বিশ্ব-ভূরাজনীতি ও কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু একসময় যা ছিল জ্বালানি তেল, গ্যাস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালী, একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে তা বন্দী হয়েছে কয়েক মিলিমিটারের ক্ষুদ্র এক টুকরো সিলিকন চিপে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ষষ্ঠ প্রজন্মের (৬জি) টেলিযোগাযোগ, হাইপারসনিক পেণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক যানবাহন কিংবা আধুনিক স্যাটেলাইট-বৈশ্বিক প্রযুক্তির প্রতিটি অঙ্গের মূল প্রাণশক্তি হলো এই সেমিকন্ডাক্টর।
এই বৈশ্বিক প্রোপটে ২০২৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিয়ার সামিট ২০২৬ (National Semiconductor Symposium & BEAR Summit 2026) আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ ঘরানার প্রযুক্তি সম্মেলন মনে হলেও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের চোখে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তবে এই আয়োজন এমন একসময়ে ঘটল, যখন বিশ্বরাজনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার তীব্র চিপযুদ্ধের উত্তাপে উত্তপ্ত, আর সেই যুদ্ধের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে এক ছোট্ট দ্বীপ-তাইওয়ান।
ঢাকায় আয়োজিত এই সম্মেলনকে ঘিরে আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিং কোনো প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানায়নি। তবে ভেতরের তথ্য অনুযায়ী এই ঘটনাকে বেইজিং তাদের রেড লাইনের সাথে যুক্ত একটি বিষয় হিসেবে দেখছে। ঠিক যেভাবে বিএনপির পূর্ববর্তী সরকারের সময় ঢাকায় তাইওয়ানের ট্রেড সেন্টার খোলার বিষয়টিকে দেখেছিল।
এই সম্মেলনে বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) কিংবা তাইওয়ান সরকারের কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত ছিলেন কি নাÑ সে বিষয়েও কোনো নথিভুক্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে পর্দার আড়ালে এই সম্মেলনকে ঘিরে যে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নীরব চিপ কূটনীতি শুরু হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
ঢাকার সম্মেলনে কী ঘটল : বাংলাদেশের প্রাথমিক কৌশল : বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনের মূল ল্য ছিলÑ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ হিসেবে যুক্ত করার সম্ভাবনা যাচাই করা।
সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক টেক জায়ান্ট যেমনÑ টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টস, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস, এনএক্সপি সেমিকন্ডাক্টরস, ক্রেডো টেকনোলজি গ্রুপ এবং স্যানডিস্ক-এর প্রতিনিধিসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনার মূল সুর ছিল : চিপ ডিজাইন, টেস্ট ভেরিফিকেশন, দ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব।
নীতিনির্ধারক ও শিল্পবিশেষজ্ঞদের আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কারÑ বাংলাদেশ এখনই শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে উন্নতমানের সিলিকন ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন বা চিপ উৎপাদনের দৌড়ে নামছে না; বরং বাংলাদেশের প্রাথমিক কৌশল হলো প্রযুক্তি শৃঙ্খলের তুলনামূলক কম মূলধনী অথচ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশে যুক্ত হওয়া। এর মধ্যে রয়েছে : আইসি ডিজাইন (ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ডিজাইন); চিপ যাচাইকরণ ও পরীা; ইডিএ’র (ইলেক্ট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন); এমবেডেড সিস্টেম ও সফটওয়্যার ও উন্নত প্যাকেজিং পরিষেবা।
