গাজী নজরুল বহিষ্কার : জামায়াতের নৈতিকতা

দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে তা একটি বার্তা দেয়। যদি কোনো দল কোনো নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর নৈতিক অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত বা দলীয় বিধি অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেটি দলের পক্ষ থেকে বার্তা দেয় যে, ব্যক্তি নয়, সংগঠনের নীতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তবে নৈতিকতার মূল্যায়ন একটি ঘটনার ভিত্তিতে হয় না। একটি মাত্র বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত থেকে বলা যায় না যে, পুরো দলের নৈতিকতা সমুন্নত হয়েছে বা আছে। একই মানদণ্ড অতীতে ও ভবিষ্যতেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বা হচ্ছে কি না, তা-ই আসল কথা।

গুরুতর নৈতিক স্খলনের দায়ে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রশ্ন উঠেছে, শুধু বহিষ্কার করলেই কী দলের ভাবমর্যাদা রক্ষা পাবে? এ ঘটনায় জামায়াতের লাভ-ক্ষতির হিসাবটাইবা আমরা কিভাবে দেখব?

একজন সংসদ সদস্য বা উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত আচরণ জনআস্থার সাথে সম্পর্কিত। জনগণ তাদের কাছ থেকে উচ্চতর নৈতিক মান প্রত্যাশা করেন। তবে মনে রাখা জরুরি যে, কোনো রাজনৈতিক দলের জনপরিসর বাড়তে থাকলে, সে দলে নানা ধরনের লোকজন দলে দলে ভিড় জমান। এ সুযোগে মতলববাজরাও অনায়াশে ঢুকে যায়। যারা সবসময় ক্ষমতার সংস্পর্শে থেকে সুবিধা আদায় করে নেয়। কোনো রাজনৈতিক দলের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিকতা বাড়তে থাকলে এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক্ষেত্রে নৈতিকতাবিবর্জিত এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। গতিশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত গ্রহণ-বর্জনের ভেতর দিয়ে এই কার্যক্রমটি পরিচালনা করে।

তবে রাজনীতিতে পাবলিক পারসেপশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যার মূল্য অপরিসীম। এর ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে দলের গ্রহণযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা। অন্য দিকে আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে, ধর্মীয় আদর্শবাদী না হয়ে সেক্যুলার আদর্শের কোনো দলের নেতাকর্মী একই ধরনের কর্মে জড়ালে মানুষ তা সাধারণত আমলে নেন না কেন? তারা ধরে নেন, ধর্মীয় অনুশাসনে চলা ব্যক্তি উচ্চ নৈতিকতা ধারণ করেন। আমজনতার কাছে সেক্যুলার নেতৃত্বের ব্যক্তিগত নৈতিকতা বিশেষ করে যৌনজীবন তেমন গুরুত্ব পায় না। নৈতিক স্খলনজনিত ঘটনা ইসলামপন্থী দলের কোনো নেতাকর্মী ঘটালে তার অভিঘাত সমাজে তীব্র আলোড়ন তোলে। তাই দেখা গেল, গাজী নজরুলের ঘটনা সারা দেশে সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

আজকের আলোচনায় আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করতে সচেষ্ট হবো, জামায়াতের মতো আদর্শবাদী সংগঠনের ওপর এ ঘটনার সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত কী প্রভাব ফেলতে পারে।

বৈবাহিক বন্ধনের বাইরে কোনো নারী-পুরুষ শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে আমাদের সমাজে অর্থাৎ মুসলিমপ্রধান দেশে তা তীব্রভাবে নিন্দনীয়। শরিয়া অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে রাষ্ট্রীয় আইনে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। শরিয়ায় বিয়ে একটি সামাজিক চুক্তি। কেউ বিয়ে করলে তাকে সামাজিক ঘোষণার আওতায় আসতে হয়। সাক্ষী অপরিহার্য। কিন্তু মুশকিল হলো, ঘোষণা লিখিত হতেই হবে, এমন কোনো বিধান কী আছে? বাংলাদেশে মুসলিম বিয়ের রেজিস্ট্রেশন শুরু হয় ১৯৬২ সালে পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান প্রবর্তিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী। এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো কাবিননামা; যা বিবাহবন্ধনে লিখিত একটি দলিল। এখন যেকোনো বিয়েতে এটি বাধ্যতামূলক।

গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত একান্ত ভিডিও ক্লিপ ফাঁস হওয়ার পর তিনি দাবি করেন, উল্লিখিত তরুণী তার স্ত্রী। কিন্তু একটি পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাবিননামার তারিখ ভিডিও ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পরে লিখিত হয়েছে। এ কথা মেনে নিয়েও বলা যায়, গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের সাথে যারা জড়িত, তারা কয়েকটি আইন সরাসরি লঙ্ঘন করেছেন। কারণ, মানুষের একটি ব্যক্তিগত জগৎ থাকা দরকার, যেখানে রাষ্ট্র বা অন্য কেউ কোনোভাবে অনুপ্রবেশ করতে পারেন না। গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনায় সেই সীমারেখা ভেঙে ফেলা হয়েছে।

নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় দেশে দেশে আইন আছে। আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা আইন অন্যতম। এটি এমন একটি আইন, যা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যক্তিগত জীবন এবং গোপনীয়তার অধিকারের সুরক্ষা দেয়। এ ধরনের আইন নির্ধারণ করে— কে, কী উদ্দেশ্যে এবং কিভাবে কারও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার, সংরক্ষণ বা ফাঁস করতে পারবে। আইন বলে যে, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের আগে ব্যক্তির সম্মতি নিতে হবে। তথ্য শুধু নির্দিষ্ট ও বৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে। তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করাও এ আইন অনুযায়ী জরুরি। অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে তথ্য প্রকাশ না করা, ব্যক্তি চাইলে নিজের তথ্য দেখার, সংশোধনের বা কিছু ক্ষেত্রে মুছে ফেলার অধিকার রাখেন।

বাংলাদেশে গোপনীয়তা সুরক্ষার বিষয়টি বিভিন্ন আইনে উল্লেখ থাকায় কোনো নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশ বা ছড়িয়ে দেয়া আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও ঘটনার ধরন অনুযায়ী একাধিক আইন প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন— ব্যক্তিগত জীবন, বাসস্থান ও যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃত। ডিজিটাল মাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি/ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রচার, প্রকাশ বা ছড়িয়ে দিয়ে ক্ষতি করলে তা অপরাধ। যদি ভিডিওটি মানহানির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ঘটনার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ফৌজদারি আইনও প্রযোজ্য হতে পারে। যদি ভিডিওটি গোপনে ধারণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও আলাদা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব আইনি দৃষ্টিভঙ্গি একত্রে করলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নৈতিক অবস্থান তৈরি করে।

সব দিক বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, জনপ্রতিনিধির জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উপায়ও নৈতিক হতে হবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার হতে হবে যথাযথ প্রক্রিয়ায়। অনুমতিবিহীন ব্যক্তিগত উপাদান ফাঁস ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনা স্বাভাবিক করে তোলা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সামাজিক আস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

এবার আমরা খতিয়ে দেখতে চাই জামায়াত অতি দ্রুত গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে রাজনৈতিকভাবে কতটুকু ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারল। নাকি রাজনৈতিক লোকসান কাটিয়ে ওঠা আদৌ সম্ভব হবে না দলটির।

আমাদের পর্যবেক্ষণ, জামায়াত গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে তা একটি বার্তা দেয়। যদি কোনো দল কোনো নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর নৈতিক অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত বা দলীয় বিধি অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেটি দলের পক্ষ থেকে বার্তা দেয় যে, ব্যক্তি নয়, সংগঠনের নীতি গুরুত্বপূর্ণ। এটি জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তবে নৈতিকতার মূল্যায়ন একটি ঘটনার ভিত্তিতে হয় না। একটি মাত্র বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত থেকে বলা যায় না যে, পুরো দলের নৈতিকতা সমুন্নত হয়েছে বা আছে। একই মানদণ্ড অতীতে ও ভবিষ্যতেও সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বা হচ্ছে কি না, তা-ই আসল কথা। নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা ধারাবাহিকতায় সমুন্নত হয়ে থাকে। তাই গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জামায়াতের নৈতিক জবাবদিহির একটি প্রচেষ্টা। তবে নৈতিকতার প্রকৃত মানদণ্ড হলো ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সবার জন্য সমান নিয়ম।

গাজী নজরুলের ঘটনায় জামায়াতের রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি, দুটোই হয়েছে। তবে লোকসানের চেয়ে লাভ বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। সম্ভাব্য রাজনৈতিক লাভ—

নৈতিক অবস্থানের বার্তা : দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ায় দলটি সমর্থকদের কাছে এই বার্তা দিয়েছে যে, ব্যক্তি নয়; নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে দলীয় আদর্শই বড়। দলের নেতাকর্মীর কাছে এটি একটি সঙ্কেত যে, নির্দিষ্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। জামায়াত প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে একটি নীতিনিষ্ঠ ও আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে আসছে। এ সিদ্ধান্ত সেই দাবির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষতি : যেহেতু ওই সংসদ সদস্য স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় তাই তার বহিষ্কার স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। তবে জামায়াত যেহেতু স্তরভিত্তিক রাজনৈতিক দল, এতে তেমন ক্ষতির মুখে পড়বে না বলে নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। এটি ঠিক যে, বহিষ্কারের ফলে ঘটনাটি জনপরিসরে আরো বেশি আলোচনায় এসেছে। অনেক সময় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ দলের নৈতিক অবস্থানকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি সংশ্লিষ্ট বিতর্কও দীর্ঘস্থায়ী করে। জামায়াতবিরোধীরা এখন দেখতে চাইবেন, ভবিষ্যতে একই ধরনের অভিযোগ অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে উঠলে দল একই মানদণ্ডে ব্যবস্থা নেয় কি না।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো— এদেশের ভোটাররা শুধু নৈতিকতার প্রশ্নে ভোট দেন না। অর্থনীতি, স্থানীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক জোট, নির্বাচনী পরিবেশ, সরকারের প্রতি জনমত, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা— এসব বিষয়ও ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। তাই এই একক ঘটনাকে দলের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণকারী হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]