০৬ আগস্ট ২০২০

চীন-ভারত কি যুদ্ধ বাধার দিকে হাঁটছে

চীন-ভারত কি যুদ্ধ বাধার দিকে হাঁটছে - ছবি : সংগৃহীত
24tkt

চীন-ভারত যুদ্ধ কি বেধে যেতে পারে? সাধারণ তবে শিক্ষিত মানুষ যারা এতদিন দূর থেকে দেখে একটু মজা পাচ্ছিল তারা এখন যুদ্ধের টেনশনটা দীর্ঘ হচ্ছে দেখে এবার নিজের জন্য একটু উদ্বিগ্ন হয়ে যাচ্ছে যে, নিজের জন্য আমল করার মতো এখানে কোনো লুকিয়ে থাকা হুমকি বা বিপদ হঠাৎ হাজির হতে পারে কি না! তা নিয়ে ভাবছে। গত ১৫ জুন চীনা হামলায় কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় মারা যাওয়ার পর থেকে এই টেনশনটা এভাবে ক্রমেই সত্যি বলে হাজির হয়েছে।

পুরা ব্যাপারটা শুধু ভারতীয় সৈন্য মারা যাওয়ার মধ্যে আটকে থাকলে তাও হয়তো চলত। কিন্তু সর্বদলীয় বৈঠকের ব্রিফিংয়ে ভারতের কেউ যা কল্পনাও করেনি তাই ঘটে গেছে। গত ছয় বছরে সবসময় ছত্রিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি দেখিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই সভায় বলে বসেন, ‘সীমানা পেরিয়ে কেউ ভারতে ঢোকেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই।’ এর সোজা মানে দাঁড়ায়, ওই ২০ ভারতীয় সেনা চীনের ভূখণ্ডে গিয়ে মার খেয়ে মরেছে। আর সহযোদ্ধা-সৈন্যরা তাদের লাশ বয়ে ভারতে এনেছে, এমন মানে হয়ে গেছে। কিন্তু ব্যাপারটা এতই শকিং আর বেইজ্জতির প্রশ্ন যে, বিরোধীরা বুঝে যান এ নিয়ে কথা বাড়ালে সারা ভারত আরো অপমানিত হবে। তাই ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত নিজের কলামে লিখছেন, কোনো বিরোধী নেতা সভার ওই অবস্থায় আর যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মুখ খোলেনইনি। কিন্তু কিছু ‘সাহসী’ সাংবাদিক বা সাবেক কূটনীতিক যারা নিজেদের খুবই ‘সাচ্চা ন্যায়পরায়ণ’ মনে করেন তারা তাদের ভারত-নেশন আরো অপমানিত হবে, সে সম্ভাবনার দিকটা ভুলে বা পেছনে ফেলে প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কর্তব্য পালনে খুবই ব্যস্ত। আসলে তারা নেশনের অপমানের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে যে এর দায় মোদির ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছেন, সুতরাং অন্তত নিজেরা আর অপমানিত বোধ করছেন না। ভারতের সাংবাদিক করণ থাপার আর সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাওয়ের সাক্ষাৎকার দেখে তাই মনে হয়েছে। যেন তারা জানেন না যে, মোদির রাজনীতি উগ্র হিন্দু-জাতিবাদী এবং তার বিজেপি দল মিথ্যা বলতে বলতে পুরা দেশকেই প্রায়ই অপমান করে ফেলে থাকে। তারা ভারতের মুসলমান নাগরিকদের সীমাহীন নিপীড়ন নির্যাতন হত্যা করে থাকে। আর এজন্য নিয়মিত দুনিয়ার হিউম্যান রাইটস সংগঠনগুলো এসব কাজ তুলে ধরে মোদি সরকারের নিন্দা করে। তাতেও এরা কেউ বিজেপির মতোই কোনো অপমান বোধ করেন না।

