ব্যাংকিং খাতের ভেতরেই ঋণ-বোমা

তথ্য আছে, নজরদারি আছে- তারপরও ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ

দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি হয়তো নতুন কোনো পরিসংখ্যানে নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় পাঁচ দশকের তথ্যসংগ্রহের ইতিহাসেই লুকিয়ে আছে। ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর আমানত, ঋণ, অগ্রিম, বিল, সুদের হার, খাতভিত্তিক ঋণ, পুনরুদ্ধার ও বকেয়া অর্থের তথ্য সংগ্রহ করছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে কোথায় ঝুঁকি জমছে- তা জানার মতো তথ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে; কিন্তু সেই তথ্যই এখন একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে- তথ্য যদি থাকে, ঝুঁকি শনাক্তের ব্যবস্থা যদি থাকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাও যদি থাকে, তাহলে ব্যাংকিং খাতের ঋণঝুঁকি এত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাল কিভাবে?

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক |ইন্টারনেট

দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি হয়তো নতুন কোনো পরিসংখ্যানে নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় পাঁচ দশকের তথ্যসংগ্রহের ইতিহাসেই লুকিয়ে আছে। ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর আমানত, ঋণ, অগ্রিম, বিল, সুদের হার, খাতভিত্তিক ঋণ, পুনরুদ্ধার ও বকেয়া অর্থের তথ্য সংগ্রহ করছে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে কোথায় ঝুঁকি জমছে- তা জানার মতো তথ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে; কিন্তু সেই তথ্যই এখন একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে- তথ্য যদি থাকে, ঝুঁকি শনাক্তের ব্যবস্থা যদি থাকে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাও যদি থাকে, তাহলে ব্যাংকিং খাতের ঋণঝুঁকি এত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাল কিভাবে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে এর অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা ইতোমধ্যে সমস্যাগ্রস্ত বা শ্রেণিকৃত। মাত্র ছয় মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

এটি আর বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যাংকের সমস্যা নয়। এটি এখন পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্পদের মান-এর সঙ্কট। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাস একটি কঠিন সত্য সামনে আনে। ব্যাংকের কাঠামো বদলেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে বেসরকারি ব্যাংক হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং বিস্তৃত হয়েছে। বিদেশী ব্যাংক এসেছে। ন্যূনতম মূলধন কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা হয়েছে আরো বিস্তৃত ও আধুনিক। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা বলছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ব্যাংকের সংখ্যা বা মূলধনের ঘাটতি নয়- ঋণের গুণগত মান, সুশাসন এবং জবাবদিহির ঘাটতি।

বিশ্লেষকদের মতে, সামনে প্রশ্নটি আর ‘কতটি ব্যাংক থাকবে’- এটি নয়। প্রশ্ন হলো- কতটি ব্যাংক প্রকৃতপে সুস্থ? কত টাকা সত্যিই ফেরত আসবে? কারা সেই টাকা নিয়েছে? কেন তারা ফেরত দেয়নি এবং এত তথ্য থাকার পরও এত বড় তি হতে দেয়া হলো কেন? বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের পরবর্তী সংস্কারের সাফল্য তাই নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, নতুন মূলধন বা নতুন নীতিমালায় নয়; বরং যে অর্থ আর ফেরত আসবে না, তার প্রকৃত তি স্বীকার করা এবং যারা সেই তির জন্য দায়ী- তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর নির্ভর করবে।

ঋণের পাহাড়, ফেরতের সঙ্কট

গতকাল প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ ঝপযবফঁষবফ ইধহশং ঝঃধঃরংঃরপং-এ মার্চ পর্যন্ত তফসিলি ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা; বিল-সহ মোট ব্যাংকিং ক্রেডিট ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৭৯ হাজার কোটি টাকা। কয়েক মাসের ব্যবধানে জুনে শ্রেণিকৃত ঋণই ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন নতুন ঋণ কত বিতরণ হচ্ছে তা নয়; বরং বিদ্যমান ঋণের কত অংশ প্রকৃতপে ফেরত আসবে।

কারণ একটি ঋণ শ্রেণিকৃত হওয়ার অর্থ শুধু কাগজে একটি হিসাব বদলে যাওয়া নয়। এর সাথে যুক্ত থাকে ব্যাংকের আয় কমে যাওয়া, সুদ আদায় অনিশ্চিত হওয়া, প্রভিশন বাড়ানোর প্রয়োজন, মূলধনের ওপর চাপ এবং শেষ পর্যন্ত আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি।

আর শ্রেণিকৃত ঋণের বড় অংশ যদি শেষ পর্যন্ত মন্দ ঋণে পরিণত হয়, তাহলে সেটি ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে কার্যত আটকে থাকা সম্পদে পরিণত হয়।

