাম। তিনি বললেন : অচিরেই তারা অধিক সংখ্যায় পলায়ন করবে। আমি তখনই এ আয়াতের তাৎপর্য উপলব্ধি করলাম।
এরূপ আয়াতের লক্ষ্য হচ্ছে, মুসলিম মানসকে অনিবার্য পরিবর্তন ও আসন্ন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পবিত্র কুরআনে সমসাময়িক দু’টি পরাশক্তির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের উল্লেখ দেখতে পাইÑ রোমান ও পারসিক এবং মক্কায় মুসলমান ও কাফেরÑ দুই গ্রুপই সংঘর্ষের ব্যাপারে উদ্বেগ পোষণ করত। এ প্রেক্ষাপটে আল-কুরআন মুসলমানদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমন দিন আসন্ন যখন আধিপত্য আহলে কিতাব রোমানদেরই হবে এবং অগ্নিপূজক পারসিকদের পরাজয় ঘটবে। যদিও আজ তারা বিজয়ী, কয়েক বছরের মধ্যেই তারা পরাজিত হবে। এ প্রসঙ্গে সূরা রূমের ১-৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : আলিফ লাম মীম। রোমানরা পরাজিত হয়েছে কয়েক বছরের মধ্যেই এক নিকটবর্তী স্থানে। এবং তারা তাদের এ পরাজয়ের পর শিগগিরই বিজয়ী হবে, পূর্বে ও পরের এখতিয়ার আল্লাহর হাতে। আর ওই দিন মুমিনরা আনন্দিত হবে আল্লাহ তায়ালার এ সাহায্যের জন্য। তিনি যাকে ইচ্ছে সাহায্য করেন। তিনি প্রবল পরাক্রমশালী পরম দয়ালু।
উল্লিখিত আয়াতগুলোতে আমাদের দু’টি দিকের প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছে :
১. মুসলমানেরা সংখ্যায় ও উপায় উপকরণে কম হলেও বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ, তাদের আশপাশের বৃহৎশক্তিগুলোর সংঘাত সংঘর্ষ এবং তাদের ওপর এ সংঘাতের ফলাফলের ব্যাপারে তারা বেশ সচেতন ছিল।
২. পবিত্র কুরআন এসব ঘটনা উল্লেখ করে পরিবর্তনের উপাদান ও বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে উত্তরণের দিকে মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
সূরা মুযযামমিলের শেষ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাহাজ্জুদ নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াতের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা: ও মুসলমানদের ওপর থেকে কড়াকড়ি শিথিল করার কথা বলেছেন। কেননা তাদের শত্রুর সাথে মোকাবেলা করতে হচ্ছিল। এসব শত্রু মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আল্লাহর পথে অগ্রযাত্রা ব্যাহত করছিল। ফলে মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেয়া এ সংঘর্ষের মোকাবেলার জন্য তাদের শক্তি সঞ্চয় করা আবশ্যক ছিল।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনার প্রভু জানেন, আপনি ও আপনার সঙ্গীগণের মধ্যে কিছু লোক ইবাদতের জন্য রাতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং কখনো অর্ধরাত্রি, আবার কখনো রাতের এক-তৃতীয়াংশ দণ্ডায়মান থাকেন। আর রাত ও দিনের পূর্ণ পরিমাণ আল্লাহই করতে পারেন। তিনি জানেন, আপনারা সারা রাত ধরে ইবাদত করতে সক্ষম নন। অতএব, তিনি আপনাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং যে পরিমাণ কুরআন সহজে তেলাওয়াত করা যায় তেলাওয়াত করুন। তিনি অবগত আছেন, তোমাদের মধ্যে কতক পীড়িত হবে, আর কতক জীবিকান্বেষণের জন্য দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করবে। আর কতক আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। সুতরাং যে পরিমাণ কুরআন সহজে তেলাওয়াত করা যায়, তেলাওয়াত করুন (সূরা মুযযামমিল : ২০)।

সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি
মনোযোগ সহকারে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সিরাত অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ সা: তাঁর দাওয়াতের ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন না। বরং আল্লাহ প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা ও উপায়-উপকরণের আলোকে ভবিষ্যতের জন্য সবসময় চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা করতেন।
হজ মওসুমে রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রচেষ্টা ও তৎপরতা সম্পর্কে পড়াশোনা করলেই তা বোঝার জন্য যথেষ্ট হবে। হজের সময় আরবের সব গোত্র সমবেত হতো এবং রাসূলুল্লাহ সা: তাদের কাছে কিভাবে দাওয়াত পেশ করতেন, তিনি তাদের সাহায্য কামনা করতেন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সম্পদ প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এ থেকেই বোঝা যায়, ভবিষ্যতের দিকে তার দৃষ্টি কতটা প্রসারিত ছিল।
রাসূলুল্লাহ সা: দু’টি প্রধান নীতিতে বিশ্বাস করতেনÑ
প্রথমত, অবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, কেননা পরিবর্তনের কারণ বিরাজমান ছিল। বিদ্যমান পরিস্থিতির বিকল্পই ছিল ইসলাম। অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে ঊষার আলো উদ্ভাসিত হবেই। সুতরাং, মুসলমানদের দৃঢ়পদ ও সহিষ্ণু হতে হবে এবং যথাযথ সময় হওয়ার আগেই ফলাফলের আশা করা ঠিক হবে না।
মক্কায় রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাথীদের বিশেষ করে দুর্বল শ্রেণীর ওপর কাফেরদের অত্যাচার এত বেড়ে গেল যে, খাব্বাব ইবনে আরাত রা: রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে এসে ফরিয়াদ জানালেন এবং সাহায্য চাইলেন। রাসূলুল্লাহ সা: তখন কাবা ঘরের ছায়ায় ঘুমাচ্ছিলেন। খাব্বাব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সাহায্য চাইবেন না? আপনি কি আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন না? রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কোনো কোনো লোককে ধরে নিয়ে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়েছে, অতঃপর তাদের মাথার খুলি করাত দিয়ে ভাগ করা হয়েছে, লোহার চিরুনি দিয়ে তাদের হাড় থেকে মাংস আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও তাদের দ্বীন থেকে বিমুখ করা যায়নি। আল্লাহর শপথ, তিনি ইসলামি দ্বীনকে প্রভাবশালী করবেন এমনভাবে যে, একটি কাফেলা সানা থেকে হাদ্রামাওত (ইয়েমেন) পর্যন্ত সফর করার সময় কেবল আল্লাহকে ভয় করবে। অবশ্য কাফেলার পাহারাও দেবে যাতে নেকড়ে বাঘ তাদের ভেড়ার পালে হামলা না চালায়। কিন্তু তোমাদের ধৈর্য নেই, সেই সত্য বাস্তবে দেখার জন্য প্রতীা করবে।’ (বুখারি)
দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহ সা: বিশ্বাস করতেন এ কাক্সিত ভবিষ্যৎ তখনই বাস্তবে রূপলাভ করবে, যখন মানুষ আল্লাহর অনুমোদিত বিধি অনুযায়ী কর্তব্য পালন ও নিজেকে যথাসম্ভব প্রস্তুত করবে। পথ থেকে সব বাধা অপসারণে তৎপর হবে এবং এর বাইরে সবকিছু সৃষ্টিকর্তার ওপরে ছেড়ে দেবে। কেননা মানুষ যা করতে পারে তা আল্লাহর জন্য করা আদৌ কঠিন নয়।
রাসূলুল্লাহ সা:-এর মদিনায় হিজরতের মধ্য দিয়ে এ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আরব উপদ্বীপের মধ্যেই হিজরতের স্থান বেছে নিয়েছিলেন উপযুক্ত স্থান মনে করে, আবিসিনিয়ার মতো কোনো স্থান নয়। তিনি আনসারদের সাচ্চা আরব মনে করতেন। তারা নিজেদের পরিবারবর্গের মতোই তাঁকে রা করার ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের হিজরতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এ জন্য যে, যাতে তাদের জন্য মক্কা ত্যাগ করা সহজতর হয়। বস্তুত তাদের পরে রাসূল সা:-এর মদিনায় পৌঁছা যেন আরো গুরুত্ববহ হয়।
আল্লাহর অনুমতি পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা: যাত্রার বাহনের জন্য পশু ঠিক করলেন। তাঁর সঙ্গী এবং পথের গাইড কে হবে তাও ঠিক করে নিলেন। এমনকি কাফেরেরা তাকে তালাশ করে ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোন গুহায় আত্মগোপন করবেন, এসব আগেই স্থির করে নিলেন।
তিনি মানুষের পে সম্ভব সবরকম গোপনীয়তা বজায় রেখে সব প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং যেসব বিষয়ের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই সেগুলো আল্লাহর ওপর সোপর্দ করলেন। আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করবেন এ বিষয়ে তাঁর কোনোই সন্দেহ ছিল না। যখন হজরত আবু বকর রা: গুহায় তাঁকে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সা:, ওদের মধ্যে কেউ যদি তার পায়ের নিচে তাকায় তাহলে সে নিশ্চয় আমাদের দেখে ফেলবে।’ রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘আবু বকর, তুমি সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে কি চিন্তা করো, যাদের সাথে তৃতীয় আরেকজন আছেন, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ। আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘যদি তোমরা তাঁকে (মুহাম্মদ) সাহায্য না করো, তাতে কিছু আসে যায় না। তবে বস্তুত আল্লাহ তায়ালাই তাঁকে সাহায্য করেছেন সেই সময়; যখন কাফেরেরা তাঁকে দেশান্তর করে দিয়েছিল, যখন দুইজনের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি, যেই সময় উভয়ে (মুহাম্মদ ও আবু বকর) গুহার মধ্যে ছিলেন, যখন তিনি স্বীয় সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘তুমি বিষন্ন বা ভীত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় সান্ত্বনা বর্ষণ করলেন এবং তাঁকে শক্তিশালী করলেন এমন সেনাদল ফেরেশতা দ্বারা, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি এবং আল্লাহ কাফেরদের বাক্য ীণতম করেছিলেন; আর আল্লাহর বাণীই সমুচ্চ রইল; আর আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন সর্বশক্তিমান ও প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তাওবা-৪০)
অনুবাদ : সানাউল্লাহ আখুঞ্জি

 


আরো সংবাদ