প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী শেখ মুজিবকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। আর আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। সেসময় তাজউদ্দীন আহমদ ভারত সরকারের সহায়তায় একটি প্রবাসী সরকার গঠন করেন। প্রবাসী সরকার নিজেদের মুজিবনগরভিত্তিক সরকার হিসেবে পরিচয় দিলেও আসলে তা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক, যার সদর দফতর ছিল ৪নং থিয়েটার রোডের একটি প্রশস্ত বিলাসবহুল বাড়ি, যা একসময় ছিল অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের বাসভবন।
তাজউদ্দীন আহমদ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করতেন। ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের চিন্তা তার ছিল না। তার অফিস কক্ষের পেছনের কক্ষটি ছিল তার বাসগৃহ। সেখানেই তিনি থাকতেন। নিজের কাপড় নিজেই ধুতেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব ছিলেন ড. ফারুক আজিজ খান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে একটি বই লিখেছেন। ১৯৭১ নামক ওই বইয়ে তিনি কৌতূহলোদ্দীপক একটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশ যে স্বাধীন হবে, সে বিষয়ে তাজউদ্দীন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে দেশ কতটা বাসযোগ্য হবে, সে বিষয়ে তার সন্দেহ ছিল। তিনি যখন বিষণ্ন থাকতেন, তখন মাঝে মধ্যেই আমাকে বলতেন, আমি জানি না, ‘তুমি দেশে বাস করতে পারবে কি না।’ আমি তাকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সফল হইনি। “মুক্তিযুদ্ধে তিনি যেভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, আসলেই সেটা খুব কঠিন কাজ ছিল। চার দশক পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক বাঙালিকে একই মনোভাব পোষণ করতে দেখি। তাদের এই মনোভাবের কারণ হয়তো ভিন্ন।” (পৃষ্ঠা-১৩৫)

তাজউদ্দীন কন্যা শারমিন আহমদ তার ‘তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা’ বইয়ে আরেকটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “৬ ডিসেম্বর যেদিন ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলো সেদিন আমাদের সবার হৃদয়ে বয়ে গেল বিপুল আনন্দের জোয়ার। আমাদের ছোট ফ্ল্যাটটি ভরে গেল ফুলে আর ফুলে।
আব্বু আমাদের উল্টো দিকের কোনাকুনি ফ্ল্যাটে গেলেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে মন্ত্রিসভার সভা করতে। আব্বুর সঙ্গে আনন্দে উল্লসিত আরো অনেকে। সভা সেরে মাত্র আধঘণ্টার জন্যে আমাদের ফ্ল্যাটে এলেন। সোহেলকে তিনি কোলে তুলে নিলেন। আনন্দে বিহ্বল আমরা দাঁড়ালাম আব্বু, আম্মার পাশে। আমাদের সবার হাতে ধরা ফুলের তোড়া। আব্বুর চেহারায় বিষণ্নতার ছাপ। তিনি ফ্ল্যাট ভরা উল্লসিত লোকজনের মধ্যে থেকে হঠাৎ করে ঢুকলেন আমাদের শোবার ঘরে। তার কিছুক্ষণ পরই ঝড়ের গতিতে বের হয়ে চলে গেলেন। বহু যুগ পর আম্মা আমার কাছে সেই বিশেষ দিনের একটি অজানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। আব্বু ঘরে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই আম্মা ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি দেখেন আব্বু ঘরের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। আম্মা, যিনি আব্বুকে গভীরভাবেই জানতেন, বুঝলেন যে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য কাঁদছেন। বাংলাদেশের জন্য এত বড় অর্জন, এই স্বীকৃতির দিন, অথচ তিনি পাশে নেই। আম্মাকে দেখে আব্বু কান্না থামালেন। তার পর কোনো এক গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আব্বু জানালার গরাদে হাত রাখলেন। তার পর আম্মা দেখলেন যে আব্বু আম্মার দিকে ‘অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে’ তাকিয়ে রয়েছেন। তার পর হঠাৎই আম্মাকে বললেন, ‘শ্রীমাভো বন্দরনায়েক কি তুমি হবে?’ দু’বার কথাটি তিনি উচ্চারণ করলেন আব্বুর হঠাৎ ওই উক্তিটি সম্পর্কে আম্মা তার মনের অবস্থা আমার কাছে এভাবে ব্যক্ত করলেন, ‘ঐ মুহূর্তে আমি তাজউদ্দীনের ঐ তাল, লয়, পৃথিবীর বাস্তবতা বিচ্যুত, পৃথিবীর লাখো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন মন্তব্যের কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না। কথাটি বলেই তাজউদ্দীন দ্রুতগতিতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি বেশ কয় মুহূর্ত নিঃসাড় হয়ে আকাশ-পাতাল ভাবনার রাজ্যে ডুবে গেলাম। ঐ কথাটির অর্থ কী?
১৯৫৯ সালে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী সলোমান বন্দরনায়েক বৌদ্ধধর্মাবলম্বী এক চরমপন্থী ভিক্ষু-ধর্মযাজকের গুলিতে প্রাণ হারান। ১৯৬০ সালে তাঁর বিধবা স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েক তাঁর স্বামী শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম দলের নেতৃত্ব দেন এবং বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। শ্রীলঙ্কার ঐ রাজনৈতিক ঘটনা ও পরিবেশের সঙ্গে আব্বুর ঐ মন্তব্যটির কী কোনো সম্পর্ক ছিল? স্বীকৃতির ঐ আনন্দঘন পরিবেশ ছাড়িয়ে আব্বু কী দিব্যদৃষ্টি মেলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্যোগ ও তাঁর জীবনের মর্মান্তিক পরিণতিই দেখতে পেয়েছিলেন? আব্বুও চরমপন্থী ঘাতকদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন।” (পৃষ্ঠা ১২১-১২২)
বাংলাদেশ কেন বাসযোগ্য হবে না সে বিষয়ে ফারুক আজিজ খান তাজউদ্দীন আহমদকে কোনো প্রশ্ন করেছিলেন কি না, তা তার লেখা থেকে জানা যায় না। তবে ওই কঠিন সময়টা তাজউদ্দীন আহমদ যেভাবে পার করেছেন তার বিশ্লেষণ করলে কিছুটা ধারণা করা যায় কেন তাজউদ্দীন আহমদ এরকম একটি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। তাজউদ্দীন আহমদকে সেসময় যেসব কঠিন সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে :
এক. নেতাদের মধ্যে কোন্দল। তাজউদ্দীন আহমদ কেন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন তা নিয়ে দলীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। ফারুক আজিজ খান সে বিষয়ে লিখেছেন, “দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে অনেকেই মনে করতেন যে তাঁরাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য দাবিদার। এ জন্য তাঁদের নিজস্ব যুক্তিও ছিল। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল- অন্তত প্রথম দিকে। অনেক প্রভাবশালী এমএনএ তাজউদ্দীনের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন খন্দকার মোশতাক ও মিজানুর রহমান চৌধুরী। অধ্যাপক ইউসুফ আলী উত্তরবঙ্গের একটি অংশের নেতৃত্ব দিতেন, যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ছিলেন। তবে তাঁরা অত সরব ছিলেন না। সিলেটের এমএনএ দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং চট্টগ্রামের এমপি জহুর আহমেদ চৌধুরী মুজিবনগর সরকারের সমালোচক ছিলেন। জহুর আহমেদ আগরতলায় নিজের দফতর খুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি দু-একবার কলকাতায় এসেছিলেন। ফরিদ গাজীকে একবার থিয়েটার রোডে আসতে দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। বরিশালের তরুণ এমএনএ নূরুল ইসলাম মনজুও সরকারের তীব্র সমালোচক ছিলেন। এরকম আরও কয়েকজন ছিলেন। আমি দেখছিলাম যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কোনো চেইন-অব-কমান্ড নেই। আর এটা আসলে নেতৃত্বের সঙ্কটকেই তুলে ধরেছে। বেশ কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও যেকোনো একজনকে প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করা কঠিন ছিল। তাজউদ্দীন সাহেব একাধিকবার বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল। এর সমস্যাও অনেক বড়। তিনি তাঁর এই মন্তব্যের বিষয়ে খুব নিশ্চিত ছিলেন।” (পৃষ্ঠা-১৩৪)
