১৬ অক্টোবর ২০২১
`

সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি এবং ‘অকৃতজ্ঞ’ ভারতবাসী!

-

সরকার ঘোষিত চলমান কঠোর লকডাউনের সময় আমার অতি পুরোনো কিছু অভ্যাস আবার পেয়ে বসেছে। জন্মগতভাবেই অনুগত ও একান্ত বাধ্য থাকার অভ্যাস রপ্ত করেছি পারিবারিক অনুশাসনের কারণে। ফলে সরকার, রাষ্ট্র, আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অথবা ময়মরুব্বিরা যদি কোনো হুমুক জারি করেন তবে অভ্যাসবশত তা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেই। এই কারণে করোনাকালে সরকার যত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তার সবই সাধ্যমতো পালন করার চেষ্টা করছি। নিজেকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছি এবং নেহায়েত দরকার না পড়লে বাইরে যাওয়া তো দূরের কথা- জানালা দিয়ে রাস্তার দৃশ্য দেখার চেষ্টাও করিনি। এসব করতে গিয়ে অর্থাৎ সরকারের বিধিনিষেধ মান্য করতে গিয়ে আমার শরীর, মন ও মস্তিষ্কের ওপর এক নিদারুণ চাপ পড়ে। কারণ বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে সর্বদা নিজেকে ব্যস্ত রাখতে অভ্যস্ত। সুতরাং ঘরে বসে থাকা আমার জন্য রীতিমতো ভয়ঙ্কর এক ‘আজাব’ যা আমার সব সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করে দেয়।

উল্লিখিত অবস্থায় বদ্ধ ঘরে নিজের শরীর-মন-মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখার জন্য অনেক কাজ করি। প্রথমত, গৃহকর্মে গৃহিণীকে সাহায্য করি। তারপর গৃহিণীর শরীর স্বাস্থ্যও যেন ভালো থাকে এ জন্য তাকে বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক ভিডিও দেখাই, বই পড়ি, ব্যায়াম করি; ইবাদতের ফরজ আমলের পাশাপাশি নফল আমলগুলো সাধ্যমতো করি। কিন্তু তার পরও হাতে বেসুমার সময় থেকে যায়। এর কারণ হলো- সাধারণত রাত সাড়ে ৩টায় ঘুম থেকে উঠি এবং রাত ১১টার মধ্যে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। কোনো কোনো দিন দুপুরের দিকে একটু ঘুমাই যদি হাতে তেমন কাজ না থাকে অথবা শরীরে ক্লান্তি থাকে। অন্যথায়, সারা দিন-রাতে আমার হাতে প্রায় ২০ ঘণ্টা সময় থাকে কাজ করার জন্য এবং প্রায় ৩৫ বছর ধরে একই শিডিউলে এবং একই মডিউলে জীবন পরিচালনা করে যাচ্ছি।
করোনাকালে এমনিতেই আমার কাজের পরিধি কমে গেছে। তার ওপর, লকডাউন হলে তো কথাই নেই। অফিস বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। সামাজিক যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ। খুব প্রয়োজন না হলে ফোনেও কথা বলি না। তাছাড়া আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলো, টেলিফোন আলাপ যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করা এবং সাধারণত ৩০ সেকেন্ড থেকে এক-দুই মিনিটের মধ্যে টেলিফোনের কথোপকথন শেষ করি। সুতরাং সরকারের চলমান কঠোর লকডাউন আমাকে কোন পরিস্থিতিতে ফেলেছে তা আশা করি, সম্মানিত পাঠক বুঝতে পেরেছেন।

