০৭ মে ২০২১
`
ধর্ষককে প্রশ্ন নিয়ে তোলপাড়

ভারতের প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি

ভারতের প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়ে - ছবি : সংগৃহীত

ধর্ষণ নিয়ে বিরুপ মন্তব্যের অভিযোগে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ দাবি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়েকে লেখা একটি ‘খোলা চিঠিতে’ পাঁচ হাজারের ওপর নারীবাদী, নারী অধিকারকর্মী ও নাগরিকরা তাদের উদ্বেগ ও ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি বোবড়ের মন্তব্যে তারা ‘ক্রুদ্ধ’ ও তার বিবৃতি প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে।

ভারতের প্রধান বিচারপতি আদালতে ধর্ষককে দু’টি ‘ন্যক্কারজনক’ প্রশ্ন করেছিলেন।

প্রথমটি: ‘আপনি কি ওই মেয়েকে বিয়ে করবেন?’

তিনজন বিচারকের একটি বেঞ্চের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শারদ বোবড়ে এই প্রশ্ন করেছেন ২৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে, যার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিকে তিনি আরো বলেছেন, ‘আপনি যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে চান, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি। না চাইলে আপনি চাকরি হারাবেন ও জেলে যাবেন।’

তার এই মন্তব্য নিয়ে ভারতজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অভিযোগকারী নারী, ২০১৪ থেকে ১৫ সালের মধ্যে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনার যেসব ভয়ঙ্কর অভিযোগ এনেছেন, সেসময় তার বয়স ছিল ১৬। অভিযুক্ত ব্যক্তি তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়।

প্রধান বিচারপতি বোবড়েকে লেখা ওই চিঠির বর্ণনা অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মেয়েটির পিছু নিয়ে তাকে হয়রানি করে। তাকে বেঁধে রাখে। চিৎকার যাতে করতে না পারে এ জন্য তার মুখ কাপড় গুঁজে বন্ধ করে রাখে। এরপর অপ্রাপ্তবয়স্ক ওই স্কুলছাত্রীকে বারবার ধর্ষণ করে ও পেট্রল ঢেলে তার গায়ে আগুন দেবার ও তার ভাইকে খুন করার হুমকি দেয়‘।

এতে আরো বলা হয়, ‘ওই স্কুল শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করলে ধর্ষণের ঘটনা প্রথম প্রকাশ পায়’।

মেয়েটির পরিবার আরো অভিযোগ করেছে যে তারা পুলিশে খবর না দেবার ব্যাপারে সম্মতি দেয়। কারণ অভিযুক্তের মা তাদের বলেছিল যে মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর ছেলেটির সাথে তারা মেয়েটির বিয়ে দেবে।

ভারতে ধর্ষণের ঘটনার জন্য প্রায়ই ধর্ষিতাকে দায়ী করা হয়ে থাকে এবং এ ধরনের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে একটা মেয়ের জন্য সারা জীবনের কলঙ্ক হিসেবে দেখা হয়। ফলে মেয়েটির পরিবার ছেলেটির মায়ের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত পরে সেই প্রতিশ্রুতি মানতে অস্বীকার করে আরেকজনকে বিয়ে করার পর ধর্ষণের শিকার মেয়েটি পুলিশের কাছে যায়।

অভিযুক্ত ব্যক্তি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে সরকারি কর্মচারী। গ্রেফতার হলে তিনি চাকরি হারাবেন এই মর্মে নিম্ন আদালতে আবেদন জানালে তাকে জামিন দেয়া হয়। কিন্তু মুম্বাই হাইকোর্ট এই নির্দেশকে ‘ন্যক্কারজনক’ আখ্যা দিয়ে তার জামিন বাতিল করে।

এর পর ওই ব্যক্তি সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিমকোর্ট গত সোমবার তাকে চার সপ্তাহের জন্য গ্রেফতার না করার জন্য আদেশ দেয়। পাশাপাশি শুনানির সময় ওই ব্যক্তির আইনজীবী ও বিচারপতি বোবড়ের মধ্যে 'আলোড়ন সৃষ্টিকারী' কথোপকথন হয়।

প্রতিক্রিয়া
খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ভারতের প্রথম সারির নারীবাদী ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বিচারপতি বোবড়ের মন্তব্য বর্ণনা করার ক্ষেত্রে মুম্বাই হাইকোর্টে উচ্চারিত ‘ন্যক্কারজনক’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।

খোলা চিঠিতে বলা হয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়ের ধর্ষণের মামলা নিষ্পত্তিতে আপোষ হিসেবে আপনি বিয়ের যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা ‘ন্যক্কারজনক’-এরও অধম এবং ধর্ষণের শিকার একজনের ন্যায় বিচারের অধিকার এতে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। যাকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ, তাকে বিয়ে করার এই প্রস্তাব দিয়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি- আপনি মেয়েটিকে একজন নির্যাতনকারী, যে তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছিল, তার হাতে সারাজীবন ধর্ষণের জন্য তুলে দিচ্ছেন।

ডিসেম্বর ২০১২ সালে দিল্লিতে একটি বাসে এক তরুণীকে গণধর্ষণ ও পরে তার মৃত্যুর ঘটনায় ভারতে ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের বিষয়টি বিশেষভাবে অলোচনার কেন্দ্রে আসে। এ নিয়ে ভারতজুড়ে প্রতিবাদ চলে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ভারতে ধর্ষণের ঘটনা শিরোনাম হয়।