আসলে তারা নেশন-স্টেট বা জাতি এই বোধছাড়া রাজনীতি হতেই পারে না বলে মনে করে নিশ্চিন্তে ডুবে থাকেন। অথচ এরাই আবার বাস্তবে অন্যের হাতে অপমানিত হলে বা মার খেলে তখন ওই কথিত নিজ জাতি-দেশ থেকে নিজেকে মুক্ত বলে কল্পনা করতে থাকেন। তিনিও জানেন এতে অপমান বা সমস্যা যাবে না; তবু নিজেকে একটা সান্ত্বনা দিতে তারা এসব হাসির কাণ্ড করে থাকেন। কিন্তু তবু এরা ‘নেশনের’ রাজনীতিই যে ‘উগ্র জাতিবাদ’ তা বুঝেও এর প্রতি তাদের ভালোবাসা থেকে একটু হেলবেন না। তাদের বিশ্বাস এমনই শক্ত।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে এই ব্যক্তিরা আরেকটা আশার আলো দেখে ফেলেছিলেন। এরা আলোর মরীচিকায় বিশ্বাস করেন, ও পেছনে ছুটতে রাজি থাকেন। এরা জানেন এটা মরীচিকা এবং নিছক আলো নয়, এর পরেও নিজের প্রবল হতাশা ঠেকাতে মনকে বুঝ দেনÑ যদি ওটা সত্যিই আলো হয়েই যায়! এমন ব্যক্তিরা বিশেষ করে মিডিয়াকর্মীরা আশার আলো জাগাতে বলতে শুরু করলেন, আমেরিকা নাকি ভারতের সমর্থনে সৈন্য সরিয়ে আনছে জার্মানি-ইউরোপ থেকে এশিয়ায়। বাংলাদেশেও আমেরিকান স্বার্থ দেখা থাকতে চাওয়া মিডিয়ার কেউ কেউ এই খবরটাকে টুইস্ট করেছেন।

ঘটনা হলো, যুদ্ধ করে নগদ বা বাকি কোনো রিটার্নই নেই এমন বিপুল বেহুদা সামরিক খরচ করে ফেলেছে আমেরিকা। কোথায় কবে? আপনারা অনুমান করলেই তা মিলে যাবে। জবাব, ইরাক ও আফগানিস্তানে। এ কারণে দুর্বল আমেরিকার অর্থনীতি আরো ডুবছেÑ এই অনুমান প্রবল হচ্ছে সেই ২০১০ সাল থেকে। লিয়ন পেনেত্রা, চাক হেগেল বা এশ কার্টার এভাবে পরপর যারা ডিফেন্স সেক্রেটারি ছিলেন তারা সবাই খরচের সেই ঝাপ্টার বিষয়ে, ন্যাটোর মিটিংয়ে ‘ইউরোপ কোনো খরচ দেয় না’ বলে সরব হয়ে থেকেছেন। আর প্রকাশ্যে মিডিয়ায় অভিযোগ তুলেছেন এই অনুমানে যে, অপমান করলে বোধহয় ইউরোপ যুদ্ধের এই ভাটির দিনে এসে কিছু খরচের দায় নেবে। কিন্তু না, প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকান সেনারা (যখন সেটা আমেরিকার এম্পায়ার উত্থানের যুগ, ফলে বহু খরচের দায় নিজেই এককভাবে নিয়ে নিয়েছিল) আর কখনো ব্যারাক গুটিয়ে নিজ দেশে ফেরেনি বরং জার্মানিতে ঘাঁটি গেড়ে থেকে গিয়েছিল। আর ন্যাটো গঠিত হলেও এর ৯৫ শতাংশ পরিচালন খরচের দায়ভার আমেরিকা একা বহন করে গেছে। যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানে আমেরিকা এক ব্যর্থ যুদ্ধে খরচ করে গেছে, তবু মনকে সান্ত্বনা দিতে ইউরোপে ন্যাটোর খরচ দেয় না বলে ঝাড়ি দিয়ে গেছে সেই থেকে। 