মন্দ ও ক্ষতিতে প্রায় পুরো খেলাপি ঋণ

জুন ২০২৬-এর তথ্য আরো উদ্বেগজনক। শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে মন্দ ও তিজনক ঋণ প্রায় পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা- অর্থাৎ মোট শ্রেণিকৃত ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ব্যাংকিং খাতের সঙ্কটের বড় অংশ আর কেবল ‘সাময়িক খেলাপি’ নয়। বিপুল অঙ্কের ঋণ এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যেগুলোর আদায় নিয়ে বাস্তব অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এখানেই ব্যাংকিং খাতের তথাকথিত ‘পুনঃতফসিল’ বা ‘পুনর্গঠন’নির্ভর সমাধানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ঋণকে কাগজে নতুন সময়সীমা দিয়ে নিয়মিত দেখানো যায়; কিন্তু ব্যবসা যদি কার্যকর না থাকে, ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ না থাকে অথবা ঋণের অর্থ প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে হিসাবের খাত পরিবর্তন করলেই অর্থ ফেরত আসে না।

প্রভিশন ঘাটতি : দ্বিতীয় বিপদ

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে আরেকটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে প্রভিশন ঘাটতি। জুন ২০২৬ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল প্রায় চার লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা; কিন্তু ব্যাংকগুলো সংরণ করতে পেরেছে প্রায় দুই লাখ ৬১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লাখ ২২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ সম্ভাব্য তির জন্য সুরা তৈরি করার কথা, তার বড় একটি অংশ এখনো সংরতি হয়নি। এই ঘাটতির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী সম্পদের মূল্য এক জিনিস; কিন্তু বাস্তবে সেই সম্পদ থেকে টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না- তা অন্য জিনিস। কোনো ঋণ আদায় না হলে ব্যাংককে শেষ পর্যন্ত সেই তি মূলধন থেকে বহন করতে হয়।

ফলে খেলাপি ঋণ শুধু ‘ঋণ আদায়ের সমস্যা’ নয়; এটি ব্যাংকের মূলধন য়ের সমস্যাও।

মূলধন বাড়িয়ে লাভ কী হলো?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে মূলধন বাড়ানোর ঘটনা কম নয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকনির্ভর ব্যবস্থা থেকে দেশ ধীরে ধীরে বহুমালিকানার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গেছে। ২০০৩ সালে ন্যূনতম মূলধনের সীমা ১০০ কোটি, ২০০৭ সালে ২০০ কোটি এবং ২০১১ সালে ৪০০ কোটি টাকা করা হয়। পরে ২০১৯ সালে ন্যূনতম মূলধন ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক; কিন্তু মূলধনের পরিমাণ বাড়ালেই ব্যাংক নিরাপদ হয় না।

মূলধন হলো তি শোষণের শেষ প্রতিরা। ঋণ অনুমোদনের সময় যদি ঝুঁকি মূল্যায়ন দুর্বল হয়, পরিচালনা পর্ষদ যদি প্রভাবমুক্ত না থাকে, একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঋণ ছড়িয়ে প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করা যায়, অথবা ঋণ আদায়ের েেত্র রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ কাজ করে- তাহলে মূলধন বাড়িয়েও সঙ্কট ঠেকানো যায় না। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ।

ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু মান?

স্বাধীনতার পর দেশের ব্যাংকিং কাঠামো ছিল প্রধানত রাষ্ট্রীয়। পরে একের পর এক বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংক এসেছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঘটেছে। বিদেশী ব্যাংকও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান শ্রেণিবিন্যাসে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক, দেশীয় বেসরকারি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং বিদেশী ব্যাংক- সব মিলিয়ে একটি বড় ও বৈচিত্র্যময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

কিন্তু ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ার সাথে যদি ভালো ঋণগ্রহীতার সংখ্যা, দ ব্যাংকার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা একই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা বরং ঋণমানের অবনতি ঘটাতে পারে।

ব্যাংক তখন আমানত সংগ্রহের জন্য একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে এবং ঋণ বিতরণের েেত্রও চাপ তৈরি হয়। কোনো কোনো েেত্র ভালো ঋণগ্রহীতার পরিবর্তে বড় ঋণগ্রহীতা হয়ে ওঠে ব্যাংকের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।

এখানেই তৈরি হয় একীভূত ঝুঁকি- অল্পসংখ্যক বড় ঋণগ্রহীতার ওপর ব্যাংকের বিপুল অর্থ নির্ভরশীল হয়ে পড়া।

রাষ্ট্রীয় ব্যাংক বনাম বেসরকারি- সমস্যা দুই জায়গাতেই

ব্যাংকিং খাতের সঙ্কটকে শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা কিংবা শুধু বেসরকারি ব্যাংকের অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের েেত্র দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আদায়-দুর্বলতা বড় সমস্যা হিসেবে দেখা গেছে। অন্য দিকে বেসরকারি ব্যাংকের েেত্র মালিকানা-প্রভাব, সম্পর্কিত পকে ঋণ, পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব এবং একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের কেন্দ্রীভবন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসলামী ব্যাংকিংও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর ইসলামী ব্যাংকিং ও আর্থিক পরিসংখ্যান আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচালিত হোক কিংবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতিতে- ঋণের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সম্পদের মান ও আমানতকারীর অর্থ ফেরতের সমতা- এই মৌলিক ঝুঁকিগুলো অভিন্ন।

তারল্য আছে; কিন্তু স্বস্তি নেই

ব্যাংকিং খাতের আরেকটি আপাত-বৈপরীত্য হলো- এক দিকে বিপুল খেলাপি ঋণ, অন্য দিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য তারল্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর প্রধান অর্থনৈতিক সূচক অনুসারে, মে ২০২৬ শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্যসম্পদ ছিল প্রায় ছয় লাখ ছয় হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় ১২ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় তারল্য ছিল প্রায় তিন লাখ ২৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা; ফলে অতিরিক্ত তারল্য ছিল প্রায় তিন লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের হাতে অর্থ আছে- কিন্তু অর্থনীতিতে নিরাপদ ও উৎপাদনশীল ঋণ দেয়ার পরিবেশ দুর্বল।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত। কারণ ব্যাংকের কাজ শুধু টাকা জমিয়ে রাখা নয়; সুশৃঙ্খলভাবে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করা। কিন্তু খেলাপি ঋণের পাহাড়ের কারণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হলে অর্থনীতি ঋণসঙ্কটে পড়ে। আর ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঋণ দিলে ব্যাংক নিজেই তিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাত এখন ‘তারল্য আছে; কিন্তু নিরাপদ ঋণের ক্ষুধা কম’- এই অস্বাভাবিক অবস্থার মুখোমুখি।

তথ্যের অভাব নয়, প্রয়োগের ঘাটতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলি ব্যাংকের পরিসংখ্যান-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিা এখানেই। ১৯৭৪ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে। কৃষিঋণ, শিল্পঋণ, এসএমই, আমানত, সুদের হার, ঋণ বিতরণ, আদায় ও বকেয়া- সবকিছুর তথ্য পাওয়া যায়। সময়ের সাথে প্রকাশনার কাঠামোও উন্নত হয়েছে। বর্তমানে এসব তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই বলছে, প্রকাশিত তফসিলি ব্যাংকের পরিসংখ্যান এবং সাপ্তাহিক ব্যাংকিং অবস্থানের তথ্যের মধ্যে সময় ও কাভারেজের পার্থক্যের কারণে কিছু অমিল থাকতে পারে।

তবু মূল প্রশ্ন থেকে যায়- তথ্য সংগ্রহের পর কী হয়েছে? কোনো ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রবণতা দেখা গেলে আগেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি? একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের কাছে ঋণ অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হলে তা থামানো হয়েছে কি? একই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঋণের ঘুরপাক শনাক্ত হয়েছে কি? ঋণ দেয়ার আগে নগদ প্রবাহ, প্রকৃত ব্যবসা ও পরিশোধ সমতা যাচাই করা হয়েছে কি এবং সবচেয়ে বড় কথা- প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতার ঋণখেলাপি হওয়ার পর সাধারণ ঋণগ্রহীতার মতোই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি?

অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত

ব্যাংকের খেলাপি ঋণের খেসারত শেষ পর্যন্ত শুধু ব্যাংক দেয় না। দেয় পুরো অর্থনীতি। ব্যাংককে মূলধন জোগাতে হলে সরকারকে অর্থ দিতে হতে পারে। সরকারকে অর্থ দিতে হলে জনগণের করের অর্থ অথবা সরকারি ঋণ ব্যবহার করতে হয়। আবার ব্যাংক তি পুষিয়ে নিতে ঋণের সুদ বাড়ালে ভালো উদ্যোক্তাও তিগ্রস্ত হন। এর ফলে বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান কমে, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পরো চাপ তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো- ভালো ঋণগ্রহীতাকে অপোকৃত বেশি সুদ দিতে হয়, কারণ খারাপ ঋণের তি ব্যাংককে কোথাও না কোথাও পুষিয়ে নিতে হয়। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত ভালো গ্রাহক, আমানতকারী, করদাতা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

সংস্কার এখন ‘ব্যাংক রা’ নয়, ‘আমানতকারী রা’র প্রশ্ন

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কেবল দুর্বল ব্যাংককে তারল্য দেয়া, পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া কিংবা মূলধন বাড়ানোর মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত- প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদের মান নির্ধারণ। কোন ঋণ বাস্তবে ফেরত আসতে পারে, কোনটি পুনর্গঠনযোগ্য এবং কোনটি কার্যত মন্দ- এটি স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বড় ঋণগ্রহীতাদের পূর্ণাঙ্গ এক্সপ্রোজার ম্যাপ তৈরি করতে হবে। একই ব্যক্তি বা গ্রুপের সাথে প্রত্য ও পরো সব ঋণ একত্রে বিবেচনা না করলে প্রকৃত ঝুঁকি ধরা পড়বে না।

তৃতীয়ত, প্রভিশন ঘাটতি ধাপে ধাপে পূরণ করতে হবে। কারণ তি লুকিয়ে রেখে ব্যাংককে কাগজে লাভজনক দেখানো দীর্ঘমেয়াদে আরো বড় সঙ্কট তৈরি করবে।

চতুর্থত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ অনুমোদনের সাথে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের দায় নির্ধারণ না করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঋণ বিতরণ বন্ধ হবে না।

পঞ্চমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকা বিপুল তথ্যকে শুধু ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন তৈরির কাজে নয়, অগ্রিম সতর্ক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।