একটি আধুনিক চিপ তৈরির কারখানা গড়তে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন অতি বিশুদ্ধ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং জটিল কেমিক্যাল সরবরাহব্যবস্থা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় চিপ ডিজাইনে মনোযোগ দেয়া অত্যন্ত বাস্তবসম্মত কৌশল।
কেন হঠাৎ বাংলাদেশ : ‘চীন প্লাস ওয়ান’ ও বৈশ্বিক ব্যাকড্রপ
বিশ্ব-অর্থনীতি এখন ‘চীন প্লাস ওয়ান’ কৌশলে হাঁটছে। কোভিড-১৯ মহামারী এবং পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন-বেইজিং বাণিজ্যযুদ্ধ প্রমাণ করেছেÑ একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর বৈশ্বিক উৎপাদন বা প্রযুক্তির অতি-নির্ভরতা কতটা মারাত্মক হতে পারে। ফলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাপ্লাই চেইন একাধিক দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তিটি বেশ কয়েকটি উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে : ১. তরুণ ও দ্রুত প্রসারমান প্রকৌশলী গোষ্ঠী : প্রতি বছর দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হাজার হাজার প্রকৌশলী পাস করছেন। ২. প্রতিযোগিতামূলক মজুরি : ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে মেধা ও প্রযুক্তি-শ্রমের খরচ অনেক কম। ৩. অবকাঠামোগত অগ্রগতি : দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং হাই-টেক পার্কগুলোর উপস্থিতি। ৪. কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান : দণি ও দণি-পূর্ব এশিয়ার মিলনস্থলে স্থিত হওয়ার কারণে বঙ্গোপসাগরীয় করিডোর হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ।
তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এগুলো কেবলই সম্ভাবনার প্রাথমিক ধাপ। এই সম্ভাবনাকে শিল্পের রূপ দিতে প্রয়োজন সঠিক দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং সমন্বিত বিনিয়োগ।
ভূরাজনীতির প্রাণকেন্দ্র তাইওয়ান ও ‘সিলিকন শিল্ড’
সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক সমীকরণ বুঝতে হলে তাইওয়ানের অবস্থান বোঝা অপরিহার্য। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রসেসরগুলোর (৩ ন্যানোমিটার বা তার নিচে) ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয় তাইওয়ানে, যার মূল নিয়ন্ত্রক টিএসএমসি (তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি)। অ্যাপল, এসভিডিআইএ, এএমডি, কুয়ালকম-এর মতো পরাশক্তি সংস্থাগুলো চিপ নকশাকে এবং তা ফ্যাব্রিকেশনের জন্য টিএসএমসির ওপর শতভাগ নির্ভর করে।
এই নির্ভরশীলতা থেকেই উদ্ভব হয়েছে সিলিকন ঢাল ধারণার। তত্ত্বটি বলেÑ যেহেতু বিশ্ব-অর্থনীতি তাইওয়ানের চিপের ওপর নির্ভরশীল, তাই তাইওয়ানের স্থিতিশীলতা রা করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্তিত্বের স্বার্থে পরিণত হয়েছে। এই শিল্পই নাকি তাইওয়ানকে চীনের সম্ভাব্য সামরিক পদপে থেকে রা করছে।
তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অন্য অংশ মনে করেন, ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবসময় কেবল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ দিয়ে পরিচালিত হয় না। ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছেÑ অর্থনৈতিক তির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলো সামরিক অভিযানে লিপ্ত হতে পারে। তাই ‘সিলিকন শিল্ড’ কৌশলগত সুরা দিলেও তা কোনো চূড়ান্ত সামরিক নিশ্চয়তা প্রদান করে না।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বৈরথ : চিপস অ্যাক্ট বনাম ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’
২০১৮ সালের পর থেকে প্রযুক্তি আধিপত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্ঘাত এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি এখন কেবল বাজারের দখলদারিত্ব নয়, বিশ্ব-আধিপত্যের লড়াই। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছেÑ চিপস ও বিজ্ঞান আইন (২০২২)। ৫২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাষ্ট্রীয় অনুদান ও প্রণোদনা দিয়ে নিজ দেশে চিপ ফ্যাব্রিকেশন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। সে সাথে রয়েছেÑ রফতানি নিষেধাজ্ঞা টুল, চীন যেন উন্নত এআই চিপ এবং নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল নির্মিত অতিরশ্মি লিথোগ্রাফি (ইইউভি) প্রযুক্তি না পায়, তার জন্য কঠোর আইনি অবরোধ।
এ ক্ষেত্রে চীনের প্রতিক্রিয়া হলোÑ আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের অংশ হিসেবে এমআইসি ও লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম তৈরির জোর প্রচেষ্টা। এর সাথে রয়েছে বিকল্প জোট গঠন তথাÑ ব্রিকস ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে নিজস্ব ডিজিটাল ও প্রযুক্তি বাজার সুরতি করার প্রয়াস।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক দড়িখেলা : ওয়ান চায়না পলিসি, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি
বাংলাদেশের চিপ-শিল্পে প্রবেশের অর্থনৈতিক আকাক্সক্ষা যতটাই সোজা মনে হোক না কেন, কূটনৈতিক পথটি অত্যন্ত পিচ্ছিল। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এক চীন নীতি’ কঠোরভাবে মেনে চলে। বেইজিং তাইওয়ানকে তার অখণ্ড ভূখণ্ডের অংশ মনে করে। যদি বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত তাইওয়ানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা অ্যাকাডেমিয়ার সাথে ব্যবসায়িক বা শিাগত সম্পর্কে যুক্ত থাকে, বেইজিং সাধারণত তা নীরবে সহ্য করে; কিন্তু যদি তাইওয়ানের রাষ্ট্রসমর্থিত সংস্থা বা সরকারি কোনো উদ্যোগের সাথে ঢাকার আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তবে তা বেইজিংয়ের সাথে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করবে।
অন্য দিকে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) ও ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তার অনুসারী জোটগুলো (কোয়াড, ইইউ) চিপ সাপ্লাই চেইনকে চীনের প্রভাবমুক্ত করতে বান্ধব রাষ্ট্রে কারখানা ও ডিজাইন স্থানান্তর নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশকে এই বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে অন্তর্ভুক্ত করা যুক্তরাষ্ট্রের আইপিএস নীতির কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন অংশীদার ও আমদানির উৎস, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার এবং প্রধান বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিনিয়োগের উৎস। বাংলাদেশকে তাই অত্যন্ত সতর্কভাবে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতির অধীনে প্রযুক্তি কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে।
আঞ্চলিক তুলনা : ভিয়েতনাম, ভারত ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা
সেমিকন্ডাক্টর খাতে সাফল্য অর্জন করতে হলে প্রতিবেশীদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা জরুরি মনে করা হয়। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের গৃহীত কৌশল ছিল ব্যাক-অ্যান্ড প্রসেসিং ও অ্যাসেম্বলি আর সাফল্যে কারণ ছিল বিশাল বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (ওহঃবষ, অসশড়ৎ) ও সহজ শ্রম আইন। এখান থেকে বাংলাদেশের জন্য শিা হতে পারে উৎপাদন নয়, প্রথমে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকে আকর্ষণ করা। এর বিপরীতে ভারতের কৌশল হলোÑ ডিজাইন সমতা ও সরকারি প্রণোদনা সাফল্যের মূল কারণ চিপ ডিজাইনে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা এবং বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ। এখানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ডিজাইন হাউজগুলোকে গবেষণাগার স্থাপনে উৎসাহিত করতে পারে। মালয়েশিয়ার প্যাকেজিং ও টেস্টিং (এটিপি) সাফল্যের মূল কারণ হলোÑ পেনাং দ্বীপে চার দশকের অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক টেস্টিংয়ের ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ। এখান থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হতে পারেÑ নিখুঁত নির্দিষ্ট নিশ (ঘরপযব) খাতে মনোযোগ কেন্দ্রীকরণ।