আধ্যাত্মিকতা, ইবাদত, আত্মত্যাগ এবং ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে ফিরে আসে পবিত্র মহররম মাস। মুসলিম উম্মাহর কাছে এই মাসের ১০ তারিখ অর্থাৎ ‘পবিত্র আশুরা’ একাধারে ঐতিহাসিক, ঘটনাবহুল, তাৎপর্যপূর্ণ এবং কারবালার হৃদয়বিদারক স্মৃতির কারণে শোকাবহ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। রাসূলুল্লাহ সা:-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন রা: এবং তাঁর পরিবারবর্গের অন্যায়, অসত্য ও জুলুমের বিরুদ্ধে অনড় অবস্থান এবং শাহাদত এই দিনটিকে ত্যাগের এক অনন্য মূর্তপ্রতীক করে তুলেছে। দুর্ভাগ্য হলো কালক্রমে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে মূল ইসলামী আদর্শের বাইরে গিয়ে নানা ধরনের অনৈসলামিক প্রথা, কুসংস্কার এবং অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আশুরার প্রকৃত শিক্ষা এসব বাহ্যিক আড়ম্বর, লৌকিকতা এবং কৃত্রিম মাতমের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ।
‘আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস হলো বারোটি। আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহ এই ১২টি মাস নির্ধারণ করে রেখেছেন। এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষভাবে সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ।’ (সূরা তাওবাহ-৩৬) মহররম মাস হলো এই চারটির মধ্যে অন্যতম একটি। বাকি তিনটি মাস হলোÑ জিলকদ, জিলহজ ও রজব। ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, এই চার পবিত্র মাসে সবধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মহররমের ১০ তারিখ তথা আশুরার দিন হজরত মুহাম্মদ সা: নিজে রোজা রেখেছেন এবং মুসলমানদের রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এই রোজা রাখার পেছনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। রাসূল সা: যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে এলেন, তখন তিনি দেখতে পান যে, মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে। তিনি তাদের এই রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইহুদিরা উত্তর দেয় :
‘এটি একটি মহান দিন। এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা আ: ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার দলকে সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই মূসা আ: আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই দিনে রোজা রেখেছিলেন, আর আমরাও তাঁর অনুসরণে এই দিনে রোজা রাখি।’ ইহুদিদের এই উত্তর শুনে রাসূল সা: বললেন, ‘তোমাদের চেয়ে আমরা মূসা আ:-এর আদর্শের অধিক হকদার ও নিকটবর্তী।’ (বুখারি-২০০০, মুসলিম-১১৩০) এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে, আশুরার মূল চেতনা হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয় উদযাপন।
আশুরার রোজার সবচেয়ে বড় ফজিলত হলো, এর মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার বিগত এক বছরের ছোট বা সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেন। রাসূল বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, আশুরার দিনের রোজা তার পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হবে।’ (মুসলিম-১১৬২) ইসলামে রমজান মাসের ফরজ রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে নফল ও সুন্নত রোজার মধ্যে মহররমের রোজার স্থান সবার উপরে। হজরত ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন : ‘আমি নবী করিম সা:-কে রমজান মাস এবং আশুরার দিন ব্যতীত অন্য কোনো দিনের রোজাকে অন্য দিনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে এত গুরুত্বসহকারে অনুসন্ধান করতে দেখিনি।’ (বুখারি-২০০০)
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম নববী রহ: এবং অন্য মুহাদ্দিসদের মতে, আশুরার রোজার সুন্নাহ আদায়ের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো মহররমের ৯ এবং ১০ তারিখে রোজা রাখা। তবে কোনো কারণে যদি ৯ তারিখে রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে ১০ এবং ১১ তারিখে রোজা রেখে ইহুদিদের সাদৃশ্য থেকে মুক্ত থাকা উচিত। এটিই হলো আশুরার বিশুদ্ধ ইবাদত পদ্ধতি।
সাংস্কৃতিক রূপান্তর
ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলার সমাজ ও ইতিহাসে মহররমকে কেন্দ্র করে এক বিশাল সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটেছিল। নবাবী আমলে (১৭১৭-৯৩ খি:) তৎকালীন স্বাধীন ও আধা-স্বাধীন নবাবদের প্রায় সব রাজবংশই ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে ইসনা আশারি বা দ্বাদশী শিয়া ছিলেন। ফলে তাদের সময়ে কারবালার স্মৃতিচারণ ও মহররমের নানা আনুষ্ঠানিকতা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। নবাব মুর্শিদকুলী খান (১৭১৭-২৭ খ্রি:) বাংলার ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, তা মূলত নাসিরি রাজবংশ (১৭১৭-১৭৪০ খ্রি:) নামে পরিচিত। এই বংশের সব শাসকই ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় জীবনে বিশেষ ধর্মীয় মতাবলম্বী ছিলেন। নবাব মুর্শিদকুলী খান জন্মসূত্রে দাক্ষিণাত্যের এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলেও শৈশবে তাকে পারস্যের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম হাজী শফি ইসফাহানি দত্তক নেন। তিনি এই বালককে ‘মুহাম্মদ হাদি’ নাম দিয়ে সম্পূর্ণ বিশেষ ধর্মীয় ভাবধারায় ও উচ্চশিক্ষায় বড় করে তোলেন। পরে বাংলার মসনদে বসার পর মুর্শিদাবাদে তার তৈরি বিখ্যাত ‘কাটরা মসজিদ’ এবং সেখানে বিশেষ ধর্মীয় ওলামাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা তার ধর্মীয় বিশ্বাসের এক বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ। নবাব সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান (১৭২৭-৩৯ খ্রি:) ছিলেন মুর্শিদকুলী খানের জামাতা এবং পরবর্তী নবাব। তিনি ইরানের বিখ্যাত আফশার বংশোদ্ভূত পরিবারের সন্তান ছিলেন।
নাসিরি বংশের পর বাংলার ক্ষমতায় আসে আফশার বা আলীবর্দী বংশ। নবাব আলীবর্দী খানের পরিবারও ছিল ইরান থেকে আসা অত্যন্ত সভ্রান্ত বংশোদ্ভূত। নবাব আলীবর্দী খান (১৭৪০-৫৬ খ্রি:) সরফরাজ খানকে গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত করে বাংলার মসনদে বসেন। তার শাসনামলে মুর্শিদাবাদ ও হুগলিতে বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতি, তাজিয়া মিছিল ও মহররমের শোক র্যালিতে রাষ্ট্রীয় বাজেট ও পৃষ্ঠপোষকতা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। নবাব আলীবর্দী খানের দৌহিত্র এবং বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌলাও (১৭৫৬-৫৭ খ্রি:) ছিলেন একই মতাদর্শের অনুসারী। মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত ‘নিজামত ইমামবাড়া’ মূলত তার সময়েই প্রথম বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত গাম্ভীর্য ও রাজকীয় সম্মানের সাথে কারবালার শোক পালন করা হতো। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর নির্মম যুদ্ধের পর মীর জাফর যে বংশের সূচনা করেন, তা ইতিহাসে নাজাফি রাজবংশ (১৭৫৭-৯৩ খ্রি:-স্বাধীন আমল পরবর্তী) নামে পরিচিত। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত বিতর্কিত এবং ইংরেজদের হাতের পুতুল হলেও, ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে এই বংশের নবাবরা সবাই ছিলেন বিশেষ ধর্মীয় বিশ্বাসের।
নবাবদের যুগের বাইরেও মুঘল সুবাহদারদের (গভর্নর) আমলে বাংলায় একই ধরনের প্রভাব ছিল। এই বিশেষ ধর্মীয় শাসকদের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক শাসনের ফলেই বাংলায় বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, ঢাকা (ঐতিহাসিক হোসাইনি দালান ইমামবাড়া) এবং হুগলিতে মহররমের আনুষ্ঠানিকতা, ইমামবাড়া সংস্কৃতি, তাজিয়া মিছিল এবং শোকগাথার ওপর ফারসি সংস্কৃতির এক বিশাল, গভীর ও স্থায়ী প্রভাব তৈরি হয়েছিল। পরে যা সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়।
আশুরার প্রকৃত শিক্ষা
মানুষের অসচেতনতার কারণে সমাজে আশুরাকে কেন্দ্র করে অনেক অনৈসলামিক প্রথার জন্ম হয়েছে। মহররম এলে অনেক জায়গায় বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন’ বলে কৃত্রিম মাতম করা, বিশেষ ধরনের কালো পোশাক পরা, শরীরকে রক্তাক্ত করা, ঢোল-তবলা বাজিয়ে লাঠিখেলা ও তাজিয়া মিছিলের নামে মেলা বসানো এবং বিশেষ ধরনের খিচুড়ি বা শিন্নি তৈরিকে বাধ্যতামূলক মনে করা হয়। অথচ ইসলামের স্পষ্ট বিধান হলো, কারো মৃত্যুতে এভাবে বুক চাপড়ে কাপড় ছিঁড়ে মাতম করা নিষিদ্ধ। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের কাঁদায়; কিন্তু ইসলাম আমাদের ধৈর্য ও আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়, কৃত্রিম আড়ম্বরের নয়।
আশুরার প্রকৃত ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখা, ইস্তিগফার করা এবং কারবালার শহীদদের মহান ত্যাগের চেতনাকে নিজের জীবনে ধারণ করা।
আশুরাকে সবধরনের অপসংস্কৃতি, লৌকিকতা ও কুসংস্কারের কবল থেকে মুক্ত করতে হলে দেশের আলেম সমাজ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যমকর্মীদেরকে অগ্রণী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। সাধারণ মানুষকে আবেগের চেয়ে বিবেকের এবং বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে পবিত্র সুন্নাহর অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার