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম তাঁর ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইয়ে লিখেছেন : “সে সময়ে নিচের পর্যায়ে কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যক্তির দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আমাদের বিস্মিত করে। যুদ্ধ করার চাইতেও যুদ্ধ শেষ হলে বাংলাদেশে কে কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হবেন সে উদ্দেশ্যে ‘লবি’ করতেই তাঁরা অধিকাংশ সময় ব্যস্ত ছিলেন। তারা হয়তো ভাবতেন যে, যুদ্ধ করার দায়িত্ব তাঁদের নয়, এটা অন্যদের কাজ। তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্বে। ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে অত্যন্ত তিক্ত কলহে লিপ্ত হয়ে অচিরেই তাঁরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে পড়েন এবং তাদের তিক্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলটিকে প্রায় বিভক্ত করে ফেলে। কিন্তু তার চেয়েও অধিক বেদনাদায়ক ছিল এদের অনেকেরই অশালীন জীবনধারা। তাঁরা ভালো খাবার-দাবার এবং দামি কাপড়-চোপড়ের জন্য খরচ করতে লাগলেন দেদার, আর এভাবেই স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত একটি জাতির ভাবমূর্তিকে ম্লান করা হলো বহুলাংশে। বিলাসবহুল আবাস, সুন্দর দামি পোশাক, উন্নতমানের খাবার এবং পানীয়, দামি সিগারেট- সব কিছুর প্রতি ছিল তাঁদের প্রচণ্ড মোহ। বাংলার মানুষ যখন নিদারুণ প্রতিকূল পরিবেশে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, এদেশের কোটি কোটি মানুষের মাথার ওপর যখন বসছে মৃত্যুর খড়গ, প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে বাংলার শত শত মানুষ, তখন এদের অনেকেই হতভাগ্য এ দেশবাসীর সাথে সহমর্মিতার নিদর্শনস্বরূপ একটু সংযমের পরিচয় দেয়ার চেষ্টাও করেনি।” (পৃষ্ঠা : ২২১-২২২)
দুই. শেখ ফজলুল হক মনির উদ্ধত আচরণ। ফারুক আজিজ খানের ভাষ্যমতে, “প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় হুমকি ছিলেন শেখ মুজিবের ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি। বয়সে তরুণ হলেও তিনি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বঙ্গবন্ধুর ভাগনে হিসেবে নির্বাসিত সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার কেবল তাঁরই আছে। মনি অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর জীবনের ওপর হুমকি তৈরি করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রাণনাশের জন্য একজন সশস্ত্র তরুণকে পাঠানো হয়েছিল। সে অবশ্য এসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান। শেখ মনি তাঁর সহযোগীদের নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) সহায়তায় গঠন করেন ‘বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’ (বিএলএফ)। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান, যাঁকে একজন মার্ক্সীয় তাত্ত্বিক বলা হয়।” (পৃষ্ঠা-১৩৫)
তিন. ব্যাংক লুটের টাকা আত্মসাৎ। ফারুক আজিজ খান আরো লিখেন, “সেসময় একটি জোর গুজব রটে যায় যে স্টেট ব্যাংকের বগুড়া শাখা থেকে লুট করা টাকাসহ বেশ কয়েক লাখ রুপি কিছু লোকের কাছে আছে। আর তারা কলকাতায় বেশ আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করছে। আমি অবশ্য জানতাম না যে তারা কারা আর তা জানার চেষ্টাও করিনি।” (পৃষ্ঠা-১৩২) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচের কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কাইউম খান তার ‘বিটারসুইট ভিক্টরি : এ ফ্রিডম ফাইটার’স টেল’ বইয়ে ১৯৭১ সালের মার্চে বিভিন্ন ব্যাংক ও ট্রেজারি থেকে লুট করে ভারতে নিয়ে যাওয়া অর্থ আত্মসাতের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, স্বাধীনতার পর তাদের জীবনযাত্রার মান হঠাৎ করে উন্নত হয়ে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা সমর্থিত হয়।
মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচটি ইমামের লেখা ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ বই থেকে জানা যায়, অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে আগস্ট মাসে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। ১৬ আগস্ট এমএ হান্নান চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং জে জি ভৌমিক ও এস বড়ুয়াকে সদস্য করে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল তাদের দায়িত্ব ছিল কী পরিমাণ আর্থিক ও অন্যান্য সম্পদ বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে ভারতে নিয়ে আসা হয়েছিল তা জানা এবং সেসব সম্পদ সরকারের কাছে যথাযথভাবে হস্তান্তর করা হয়েছিল কি না সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। কর্নেল শরিফুল হক ডালিম বীর উত্তম তাঁর ‘আমি মেজর ডালিম বলছি’ বইয়ের ৮৯ নম্বর পৃষ্ঠায় এক মহারথীর ব্রিফকেস থেকে ১২ লাখ টাকা উদ্ধারের এক চমকপ্রদ কাহিনীর উল্লেখ করেছেন।
চার. সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ। এ সম্পর্কে ফারুক আজিজ খান লিখেছেন, “দলের মতো সশস্ত্রবাহিনীতেও ঐক্যের অভাব ছিল। সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ আমাদের চোখে ধরা পড়েছিল। একটি পক্ষ কর্নেল (অব:) আতাউল গনি ওসমানীকে সরিয়ে একজন নিয়মিত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য সচেষ্ট ছিল। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিস্তারিত না জানলেও এদের বিপক্ষ দল সম্পর্কে অবগত হয়েছিলাম। ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে অনুরোধ করব, আপনি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দেবেন যে আমরা সেনাপ্রধানকে (ওসমানী) পরিবর্তন করার যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করব।’ আমি যখন প্রধানমন্ত্রীকে বার্তাটি পৌঁছে দিই, তখনই বুঝতে পারি যে তিনি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। তবে এ বিষয়ে তাঁর মনোভাব আমাকে বুঝতে না দিয়ে তিনি বললেন, ‘আরও কিছু জানলে আমাকে জানাবেন।’ আমি অবশ্য আর কিছু জানতে পারিনি। ধারণা করি, বিষয়টি ওখানেই শেষ হয়েছিল।” (পৃষ্ঠা-১৪০) ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ বইয়ে মঈদুল হাসান বলেছেন- “তাঁরা তাঁদের নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে, একই সঙ্গে নৈরাশ্য ও রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে বড় হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠেছে ওয়ার-লর্ড বা সেনানায়কসুলভ আত্মগরিমায়। এঁরা রাজনীতিবিদদের কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ববোধের অভাব দেখে তাঁদের অশ্রদ্ধা করতে শেখেন। শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অশ্রদ্ধাজনিত কথা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের মুখে আমি এবং আরও অনেকেই ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে শুনেছি। তিনি যে একটা সফল অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর যে একটা বিরাট অবদান ছিল, কিন্তু তৎসত্ত্বেও তিনি নিজে ধরা দেওয়ার ফলে এই যে অত্যন্ত বিরূপ দুর্দশার মধ্যে সবাই পড়েছি, এটা নিয়ে সবার মধ্যে আলোচনা হতো।” (পৃষ্ঠা-৬৩)
‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ বইয়ে এস আর মীর্জার মন্তব্য হচ্ছে, সামরিক বাহিনীতে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ প্রবেশ করেছিল পাকিস্তান আমলে। তবে অধস্তন পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারা তখন ক্ষমতার জন্য উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠেননি। শুধু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী হয়েছিলেন। এটা সেনাবাহিনীর সমগ্র অংশ নয়। মুক্তিযুদ্ধকালে এটা হয়েছিল সেক্টর অধিনায়কদের পর্যায়ে। আর এই যে তিনটা ব্রিগেড বাহিনী তৈরি করা হলো যে প্রক্রিয়ায়, সেটা তাদের রাজনৈতিকীকরণে প্রভূত সহায়তা করেছে।” (পৃষ্ঠা-৬২)
পাঁচ. মুক্তিযোদ্ধাদের লুটপাট। এ কে খন্দকার তাঁর ‘ভেতরে বাইরে’ বইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লুটপাট সম্পর্কে লিখেছেন, “কিছু গেরিলা ভেতরে গিয়েছে মূলত অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, যেমন লুট, হত্যা, ডাকাতি ইত্যাদি এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রচণ্ড ক্ষতি করেছে। কিছু দল ভেতরে গিয়ে প্রায়ই তাদের অস্ত্রগুলো ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য রেখে দিচ্ছে এবং কোনো অভিযান পরিচালনা করছে না। ছেলেদের একটি বড় অংশ একেবারে তাৎপর্যহীন কিছু কাজ করছে, যা যুদ্ধে কোনো সাহায্য করছে না, যেমন টেলিফোনের তার কেটে দেওয়া।” (পৃষ্ঠা-৯৭) মঈদুল হাসান তার মূলধারা ‘৭১ বইয়ে লিখেছেন, “মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিংয়ের ব্যাপারে পরিষদ সদস্যদের সুপারিশ করার যে বিধান ছিল, অনেক ক্ষেত্রে সেই সুপারিশের অপব্যবহার ঘটতে দেখা গেছে। এঁদের অনেকে স্থানীয় রাজনীতির সুবিধার্থে অধিক সংখ্যায় কেবল নিজ নিজ এলাকার তরুণদের মুক্তিবাহিনীতে ঢোকাবার প্রবণতা দেখাতেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর দৈহিক যোগ্যতা, সংগ্রামী স্পৃহা এবং চারিত্রিক গুণাগুণ শিথিলভাবে বিচার করা হয়েছে। অংশত এর ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহত্তর অংশ পরবর্তীকালে লড়াই থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে থাকে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ অপেক্ষা গ্রামীণ বিবাদ ও ব্যক্তিগত রেষারেষির নিষ্পত্তিতে, এমনকি সরাসরি লুটতরাজে অংশগ্রহণ করে।” (পৃষ্ঠা-২১)
জেনারেল (অব:) এস এস উবান তাঁর ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগং’ বইয়ে লিখেছেন, ‘যুবনেতারা বাংলাদেশের ভেতরে তাদের বিস্তৃত সংগঠনের বদৌলতে জানতে পেরেছিলেন যে কিছু মুক্তিবাহিনী ইউনিট কিছু বদ অভ্যাস রপ্ত করেছে, যাদের মধ্যে কতকে সাধারণ জনগণের ওপর লুটতরাজ করেছে এবং তাদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার চালিয়েছে, অন্যেরা ব্যক্তিগত শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে। আগেই যেমন বলা হয়েছে, মুক্তিবাহিনীতে সব রকমের লোককে রিক্রুট করা হয়েছিল এবং যদিও একটি ফোর্স হিসেবে মুক্তিবাহিনী চমৎকার কাজ করেছিল, তবু মুক্তিবাহিনীর মধ্যে কেউ কেউ ছিল নিন্দনীয় এবং তারা গোটা ফোর্সের দুর্নাম সৃষ্টি করেছিল।” (পৃষ্ঠা-৪১)
ছয়. মুজিব বাহিনী কর্তৃক বামপন্থীদের হত্যা। ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ বইয়ে এস আর মীর্জা বলেছেন, “আমি অনেক গেরিলা ও মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে শুনেছি যে মুজিব বাহিনীর অনেক সদস্যই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যাঁরা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেককে হত্যা করেছেন। এমনকি বাম রাজনীতি করেন, এমন সন্দেহের বশবর্তী হয়েও অনেককে হত্যা করা হয়।” (পৃষ্ঠা-১২১)
এতসব কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখা ও জানার কারণেই সম্ভবত তাজউদ্দীন আহমদ মনে করতেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবে ঠিকই, তবে বাসযোগ্য হবে না।