আসলে আঁচ লাগা শুরু হয় ইরাক আফগানিস্তানে ওয়ার অন টেররের পরাজয় থেকে। একটা কমিটি বসেছিল ২০০৬ সালে যার পরিষ্কার রিপোর্ট ছিল যে, আমেরিকা যুদ্ধে হেরে গেছে এই অর্থে; আমেরিকা এমন এক অনন্ত যুদ্ধে আটকে গেছে যা থেকে বিজয় লাভ অসম্ভব; আবার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াও সহজ ছিল না। অথচ এ থেকে নিয়মিত যে খরচ বেড়েই চলেছিল, তাতেই মূলত আমেরিকান অর্থনীতির ভেঙে পড়া আর বেসামাল অবস্থার শেষে ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা হাজির হয়ে যায়। আর তখন থেকেই চীনের সাথে তুলনায় অর্থনীতিতে আমেরিকার পিছিয়ে পড়ার শুরু। ওবামা আমলে তার প্রশাসন তাই এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ইরাক-আফগান যুদ্ধে বিজয় আর না, ২০১০-১৪ ধরে সময়কালের মধ্যে সব সৈন্য ফিরিয়ে আনতে হবে। এই ছিল সবচেয়ে নির্ধারক সিদ্ধান্ত। এটা বাইপার্টিজান সিদ্ধান্ত। আর সেটার তলানি অংশটাও গুটিয়ে ফেলা হলো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে, এটাও বাইপার্টিজান মানে দু-দল মিলে নেয়া সিদ্ধান্ত। তাই আফগানিস্তান ছেড়ে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তালেবানদের সাথে ট্রাম্পের মরিয়া চুক্তি। ওদিকে ৭৫ বছরের আগের সিদ্ধান্ত বদলানো যে (ন্যাটোর নামে), ইউরোপে থাকা সেনা প্রত্যাহার, যা নিয়ে আবার ইউরোপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।

লক্ষণীয় যে, এই ফেরত আনা সেনা এশিয়ার কোথার মোতায়েন হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের যতগুলো কারণ ছিল তার মধ্যে মোদির মতোই চাপাবাজি করে ‘চীন-ভারতের সামরিক টেনশনও একটা বাড়তি কারণ’ বলে এই শব্দ কয়টা সেখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। 

তবু আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা একটা পুরানা ব্যর্থ আলাপ। কেন? ওবামা আমলে খুবই জোর দিয়ে বলা হতো যে এটা হলো ওবামার এশিয়া ‘পিভোট’ পলিসি। ওবামা আমলে অনুমান-পরিকল্পনাটা ছিল এমন যে, আমেরিকার অনুমিত চীনের আগ্রাসী নীতির কারণে আশ্রয় লাভের জন্য ইস্ট এশিয়ার দেশগুলো (ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম...) নিরাপত্তা খুঁজতে আমেরিকার কোলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর আমেরিকা ভারসাম্য রক্ষাকারী (পিভোটাল) ভূমিকায় নেমে কথিত আগ্রাসী চীনের হাত থেকে এদের সবাইকে রক্ষা করবে। এই ছিল মোটামুটি মূল অনুমিত ধারণা-পরিকল্পনা। আর এরই অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় একটা স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানো ও উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মধ্যেই এই পরিকল্পনাটাও ব্যর্থ ও পরাজিত হয়ে যায়। কারণ ইস্ট এশিয়ার কেউ আমেরিকার কাছে নিরাপত্তা খুঁজতে যায়নি। জাপানের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক পত্রিকা ‘ডিপ্লোম্যাটের’ মতে সেকালে এটা ঐণচঊজখওঘক 'যঃঃঢ়ং:// ঃযবফরঢ়ষড়সধঃ.পড়স/২০১৭/০১/ঃযব-ঢ়রাড়ঃ-ঃড়-ধংরধ-ধিং-ড়নধসধং-নরমমবংঃ-সরংঃধশব/ 'ঐণচঊজখওঘক 'যঃঃঢ়ং:// ঃযবফরঢ়ষড়সধঃ.পড়স/ ২০১৭/০১/ঃযব-ঢ়রাড়ঃ-ঃড়-ধংরধ-ধিং-ড়নধসধং-নরমমবংঃ-সরংঃধশব/'ওবামার বিগেস্ট মিসটেক ঐণচঊজখওঘক 'যঃঃঢ়ং://ঃযবফরঢ়ষড়সধঃ.পড়স/ ২০১৭/০১/ঃযব-ঢ়রাড়ঃ-ঃড়-ধংরধ-ধিং-ড়নধসধং-নরমমবংঃ-সরংঃধশব/'।

কারণ সাউথ চায়না সি নিয়ে ইস্ট এশিয়ায় টেনশন আছে, অসন্তোষ আছে। কিন্তু সেজন্য কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দেয়া সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে তপ্ত কড়াই থেকে চুলার ভিতরে ঝাঁপ দেয়ার শামিল মনে হয়েছিল। তাই তারা সামরিক প্রশ্নে চীন-আমেরিকা কোন দিকে যায়নি, দূরে ছিল। বরং অর্থনীতির প্রশ্নে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে গেছে। এক কথায় এটা আমেরিকার জন্য এক ‘বিগ মিস-ক্যালকুলেশন’। তবে নতুন করে যুদ্ধে কোনো রিটার্ন ছাড়াই আবার অর্থ নষ্ট হলো। মাঝখান থেকে অস্ট্রেলিয়াও ঘাঁটি বানাতে উৎসাহ ভরে যতটুকু নিজের অর্থ ঢেলেছিল সেটাও লস। 

তাহলে এখন জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের নামে সেই পতিত প্রকল্পে হাওয়া, নাড়াচাড়া দেয়া কেন? প্রথমত আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এর সাথে চীন-ভারতের উত্তেজনার কোনোই সম্পর্ক নেই। কারণ চীন-ভারত উত্তেজনা শুরুর বহু আগে থেকেই এই সেনা প্রত্যাহারের নড়াচড়ার শুরু। এর কারণ মূলত হংকং। আর সাথে কিছু আলাদা টেনশনে থাকা তাইওয়ান। এক-চীনের দাবিতে চীন কবে তাইওয়ানে হামলা করে, তা থেকে নিজের নিরাপত্তার জন্য সে একেবারেই আমেরিকার হাতে বাঁধা। কিন্তু হংকংয়ে নতুন টেনশনটা কী? মূল টেনশনটা হলো, তারা চীনের থেকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন কী পেতে পারে ঘটনা সেদিকে মুভ করেনি। বরং ‘চীনের থেকে স্বাধীনতা’ মানে হংকংকে চীন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা। এ নিয়ে ব্রিটিশ-আমেরিকান স্বার্থ-পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকে পড়া মানে, এর ভিতরে নিজেদের স্বাধীনতার স্বার্থকে প্রোথিত করা। এ দুই পথের কোনটা ভালোমন্দ, ব্যাপারটা সেভাবে দেখার চেয়ে যেমন পথ তেমন ওটা মিস্টি না তিতা, এভাবে বলাই সঠিক হবে। তারা যেপথ বেছে নেবে তার সমান মূল্য তো দিতে হবেই। যদিও চরম আত্মাহুতি দিলেই হংকংয়ের স্বাধীনতা মিলবে এমন নিশ্চয়তা নাই, বেইজিংয়ের তিয়েনআনমিন স্কয়ারের অভিজ্ঞতা তাই বলে। হংকং ইস্যু সাধারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে মনে করা অতি সরলীকরণ হবে।

