ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। চোখ বাঁধার কালো কাপড়ের আড়াল কাটিয়ে এক চিলতে অনিশ্চিত আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন পাঁচ যুবক। কিন্তু দীর্ঘ বন্দীজীবনের বিভীষিকা কাটিয়ে সেদিন তাদের ভাগ্যে মুক্ত বাতাস জোটেনি; বরং তারা উঠে এসেছিলেন এক সাজানো নাটকের মূল মঞ্চে; যেখানে ল্যাপটপের কৃত্রিম ধোঁয়া আর অস্ত্রশস্ত্রের স্তূপ দিয়ে রাতারাতি লিখে দেয়া হয়েছিল তাদের ‘জঙ্গি’ পরিচয়ের চিত্রনাট্য।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দেয়া এক চাঞ্চল্যকর লিখিত জবানবন্দীতে তৎকালীন ছাত্রদল নেতা ও গুমের শিকার ভুক্তভোগী নুরে আলম তুলে ধরেছেন ডিজিএফআই ও র্যাবের সমন্বয়ে কীভাবে পরিচালনা করা হতো এসব ভুয়া ও সাজানো অপারেশন।
জবানবন্দী অনুসারে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ তৎকালীন শীর্ষ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ছকেই স্বাধীন মতপ্রকাশকারীদের বলপূর্বক গুম ও পরবর্তীতে ‘সফল অভিযান’ দেখিয়ে আদালত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হতো।
জবানবন্দী থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল মধ্যরাতে নীলফামারীর আরাজি কানিয়াল খাতায় নিজ বাসা থেকে নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের ছাত্র ও শাখা ছাত্রদলের সভাপতি নুরে আলমকে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের গোপন বন্দীশালা ‘আয়নাঘর’ বা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) এবং পরবর্তীতে টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) দীর্ঘ আট মাস পুরোপুরি গুম করে রাখা হয়।
জবানবন্দীতে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, গোপন সেলে থাকাকালীন মাইকে মৃত্যুর সংবাদের ‘পূর্ব কাফরুল নিবাসী’ কথাটি শুনে এবং বিমান ও ট্রেনের শব্দ শুনে তিনি বুঝতে পারেন তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই কোথাও রাখা হয়েছে। দেয়ালের গায়ে আঁকা দাগ আর ‘হে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করো’ বা ‘আল্লাহ জালিমদের সাহায্য করেন না’ এমন আকুতি দেখে তিনি অন্য বন্দীদের উপস্থিতি টের পান।
সেখানে সিলিংয়ের আংটার সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে বেধড়ক পিটানো, সারা দিনে মাত্র দুইবার সর্বোচ্চ দুই মিনিটের জন্য বাথরুমে যেতে দেয়া এবং দু’হাতে দরজার শিকের বাইরে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে সোজা হয়ে ঘুমাতে না দিয়ে কয়েকমাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। মূলত ফেসবুকে শেখ হাসিনা সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করা এবং বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকাই ছিল এই বর্বরতার কারণ।
ভুক্তভোগী গুম থাকা অবস্থায় বাইরে তার বিধবা মা নীলফামারী সদর থানায় জিডি ও পরবর্তীতে কোর্টে অপহরণ মামলা করেন। তিনি জেলা প্রশাসক ও অধ্যক্ষ বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং সংবাদ সম্মেলন করে সন্তানকে ফেরত পেতে আকুতি জানান। নুরে আলমের মুক্তির দাবিতে নীলফামারী চৌরঙ্গীর মোড়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করলে পুলিশ হামলা চালায় এবং কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী নূরকে তুলে নিয়ে যায়।
জবানবন্দী অনুসারে, পর্যায়ক্রমে তাকে হাত-চোখ বেঁধে স্থানান্তরিত করা হয় র্যাব-৪ এবং এরপর র্যাব-১০ এর অত্যন্ত সংকীর্ণ সেলে। সেখানে কয়েক মাস বন্দী রাখার পর ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ভোরে নুরে আলমসহ ভুক্তভোগী সামি, আবুজর গিফারী, নাজিম উদ্দিন ও তাজুল ইসলামকে আলাদা দু’টি গাড়িতে করে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়। চট্টগ্রাম শহরতলির একটি ভবনের দোতলায় পাঁচ বন্দীকে বসিয়ে রেখে বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনি আটকে দেয় র্যাবের তল্লাশি টিম। এরপর শুরু হয় সাজানো নাটকের দৃশ্যধারণ। ঘরের ভেতর অবস্থানরত র্যাবের অভ্যন্তরীণ দলটি মেঝেতে একটি পুরনো ল্যাপটপে আগুন ধরিয়ে কৃত্রিম ধোঁয়ার সৃষ্টি করে। পাশের ভবনের ছাদ থেকে কোনো সাংবাদিক যাতে ভেতরের চিত্র ভিডিও করতে না পারেন, সেজন্য র্যাব সদস্যরা মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে জানালাগুলো বন্ধ করে দেয়।
একই সময়ে ভবনের বাইরে র্যাবের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে টহল দিতে থাকে এবং হ্যান্ডমাইকে ভেতরে থাকা কথিত ‘জঙ্গিদের’ আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। ভেতর থেকে র্যাব সদস্যদের সঙ্কেত পাওয়ার পর বাইরের টিম দরজায় প্রচণ্ড শব্দে আঘাত করে দরজা ভাঙার অভিনয় সম্পন্ন করে। দীর্ঘ তিন থেকে চার ঘণ্টার এই কৃত্রিম নাটক শেষে সেখানে হাজির হন চট্টগ্রাম র্যাব-৭-এর তৎকালীন অধিনায়ক কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি ঘরে ঢুকে বন্দীদের চোখের বাঁধন খোলার নির্দেশ দেন এবং আগে থেকে সেখানে নিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পিস্তল, গোলাবারুদ, বলবেয়ারিং, পেরেক, তার ও নিষিদ্ধ বই মেঝেতে সাজাতে বলেন। তৎকালীন র্যাব অধিনায়ক নির্দেশ দেন এসব মালামাল যেন এমনভাবে গুছিয়ে নিচে উপস্থাপন করা হয়, যাতে গণমাধ্যম ও বাইরের সাধারণ মানুষের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ না থাকে।
অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযান শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে তাদের র্যাব-৭ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে আকবর শাহ থানায় তাদের বিরুদ্ধে দু’টি মিথ্যা অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। রিমান্ড চলাকালে র্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তা এএসপি রুহুল আমিন ভুক্তভোগীর কাছে স্বীকার করেন যে, তাকে মূলত ডিজিএফআইয়ের নির্দেশেই বাসা থেকে গুম করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সেলে স্থানান্তর ও এই নাটক সাজানো হয়েছিল। দীর্ঘ ১১ মাস বিনাবিচারে কারাভোগের পর অবশেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন নুরে আলম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নুরে আলমের জবানবন্দীর মাধ্যমে এই মামলার সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল বুধবার জবানবন্দী দেয়া গুমের শিকার ভুক্তভোগী নুরে আলমকে জেরা করেন গ্রেফতার তিন আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু, শেখ হাসিনার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো: আমির হোসেন, এম হাসান ইমাম ও সুজাত মিয়া।
প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম, শাইখ মাহদী, তাসমিরুল ইসলাম, জহিরুল আমিনসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
মামলার আসামি ১৩ জনের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ১০ জন আসামি পলাতক রয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভুক্তভোগী নুরে আলমের জবানবন্দী গ্রহণ ও আসামিপক্ষের জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৩১ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন।



