অধরা জুলাই আকাঙ্ক্ষা

আকাঙ্ক্ষা ছিল আমূল পরিবর্তনের। কিন্তু ভোট হলো, নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলো, বদল হলো ঠিক কোথায়?- এমন প্রশ্ন এখন রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অনিয়ম, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির সংস্কৃতি বহাল রয়েছে আগের মতোই, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে গভীর আলোচনা।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition
  • জুলাইয়ের শক্তিগুলোর অনৈক্য দেশের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে : আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
  • দলগুলোর মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকতে পারে, হানাহানি গ্রহণযোগ্য নয় : বদিউল আলম মজুমদার
  • বিএনপি সরকার জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর : মির্জা ফখরুল
  • জুলাই-চেতনা হারিয়ে গেলে বৈষম্য, লুটপাট, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ফিরে আসবে : মিয়া গোলাম পরওয়ার
  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে : নাহিদ ইসলাম

আকাক্সক্ষা ছিল আমূল পরিবর্তনের। কিন্তু ভোট হলো, নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলো, বদল হলো ঠিক কোথায়?- এমন প্রশ্ন এখন রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও অনিয়ম, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও দুর্নীতির সংস্কৃতি বহাল রয়েছে আগের মতোই, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে গভীর আলোচনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে চলমান মতপার্থক্য ও বিভেদ একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, অভ্যুত্থান এবং পরিবর্তিত রাষ্ট্রগঠনের সাথে জড়িত শক্তিগুলোর বিভেদ যত বাড়বে, পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা ততই প্রবল হবে। ইতোমধ্যে পতিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার যে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, তা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে তারা মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর মতে, জুলাইয়ের শক্তিগুলোর অনৈক্য দেশের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে। তিনি বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ হলে জয়, আর বিভক্ত হলে পতন- এটিই নিয়ম। তাই ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোকে যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

পর্যবেক্ষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাত্র দুই বছরের মাথায় আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলো এখন বহু ভাগে বিভক্ত। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)- এই তিনটি দল এখন তিন দিকে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি নিজেদের মতো করে সরকার পরিচালনা ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করার কথা বললেও দলটির সাথে জামায়াত ও এনসিপির দূরত্ব স্পষ্ট। এমনকি সম্প্রতি বিএনপির সাথে এনসিপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্য দিকে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির সাথে জামায়াতের বনিবনা হচ্ছে না।

সব মিলিয়ে এক সঙ্ঘাতময় রাজনীতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে, আর এই পরিস্থিতিতে উৎসুক হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। একই সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কয়েকটি বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, জুলাইয়ের ‘স্পিরিট’ বা চেতনা নষ্ট হলে গণতন্ত্রের ধারা ফিরিয়ে আনতে গত ১৭ বছরের আন্দোলন ও আত্মত্যাগের কোনো সুফল দেশের জনগণ পাবে না।

দলগুলোর সঙ্ঘাতময় রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)- এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলগুলোর মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তবে তা হানাহানি বা দ্বন্দ্বে রূপ নেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; কারণ সহিংসতা কখনো গণতান্ত্রিক ভাষা হতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তৃতীয় পক্ষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবে, যা কারও জন্যই শুভকর হবে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া, জবাবদিহিতা ও ‘জুলাই সনদে’র পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের রাজনৈতিক অসন্তোষ কাটেনি। সংবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে সরকারি দলের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন, গণভোট মেনে জুলাই সনদ কার্যকর না করে কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি প্রদান, জবাবদিহিতা ও বৈষম্যহীন সমাজগঠনে ঐকমত্যের অভাব, জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারপ্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালের রায়ে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের অসন্তোষ এবং আন্দোলনে জড়িতদের ওপর সরকারি দলের দমন-পীড়ন- এসব বিষয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান নির্বাচিত সরকার যদি বিরোধী দলগুলোকে সাথে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সচল করতে না পারে এবং গণহত্যার আসামিদের সাজা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশে আবার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি ও অভিযোগের বিষয়ে এলজিআরডিমন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি সরকার জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর। আমি মনে করি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত বিতর্কের অবসান ঘটা উচিত। আন্দোলন যে নতুন রাষ্ট্রগঠনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে, তা আমাদের সফল করতে হবে। আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে যে আমরা ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গঠন করতে পারব।’

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল দেশের রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন, বৈষম্যহীন সমাজগঠন এবং সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। এই কারণেই আমরা বারবার সংবিধান সংস্কারের জোর দাবি জানিয়ে আসছি।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনা হারিয়ে গেলে গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধের সব বৈশিষ্ট্যই বিলীন হয়ে যাবে। ফলে দেশে আবারো বৈষম্য, লুটপাট, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসবে।’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের জন্ম দেয়। কিন্তু এই দুই বছরের পরিক্রমায় রাষ্ট্র সংস্কারের গতিপ্রকৃতি, বিচারকাজ, নির্বাচনোত্তর নতুন রাজনৈতিক দৃশ্যপট, অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের প্রতি আচরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এখন বিপরীত মেরুতে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রধান রূপরেখা ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। ১১টি পৃথক সংস্কার কমিশনের দীর্ঘ ৯ মাসের পর্যালোচনার পর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ চূড়ান্ত হয়। তবে দুই বছর পর এসে সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ফাটল ধরেছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে (১৫ মার্চের মধ্যে) এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সেই অধিবেশন আহ্বান করা সম্ভব হয়নি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তারা কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে। গণভোটে দেশের মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দেয়া সত্ত্বেও সরকার তা কার্যকর না করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের তিনটি মূল দাবি ছিল- বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচন হলেও বিচার ও সংস্কার আমরা এখনো পাইনি। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কার চায়, কিন্তু সরকার সেই রায় অমান্য করে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’

ঐক্যের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের আচরণে আন্তরিকতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং সরকারি দলের লোকেরা বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী ও হিংসাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘যে প্রত্যাশা নিয়ে জনগণ রক্ত ও জীবন দিয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা মানছে না। বিরোধীমতের ওপর অতীতের মতোই নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।’

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধানতম দাবি ছিল গণহত্যার বিচার এবং আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের দুঃশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বিগত দুই বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বিশেষ বিচারিক প্রক্রিয়া চালু করা হলেও এর অগ্রগতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক আহত আন্দোলনকারী এখনো সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসুবিধা পাননি বলে তারা রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রকে এবার জনগণের হাতে ফিরিয়ে না দিলে ইতিহাস আবার সাক্ষ্য দেবে, অভ্যুত্থানে ক্ষমতার রদবদল হলেও সাধারণ মানুষের স্থান তৈরি হয়নি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের ভেতরের সব সিদ্ধান্তে জনগণের আকাক্সক্ষার সঠিক প্রতিফলন ঘটানোর এখনই উপযুক্ত সময়।’

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু অভ্যুত্থানের প্রকৃত আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ দেয়ার অভিযোগ করার পাশাপাশি দলটির বিশাল ক্যাডার বাহিনী ও সুবিধাভোগী আমলাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তদুপরি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও তীব্র জ্বালানি সঙ্কটের মতো জনদুর্ভোগের সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।