মোস্তফা কামাল
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। এই দীর্ঘ সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের সম্পর্ক কেবল দু’টি ভিন্ন দেশের নাগরিকের আইনি সম্পর্ক নয়; এখানে রয়েছে আরো অনেক রসায়ন। বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের ক্ষমতা অবসান করে কেন্দ্রীয় সরকারে আধিপত্য বিস্তার করা ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় এসেছে। নতুন সরকার বেপরোয়া পুশইন শুরু করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তবাহিনী তা রুখে দেয়ার মধ্যেই বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের আগমন। দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন আবহ এখন।
বাংলাদেশের তিন দিকে তিনটি রাজ্য তথা- পূর্বে ত্রিপুরা, উত্তরে আসাম ও পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি রাজ্য সরকার গঠন করেছে। কেন্দ্রেও আছে বিজেপি সরকার। এখন আর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে অমিলের অজুহাতে সীমান্তের উত্তেজনা ও অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য প্রবাহ আটকানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ১২ জুন, বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত সড়ক দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ করেছেন। বাংলাদেশে দায়িত্বে আসার আগে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী ছিলেন। ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে প্রথামাফিক পেশাগত কূটনীতিবিদদের পরিবর্তে একজন ঝানু রাজনীতিবিদকে নিয়োগ নানা মহলে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। আরেক কঠিন বাস্তবতা হলো- বর্তমানে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী নানা অপরাধের দণ্ড মাথায় নিয়ে অবস্থান করছে ভারতে।
সীমান্তে স্থিতিশীলতা-সহনশীলতা ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণের সাম্প্রতিক অঙ্গীকারও মানছে না ভারত ও দেশটির সীমান্ত বাহিনী। তা সদ্য সমাপ্ত ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনের পরও। ক’দিন আগে হয়ে যাওয়া বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে বিজিবি কর্মকর্তারা ছাড়াও ছিলেন স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদফতর, যৌথ নদী কমিশন এবং অন্যান্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনরা। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩১টি এবং ভারতের পক্ষ থেকে ২১টি অ্যাজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়। অ্যাজেন্ডাগুলোর ওপর আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত হয় প্রামাণিক দলিল। জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশন্সে সই করেছেন বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবি এবং ভারতের পক্ষে বিএসএফ মহাপরিচালক।
বিজিবি মহাপরিচালকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল সম্মেলনে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করে সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের বিষয়টি। বিশেষ করে সীমান্তে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা তথা হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশন্স-জেআরডিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। বাদ যায়নি আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমের কথাও। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রশ্নে উল্টাচিত্র। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বিজিবি মহাপরিচালকের সাক্ষাতের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সীমান্ত সম্মেলনে আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার সাথে অংশগ্রহণকারী বাহিনীর প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ একটি অনুসৃত প্রথা। এর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৫৬তম সীমান্ত সম্মেলনেও যথারীতি বিএসএফের ডিজি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে একই ধরনের সাক্ষাৎ করেন। এবার বিএসএফ মহাপরিচালকের সাথে বিজিবির অন্য শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সাক্ষাৎও পূর্বনির্ধারিত। আয়োজক দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে আমন্ত্রিত দেশের প্রতিনিধিদের সৌজন্য সাক্ষাৎ অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।
সীমান্তে বিজিবির সাহসী ভূমিকা ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তীতে রূপান্তরিত পরিস্থিতিতে জনগণকে সঙ্গী করে সীমান্ত হত্যা, পুশইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, মিয়ানমার সীমান্তে অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবির দায়িত্বশীল ভূমিকা বাহিনীটির বিষয়ে জনমনে আস্থা ফিরিয়েছে, নতুন ভরসাও জাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের যেকোনো ‘পুশইন’ রুখে দিচ্ছে দৃঢ়তার সাথে। এ কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ একটি মাইলফলক ঘটনা। বিজিবি আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে কি না তা নিয়ে আলোচনা এসেছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর জনগণের নতুন প্রত্যাশা। সীমান্ত হত্যা, পুশইন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা-বিশ্লেষণ অবশ্যই তথ্যভিত্তিক হওয়া উচিত। বিজিবির বার্তা স্পষ্ট- আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া যাবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবি ও স্থানীয় জনতার সতর্ক অবস্থানের এ দৃষ্টান্তকে ধরে রাখতেই হবে। যেকোনো অনুপ্রবেশ, পুশইন বা চোরাচালানের বিরুদ্ধে তাদের এ কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে। বিজিবির এ জাগ্রত অবস্থান সীমান্তবর্তী জনপদগুলোর পাশাপাশি পুরো দেশবাসীর মনে গভীর স্বস্তি এনেছে। মনে রাখা দরকার, ভারতের সাথে সীমান্ত ভাগাভাগি করা বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রায় অর্ধেক জেলায় বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ এই সীমান্তে নিরাপত্তা ও সুস্থ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল।
ভারতের সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান ও আফগানিস্তানের সাথে। এর মধ্যে সীমান্তে নিরীহ গ্রামবাসী এমনকি নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা কেবল বাংলাদেশের সীমান্তেই ঘটে, যা দুর্ভাগ্য ও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের প্রায় চার দিকেই ভারতীয় সীমান্ত। এসব সীমান্ত সমতলভূমি, পাহাড়, বন-জঙ্গল, নদী ও সাগরের জলরাশি বিস্তৃত। ফলে সমতল ভূমি ছাড়া অন্যান্য স্থানে দুই দেশের সীমানা সুনির্দিষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। এমন বহু জনপদ আছে যেখানে একটি বাড়ির বসতভিটা সীমান্তের এক দিকে আর রান্নাঘর অপর দিকে। গাছের গোড়া এক দেশে আর পাকা ফল ঝরে পড়ে অন্য দেশে।
পাহাড় ও বন এলাকায় সীমান্ত পিলার জঙ্গলে ঢেকে যায়। এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলা অসম্ভব হয়। বলা চলে পাহাড়, নদী, সাগর ও জঙ্গলে তা মেনে চলা কঠিন। ভারত ও বাংলাদেশের সামনে এখন বড় বিষয় হয়ে আসবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা। তিস্তা, ফেনী, গোমতিসহ সব অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহের সঠিক হিসাব নির্ধারণ করাও চ্যালেঞ্জিং বিষয়। অথচ সীমান্তের পরিপ্রেক্ষিত এমনটি নয়। স্থানিক পর্যায়ে সীমান্তের দুইপাড়ের মানুষের মধ্যে এখন বৈবাহিক এবং পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। এপারে কারো ফুফু বা খালার বাড়ি, ওপারে মামাবাড়ি।
কোথাও কোথাও জিরো লাইনের কাছাকাছি থাকা মসজিদ, মন্দির বা গির্জায় দুই দেশের নাগরিকরাই মিলেমিশে ব্যবহার করত। জুমার নামাজ, বার্ষিক ওরস বা ধর্মীয় উৎসবে এক মধুর আবহ থাকত। তা বরবাদে একতরফা ভূমিকা ভারতেরই। সীমান্তবাসীর মনস্তাত্ত্বিক এ বৈশিষ্ট্য পদে পদে বিনষ্ট করেছে তাদের সীমান্তবাহিনী। বিগত দেড় দশকে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তজুড়ে ব্যাপক হারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, ফ্লাডলাইট স্থাপন এবং বিএসএফের আক্রমণাত্মক নজরদারি এই চিত্রটিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
বিজিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় দুই হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছিল। ওই সময়ে মূলত বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ছোট-বড় দলে ভাগ করে পুশইন করা হতো। অন্য দিকে ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে এসে এই পুশইনের প্রচেষ্টা নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুশইনের নিষ্ঠুর অপচেষ্টা চলছে, কাঁটাতারের শূন্যরেখায় শিশু ও নারীদের খোলা আকাশের নিচে দিনভর আটকে থাকা এবং বিএসএফের গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা- আগের সেই মানবিক আবেগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবাহিনী-বিজিবি ওপারের সাধারণ জনতাকে কখনো তাচ্ছিল্য করে না। কখনো চোর-পাচারকারী সাজিয়ে তাদের গুলি করে না, পেটায় না। সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবি দুরন্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, চোখে চোখ রাখছে বিএসএফের সাথে। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে নয়। সীমান্ত ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পুরোটাই চর্চা করছে বাহিনীটি। সৌন্দর্যের সমান্তরালে বিজিবির এ বীরত্ব দেশের জন্য গর্বের।
লেখক : ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন



