ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন দু’টি রাজনৈতিক সংগঠন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয় ১৮৮৫ সালের ২৮ অক্টোবর মোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) শহরে ব্রিটিশ সিভিল সার্জেন্ট অ্যালেন অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগে। তার উদ্যোগের সাথে আরো জড়িত ছিলেন দাদাভাই নওরোজি, উমেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, দিনশ এলদুজি ওয়াচা, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে, উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন, জন জারডাইন, ফিরোজ শাহ মেহতা, বদরুদ্দিন তৈয়বজি, মনোমোহন ঘোষ, লালমোহন ঘোষ প্রমুখ।
অপরদিকে মুসলিম লীগ গঠিত হয় ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে। তা ছাড়া নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে শাহবাগের ইশরাত মঞ্জিলে (ইশরাত মঞ্জিলের একাংশ এখন মধুর ক্যান্টিন হিসেবে পরিচিত) আয়োজিত এক সভায় ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা আগা খানকে সভাপতি করে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠিত হয়। ওই উদ্যোগের সাথে জড়িতদের মধ্যে নবাব মহসিন উল মুলক, নবাব ওয়াকার উল মুলক, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, সৈয়দ আমীর আলী উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগ পূর্ববঙ্গে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ শুরু করে। সে সময় দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এক সভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি ও তরুণ নেতা শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে এ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়।
অখণ্ড বাংলার সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীরাই মূলত আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। সেই হিসেবে বলা যায়, মুসলিম লীগেরই একটি দলছুট অংশ আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী মুসলিম লীগের সে সময়কার বক্তব্য ছিল, খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ জমিদার ও ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। সে জন্যই তারা আওয়ামের অর্থাৎ, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে বাধ্য হয়েছেন।
আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ছিলেন তরুণ ইসলামী চিন্তাবিদ। কিন্তু তারপর শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করলে, দলটির অনেক পরিবর্তন ঘটে। শেখ মুজিব ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সুফি সোহরাওয়ার্দী তরিকার প্রবর্তকের উত্তরসূরি হলেও শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পশ্চিমা ধাঁচের জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন পোলিশ বংশোদ্ভূত একজন রাশিয়ান অভিনেত্রী। সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে থাকার কারণে শেখ মুজিবও ব্যক্তিগত আচার আচরণে ইসলামের কঠোর অনুসারী ছিলেন না। তিনি তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, মওলানা ভাসানী ও শামসুল হকের সাথে জেলে থাকাকালে তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং পবিত্র কুরআনের তরজমা শুনতেন। আওয়ামী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা এবং পৃথক নির্বাচনের পরিবর্তে যুক্ত নির্বাচন চালুর ব্যাপারে শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পূর্ববঙ্গীয় সদস্যরা পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস গঠন করে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন, যদিও ১৯৪৭ সালের ২০ জুন তারা বাংলা ভাগের পক্ষে এবং পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দু’জনের নাম প্রায় সবারই জানা। একজন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আরেকজন মনোরঞ্জন ধর। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য গণপরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আর মনোরঞ্জন ধর শেখ মুজিবের আমলে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
যে কথা অনেকেরই অজানা তা হলো, যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার পর আতাউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী মন্ত্রিসভায় কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও মনোরঞ্জন ধর মন্ত্রী ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তান হওয়ার পরও কংগ্রেসদলীয় সদস্যরা নিজেদেরকে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অংশ বলেই মনে করতেন এবং সেটি গর্বের সাথে গণপরিষদে স্বীকারও করেছেন। (রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদি সম্পাদিত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা-৯৫)
১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ তার নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত করলে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি থেকে অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। এরপর ১৯৫৬ সালে পৃথক নির্বাচনের পরিবর্তে যুক্ত নির্বাচন চালু হলে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি দুটো দলই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ তাদের সদস্যরা হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত আসন থেকেই নির্বাচিত হতেন; মুসলিম আসন থেকে নয়। ১৯৭০ সালে কংগ্রেস পার্টি কলস মার্কা নিয়ে নির্বাচন করলেও কোনো আসন পায়নি। এরপর ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে পিটার পল গোমেজ নামক একজন নেতা কংগ্রেস থেকে নির্বাচন করলেও পরাজিত হন। পিটার পল গোমেজ প্রসঙ্গে পাঠকদের একটি তথ্য জানানো যেতে পারে, সেটি এই যে, ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী হত্যাকাণ্ডে ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন এই কংগ্রেস নেতা পিটার পল গোমেজ। স্পিকার আবদুল হাকিমকে ‘পাগল’ অভিহিত করে গণপরিষদে তিনি যে প্রস্তাব উত্থাপন করেন তারই জেরে আওয়ামী লীগ ও কেএসপির মধ্যে অধিবেশন কক্ষে যে মারামারি শুরু হয় তারই এক পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী আহত হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন।
আর কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা মনোরঞ্জন ধর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কংগ্রেস দলের কার্যত বিলুপ্তি ঘটান। আওয়ামী লীগ যেহেতু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নীতি ও আদর্শকে নিজেদের নীতি ও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে সে কারণে বাংলাদেশে কংগ্রেসের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। সে হিসেবে আওয়ামী লীগই হয়ে ওঠে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বাংলাদেশ শাখা।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান প্রসঙ্গে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টে তার দেয়া ভাষণে বলেছিলেন, বাংলাদেশ সরকারেও আমাদের মতো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থায় বিশ্বাসী। যদিও আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাকে জাতীয় মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



