২০ আগস্ট বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে এ নিয়ে এখনো জনমনে তেমন কোনো আগ্রহ, কৌতূহল বা কোনো ‘প্রশ্ন’ নেই। কারণ এর ফলাফল নির্ধারিত। ক্ষমতাসীন বিএনপি এবারের অবিতর্কিত নির্বাচনে, জাতীয় সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ফলে বিএনপির পক্ষ থেকে যাকেই প্রার্থী করা হোক না কেন, তার বিজয় নিশ্চিত। সংবিধান অনুসারে, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্যের পক্ষে, দলের মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেয়া সম্ভব নয়। তাই এই নির্বাচন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতার মতো। তবে উপরে একটি প্রশ্ন ব্র্যাকেটে বন্দী করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। অতীতে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে। সংসদ নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট ছলচাতুরী ও ম্যানিপুলেশন হয়েছে। নির্বাচনের নামে বহুবার প্রহসন মঞ্চস্থ হয়েছে। ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সেসব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না দেশ ও আন্তর্জাতিক বলয়ে। সেসব নির্বাচনের সাথে কৌতুকপূর্ণ নানা বিশেষণ সংযুক্ত হয়ে আছে। মোটা দাগে বলা চলে, ওই সব নির্বাচন শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, ছিল পোকায় কাটা। এমন সন্দেহযুক্ত ভোটে বিজয়ী হলে নির্বাচিত
রাষ্ট্রপতি তথা রাষ্ট্রপ্রধান, তার ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। তার সম্মান ও মর্যাদার অপরিসীম ঘাটতি থাকে। ওই সব সংসদে যারা কয়েকবার রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, দেশে এবং বিদেশেও তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
আর যে কথা না বললেই নয়। বাংলাদেশে এমন সব প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দায়ী কে? রাষ্ট্রীয় অর্থেই প্রতিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেটি স্থানীয় বা জাতীয় যে প্রকৃতির নির্বাচনই হোক। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে বা মানোত্তীর্ণ না হলে সরকার তথা জনগণের বিপুল অর্থের নিছক অপচয় ঘটে। এই পরিস্থিতির জন্য আসলে দায়ী কে। এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর, বহুপক্ষ। স্বয়ং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর দুর্বলতা, নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতা, প্রশাসনের সব স্তরে অনিয়ম, নির্বাচনের সাথে জড়িত বিচারিক ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভীতিজনিত দুর্বলতা, নির্বাচনী বিধিবিধান উপেক্ষা করা। মোটা দাগে এসব সমস্যা বা দুর্বলতা দূর করা ছাড়া ভালো কোনো নির্বাচন সম্ভব নয়। সর্বোপরি নির্বাচনে প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার যে অদম্য আকাঙ্ক্ষা, এর প্রতিবিধান এখন অনিবার্য। অতীতে কখনোই এই সমস্যাগুলো কেউ আমলে নেয়নি। এখন দেশের রাজনীতিতে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, এটি এক সুবর্ণ সুযোগ প্রতিবিধানে যাওয়ার। এই সুযোগ হাত ছাড়া হলে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা যে তিমিরে পৌঁছেছে, সেই তমসার বলয় থেকে বেরিয়ে কলঙ্কমুক্ত নির্বাচন কখনো আলোর মুখ দেখবে না।
যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধানতম ভিত্তি হলো- অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান। একটি প্রশ্নমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার শান্তিপূর্ণ প্রকাশ। জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে আগ্রহহীনতা দেখা যাচ্ছে, এই নেতিবাচকতাকে ইতিবাচক করে তোলা সম্ভব, যদি সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর গুণমান অনন্য বলে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। একটি নির্বাচন সংসদ সদস্য বা কেবল সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়। এটি রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি (প্রশ্নবিদ্ধ) জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সঙ্কট দূরীভূত হওয়ার পরিবর্তে নতুন করে বিরোধ, তর্কবিতর্ক, আন্দোলন, সহিংসতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নির্বাচন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং নতুন সঙ্কটের সূচনা করেছে। একই সাথে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল, হানাহানি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, যা জনমনে ভীতির সৃষ্টি করে। সেই সাথে প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হয়। এর অন্যতম কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্কট। পরাজিত দল অশুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়া বা ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অন্য দিকে বিজয়ী দল নির্বাচনের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। এই অবস্থানগত দ্বন্দ্বের ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সমঝোতার পরিবর্তে সঙ্ঘাতমুখী রাজনীতির পরিবেশ তৈরি হয়। সংসদ বর্জন, রাজপথে আন্দোলন, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ জনজীবন ও অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা।
অন্য দিকে সুষ্ঠু ও কার্যকর নির্বাচন করা সম্ভব হলে দেশে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি এবং জনগণের রায় মেনে নেয়ার শৈলী তৈরি হবে। অন্যথায় বিনিয়োগ, উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন এক বৃত্তে বাংলাদেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংবিধানসহ অন্যান্য আইনের সব দুর্বলতা দূর করা। তাহলেই পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে শ্রী বৃদ্ধি পাবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং গঠনমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে। নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পেলে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। দলগুলোর অর্থনৈতিক অর্থহীন শৈলীর অবসান ঘটতে পারে। সারা দেশে রাজনৈতিক বৈধতা অবসানের অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হবে। একই সাথে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ এবং তরুণ প্রজন্মেরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা যত বেশি বিকশিত হবে, ততই নির্বাচন ঘিরে অস্থিতিশীলতার পরিবর্তে স্থিতিশীলতা ও আগ্রহ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাড়বে। এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোর ইতিবাচকতার যে ঘাটতি সেটিও দূর করা প্রয়োজন, যা এখন অনেকটাই অনুপস্থিত। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করে আসছে, যেখানে নির্বাচন হবে উৎসবমুখর। প্রার্থীদের প্রতীক নির্বিশেষে জন আস্থা অর্জনের পথে হাঁটতে হবে। পরস্পরকে মোকাবেলার মানসিকতা দূর করা জরুরি। সর্বজনগ্রাহ্য জনগণের রায়কে সব পক্ষ সম্মান করবে এবং নির্বাচন শেষে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ- সবার সম্মিলিত দায়িত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ। এর অন্যথা হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থবিরতার ঝুঁকি বাড়ে। পরিবহন, বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দ্রব্যমূল্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। একই সাথে কর্মসংস্থার, পর্যটন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং দৈনন্দিন জীবিকানির্ভর মানুষের আয়-রোজগারেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি আরো গভীরে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়া, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ফলে রাজনৈতিক সঙ্কট কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের জীবনমানের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। তাই একটি গ্রহণযোগ্য, প্রশ্নমুক্ত, অপবিশেষণমুক্ত নির্বাচনী-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পেলে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, সংলাপের চর্চা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে নির্বাচনকে সঙ্ঘাতের নয়; বরং জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে পরিণত করা সম্ভব। পাশাপাশি বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটবে। আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে। গণতন্ত্রের অপূর্ব এই বিকাশ শুধু সরকারপক্ষের একার কাজ নয়। সরকারের প্রতিপক্ষে কেউ একে হৃষ্টপুষ্ট করে তোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখতে হবে। তবে সরকারকে তার প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট স্পেস দিতে হবে, যাতে সংসদ জবাবদিহিতার প্রকৃত একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা, বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি রয়েছে। অনেকের মতে সেটি সুবিন্যস্ত নয়। কমিশনের নিয়োগপদ্ধতি, ক্ষমতার প্রয়োগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে আরো স্পষ্টতা প্রয়োজন। তাই সংবিধান সংশোধন বা পরিপূরক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে কমিশন জনগণ ও সব রাজনৈতিক দলের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারে।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত