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতের বাস্তবতা : সম্ভাবনা বনাম সীমাবদ্ধতা
ঢাকায় সম্মেলনের চমকপ্রদ আলোচনার বাইরে বাস্তবতার কঠিন হিসাব অত্যন্ত সংবেদনশীল। ঢাকার শক্তির জায়গা হলোÑ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সাস্ট), আইইউটি (আইইউটি), কুয়েট, রুয়েট, চুয়েটসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে ভিএলএসআই (ভিএলএসআই) ও মাইক্রোইলেকট্রনিক্স নিয়ে পড়াশোনা হচ্ছে। এ ছাড়া সিলিকন ভ্যালি, ইউরোপ ও তাইওয়ানের শীর্ষ চিপ কোম্পানিতে বহু বাংলাদেশী প্রকৌশলী অত্যন্ত সুনামের সাথে কর্মরত আছেন।
অন্য দিকে বাংলাদেশের জন্য ঘাটতি ও মূল চ্যালেঞ্জ হলোÑ ১. ল্যাব ও ইডিএ লাইসেন্সের অভাব : অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইডিএ (ঊষবপঃৎড়হরপ উবংরমহ অঁঃড়সধঃরড়হ) সফটওয়্যার (যেমন-ঝুহড়ঢ়ংুং, ঈধফবহপব) লাইসেন্স ও আধুনিক চিপ টেস্টিং ল্যাবের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। ২. বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের বিচ্ছিন্নতা : অ্যাকাডেমিক গবেষণা সরাসরি বাণিজ্যিক চিপ নকশায় রূপান্তরিত হওয়ার কাঠামো অনুপস্থিত। ৩. মেধাস্বত্ব সুরা : আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের কোটি ডলারের ডিজাইন বাংলাদেশে আনতে দ্বিধা করবে যদি না মেধাস্বত্ব সুরায় কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক থাকে। ৪. ব্রেন ড্রেন : পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে দ প্রকৌশলীরা স্থায়ীভাবে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
আগামী ১০ বছরের জন্য কৌশলগত রোডম্যাপ
বাংলাদেশকে কেবল সম্মেলন আয়োজক দেশ থেকে সত্যিকারের ‘চিপ ডিজাইন হাব’-এ পরিণত হতে হলে তিন ধাপের একটি রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে : স্বল্পমেয়াদি পদপে (এক-তিন বছর) : জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর নীতি প্রণয়ন : উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে বিশেষ কর ছাড় ও বিনিয়োগ সুরা নিশ্চিত করা। ইডিএ ব্যাংক ও ল্যাব প্রতিষ্ঠা : সরকারি অর্থায়নে সেন্ট্রাল ভিএলএসআই ডিজাইন ল্যাব তৈরি করা, যাতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীরা সুযোগ পান। প্রবাসী মেধা সম্পৃক্তকরণ : প্রবাসে কর্মরত অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও গবেষকদের দেশে এনে স্বল্পমেয়াদি কোর্স ও স্টার্টআপ মেন্টরিং করানো।
মধ্যমেয়াদি পদপে (তিন-সাত বছর) : গবেষণা ও উন্নয়ন (জ্উ) তহবিল : জাতীয় বাজেটে প্রযুক্তি গবেষণার জন্য আলাদা তহবিল নিশ্চিত করা। মাল্টিন্যাশনাল ডিজাইন সেন্টার আনা : সিনোপসিস, ক্যাডেন্স, কোয়ালকম-এর মতো প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে প্রণোদনা দেয়া। প্যাকেজিং ও টেস্টিং সমতা : চিপ ফ্যাব্রিকেশনে না গিয়ে চিপ প্যাকেজিং ও টেস্টিং কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া।
দীর্ঘমেয়াদি ল্য (সাত-পনের বছর) : বাংলাদেশকে দণি এশিয়ার অন্যতম প্রধান আইসি ডিজাইন ও টেস্টিং হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। স্থানীয় প্রযুক্তিনির্ভর চিপ স্টার্টআপ গড়ে তোলা, যা বৈশ্বিক অটোমোটিভ, আইওটি ও এআই বাজারে পণ্য সরবরাহ করবে।
নীরব বিপ্লব নাকি ণিকের উন্মাদনা?
২০২৬ সালের ঢাকার জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়ামের কোলাহল থেমে গেছে; কিন্তু বিশ্ব-রাজনীতির দাবাখেলায় বাংলাদেশ এক নতুন ঘরে পা দিয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প কোনো সস্তা প্রচারণার জায়গা নয়; এটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, সুসংগঠিত এবং ধৈর্যশীল বিনিয়োগের খাত।
বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে কেবল সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকেÑ তবেই কেবল তরুণ প্রকৌশলীদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে চিপ-প্রযুক্তির বিশ্বমানচিত্রে নিজেদের স্থান করে নেয়া সম্ভব হবে। অন্যথায়, এই মহাসুযোগ বৈশ্বিক চিপযুদ্ধের ইতিহাসে ঢাকার আরো একটি নিছক সেমিনারের স্মৃতি হিসেবেই জমা পড়ে থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের চিপস এবং বিজ্ঞান আইন (২০২২) এবং ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের তীব্র সেমিকন্ডাক্টর টেক-ওয়ার বৈশ্বিক চিপ সাপ্লাই চেইনকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। আগে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ছিল একক দতা ও ভৌগোলিক কেন্দ্রীভূত (যেমন-তাইওয়ান, কোরিয়া ও চীন-কেন্দ্রিক)। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ চিপ সরবরাহ শৃঙ্খলকে ঝুঁকি কমানো ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশে স্থানান্তরিত করা নীতিতে সাজাচ্ছে।
এই পটভূমিতে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর সামনে পাঁচটি প্রধান অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে :
‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ ও ‘চীন প্লাস ওয়ান’ বিনিয়োগ আকর্ষণ
যুক্তরাষ্ট্রের চিপস আইন-এর অন্যতম ল্য কেবল নিজ দেশে চিপ তৈরি নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগী দেশগুলোতে সাপ্লাই চেইনের নিরাপত্তাকল্পে আইটিএসআই তহবিল (আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি নিরাপত্তা ও উদ্ভাবন তহবিল) প্রতিষ্ঠা করা।
অর্থনৈতিক সুবিধা : বহুজাতিক চিপ প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন-ইন্টেল, টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ) তাদের টেস্টিং, অ্যাসেম্বলি ও ডিজাইন সেন্টার চীন থেকে সরিয়ে দণি ও দণি-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার করছে।
উদীয়মান দেশের অবস্থান : বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলো যদি স্থিতিশীল পরিবেশ ও সস্তা কারিগরি শ্রম দিতে পারে, তবে কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) তাদের দেশে নিয়ে আসা সম্ভব।
ব্যাক-এন্ড সার্ভিস ও প্যাকেজিং খাতের বাজার দখল
উন্নত চিপ উৎপাদনের কারখানা নির্মাণে ১০-২০ বিলিয়ন ডলারের চড়া বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা উদীয়মান অর্থনীতির জন্য কঠিন; কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাক-এন্ড সার্ভিস বা এটিপি (অংংবসনষু, ঞবংঃরহম ধহফ চধপশধমরহম) খাতে তুলনামূলক কম মূলধনে প্রবেশ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধা হলো : উন্নত চিপগুলো আমেরিকা বা তাইওয়ানে ডিজাইন ও ফ্যাব্রিকেটেড হলেও তার প্যাকেজিং ও টেস্টিং ব্যাক-এন্ডে উদীয়মান দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। এতে নতুন মেগা-কারখানা ছাড়াই রফতানি আয় বহুগুণ বাড়ানো যায়।
আইসি ডিজাইন, ইডিএ ও সফটওয়্যার আউটসোর্সিং
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উচ্চমূল্য সংযোজনকারী একটি ধাপ হলো ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ডিজাইন ও ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) সফটওয়্যার তৈরি। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধা হলোÑ উদীয়মান দেশগুলোর প্রধান শক্তি হলো তাদের বিশালসংখ্যক তরুণ প্রকৌশলী। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক ফ্যাবলেস কোম্পানিগুলো বিশ্বব্যাপী সাশ্রয়ী আউটসোর্সড ডিজাইন পার্টনার খুঁজছে।