যেমন হংকংয়ের ব্যবসায়ীরা যাদের স্বার্থ মূল ফ্যাক্টর তারা কি ছাত্র-তরুণতরুণীদের সাথে স্বাধীন হবার আন্দোলন পর্যন্ত যেতে চাইবেন কি না সেটা এখনো পুরোই অনিশ্চিত। কারণ হংকং চীনা পণ্যের বিক্রির বড় ‘হাব’, দুনিয়াজুড়ে চীনা পণ্য পৌঁছে দেয়ার পাইকারি বাজার। কাজেই এই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ কতটা চীনবিরোধী হবে, তারা কতটা সাড়া দিতে আগ্রহী হবেন বলা মুশকিল। আবার এটা ১৯৮৯ সাল নয়। ফলে চীন তিয়েনআনমিনের মতো ব্যাপক ম্যাসাকার করে ফেললে তা সামলানো চীনের জন্যও কঠিন পরীক্ষা হবে, অন্তত সহজেই হবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, তা বলাই বাহুল্য। এসব মিলিয়ে চিন্তা করে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া হলো, আইনি প্রস্তুতি নেয়া। চীন ইতোমধ্যে একটা নতুন আইন পাস করেছে যার কারণে, কেউ রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম যত যাই করুক, কিন্তু তা ছাড়িয়ে হংকংয়ের স্বাধীনতা চাই ধরনের স্লোগান দিলে, অ্যাটর্নি অফিস এর ভালো প্রমাণ পেলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি’ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। এই আইনে ইতোমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বাক্ষর হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত চীনের জন্য একটা দুর্বল পয়েন্ট হলো, আইনটা পাস হয়েছে মেইনল্যান্ড চীনে, হংকংয়ের আইনসভাতেও তা এনডোর্স করে নেয়া হয়নি। নিলে ভালো হতো। এর পক্ষে আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে কি না আমরা জানি না।

ঘটনা হলো এ নিয়ে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া কী হবে? ঘটনা সেখানে। যেমন, প্রত্যক্ষ সূত্র নেই; কিন্তু ‘হতে পারে’ ধরনের মিডিয়ায় নিউজ ছিল যে, চীন এই আইন চালু করলে আমেরিকা চীনের ওপর ‘অল-আউট’ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে। এর তাৎপর্য হলো, চীন ডলারে কোনো কিছু কেনাবেচা করতে পারবে না। এদিকে চীনের এই আইন পাস হয়ে গেছে। তবে ইতোমধ্যে আমেরিকার অল-আউট অবরোধ আরোপ করা হয়নি। যদিও ছোটখাটো (যেমন ভিসা রেস্ট্রিক্টকশন ধরনের) অবরোধ আপত্তিগুলো কার্যকর হতে যাচ্ছে। 

অল-আউট অবরোধ আরোপÑ কথাটা শুনতে ভালো লাগে, আমেরিকা তা ঘোষণা করে দিতেও পারে যদি, তাতে সে এখনো অনেক পাওয়ারফুল বল মনে হবে হয়তো। কিন্তু বাস্তবতা পুরো উলটো হয়ে যাওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা। চীন এই সুযোগে তার কারেন্সি ইউয়ানকেই (ডলারের জায়গায়) আমদানি-রফতানিতে লেনদেনের মুদ্রা নিয়ে বসতে পারে। আর সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনে এর দাম যদি ইউয়ানে পরিশোধ করতে পারে, তবে ডলার ফেলে ইউয়ানই দুনিয়ায় লেনদেন প্রধান কারেন্সি বলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনা আছে- তখন কী হবে?

আর এ থেকেই বাজারে অল-আউট অবরোধের গুজব আর সামরিক প্রস্তুতির সম্পর্কটা বোঝা যেতে পারে। কিন্তু সাবধান। আমেরিকা যদি যুদ্ধ-বেচার ক্ষেত্রে হেরে যাওয়া পার্টি হয়ে থাকে আর সেজন্য গত ১০ বছরে সে যদি প্রধানত খরচ কমানোর পার্টি হিসেবে নাম লিখিয়ে থাকে, তাহলে এখন আবার হংকং ইস্যুকে কেন্দ্র করে অল-আউট যুদ্ধের প্রস্তুতি নিবেÑ এ কথা ঠিক মেলে না, মানে হয় না। সম্ভবত সেজন্যই এখনো পরিস্থিতি ছোটখাটো অবরোধের মধ্যে আটকে আছে। এই হলো, সেনা প্রতাহারে ঘটনার সত্যি কথাটা। কিন্তু তা বলে হম্বিতম্বি করা, মোদির মতো চাপাবাজি করা যাবে না, তা তো নয়। দেখা যাক!

অবশ্যই যাবে। সেটাই সম্ভবত করা হচ্ছে বা চলছে। মোদির আমেরিকার পকেটে হাত ঢুকিয়ে থাকার কাজ-সার্ভিসটা করে দেন মূলত এস জয়শঙ্কর, ভারতের এখনকার বিদেশমন্ত্রী। মোদির সাথে তার এই সম্পর্ক আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত থাকার পর তার অবসরে চলে যাওয়ার আগে আগে সেই ২০১৪ সালে। কিন্তু সেটা ছিল মোদির ক্ষমতায় আসারই বছর। মোদি যখন আমেরিকার সাথে সম্পর্ক কীভাবে শুরু করবেন, কোন দিক দিয়ে আগাবেন, এসব দুশ্চিন্তায় বে-দিশা হয়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্রদূত জয়শঙ্করের হোনওয়ার্ক মোদির কাছে খুবই কাজের মনে হয়। সেই থেকে জয়শঙ্কর মোদির ‘আমেরিকান পকেটে হাত ঢুকানো’র বিশেষ দূতের ভূমিকায় আছেন। কারণ, আমেরিকান ডিপ্লোমেটদের কারো কারো সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক দু’পক্ষই খুবই কাজের জিনিস বলে মানতে শুরু করেছিল। আর সেই রাষ্ট্রদূত থেকে জয়শঙ্কর এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

বলা হয়ে থাকে, চাপাবাজি বিষয়ক তার সু অথবা কু পরামর্শে আমেরিকান সেক্রেটারি অব স্টেট পম্পেও আর ট্রাম্প এক চাপাবাজির উদ্যোগ নেয়। মাইক পম্পেও জার্মানি থেকে আমেরিকার সৈন্য স্থানান্তরের কারণগুলোর মধ্যে একটা কারণ হিসেবে ‘চীন-ভারত টেনশন’ কথা কয়টা ঢুকিয়ে দেন। আর তাতেই কিছু ‘পেইড মিডিয়া’ এ নিয়ে হইচই ছড়ানো শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে তামাশার দিকটা হলো, মোদি সরকারের কেউ এ নিয়ে কোথাও কোনো মন্তব্য করেননি। কারণ তারা এই চাপাবাজিটা থেকে কিছু লাভালাভ তুলে নেয়ার চেয়েও বড় টেনশনে আছেন যে, চীন আবার এই মিথ্যা খবরে ক্ষেপে গিয়ে কিছু না করে বসে।