উপরিউক্ত অবস্থায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য কৈশোর ও যৌবনের প্রথম পর্যায়ের দিনগুলোর মতো আগ্রহ ভরে দেশ-বিদেশের সিনেমা দেখতে শুরু করি। ল্যাপটপ-আইপ্যাড বা মোবাইলে নিজের পছন্দ মতো সময়ে ধীরে সুস্থে ইদানীংকালে প্রযুক্তির কল্যাণে যেভাবে সিনেমার মতো লম্বা ভিডিও দেখা সম্ভব তা কয়েক বছর আগে কল্পনাও করা যেত না। যেমন ধরুন- ল্যাপটপে একটি ইংরেজি সিনেমা আধা ঘণ্টা ধরে দেখলাম। তারপর ল্যাপটপ বন্ধ করে অন্য কাজ করলাম। এরপর আমার অন্য ডিভাইস অর্থাৎ আইপ্যাড বা মোবাইলে যখন একই সিনেমাটি দেখতে চাইব তখন প্রযুক্তি আমাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সিনেমাটির কাছে নিয়ে যাবে এবং ল্যাপটপে যেখানে আমি বিরতি দিয়েছিলাম, ঠিক সেই স্থান থেকে দেখার ব্যবস্থা করে দেবে। ফলে সিনেমা বা কোনো ভিডিও উপভোগ এখন অনেক অনেক সহজ হয়ে গেছে এবং সেই সুযোগ গ্রহণ করে বিশ্বের হিট-সুপারহিট বাণিজ্যিক, ফিচার কিংবা প্রামাণ্য চলচ্চিত্রগুলো একের পর এক উপভোগ করে চলেছি।

সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে যখন হাল আমলের হিন্দি ব্লক বাস্টার ছায়াছবির কথা মনে আসে তখন আমার ছেলে-মেয়ের পরামর্শ নেই। কয়েক দিন আগে এমন এক পরিস্থিতিতে আমার মেয়ে নন্দিতা বলল বলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সঞ্জয় লীলা বানশালী নির্মিত ‘পদ্মাবতী’ সিনেমাটি দেখার জন্য। সিনেমাটি সম্পর্কে আমি আগেই জেনেছিলাম যে, ছবিটি নির্মিত হওয়ার পরপরই সমগ্র ভারতের মুসলমানরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল এবং সিনেমার সপক্ষে উগ্র হিন্দুরা উল্লাস করেছিল। তখনকার পত্রপত্রিকার মাধ্যমে যটটুকু জেনেছিলাম তা হলো- পরিচালক বানশালী মধ্যযুগের কবি মালিক মোহাম্মদ জাইসী রচিত ‘পদুমাবৎ’ কাব্য অনুসরণে সিনেমাটি নির্মাণের কথা বললেও বাস্তবে তিনি অনেক মনগড়া কাহিনী এমনভাবে সংযুক্ত করেছেন যার ফলে খিলজি বংশের মহান শাসক সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজিকে দর্শকরা একজন উন্মাদ ও বিকৃত রুচির সমকামী এবং বহুগামী বিবেকহীন ‘যৌনদানব’ হিসেবে দেখতে পাবে।

সঞ্জয়লীলা বানশালী বর্তমানে বলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী চলচ্চিত্র পরিচালক। তার বেশির ভাগ সিনেমা সুপার-ডুপার হিট হয় এবং কোনো কোনোটি বক্স অফিস মাতিয়ে হাজার কোটি রুপি কামিয়ে নেয়। তার সিনেমার জাঁকজমকপূর্ণ সেট, জমজমাট নাচ-গান, নায়ক-নায়িকা সিলেকশন এবং লোকেশনের কারণে একটি রাজসিক আবহ তৈরি করে বটে। তবে তিনি যেভাবে কাহিনীর বিকৃতি ঘটান তা অন্য কোনো পরিচালক হলে সাহসই পেতেন না। তার নির্মিত ‘দেবদাস’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের মূল কাহিনীকে যেভাবে বিকৃত করেছেন তা যদি শরৎচন্দ্র দেখতেন তবে নির্ঘাত আত্মহত্যা করতেন। অন্য দিকে একই কাহিনী নিয়ে নির্মিত দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন, বৈজয়ন্তী মালা অভিনীত দেবদাস অথবা কলকাতায় নির্মিত প্রমথেশ বড়–য়া অভিনীত দেবদাসের শিল্পমানের সঙ্গে সঞ্জয়লীলা বানশালীর দেবদাসের যদি তুলনা করা হয় তবে আপনি বানশালীকে কোনো নম্বরই দিতে পারবেন না। অথচ তার দেবদাস সিনেমাটি সর্বকালের রেকর্ড ব্রেক করে হাজার কোটি রুপি কামিয়ে নিয়েছে।

এ কারণে আমি বানশালীর সিনেমা সম্পর্কে আগ্রহী নই। তার ‘দেবদাস’ সিনেমাটি ১০-১২ বার চেষ্টা করেও পুরোটা দেখতে পারিনি। ১০-১২ মিনিট দেখার পরই আগ্রহ হারিয়ে দেখা বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু তার পদ্মাবতী যখন দেখতে শুরু করলাম তখন শেষ না করে উঠতে পারলাম না। এই একাগ্রতা বা আগ্রহের মূল কারণ ছিল মূলত আমার ক্ষোভ এবং রাগ। কাহিনীর শুরুতে যখন দেখলাম, ইতিহাস বিকৃতি শুরু হয়েছে এবং ভারতে মুসলিম শাসনকে অপমানিত করা হচ্ছে তখন অনিচ্ছা সত্তে¡ও সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত দেখলাম কেবল বানশালীর উগ্র হিন্দুত্ববাদী মনোভাব এবং মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবের সীমা-পরিসীমা আন্দাজ করার জন্য।
ছবির কাহিনী দেখে রাগ করেছিলাম এ কারণে যে, পদ্মাবতী বা পদুমাবৎ কাব্য সম্পর্কে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই জেনেছিলাম। একই সময়ে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সম্পর্কেও ঊনবিংশ শতাব্দীর লিখিত একটি দুষ্প্রাপ্য ইতিহাসের বইতে বিস্তারিত পড়েছিলাম এবং সেখানে সুলতানের একটি পোর্টেটও দেখেছিলাম, যা তার জীবদ্দশায় অঙ্কিত হয়েছিল। ইতিহাস মতে, মালিক মোহাম্মদ জাইসী পদুমাবৎ রচনা করেন ১৫৪০ সালে অর্থাৎ আলাউদ্দিন খিলজির মৃত্যুর ২২৪ বছর পর। মধ্যযুগের পুঁথি-সাহিত্যের মতো করে তিনি মধ্যযুগীয় হিন্দুস্তানি ভাষায় (যা আওয়াধি ভাষারূপে পরিচিত ছিল) পদুমাবৎ কাব্য রচনা করেন। এই কাব্য গ্রন্থটি ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং তিনি তার কাব্যের কোথাও আলাউদ্দিন খিলজির নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি।

ভারতের ইদানীংকালের যে হিন্দি ভাষার জয়জয়কার চলছে তা কিন্তু বাংলা ভাষার চেয়ে অনেক নবীন। কাজেই মধ্যযুগে লিখিত পদুমাবৎ আধুনিক হিন্দিতে অনুবাদ করতে গিয়ে শত শতবার বিকৃত করা হয়েছে। ফলে হিন্দিতে যে পদুমাবতের আদিরূপ রয়েছে তার সঙ্গে আওয়াধী ভাষায় রচিত পদুমাবতের খুব কমই মিল রয়েছে। অধিকন্তু ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, তা হলো লেখক মালিক মুহাম্মদ জাইসী তার জমানার অত্যন্ত নামকরা সুফি সাধক ছিলেন। কাজেই একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে তিনি কোনো অবস্থাতেই একজন মহান মুসলিম শাসকের চরিত্র হরণ করে কিছু লিখতে পারেন না। সুতরাং মালিক মুহাম্মদ জাইসীর নাম ব্যবহার করে পরিচালক বানশালী যা করেছেন তা রীতিমতো গর্হিত অপরাধ এবং তার এই কর্মের ফলে নিরীহ দর্শকরা একজন মহান শাসক সম্পর্কে সত্য জানা থেকে বঞ্চিত রয়েছে যিনি না হলে ইতিহাস থেকে দিল্লির নাম মুছে যেত এবং আজকের যে অখণ্ড ভারত তা কোনোভাবেই গঠন করা সম্ভব হতো না। সুতরাং ভারতবাসীর মধ্যে যারা ইতিহাস জানেন তারা সবাই সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে ভারতবর্ষের সর্বকালের মহানায়কদের অন্যতম মনে করেন এবং এ কারণে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর নেহরু সরকার রাজধানী দিল্লির প্রধানতম একটি সড়কের নামকরণ করেন ‘খিলজি রোড’ হিসেবে।

