কথায় চিঁড়ে ভিজলে পানির দরকার হতো না

সাধ ও সাধ্য বুঝে কথা দিলে রাখা যায়। যতটুকু সাধ্যের বাইরে ততটুকু কথা না দেয়াই ভালো। ক্লিটন সাধ্যের বাইরে গিয়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাখতে পারেননি। তবে একটা কথা ঠিক, সাধ বা সদিচ্ছা থাকলে সাধ্যও বেড়ে যায়।

ধনুকের তীর আর মুখের কথা— ছুটে গেলে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। ধনুক থেকে তীর ছোড়া হলে, সেটি ঝোপঝাড়ে আটকে থেমে যেতে পারে; কিন্তু মুখের কথা সরাসরি বিঁধে যায় ইতিহাসের পাতায়। কখনো নিজের কথা নিজের দিকে ফিরে আসে। বেশি কথা বললে এই সমস্যা হয়। কখন কী বলা হচ্ছে, খেয়াল থাকে না।

মানুষের মস্তিস্কে একধরনের ছাঁকনি থাকে, বোধ-বিবেচনার ছাঁকনি। টানা কথা বলে যেতে থাকলে সেই ছাঁকনি কার্যকারিতা হারায়। তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অশালীন-অগ্রহণযোগ্য কথা বের হয়ে আসে। তিনি তো পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশের প্রেসিডিন্ট; কিন্তু তার কথা শুনলে সেটি মনে হয় না।

ইরানের সাথে লাগতে গিয়ে গোটা আমেরিকাকে বেকুব বানিয়ে ছেড়েছেন ট্রাম্প। যুদ্ধে স্পষ্টত হেরে যাওয়ার পরও কথা বলা বন্ধ হয়নি তার। কথা শুনে বিশ্ববাসী হাসাহাসি করে। তাতে ট্রাম্পের কিছু যায় আসে না। তিনি অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে হালকা করে দিচ্ছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রর নাম শুনলে আগের মতো ‘সমীহ’ জাগে না। দেশটির প্রেসিডেন্টকে একজন কৌতুক অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পেছনের কারণ ট্রাম্পের আজগুবি সিদ্ধান্ত আর অতিকথন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন।

সিংহাসনে যখন কোনো ক্লাউন বসা থাকে, তখন রাজার প্রাসাদটিকে সার্কাসের তাঁবুর মতো মনে হয়। গত কয়েক বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সার্কাসের তাঁবু বানিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। এই তাঁবু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সাথে একেবারে মানায় না। গত দুই শ’ বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে যাদের সেরা হিসেবে ধরা হয়, তাদের একজন বিল ক্লিনটন। নব্বইয়ের দশকে ক্ষমতায় আসেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি ছিল অর্থনীতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার। সেই সাথে কর্মসংস্থান তৈরির। তিনি সেসব প্রতিশ্রুতি রাখার চেষ্টা করেছেন। দুই মেয়াদের শাসনে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। এটা ছিল মার্কিন ইতিহাসে অভূতপূর্ব রেকর্ড। এক ধাক্কায় বেকারত্বের হার নেমে এসেছিল ৪ শতাংশে। তার সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পদক্ষেপে অপনোদন হয়েছিল ফেডারেল বাজেটের বিশাল ঘাটতি। মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উদ্বৃত্ত বাজেটের দেখা মিলেছিল। এই ক্লিনটনও রাজনীতির তরী পার হতে গিয়ে সাধ্যের বাইরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সব নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী খরচে স্বাস্থ্যসেবা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার দেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই কথা রাখতে পারেননি। এই বিলটি কংগ্রেসে বিরোধিতার মুখে পড়েছিল।

সাধ ও সাধ্য বুঝে কথা দিলে রাখা যায়। যতটুকু সাধ্যের বাইরে ততটুকু কথা না দেয়াই ভালো। ক্লিটন সাধ্যের বাইরে গিয়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। রাখতে পারেননি। তবে একটা কথা ঠিক, সাধ বা সদিচ্ছা থাকলে সাধ্যও বেড়ে যায়।

কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো কথা দিয়েছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করবেন তিনি। বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনবেন। ২০৫০ সালের মধ্যে আক্ষরিক অর্থে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবেন। এর জন্য নানারকম চেষ্টা-তদবির করে গেছেন ট্রুডো। গাছ লাগিয়েছেন। পরিবেশের জন্য আরো যা যা করা দরকার, সাধ্যের মধ্যে থেকে অনেক কিছু করেছেন। শিল্প কারখানার কার্বন নিঃসরণও কমিয়ে এনেছিলেন; কিন্তু শেষপর্যন্ত সফল হতে পারেননি। এতে পরিবেশবাদীরা সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন; কিন্তু পরিবেশের জন্য ট্রুডো যে আন্তরিকভাবে কাজ করেছিলেন, সেটি তারা অস্বীকার করতে পারেন না।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার এত দায় ছিল না ট্রুডোর। সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কানাডার ১৮৬৭ সালের যে মূল সংবিধান, সেখানে ‘পরিবেশ’ বা ‘জলবায়ু পরিবর্তন’সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা, উপধারা বা আইনি বাধ্যবাধকতার নাম বা নিশানাও নেই। তারপরও ট্রুডো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তবে আন্তরিকতার কমতি ছিল না। নিজের দেয়া কথার মূল্য রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।

কানাডার সংবিধানে যা নেই, আমাদের সংবিধানে সেটি আছে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে, অনুচ্ছেদ ১৮ক-তে বলা হয়েছে— বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়, তারা কি এই বাধ্যবাধকতার কথা মনে রাখেন? নির্বাচনের আগে তাদের জিজ্ঞেস করা হলে কথার ফুল ছিটিয়ে দেন। আমরা কাজের চেয়ে কথা বেশি বলি। যে গ্রামে নদী নেই, সেই গ্রামেও সেতু বানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। ভোট শেষ হয়ে গেলে সেতুর কথা ভুলে যান, সেই গ্রামের উন্নয়নের কথাও মনে থাকে না। সব উন্নয়ন চলে যায় সংসদে! সেখানে উন্নয়নের গান বাজে, বাজনা বাজে। বাজনা শুনে ওয়াক-আউট করে বিরোধী দল। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবেন বলে ঘোষণা দেন বিরোধী দলের এমপিরা। তারপর কি ঠিকঠাকমতো রাজপথে থাকতে পারেন? এখানেও কথার বরখেলাপ হয়। অর্থাৎ সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই কথা বলতে পছন্দ করেন, রাখতে না। শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রী-এমপিরা কথা বলতেন। কখন কী কথা বলতেন, হুঁশ থাকত না। একে, তাকে রাজাকার বলতে বলতে জেনারেশন জিকেও রাজাকার বলে বসলেন। এতে দেশ ছেড়ে পালাতে হলো শেখ হাসিনাকে।

তারপর দেশ অনেকটা বদলে গেছে। নতুন সংসদ বসেছে। সরকারি দল-বিরোধী দলের সদস্যরা নিয়ম করে সংসদে যাচ্ছেন। আলোচনা করছেন। যুক্তি দেখাচ্ছেন, পাল্টা যুক্তি হচ্ছে; কিন্তু জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতির অনেক কিছু ভুলতে বসেছেন। সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল জুলাই সনদের; কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি রাখা হলো না। বাংলাদেশ আটকে থাকল পুরনো গোলোক ধাঁধায়। ধাঁধা কেটে বের হওয়া গেল না। এর মানে এই দেশের রাজনীতিবিদরা কাজ না করে কেবল কথাই বলে যাবেন। তাদের কথায় যদি চিঁড়ে ভিজত, তাহলে আর পানির দরকার হতো না। দেশ এখন পানি সঙ্কটে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]