রাষ্ট্রের নীরবতা, প্রশ্নের বিস্ফোরণ

আজ প্রয়োজন আবেগ নয়। প্রয়োজন তথ্য। প্রয়োজন কূটনৈতিক উদ্যোগ। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত। প্রয়োজন অভিযুক্তদের দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা। প্রয়োজন আদালতের সামনে সত্য উন্মোচন। হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু একজন মানুষের জন্য নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা তার দায়িত্ব নয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। একটি গুরুতর হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকার যদি মনে করে অভিযোগ ভিত্তিহীন, তাহলে তথ্য প্রকাশ করুক। যদি তদন্ত চলমান থাকে, তাহলে অগ্রগতি জনগণকে জানাক। নীরবতা কখনো সন্দেহ দূর করে না; বরং আরো গভীর করে। রাষ্ট্রের শক্তি নীরবতায় নয়, স্বচ্ছতায়। বিচারহীনতা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডকে অমীমাংসিত রাখে না, এটি নাগরিকদের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে

শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পার হতে চলেছে; কিন্তু প্রশ্নের চেয়ে উত্তর কম। রহস্যের চেয়ে স্পষ্টতা কম। আর সরকারের বক্তব্যের চেয়ে নীরবতা বেশি। এ হত্যাকাণ্ড (যদিও তিনি নাম উল্লেখ করেননি) নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যা শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মমতা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেফতার করেছিল।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘হোম মিনিস্টার (অমিত শাহ) নিজে আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, এই কথা বাইরে বলা যাবে না। এটি দেশের স্বার্থে’। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল তার এই প্রশ্ন- ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? সবটাই জানি।’

এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য। এটি এমন একজন নেত্রীর বক্তব্য, যিনি দীর্ঘদিন ভারতের একটি সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পরিচালনা করেছেন। এটি এমন একজন রাজনীতিকের বক্তব্য, যিনি সরাসরি দাবি করছেন যে হত্যাকাণ্ডের পেছনের তথ্য তার জানা আছে।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে- তাহলে সেই তথ্য কী? কারা জড়িত? কাদের নাম বেরিয়ে এসেছিল? কেন বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হয়েছিল? মমতা যদি মিথ্যা বলে থাকেন, তাহলে ভারত সরকারের উচিত তাকে চ্যালেঞ্জ করা। আর যদি সত্যের কোনো অংশও থেকে থাকে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ এটি একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়।

মমতা আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনিকে এসটিএফ গ্রেফতার করেছিল জেনে রাখুন, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভল্যুশন হয়েছিল।...মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে।...আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে।...তারপর হোম মিনিস্টার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) নিজে আমাকে ফোন করে বলেছেন- এতদিন তো কই আমি বলিনি, মুখ খুলিনি- আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে আমি এখনো নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে, আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি।’ কী এমন স্পর্শকাতর তথ্য যা প্রকাশ পেলে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠবে?

এখানে আরো কিছু তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশ যাদের প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সেই ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ গ্রেফতার করে। পরে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ তাদের নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং দিল্লিতে নিয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এরপর কী হয়েছে? তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পাওয়া গেছে? বাংলাদেশ কি কনস্যুলার অ্যাকসেস পেয়েছে? প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া কোথায় দাঁড়িয়ে? তারা এখন কোন কারাগারে আছে? তদন্তে নতুন কোনো নাম এসেছে কি?

জনগণ জানেন না। সরকারও বলছে না। এই নীরবতা অস্বস্তিকর। কারণ, এটি কোনো সাধারণ খুন নয়। এটি এমন একজন রাজনৈতিক কর্মীর হত্যাকাণ্ড, যিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। শরিফ ওসমান হাদি আজ শুধু একটি নাম নন; তিনি অনেক তরুণের কাছে সাহস, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতীক। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের প্রজন্মের কাছে হাদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের এক স্মারক। তার জীবন ও মৃত্যু ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা তরুণদের মধ্যে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেকের কাছে তিনি পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার প্রতীক, আবার অনেকের কাছে ন্যায়বিচারের দাবিতে অবিচল থাকার অনুপ্রেরণা। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি অংশের কল্পনা, আবেগ ও রাজনৈতিক চেতনায় হাদি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী উপস্থিতিতে পরিণত হয়েছেন।

মমতার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা। অন্তত ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া। কূটনৈতিক অনুসন্ধান করা। বলা যে, একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এমন অভিযোগ করেছেন, আমরা তথ্য জানতে চাই; কিন্তু সেটি হয়নি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান বা নির্বাচনী ফলের আলোকে বিচার করা কূটনৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সহজ পথ; কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সহজ পথ নয়, দায়িত্ব হলো কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া। একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী যখন প্রকাশ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেন, তখন সেটি আর কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মন্তব্য থাকে না। এটি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নে রূপ নেয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম দায়িত্ব ছিল বিষয়টি নথিভুক্ত করা, ব্যাখ্যা চাওয়া এবং প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা কূটনৈতিক অনুসন্ধান শুরু করা। কারণ, রাষ্ট্র কখনোই তথ্যহীন অবস্থানকে নীতি হিসেবে নিতে পারে না।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য- ‘পরাজিত প্রার্থীর কথা নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়’ এবং ‘এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়’- এ অবস্থান প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার শামিল। এটি দুর্বল প্রতিক্রিয়া। এটি সমস্যার সমাধান নয়; বরং সমস্যা আড়ালে রাখার প্রবণতা তৈরি করে। কূটনীতিতে ব্যক্তি নয়, বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কে বলেছেন তা নয়, কী বলা হয়েছে তা-ই মুখ্য। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বা পরাজিত ব্যক্তির বক্তব্যও পরবর্তী সময়ে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আবার ক্ষমতাবানদের বক্তব্যও ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

রাষ্ট্রের শক্তি তথ্য যাচাইয়ে, প্রতিক্রিয়ার গভীরতায় এবং স্বচ্ছ অবস্থানে। উপেক্ষা বা হালকা প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক পরিসরে দুর্বল বার্তা দেয়। এটি কেবল কূটনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে না; বরং জনমনে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। এখানে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার।

ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অতীতে সীমান্তের বাইরে গোপন অভিযান চালানোর অভিযোগ নতুন নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় হারদিপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতকে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করেছিলেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গুরপতওয়ান্ত সিং পান্নুনকে হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ভারতীয় এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মামলা হয়েছে। এসব অভিযোগ ভারত অস্বীকার বা ব্যাখ্যা করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায় যে, রাষ্ট্র-সমর্থিত গোপন অপারেশন নিয়ে প্রশ্ন এখন আর কল্পনার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আলোচনার বাস্তব অংশ।

শরিফ ওসমান হাদি হত্যায় এমন কিছু ঘটতে পারে- শুরু থেকে অনেকে এমনটি বলে আসছেন। সন্দেহের তীর ভারতের দিকে ছিল। বিশেষ করে চিহ্নিত খুনিদের নিরাপত্তা দিতে দিল্লির তৎপরতা সেই সন্দেহকে আরো ঘনীভূত করেছে। ফলে তদন্তের দাবি জানানোর সময় এসেছে। বাংলাদেশের জনগণের জানার অধিকার আছে। হাদির পরিবার জানার অধিকার রাখে। আইনের শাসন জানার অধিকার রাখে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সত্য জানেন, তাহলে তাকে তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ভারত সরকার যদি নির্দোষ হয়, তাহলে তাদেরও স্বচ্ছ হতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার যদি সত্যিই বিচার চায়, তাহলে আরো সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, তিন পক্ষই নীরব। এ নীরবতা উদ্বেগের বিষয়। কারণ, ইতিহাস বলে- রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হলে গুজব বাড়ে। অবিশ্বাস বাড়ে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ঘনীভূত হয়। রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে। সরকারের প্রতি আস্থা কমে যায়।

আজ প্রয়োজন আবেগ নয়। প্রয়োজন তথ্য। প্রয়োজন কূটনৈতিক উদ্যোগ। প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত। প্রয়োজন অভিযুক্তদের দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা। প্রয়োজন আদালতের সামনে সত্য উন্মোচন। হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু একজন মানুষের জন্য নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা তার দায়িত্ব নয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। একটি গুরুতর হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকার যদি মনে করে অভিযোগ ভিত্তিহীন, তাহলে তথ্য প্রকাশ করুক। যদি তদন্ত চলমান থাকে, তাহলে অগ্রগতি জনগণকে জানাক। নীরবতা কখনো সন্দেহ দূর করে না; বরং আরো গভীর করে।

রাষ্ট্রের শক্তি নীরবতায় নয়, স্বচ্ছতায়। বিচারহীনতা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডকে অমীমাংসিত রাখে না, এটি নাগরিকদের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এখন প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান, দৃশ্যমান পদক্ষেপ এবং সত্য উদঘাটনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নীরবতাকে নয়, সত্য অনুসন্ধানের সাহসকে মনে রাখে। সত্যের দিকে হাঁটবে, নাকি নীরবতার আড়ালে লুকাবে- সেটি এখন সরকারের সিদ্ধান্ত।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।