প্রবাদ হলো লোকমুখে প্রচলিত মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতার এমন সব সংক্ষিপ্ত অথচ চিরন্তন বক্তব্য বা বাণী যার রচয়িতার পরিচয় অজানা। প্রবচনও তাই, তবে সামান্য পার্থক্য আছে। প্রবচন হলো কোনো প্রাজ্ঞ মনীষী, পণ্ডিত বা জ্ঞানী ব্যক্তির মুখনিঃসৃত বিচক্ষণ বা চমকপ্রদ উক্তি, যা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ- বচন বা প্রবচনের রচয়িতার নাম-পরিচয় মানুষ জানে। যেমন খনার বচন, ডাকের বচন ইত্যাদি। খনার অনেক বচন এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। যেমন, ‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’।
বাংলায় অবশ্য প্রবাদ-প্রবচনের অভাব নেই। অজানা কথকের মুখ থেকে বেরুনো কথাগুলো এমনি এমনি সময়কে পরাস্ত করে টিকে থাকেনি। টিকে গেছে এর বাস্তব উপযোগের কারণে। সমাজে প্রায়ই এমন সব ঘটনা ঘটে যা আমাদের কোনো না কোনো প্রবাদ-প্রবচন মনে করিয়ে দেয়। কবে কে কোথায় কার উদ্দেশে কী মনে করে কথাটি বলেছিলেন কে জানে! কিন্তু বাঙালি জাতিগতভাবে সেই কথা মনে করে রেখেছে, তার দৈনন্দিন জীবন, মুখের ভাষা, আত্মপ্রকাশের সহজ সাবলীল উপকরণ ও চিন্তার তাৎক্ষণিক আশ্রয় হিসেবে স্থায়ী হয়েছে কথাটি। হয়ে উঠেছে কালজয়ী প্রবাদবাক্য। জাতির সম্মিলিত স্মৃতিকোষে খোদাই হয়ে গেছে সেটি।
আজকের দিনে নানা ঘটনায় আমাদের বিভিন্ন প্রবাদ মনে পড়ে। চট করে একটি প্রবাদ আউড়ে ঘটনাটি সহজভাবে বুঝে নিই, অন্যকেও বুঝিয়ে দিই। কোনো ঘটনায় আমাদের মনে পড়ে যায়, ‘কাক কাকের মাংস খায় না’। কখনো মনে আসে, ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’, ‘চাচা আপন পরান বাঁচা’, ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’ অথবা, ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি-জিতি নাহি লাজ’।
এমনই হাজারো প্রবাদ সবসময় আমাদের স্মৃতিতে জেগে থাকে, ঠোঁটের ডগায় লেগে থাকে। শুধু যথাসময়ে, যথাস্থানে ও যথাপাত্রে সেটি পরিবেশন করার অপেক্ষায়। কখনো মনে আসে, এই প্রবাদটি, ‘চোরের মায়ের বড় গলা’।
গত ক’দিন ধরে আমাদের বারবার মনে পড়ছে শেষের প্রবাদটি।
ছেলে চোর, চুরি করে ধরা পড়েছে। গাঁয়ের মানুষ উচ্চস্বরে সে কথা বলাবলি করছে। চোরের মায়ের হয়েছে জ্বালা। ছেলে চোর এটি সে জানে। কিন্তু স্বীকার করলে বিপদ। তাই চিৎকার করে চুরির অপবাদ অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু তার বক্তব্য অন্যদের কানে ঢোকাতে হলে গাঁয়ের সবার সম্মিলিত কণ্ঠের চেয়ে তার কণ্ঠ জোরালো হতেই হবে। না হলে তা চাপা পড়ে যাবে সমবেত শত কণ্ঠের নিচে। তাই চোরের মা গলা তোলে সবার ওপরে। সম্ভবত এই বাস্তবতাই অজানা বাঙালি কথকের ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে, চোরের মায়ের বড় গলা- এই ছোট্ট একটি বাক্যে।
কিন্তু প্রবাদটি ঠিক এ সময়ে আমাদের কেন মনে আসছে? কারণ আছে।
গত ৫ আগস্ট বুধবার জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খান ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনায় দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিক, বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধিরাও।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্মিত দুই মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। গোল বাঁধে সেই তথ্যচিত্র নিয়ে। যাদের সংবর্ধনা দিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন, তারাই এটিকে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে নাকচ করে দেন। জুলাইযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ, যারা পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নামে দল গড়েছেন, অভিযোগ করেন, তথ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। এ নিয়ে তুমুল বাগি¦তণ্ডা হয়। সেই সাথে এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান। হট্টগোল-বিশৃঙ্খলার একপর্যায়ে কূটনীতিকরাও নীরবে বেরিয়ে যান।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই ঘটনার খবরাখবর থেকে যতটা জানা যায়, তাতে স্পষ্ট- তথ্যচিত্রে সুস্পষ্টভাবে তথ্যবিকৃতি ঘটেছে। সেটি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্যমূলক বা অনবধানতামূলক, সে বিতর্কে কেউ যাননি।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার ফেসবুকে লিখেছেন, তথ্যচিত্রে একদফার (হাসিনা পতনের ডাক) ঘোষক বানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। যে নাহিদ ইসলাম (এনসিপির আহ্বায়ক) নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে এক দফার ঘোষণা দিলেন, তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই। যে আসিফ মাহমুদ (এনসিপির মুখপাত্র) মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন, তিনি এ ইতিহাসে নেই।
তথ্যচিত্রটির বিষয়ে আমরা কোনো মন্তব্য না করে শুধু অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদের মন্তব্যটি উল্লেখ করতে চাই। তথ্যচিত্রের অসঙ্গতি চিহ্নিত করে অনুষ্ঠান মঞ্চেই তিনি বলেন, ‘ডকুমেন্টারিতে অনেক ভুল আছে। প্রথম ভুল যেটি দেখেছি, সেখানে আবু সাঈদের ছবি নেই। আবু সাঈদ বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি, প্রতীক। তার ছবি না থাকলে এটি কোনো ডকুমেন্টারিই নয়।’
এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, মন্ত্রণালয় যাদের দিয়ে বা যাদের নির্দেশনায় তথ্যচিত্র বানিয়েছে, তারা দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্য উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন। তা না হলে, একজন নবিস চিত্রনির্মাতাকে দিয়ে বানানো হলেও তিনি সবার আগে শহীদ আবু সাঈদের ছবি সংযোজন করতেন। কারণ, সবাই জানেন, আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ। না, পথে-ঘাটে, মিছিলে বা বিশৃঙ্খল সঙ্ঘাতের মধ্যে অথবা অন্ধকারে হঠাৎ গুলি খেয়ে তিনি শহীদ হননি। সাঈদ মারা গেছেন সরাসরি উদ্যত বন্দুকের সামনে দুই হাত ছড়িয়ে বুক পেতে দিয়ে। একটি নয়, উপর্যুপরি গুলি করে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশ তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে। বিশ্ব ইতিহাসে এমন নৃশংস ঘটনা বিরল। ওই একটি ঘটনাই আন্দোলনের গতি তীব্রতর করে তোলে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রতি মানুষের সমস্ত ঘৃণা ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিরাট বিস্ফোরণ ঘটে। নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ বা অন্য সমন্বয়করা কী ভূমিকা পালন করেছেন তা-ও দেশবাসী খুব ভালো করে জানেন। শুধু জানেন না তথ্যচিত্রের নির্মাতারা। কিন্তু সেটিও আমাদের আলোচ্য নয়।
আমরা বলতে চাই, যারা অপকর্মটি করলেন, তারা মূলত ফ্যাসিবাদী চরিত্রের মাফিয়াগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের মতো একই চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। আওয়ামী লীগ একাত্তরের পর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৫৩ বছর ধরে ঠাণ্ডা মাথায় ইতিহাস বিকৃত করেছে। প্রকৃত সত্য ধামাচাপা দিয়ে মনগড়া বানোয়াট ইতিহাস রচনা করেছে, এখানেও ঠিক সেই কাজটিই হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। জুলাইযোদ্ধারা যখন প্রতিবাদ করছে, অভিযোগ তুলছে তখন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের মন্তব্য বিস্ময়কর। তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার নামে উসকে দেয়ার চেষ্টা করেছেন কি না, এমন সংশয় জাগে। অনেকটা ধমকের সুরে তিনি বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন? কী করছেন আপনারা? আপনারা শহীদ পরিবারদের জন্য কী করেছেন? কিছুই করেন নাই।’
সবচেয়ে আপত্তিকর ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিবৃতিটি এসেছে পরের দিনের পত্র-পত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুঃখ প্রকাশের ছলে প্রথমে হেয় করার চেষ্টা করেছে প্রতিবাদী জুলাইযোদ্ধাদের ‘কতিপয়’ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে। এরপর কৌশলে তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী বলেছে। ভাষাটা দেখুন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, বিদেশী কূটনীতিবিদ, গণমাধ্যম ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সামনে গোলযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূতি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।’ প্রতিবাদকে বলা হচ্ছে, এটি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বানচাল করা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রয়াস ছিল কি না সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।’
তথ্যচিত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক দফার ঘোষক হিসেবে দেখানো প্রসঙ্গে জুলাইযোদ্ধাদের কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার যে চেষ্টা করেন; সেদিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হচ্ছে- ‘অপতথ্য ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় আবারো ফ্যাসিবাদের কবলে রাষ্ট্রকে নিয়ে যাওয়ার শামিল। ... জাতিকে এ ধরনের হঠকারী, রাষ্ট্রবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো যাচ্ছে।’
অথচ, স্বয়ং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানমঞ্চে বলেছেন, জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশীদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত। এমন মার্জিত ও শোভন প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভবত শুধু তার পক্ষেই সম্ভব।
শুরুতে প্রবাদ প্রবচনের প্রসঙ্গ ধরে যে কথা বলছিলাম সেটি এখন মিলিয়ে দেখুন। নিজের অপকর্ম ধামাচাপা দেয়ার কী মরিয়া চেষ্টা! গলার রগ ফুলিয়ে তারস্বরে চিৎকার করছে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়। যতটা প্রতিবাদ হয়েছে তারও চেয়ে বেশি জোরে বলছে, আমরা চোর না। ঠিক চোরের মায়ের মতো। কিন্তু তাদের চিৎকারে মানুষের মন থেকে সত্য কি মুছে যাবে? মনে হয় না। চোরকে মানুষ চোর হিসেবে জানবে, দেখবে। তাকে গাঁয়ের পথে দেখলে সতর্ক হবে। না জানি আজ রাতের অন্ধকারে কার বাড়িতে সিঁদ কাটে!
বাঙালির প্রবাদ নির্মাণ সত্যি সার্থক। চোরের মায়ের বড় গলা প্রবাদের সর্বশেষ প্রমাণ- তথ্যচিত্র নির্মাতা মন্ত্রণালয়।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