কিন্তু এতে চীনা প্রতিক্রিয়াটা ধরা পড়ে যখন চীনা গ্লোবাল টাইমসে এক প্রফেসর আর্টিকেল লিখে বলেন, ভারতের প্রধান সমস্যা হলো ‘উগ্র জাতিবাদ’। মানে তিনি বলতে চাইছেন মোদি সরকার চীনের বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই করে ফেলবে, সেই করে ফেলবে, বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে, মুখ তোড়া জবাব দেবো, অথবা একমাত্র ৩৬ ইঞ্চি ছাতির মোদি এমন জবাব দিতে পারেনÑ এ ধরনের উস্কানি দিয়ে ভোটের ইস্যু বানানোতে মোদি এক ওস্তাদÑ অথচ পুরো ব্যাপারটাই বানোয়াট। এতে সমস্যা হলো, যদি কখনো সত্যিকার পরিস্থিতি আসে আর মোদি কিছুই করতে পারেন না অবস্থা, তা হলে মোদি ইজ্জত-সম্মান হারানো এক ভয়ঙ্কর লোক হিসেবে হাজির হয়ে যাবেন। ব্যাপারটা নিয়ে চীন এতই বিরক্ত যে, এবারের বিশ ভারতীয় সেনার বিপরীতে চীনা আহত-নিহতের ফিগারটা কী তা সে একেবারেই প্রকাশ করেনি। যেন মোদির দল এ নিয়ে কোনো নির্বাচনী বীরত্বগাথা তৈরি না করতে পারে।

ঘটনা হলো, মোদিও চীনের বিরক্ত হওয়ার বিষয়টা জানেন। সম্ভবত এজন্যই মোদি স্বীকার করে নিয়ে বললেন যে, ভারতীয় ভূখণ্ডে কেউ ঢোকেনি। এর উদ্দেশ্য ছিল চীনকে ঠাণ্ডা ও খুশি করা। বরং মনে ওই ধারণা যে এই মোদি উগ্র জাতিবাদী রাজনীতির লোক হিসেবে ভোটের লোভে যেকোনো গল্প বানাতে মিছা মিছা যুদ্ধ লাগিয়ে এই সেই জয় নিয়ে আসছেন বলে কোনো মকারি-যুদ্ধ খাড়া করে ফেলতে পারেন। তাই সত্যিকার ভয় দেখাতে চীন সেনা সমাবেশ করেছে। এর পালটা ভারতও করেছে। তাই সত্যিকার যুদ্ধের মুডে কেউ নেই বলেই মনে হয় যদি না ‘নেশনকে দেখানোর মুডে’ চলে যান মোদি। বিশেষত এই কোভিড ভাইরাসে কাবু হয়ে থাকার কালে। 

সম্প্রতি মোদি লাদাখ সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে আবার হম্বিতম্বি। কড়া কথার মধ্যে তিনি চীনকে পরোক্ষে ‘আগ্রাসনবাদী’ বলেছেন। অর্থাৎ নাম না নিয়ে বলেছেন। আবার সেনাদের সামনে বক্তৃতায় ‘ভারত কখনো মাথা নত করেনি। এখানেও করবে না’ ধরনের গা গরম করা কথা বলেছেন। সেনাদের উত্তপ্ত করতে আর মনোবল ধরে রাখতে এমন কথা রাজনৈতিক নেতারা বলেই থাকেন বা বলতেই হয়। মোদি এরপর কিভাবে পদক্ষেপ-আচরণ করেন তা দিয়ে তার কথার অর্থ তৈরি হবে।
কিন্তু চীন ইতোমধ্যেই একটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ভারত যেন কোনো স্ট্র্যাটেজিক মিস-ক্যালকুলেশন বা ভুল হিসাব না করে বসে। অর্থাৎ মোদির কথা নেহায়েত কথার কথা হিসাবে থাকাটা ভালোÑ চীন এটা বুঝিয়েছে।

মোদি আরেক তত্ত্ব কথা বলেছেন, দুর্বলরা নাকি শান্তি স্থাপন করতে পারে না। তাই তিনি ‘সাহসী’ হতে বলছেন। কিন্তু কথা হলো, দুর্বলের উল্টোটা হলো সবল হওয়া; কিন্তু মোদি খামোখা উল্টাপাল্টা সাহস দেখাতে গিয়ে না ডুবে যান, সে শঙ্কাও হাজির।

আগামী দিনে মোদি আবার ‘আমাকে কেউ মারে নাই’ ধরনের মেসেজ দিয়ে নিজেকে কারেক্ট করেন কিনা কিংবা কী বলে বসে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