বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক

দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, পর্যটন, ব্যবসা ও যুব বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পেলে রাজনৈতিক উত্তেজনা সহজে প্রশমিত করা সম্ভব। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় উভয় দেশের সম্পর্কের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘সঙ্ঘাত ব্যবস্থাপনা’ থেকে ‘কৌশলগত ভারসাম্যে’ উত্তরণ। এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপ, ন্যায্যতা এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি হবে মূল ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বার্থে উভয় দেশের সামনে সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই

মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান
মেজর (অব:) মো: আখতারুজ্জামান |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় সাধারণত কয়েকটি বিষয় সামনে আসে- পানিবণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা কিংবা অভিবাসন; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় এ সম্পর্ক কেবল কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যার আলোকে দেখা যথেষ্ট নয়। দুই দেশ আজ এমন এক বাস্তবতায় উপনীত, যেখানে সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং মানবিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।

ভূগোল আমাদের প্রতিবেশী করেছে, ইতিহাস আমাদের সংযুক্ত করেছে, আর ভবিষ্যৎ আমাদের সহাবস্থানের অপরিহার্যতা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তাই মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ও ভারত কি অতীতের অবিশ্বাস, সাময়িক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে, নাকি আগামী প্রজন্মের স্বার্থে নতুন কৌশলগত ভারসাম্যের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে।

দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিহিত এমন এক সম্পর্কের মধ্যে, যেখানে পারস্পরিক স্বার্থ সংরক্ষিত, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা সম্মানিত এবং শান্তি ও উন্নয়ন হবে যৌথ অগ্রাধিকারের বিষয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা যত শক্তিশালী হবে, সহযোগিতার ভিত্তিও তত দৃঢ় হবে। মতপার্থক্য ও বিরোধকে সঙ্ঘাতে নয়, সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং ভারত- উভয়ের জনগণের সর্বোত্তম ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

উভয় দেশের মধ্যে একটি টেকসই, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে সর্বপ্রথম দূর করতে হবে আধিপত্য, বৈষম্য এবং অসম নির্ভরতার আশঙ্কা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস সাধারণত জন্ম নেয় তখন, যখন কোনো পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক একচেটিয়াকরণ কিংবা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের শিকার হওয়ার আশঙ্কা অনুভব করে। ফলে একটি সত্যিকারের অংশীদারিত্বের পূর্বশর্ত হলো, উভয় দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এ আস্থা প্রতিষ্ঠা করা যে, কেউ কারো ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায় না। কেউ কারো স্বাধীনতা, পরিচয়, স্বার্থ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা খর্বের চেষ্টা করবে না।

বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যেমন তাদের জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকা উচিত নয়, তেমনই ভারতের জনগণের মধ্যেও সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈধ বাণিজ্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বা উদ্বেগ থাকা উচিত নয়। আস্থা তখনই জন্ম নেয়, যখন উভয় পক্ষ নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত ও সম্মানিত মনে করে।

একইভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এমন ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যেখানে বাণিজ্য বাধা, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা, বাজার আধিপত্য, অযৌক্তিক সুবিধা, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা অসম অর্থনৈতিক নির্ভরতার পরিবেশ সৃষ্টি না হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার লক্ষ্য কোনো এক পক্ষের লাভ নয়; বরং উভয় দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা তখনই শক্তির উৎস হয়, যখন তা পারস্পরিক লাভ, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং ন্যায্য সুযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।

একই নীতি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষা, সংস্কৃতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শ অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যম হতে পারে না। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও শান্তি নির্ভর করে বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা এবং সার্বভৌম স্বাধীনতার প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা।

সত্যিকারের অংশীদারিত্ব তখন সম্ভব, যখন উভয় দেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে সহযোগিতা করবে। কেউ অন্য পক্ষের ওপর রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা নির্ভরতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে না। স্থায়ী শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি আধিপত্য নয়, আস্থা; প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা এবং নির্ভরতা নয়, সমমর্যাদাভিত্তিক অংশীদারত্ব।

বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ে স্বীকার করে যে, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং সম-অধিকারভিত্তিক নাগরিকত্ব একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি। উভয় দেশের নাগরিকদের জীবন, নিরাপত্তা, ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সাংবিধানিক অধিকার সমভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতিগত পরিচয়, ভাষাগত বৈচিত্র্য বা সাংস্কৃতিক ভিন্নতায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন বৈষম্য, হয়রানি, ভয়ভীতি, জবরদস্তি, সামাজিক বঞ্চনা, বাস্তুচ্যুতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়, সে বিষয়ে উভয় রাষ্ট্রকে সতর্ক, সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল থাকতে হবে। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক, সাংবিধানিক এবং মানবিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশ বহুধর্মীয়, বহুসাংস্কৃতিক ও বহুভাষিক ঐতিহ্যের ধারক। এই বৈচিত্র্য কোনো দুর্বলতা নয়; বরং উভয় দেশের ঐতিহাসিক শক্তি ও সামাজিক সম্পদের উৎস। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক সহনশীলতা, সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সব সম্প্রদায়ের সমমর্যাদা এবং নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক মর্যাদার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা কেবল অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতায় নয়, বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশই সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা, বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে অপরিহার্য।

গত পাঁচ দশকে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতি অস্বীকারের সুযোগ নেই। সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন, সংযোগ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একই সাথে পানিবণ্টন, সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা, অবৈধ অভিবাসন, নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসও সম্পর্ক জটিল করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর সীমান্ত ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিতর্ক ফের দেখিয়েছে, মানবিক বিবেচনা, আইনি প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। রাষ্ট্রের যেমন সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার আছে, তেমনই মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তথ্যভিত্তিক যাচাই, যৌথ নাগরিকত্ব নিরূপণ প্রক্রিয়া, মানবিক সুরক্ষা এবং কার্যকর কূটনৈতিক সমন্বয় ছাড়া এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তবে উভয় দেশ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় পানি, বাণিজ্য ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্নগুলোর অন্যতম। অভিন্ন নদ-নদীর প্রবাহ শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক বিষয় নয়; এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ, জীবিকা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ, বন্যা, খরা এবং পানির চাহিদা আরো জটিল হয়ে উঠবে। তাই পানি প্রশ্নে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অববাহিকা-ভিত্তিক সহযোগিতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান টেকসই পথ।

একইভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সম্পর্ক তখন শক্তিশালী হয়; যখন উভয় পক্ষ সহযোগিতার সুফল অনুভব করে। তাই বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, অশুল্ক বাধা হ্রাস, যৌথ উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে আন্তঃনির্ভরতা পারস্পরিক সমৃদ্ধির উৎস হবে, কৌশলগত দুর্বলতার নয়। একইভাবে রাজনৈতিক আস্থা ও কৌশলগত স্বস্তি তখন প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন উভয় দেশ নিশ্চিত হয় যে, সহযোগিতা সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো পক্ষের বৈধ স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে না।

আরো একটি বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দুর্যোগ ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য জনসংখ্যা স্থানান্তর আগামী কয়েক দশকে উভয় দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এসব সমস্যা কোনো রাষ্ট্র একা মোকাবেলা করতে পারবে না। ফলে জলবায়ু নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোজন কৌশল দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হওয়া উচিত।

তবে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের শক্তি শেষ পর্যন্ত জনগণের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, সীমান্ত উত্তেজনা বা সাময়িক বিরোধে কখনো দুই দেশের জনগণের মানবিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে দেয়া উচিত নয়।

দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, পর্যটন, ব্যবসা ও যুব বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পেলে রাজনৈতিক উত্তেজনা সহজে প্রশমিত করা সম্ভব।

একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় উভয় দেশের সম্পর্কের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘সঙ্ঘাত ব্যবস্থাপনা’ থেকে ‘কৌশলগত ভারসাম্যে’ উত্তরণ। এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, অ-হস্তক্ষেপ, ন্যায্যতা এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি হবে মূল ভিত্তি।

শেষ পর্যন্ত শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বার্থে উভয় দেশের সামনে সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য
[email protected]