ইরান-আমেরিকার চুক্তি

স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ধমক, হুমকি ও ফেক নিউজের মাধ্যমে ভিলেন থেকে হিরো হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। আজ না হয় কাল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি হতেই হবে। এটা সেই চুক্তি হবে, যা ৮ এপ্রিলের আগে চূড়ান্ত হয়েছিল। এই চুক্তির পর ট্রাম্প নিজে নিজেকে ইরান বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করবেন, কিন্তু সত্য হচ্ছে, তিনি মূলত ইরানের হিতাকাক্সক্ষী হয়ে গেছেন। তিনি যদি ইরানের ওপর হামলা না করতেন, ইরান তাকে পরাজিতও করত না এবং ইরান আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়ার এ সুবর্ণ সুযোগও পেত না।

আপনি মানেন আর না মানেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু ইরানের হিতাকাক্সক্ষী। ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে এক হয়ে ইরানকে ভিলেন থেকে হিরো বানিয়ে দিয়েছেন। আজকাল ট্রাম্পকে প্রতিদিন ইরানকে হুমকি দিতে দেখা যাচ্ছে। সবাই জানেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভিলেন হয়ে যাওয়াটা ট্রাম্পের ভালো লাগছে না। তিনি ইরানকে হুমকি দিয়ে নিজেকে আসল হিরো প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এ চেষ্টায় তিনি ইরানকে সুপারপাওয়ার আমেরিকার সমকক্ষ বানিয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্প বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন, তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে দেবেন না। তিনি এ দাবিও করছেন, ইরান আমাদের সাথে চুক্তি করতে চাচ্ছে। খুব শিগগিরই এই চুক্তি হয়ে যাবে। কিন্তু এরপর এক হুমকি দিয়ে চুক্তির প্রভাবকে তিনি নিজেই নষ্ট করে দিচ্ছেন।

যদি আমি এ কথা বলি যে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি অঘোষিত চুক্তি উভয় দেশের মাঝে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার আগেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত আপনারা বিশ্বাস করবেন না। আপনারা বিশ্বাস করুন, আর না করুন, ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইল এক হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, ট্রাম্প মার্চের মাঝামাঝি এ যুদ্ধ থেকে নিজে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। ইউরোপের দেশগুলো ও ব্রিটেন এই যুদ্ধে ট্রাম্পকে সঙ্গ দিতে অস্বীকার করে। একইসাথে আমেরিকাতেও এ যুদ্ধ বেশ অগ্রহণযোগ্য ছিল।

ট্রাম্পের ইচ্ছানুযায়ী, পাকিস্তানের নেতৃত্ব ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা শুরু করলে তেহরানের নেতৃত্ব যুদ্ধবিরতিতে রাজি ছিল না। জি হ্যাঁ, এ যুদ্ধের অনেক রহস্যের মধ্যে এটিও একটি যে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানে শুধু শাসন পরিবর্তনই চাচ্ছিলেন না, বরং ইরানকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করতে চাচ্ছিলেন। একটি রাষ্ট্র ভেঙে তিনটি রাষ্ট্র বানাতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাহাদত ইরানি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছে। ইরানের নেতৃত্বের আত্মত্যাগ ও ইরানি জাতির ঐক্য আমেরিকার পরাজয়ে পরিণত হয়। অতঃপর এ পরাজয়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে পাকিস্তান এক মধ্যস্থতাকারী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। যখন পাকিস্তান ইরানের নেতৃত্বের সাথে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু করে, তখন ইরানি নেতৃত্ব স্পষ্ট বলে দেয় যে, ট্রাম্প একজন অবিশ্বস্ত মানুষ। ট্রাম্প বারবার ইরানের সাথে আলোচনা করেন। বারবার ইরানে হামলা চালান। সুতরাং এখন যুদ্ধবিরতি সেই সময়ই হবে, যখন ট্রাম্প আমাদের এই নিশ্চয়তা দেবেন যে, ইরানের ওপর আর হামলা করবেন না। আমাদের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করবেন।

পাকিস্তান ইরানি নেতৃত্বের জবাব ট্রাম্পের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। ট্রাম্প নিশ্চয়তা দেন, তিনি তৃতীয়বার ইরানে হামলা করবেন না এবং পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্যও প্রস্তুত আছেন। এরপর দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়। এটা এক দীর্ঘ কাহিনী, এর মধ্যে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ কাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পক্ষ থেকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা।

যখন ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ৫০ বছরে প্রথমবারের মতো উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হলো, তখন পাকিস্তান এই দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দফাগুলোর ওপর আগেই একমত করিয়ে নেয়। এই ঐকমত্যের পর ইরানের প্রতিনিধিদল পাকিস্তান আসতে সম্মত হয়। ইরানি নেতৃত্ব বারবার পাকিস্তানকে বলেছে যে, ২০২৫ সালে ওমানও আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু ওমানের ভূমিকা ছিল শুধু এক পত্রবাহক বা পোস্টম্যানের মতো। পাকিস্তানকে শুধু মধ্যস্থতাকারী হলে হবে না; বরং নিশ্চয়তা দিতে হবে, ইরানে আর হামলা হবে না। ট্রাম্প বারবার পাকিস্তানি নেতৃত্বের প্রশংসা করে ইরানকে নিশ্চয়তা প্রদানের চেষ্টা করেন, পাকিস্তানের ওপর আমেরিকার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ইসলামাবাদে আলোচনার প্রথম পর্ব শুরু হওয়ার আগেই সেই সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছিল, যা নিয়ে ট্রাম্প এখনো হইচই করছেন। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানাতে সম্মতি প্রকাশ করেছিল। আর আমেরিকা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া ও ইরানের ফ্রিজ করা সম্পদ পুনরুদ্ধার করার দাবি মেনে নিয়েছিল। ইসলামাবাদে আমেরিকা ও ইরানের এ চুক্তি বাস্তবায়নে একটি সময় বেঁধে দেয়া ও অন্যান্য বিবরণ নির্ধারণের কথা ছিল।

যখন সব বিষয় চূড়ান্ত হয়ে গেল, তখন ট্রাম্পের একটি ফোনকলের পর মার্কিন প্রতিনিধিদল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি উত্থাপন করল। এ টেকনিক্যাল বিষয়টি পরে মীমাংসা হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু ইরান এ বিষয়ে নমনীয়তা দেখিয়েছিল। এ কারণে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বারবার বলছেন, ইসলামাবাদের আলোচনা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ওই আলোচনায় উভয়পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ জে ডি ভ্যান্সকে আমেরিকায় ডেকে নেয়া হয়। ফেরত যাওয়ার জন্য জে ডি ভ্যান্স যে অজুহাত দেখান, তাতে পাকিস্তানি আয়োজক ও ইরানি অতিথি একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। মার্কিন প্রতিনিধিদল হোটেল থেকে সোজা নুর খান এয়ারবেসে চলে গেলেন। সম্ভবত ট্রাম্প নিজে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে হিরো হতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি কিছু মার্কিন সাংবাদিককে ফোন করে বলেন, আপনারা ইসলামাবাদ থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন না। কেননা হতে পারে আমি নিজেই ইসলামাবাদ চলে আসতে পারি। ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদলকে অসঙ্গতভাবে ইসলামাবাদ থেকে ফেরত ডেকে সেই ভুলটাই করলেন, পুরো বিশ্ব যার খেসারত তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে দিলো।

লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করিয়ে আমেরিকা ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ করে। কিন্তু ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্যে ইরানি নেতৃত্ব মার্কিন প্রতিনিধিদলের সাথে আবার সামনাসামনি বসতে রাজি ছিল না। উভয় দেশের মধ্যে টানাপড়েনে হরমুজ প্রণালী আবার বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ১৫ এপ্রিল নিজে তেহরান যান। তিনি তেহরানে ইরানি নেতৃত্বের সাথে আলোচনা করেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের সাথেও সরাসরি কথা বলেন। আমেরিকা ও ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে একমত হয়। ১৮ এপ্রিল ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পাকিস্তানে ফিরে আসেন। আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের আয়োজন শুরু হয়। কিন্তু ট্রাম্প আবারো ইরানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। পাকিস্তান পুরোপুরি চেষ্টা করেছিল যেন যুদ্ধবিরতি ভেঙে না যায়। কেননা ইসরাইল আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল যুদ্ধবিরতি যেন ভেঙে যায়। ইসরাইল ইরানকে তুরস্ক ও সৌদি আরবের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ানোর ষড়যন্ত্র করেছিল।

ট্রাম্প মে মাসের মাঝামাঝি চীন সফরের আগে ইরানের সাথে নিজের শর্তানুযায়ী চুক্তির জন্য বেশ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ইরান ওই চুক্তি থেকে সামনে-পেছনে সরতে প্রস্তুত ছিল না, যেটা ৮ এপ্রিলের আগে চূড়ান্ত হয়েছিল। এবার ইরান সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ট্রাম্পকে কোনো চুক্তি ছাড়াই খালি হাতে চীনে পাঠানো হোক। একইসাথে খালি হাতে ফেরত পাঠানো হোক।

যে চুক্তির বিবরণ ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগেই চূড়ান্ত হয়েছিল, তা এখনো বাস্তব সত্য। এ চুক্তি বিলম্বের জন্য ট্রাম্প দায়ী, যিনি ১২ এপ্রিল বেশ অসঙ্গতভাবে মার্কিন প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদ থেকে ফেরত নিয়ে ইরানি প্রতিনিধিদলকে অপমান করেছেন। এখন মার্কিন মিডিয়া কখনো বলেছে, পাকিস্তান নুর খান এয়ারবেসে ইরানের যুদ্ধবিমান লুকিয়ে রেখেছে। কখনো বলেছে, রেজিম পরিবর্তন অভিযানে সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর কথা ছিল। এর উদ্দেশ্য হলো ভুল বোঝাবুঝি ছড়ানো।

স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ধমক, হুমকি ও ফেক নিউজের মাধ্যমে ভিলেন থেকে হিরো হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। আজ না হয় কাল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি হতেই হবে। এটা সেই চুক্তি হবে, যা ৮ এপ্রিলের আগে চূড়ান্ত হয়েছিল। এই চুক্তির পর ট্রাম্প নিজে নিজেকে ইরান বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করবেন, কিন্তু সত্য হচ্ছে, তিনি মূলত ইরানের হিতাকাক্সক্ষী হয়ে গেছেন। তিনি যদি ইরানের ওপর হামলা না করতেন, ইরান তাকে পরাজিতও করত না এবং ইরান আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়ার এ সুবর্ণ সুযোগও পেত না।

লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২১ মে, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর : ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

[email protected]