ভারতের বর্তমান উগ্রবাদী বিজেপি সরকার যেভাবে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং অতীতের গৌরবময় মুসলিম শাসন সম্পর্কে ভারতবাসীকে যেভাবে অকৃতজ্ঞ বানাবার মাস্টার প্লান তৈরি করেছে তারই অংশ হিসেবে সঞ্জয়লীলা বানশালী পদ্মাবতী সিনেমাটি তৈরি করে থাকতে পারেন। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, চেঙ্গিস খানের পুত্র চাগতাই খানের নির্দেশে ১২৯৭ সাল থেকে ১৩০৬ সাল অবধি প্রায় প্রতি বছরই দুর্ধর্ষ-মোঙ্গলরা ভারতবর্ষের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ চালায়। প্রতিটি যুদ্ধেই মোঙ্গলরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। একমাত্র ভারতবর্ষের সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ছাড়া তৎকালীন দুনিয়ার কোনো সুপার পাওয়ারই মোঙ্গল বাহিনীর সামনে টিকেনি। মোঙ্গলদের আক্রমণে অনেক বড় বড় রাজধানী ইতিহাসের পাতায় আছে কিন্তু ভুগোল থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। কত রাজা, কত সেনাপতি, কত সৈন্য কিংবা কত মানুষ যে আহত-নিহত হয়েছেন তা আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেননি।

ঐতিহাসিকরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, আলাউদ্দিন খিলজির মতো প্রতিভাধর সাহসী যোদ্ধা যদি দিল্লির সিংহাসনে না থাকতেন তাহলে ভারতবর্ষে মোঙ্গলদের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারত না। সে ক্ষেত্রে মোঙ্গল আক্রমণে দিল্লির অস্তিত্ব বিলীন হতো, কোটি কোটি ভারতবাসী মারা পড়ত এবং ভারতবর্ষ চীনের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হতো। এ কারণে বিবেকবান ভারতবাসী ঐতিহাসিক দায় মেটানোর জন্য সর্বদা আলাউদ্দিন খিলজির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অন্য দিকে, আধুনিক ভারতের যে মানচিত্র তা মোটোমুটি সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির সময়কার সাম্রাজ্যের প্রতিরূপ।
অর্থাৎ তিনিই ভারতের ইতিহাসে একমাত্র শাসক যিনি আধুনিককালের মতোই সরাসরি উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের ওপর দিল্লির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত বা দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মতো বিখ্যাত সম্রাটরা দক্ষিণ ভারতের একাংশের ওপর পরোক্ষ শাসন কায়েম করেছিলেন বটে; কিন্তু কেউই সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির মতো সরাসরি অবিভক্ত ভারতবর্ষের ওপর কেন্দ্রীয় শাসন বহাল করতে পারেননি।

রাজ্য জয়, মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করা, কেন্দ্রীয় শাসন, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন, রাজস্ব নীতি, বিচারব্যবস্থা এবং জনহিতকর কাজে সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির যে কৃতিত্ব তার জন্য ভারতবাসীর উচিত এই মহান শাসকের প্রতি কিয়ামত পর্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকা। কিন্তু সঞ্জয়লীলা বানশালীর ‘পদ্মাবতী’ সিনেমার কারণে অনেক ভারতীয়ের ওপর শয়তানের আছর পড়বে। তারা একজন মহান শাসককে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়ে তাকে উন্মাদ যৌনদানব ভাববে এবং নিজেদের অকৃতজ্ঞ সম্প্রদায়ে পরিণত করবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য



আরো সংবাদ