এর পর ধর্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিচারক ও সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিদের মন্তব্য, বক্তব্য অনেক তীক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু হয়েছে দেশটিতে। সেই ধারাবাহিকতায় সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কারণ তার ওই মন্তব্যকে দেখা হচ্ছে মামলায় দু’পক্ষের মধ্যে ‘আপোষ মীমাংসা প্রচেষ্টা’ হিসেবে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশটির গ্রাম এলাকায় পরিবারগুলোর মধ্যে সমঝোতা বা মীমাংসা করার জন্য মুরুব্বিদের এ ধরনের আপোষরফার আলোচনা করার চল রয়েছে বহু বছর ধরে। আদালতকেও কোনো কোনো সময় ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ও ধর্ষিতার মধ্যে বিয়ে দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ মীমাংসা করতে দেখা গেছে। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতে অবশ্য এমন কিছু রায়ে বলা হয়েছে, ‘বিয়ের মাধ্যমে ধর্ষণ অভিযোগের কোনো অবস্থাতেই নিষ্পত্তি করা যাবে না।’

নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, ভারতের প্রধান বিচারপতি বোবড়ের মন্তব্য ‘ধর্ষকদের এমন বার্তা দেবে যে বিয়ে ধর্ষণের ব্যাপারে একটা লাইসেন্স। একজন ধর্ষক অপরাধ করে পরে বিয়ে করার লাইসেন্স ব্যবহার করলে অপরাধ থেকে আইনগতভাবে পার পেয়ে যেতে পারে’।

ওই খোলা চিঠিতে দ্বিতীয় আরেকটি ধর্ষণের মামলার প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যে মামলায় বিচারপতি বোবড়ে একই দিনে শুনেছেন এবং সেখানেও বিতর্কিত দ্বিতীয় প্রশ্নটি করেছেন, ‘বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে যৌন মিলনকে কি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়?’

দ্বিতীয় এই মামলাটি ছিল একজন পুরুষের আবেদনের শুনানি। নারী বন্ধু তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের যে অভিযোগ আনেন তা প্রত্যাখান করে ওই পুরুষ আদালতে আবেদন করেছিলেন। ওই নারীর সাথে দু’বছর ওই পুরুষের সম্পর্ক ছিল। যখন তারা একসাথে বসবাস করতেন।

আইনি একটি ওয়েবসাইট বার অ্যান্ড বেঞ্চ বলছে, ওই নারী অভিযোগ করেন যে তিনি ‘বিয়ের আগে কোনোরকম যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখান করার’ পর ওই পুরুষ ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ তার অনুমতি নেন।

ওই নারী দাবি করেন ২০১৪ সালে তারা একটি মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেন। তখন ওই পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কে তিনি মত দেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি বলছেন, তিনি তাকে বিয়ে করেননি। তিনি দাবি করেন, তাদের মধ্যে যৌন সম্পর্কে ওই নারীর মত ছিল।

ওই পুরুষ আরেকজন নারীকে বিয়ে করার পর ওই নারী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন। গত সোমবার ওই মামলার শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি বোবড়ে বলেন, ‘বিয়ের ব্যাপারে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়া অন্যায়।’ এর পর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘যখন একজন পুরুষ ও নারী স্বামী-স্ত্রীর মতো একসাথে বসবাস করেন, তখন তার স্বামী নিষ্ঠুর চরিত্রের হলেও, আইনগতভাবে বিবাহিত দম্পতির মধ্যে যৌন মিলনকে কি ধর্ষণ বলা চলে?’

বিবাহিত সম্পর্কে ধর্ষণ
দীর্ঘ প্রচার প্রচারণার পর বিবাহিত সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণকে স্বীকৃতি দেবার বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের সুপারিশ সত্ত্বেও বিশ্বের যে তিন ডজন দেশ বিবাহিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌন অত্যাচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না, এর মধ্যে একটি ভারত।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ভারতের মতো একটা দেশ যেখানে নারীদের পশ্চাদপদ করে রাখার মানসিকতার বিরুদ্ধে। সেখানে বাইরে নয় শুধু, এমনকি পরিবারেও নিজের অধিকার আদায়ে নারীরা ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিচারপতি বোবড়ের মন্তব্যগুলো ‘খুবই সমস্যার’।

তাদের দাবি, ‘এ ধরনের মন্তব্য একজন স্বামীর হাতে যৌন, শারীরিক ও মানসিক যেকোনো নির্যাতন ও সহিংসতাকে আইনি বৈধতা দেবে। ভারতীয় নারীরা যেখানে পরিবারের ভেতর তাদের ওপর চালানো নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধে আইনি ব্যবস্থা পেতে বছরের পর বছর ধরে ব্যর্থ হচ্ছেন, সেখানে একজন বিচারপতির মন্তব্যে এ ধরনের আচরণ মানুষ স্বাভাবিক বলেই ধরে নেবে।‘

চিঠিতে প্রধান বিচারপতি বোবড়েকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে লেখা হয়েছে, ‘ভারতের শীর্ষ আইনি পদে থেকে প্রধান বিচারপতি এ ধরনের মন্তব্য করলে সেটা অন্য আদালত, অন্য বিচারক, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের কাছে এমন বার্তাই পৌঁছে দেবে যে ভারতে নারীর জন্য ন্যায়বিচার তার সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে না।’

প্রধান বিচারপতি শারদ বোবড়ে এই সমালোচনার কোনো জবাব এখনো দেননি।

সূত্র : বিবিসি



আরো সংবাদ