মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট : ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য

সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই ১৪ দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থাপত্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এটি যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনে কেবল সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জ্বালানি সরবরাহ রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু যদি এটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও গভীরভাবে পড়বে। তাই এই জোটের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, আঞ্চলিক সংলাপ, আন্তর্জাতিক আইন এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থার ওপর

সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪টি দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিতে নতুন মোড় নির্দেশ করছে। এটি কেবল একটি সামরিক উদ্যোগ নয়; বরং লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং এডেন উপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন কৌশলগত বাস্তবতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলনের হামলা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, ইসরাইলকে ঘিরে সঙ্ঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধ্য করেছে। এই প্রেক্ষাপটে রিয়াদে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর ১৪টি দেশ এই সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায়।

লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। সুয়েজ খাল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পণ্য পরিবহন হয়। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ এই রুট ব্যবহার করে। এই পথ অচল হয়ে গেলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়, ফলে যাত্রাপথ ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত দীর্ঘ হয় এবং পরিবহন ব্যয়, বীমা প্রিমিয়াম ও জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং শিল্প উৎপাদনের ওপর পড়ে।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা অনেকাংশে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং পশ্চিমা জোটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০১৯ সালে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার পর International Maritime Security Construct (IMSC) গঠিত হয়। ২০২৩ সালে হুথিদের হামলা বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে Operation Prosperity Guardian এবং পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের Operation Aspides শুরু হয়। নতুন সৌদি উদ্যোগ এই বিদ্যমান ব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং আঞ্চলিক নেতৃত্বে একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।

সৌদি আরবের এই পদক্ষেপের পেছনে শুধু নিরাপত্তা নয়, কৌশলগত ও রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে। ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা শক্তিতে পরিণত করা। ইয়েমেন যুদ্ধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে যে, কেবল বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

এই জোটের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর সম্ভাব্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈচিত্র্য। মিসরের জন্য সুয়েজ খাল জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। পাকিস্তানের একটি পেশাদার নৌবাহিনী রয়েছে এবং সৌদি আরবের সাথে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিদ্যমান। তুরস্ক আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ এবং প্রতিরক্ষাশিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জিবুতি বাব আল-মান্দেব প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থিত হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশের অংশগ্রহণ জোটের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।

এই উদ্যোগের প্রথম বড় সুবিধা হলো আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা জোরদার করা। যৌথ নৌ-টহল, স্যাটেলাইট নজরদারি, ড্রোন, সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি কমাতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত হলে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচ কমতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরো স্থিতিশীল হতে পারে। তৃতীয়ত, এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সহযোগিতা, আন্তঃকার্যক্ষমতা এবং যৌথ মহড়ার সুযোগ বাড়াবে। একই সাথে জলদস্যুতা, অস্ত্র ও মাদকপাচার এবং মানবপাচার প্রতিরোধেও এই সহযোগিতা কার্যকর হতে পারে।

তবে এই উদ্যোগের ঝুঁকিও কম নয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাতকে আরো বিস্তৃত করতে পারে। যদি জোটটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইয়েমেনে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়ে, তবে সঙ্ঘাত আরো জটিল হতে পারে। বর্তমানে হুথিদের সাথে সৌদি আরবের উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে এবং লোহিত সাগরে হামলার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি ইরানকে ঘিরে। যদিও সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে যে, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, তবুও তেহরান এটিকে নিজেদের প্রভাববলয় সীমিত করার উদ্যোগ হিসেবে দেখতে পারে। ইরান বহু বছর ধরে হুথি, হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে তার কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ফলে এই জোট ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে এবং প্রক্সি সঙ্ঘাত আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই জোটের রাজনৈতিক ঐক্য কতটা টেকসই হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় স্বার্থ সবসময় এক নয়। পাকিস্তানকে একই সাথে সৌদি আরব ও ইরানের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তুরস্কের নিজস্ব আঞ্চলিক কৌশল রয়েছে। মিসরের অগ্রাধিকার সুয়েজ খালের নিরাপত্তা। ফলে বড় কোনো সঙ্কট দেখা দিলে অভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ নাও হতে পারে। বহুজাতিক সামরিক জোটে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং শক্তি প্রয়োগের নীতিমালা নিয়ে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়।

চীনও এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। জিবুতিতে চীনের প্রথম বিদেশী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ লোহিত সাগর দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে বেইজিংও এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চায়, যদিও তারা সাধারণত এমন কোনো জোটকে সমর্থন করবে না, যা বৃহৎ শক্তির সঙ্ঘাত আরো বাড়িয়ে দেয়। অন্য দিকে ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি সমুদ্রপথে আসে এবং পশ্চিম এশিয়া তার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই দিল্লিও লোহিত সাগরের নিরাপত্তাকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

বাংলাদেশের জন্যও এই উদ্যোগের তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। লোহিত সাগরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ে। যদিও বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য নয়, তবুও একটি বাণিজ্যনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে নিরাপদ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ তার জাতীয় স্বার্থের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সাথে বঙ্গোপসাগরে নিজস্ব সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং Maritime Domain Awareness বৃদ্ধির গুরুত্বও এই উদ্যোগ নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সবশেষে বলা যায়, সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত এই ১৪ দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা স্থাপত্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এটি যদি আন্তর্জাতিক আইন মেনে কেবল সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জ্বালানি সরবরাহ রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যদি এটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও গভীরভাবে পড়বে। তাই এই জোটের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনীতি, আঞ্চলিক সংলাপ, আন্তর্জাতিক আইন এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক আস্থার ওপর। ইতিহাস হতে আমরা জানতে পারি, সমুদ্রপথ রক্ষায় সামরিক শক্তি প্রয়োজন, কিন্তু স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।

এই জোটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এটি কতটা প্রতিরক্ষামূলক চরিত্র বজায় রাখতে পারে, আন্তর্জাতিক আইনকে কতটা সম্মান করে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কতটা কার্যকর সমন্বয় গড়ে ওঠে এবং সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানকে কতটা গুরুত্ব দেয় তার ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী শান্তি কেবল অস্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত হবে না; বরং নিরাপত্তা, কূটনীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সমন্বিত প্রয়াসই এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]