বাংলাদেশের উদাহরণ হলোÑ এখানকার তরুণ প্রকৌশলীদের তৈরি আইসি ডিজাইন ফ্রেমওয়ার্ক আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করে মিলিয়ন ডলারের সার্ভিস ফরেক্স (বৈদেশিক মুদ্রা) অর্জন করা সম্ভব।
রফতানি বাজারের বহুমুখী সম্প্রসারণটিও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন বাংলাদেশের পোশাক খাত বা ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলির ওপর অতি-নির্ভরতা যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এর অর্থনৈতিক সুবিধা হলোÑ চিপযুদ্ধের প্রোপটে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অংশ হলে জাতীয় রফতানি ঝুলিতে উচ্চ-প্রযুক্তির আইটি/হার্ডওয়্যার সার্ভিস যুক্ত হয়। এটি সরাসরি একটি দেশের ‘নলেজ বেসড ইকোনমি’ বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি তৈরিতে প্রবৃদ্ধির ইন্ধন জোগায়।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহায়তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
যুক্তরাষ্ট্রের চিপস আইন এবং ইউরোপের চিপস আইনÑ উভয় েেত্রই মিত্র দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ফান্ড ও স্কলারশিপের বিধান রয়েছে। এতে অর্থনৈতিক সুবিধা হলোÑ উদীয়মান দেশগুলোর মেধা প্রচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমতা বৃদ্ধিতে মার্কিন বা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও টেক-জায়ান্টদের সাথে সরাসরি অংশীদারত্ব গড়ে উঠছে। এর মাধ্যমে দেশের ভেতরেই উন্নত সিলিকন-ল্যাব, চিপ-টেস্টিং অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের চিপ-ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা যাচ্ছে।
চিপযুদ্ধের কৌশলগত বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে উন্নত ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশনের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না। চিপযুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিকেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগে আইসি ডিজাইন + অ্যাসেম্বলি/টেস্টিং + যোগ্য মানবসম্পদÑ এই তিন উপাদানের সঠিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি-বাজারের অংশীদার হওয়া বাস্তবসম্মত।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির কূটনীতি যত চটকদারই হোক না কেন, বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জটি ঘরোয়া প্রস্তুতির ঘাটতিতে আটকে আছে : মানসম্পন্ন প্রকৌশলীর েেত্র তত্ত্বভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আছে, তবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিএলএসআই অভিজ্ঞতার অভাব। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদপে হলোÑ সিলিকন ভ্যালি ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ প্রশিণ বাধ্যতামূলক করা।
গবেষণাগার ও ইডিএ লাইসেন্সের েেত্র চিপ ডিজাইনের ব্যয়বহুল ইডিএ লাইসেন্স ও ল্যাব নগণ্য। প্রয়োজনীয় নীতিগত পদপে হলোÑ জাতীয় বাজেটের বিশেষ বরাদ্দ থেকে কেন্দ্রীয় ঊউঅ ব্যাংকিং ল্যাব প্রতিষ্ঠা। মেধাস্বত্ব সুরা েেত্র বর্তমান অবস্থা হলোÑ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মেধা সম্পত্তি আইন দুর্বল ও আইনি বাস্তবায়ন ধীর। এ েেত্র আন্তর্জাতিক টেক-ফাইলের নিরাপত্তার জন্য আইপি আইন সংস্কার দরকার। অবকাঠামো ও নীতি প্রশ্নে এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্রীয় নীতি। ১০-২০ বছর মেয়াদি অটল ‘জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর রোডম্যাপ’ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কি নতুন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার কৌশলগত মোড়ে দাঁড়িয়ে?
সেমিকন্ডাক্টরকে কেন্দ্র করে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও বিয়ার সামিট-২০২৬ এখন পর্যন্ত মূলত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক একটি উদ্যোগ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। এই সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্ব ভূরাজনীতিতে অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় চীনের প থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া, আপত্তি বা কূটনৈতিক বার্তা প্রকাশিত হয়নি।
ফলে প্রশ্ন ওঠেÑ ঢাকার এই কৌশলগত প্রযুক্তি পদেেপ বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক কেমন হতে পারে? এই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর খুঁজতে হলে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি চীনের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি, দণি এশীয় প্রযুক্তি-কৌশল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আলোকে সম্ভাব্য দৃশ্যপটগুলোকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া : তিনটি সম্ভাব্য কৌশলগত দৃশ্যপট
প্রথম দৃশ্যপট : নিবিড় পর্যবেণ : সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রতিক্রিয়া হতে পারে চীনের ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ বা নীরব পর্যবেণের কৌশল। চীন সাধারণত যেকোনো প্রযুক্তির রাজনৈতিক পদেেপ তাৎণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চারটি প্রধান দিক মূল্যায়ন করে : ১. উদ্যোগটি কি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক, নাকি এর পেছনে কোনো সরকারি/সামরিক উদ্দেশ্য রয়েছে? ২. এতে কি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের প্রত্য নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে? ৩. তাইওয়ানের সরকারি কোনো সংস্থা বা রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান কি এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত? ৪. বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ নীতির কৌশলগত ঘাঁটি হতে যাচ্ছে?
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর আপাতদৃষ্টে নেতিবাচক থাকে, তবে বেইজিং নীরব থেকেই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেণ করবে।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট : বিকল্প প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা : পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, রূপপুর মেগা পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্যাকবোন, শিল্পাঞ্চল ও ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে চীন বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। সেমিকন্ডাক্টর বা উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ আগ্রহ দেখালে চীন সঙ্ঘাতের বদলে পাল্টা সহযোগিতামূলক প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুত খাতে নতুন বিনিয়োগ; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌথ এআই ও চিপ ল্যাব স্থাপন; বাংলাদেশ প্রকৌশলীদের চিপ অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিংয়ে কারিগরি সহায়তা প্রদান।
তৃতীয় দৃশ্যপট : ‘এক চীন নীতি’ স্মরণ করানো : বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে অত্যন্ত কঠোরভাবে ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে আসছে। ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশের কোনো সরকারি সংস্থা তাইওয়ানের রাষ্ট্রীয় সাহায্যপুষ্ট বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রযুক্তি চুক্তিতে যায়, তবে বেইজিং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ‘এক চীন নীতি’র আইনি সীমারেখা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। তবে বর্তমান সম্মেলনকেন্দ্রিক এমন কোনো স্পর্শকাতরতা ঘটেনি।
কৌশলগত ভারসাম্যই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ হলোÑ ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। এক দিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও দণি কোরিয়ার সাথে হাই-টেক ডিজাইন ও নলেজ শেয়ারিং; অন্য দিকে চীন ও ভারতের সাথে বড় আকারের অবকাঠামোগত ও উৎপাদন খাতের সমন্বয়Ñ এই বহুপীয় ভারসাম্য রা করাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুরার সেরা উপায়।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, সেমিকন্ডাক্টর এখন আর কেবল সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যুদ্ধবিমান, পেণাস্ত্র এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রাথমিক চালিকাশক্তি। ফলে আগামী দিনে কৌশলগত ভারসাম্য অক্ষুণœ রেখে চিপের প্রযুক্তিজগতে প্রবেশ করা ঢাকার জন্য হবে কূটনীতির এক কঠিন পরীা।



