স্ববিরোধিতায় সমর্পিত

আগে তহশিল অফিসে নথি দলিল পরচা খতিয়ান একটা কঠোর নিয়ম মেনে মেইনটেইন করা হতো। এখন ভূমি প্রশাসনে বড় কর্তার সংখ্যা যত বাড়ছে, দলিল দস্তাবেশ সংরক্ষণ ও রেজিস্ট্রি, নামজারির পদ্ধতি যত ডিজিটালের পথে আছে; তত ম্যানুয়াল ফন্দিফিকির শুরু হয়েছে।

খলিলপুরের খগেন ব্যানার্জিদের আট ভাই ও পাঁচ বোনের সংসারে সমস্যার যেন শেষ নেই। একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে। বাড়ির বড় কর্তা খগেন বাবু আর তার স্ত্রী সুশীলা দেবী সংসারের হাল ধরে আছেন না বলে সবাই বলাবলি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে নানান ফন্দিফিকির এঁটে চলেছেন। বোনদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের ঘরে সন্তানসন্ততির সংখ্যা নেহাত কম নয়। আর আট ভাই তো যে যার মতো বড় করছে তাদের এখতিয়ার ও তালুক। বড় সমস্যা ব্যানার্জিদের চার পাশের প্রতিবেশীদের সাথে এই পরিবারের শরিকদের সম্পর্ক সবসময় সমান সখ্যতায় থাকে না। তাদের কারণে ব্যানার্জিদের জমিজমার ভাগাভাগি, পশুপাখি, জলাধার, ধন দৌলতের, ধান-চালের শরিকানা দেয়া নেয়া নিয়ে, সংসারের কেন্দ্রীয় আয় উপার্জনের হিসাব কিতাব নিয়ে বাকি সাত ভাই ও পাঁচ বোন পেরে ওঠে না। খগেন ব্যানার্জিকে ঘরে বাইরের সবাই বড় কর্তা বলে মানে, আর বড় বৌঠানের প্রতি সবার সম্মান সমীহ সেই তার এ সংসারের আসার দিন থেকে অর্থাৎ ব্যানার্জি বাড়ির বড় বৌ হিসেবে তাকে সবাই ভয় ও প্রেমে অনুকরণীয় বলে মনে করে। কেননা সুশীলা যখন নববধূ হিসেবে এ বাড়ির চৌকাঠ মাড়ায়, সেই থেকে, তার মধ্যে ঠাকুরপো ঠাকুরঝিদের প্রতি টান যেন বেশিই ছিল। সবাই তাকে সে মর্মে মর্যাদার আসনে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল; কিন্তু এখন সেই বৌ ঠাকুরান তাদের কাছে মায়া মমতাহীন কর্তৃত্ববাদী বলে মনে হয়।

ব্যানার্জিদের স্থাবর অস্থাবর সহায় সম্পত্তিতে ভাগ বাটোয়ারায় প্যাঁচ লেগে গেছে। আগেকার জমানায় নায়েব বরকন্দাজদের যেভাবে ম্যানেজ করা যেত; এখন সেভাবে তাদের সে অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে না। আগে তহশিল অফিসে নথি দলিল পরচা খতিয়ান একটা কঠোর নিয়ম মেনে মেইনটেইন করা হতো। এখন ভূমি প্রশাসনে বড় কর্তার সংখ্যা যত বাড়ছে, দলিল দস্তাবেশ সংরক্ষণ ও রেজিস্ট্রি, নামজারির পদ্ধতি যত ডিজিটালের পথে আছে; তত ম্যানুয়াল ফন্দিফিকির শুরু হয়েছে। বড় কথা দলিল দস্তাবেজে রেকর্ডপত্র যথাস্থানে থাকছে না। একজনের জমি নানাজনের নামে খতিয়ান খুলে দেয়া হচ্ছে। সূত্র বা ধারাবাহিকতা ঠিক রাখার বালাই নেই, সিএস, আরএস, বিএস, জরিপ নামীয় গোত্র গুষ্ঠীভুক্ত করতে গিয়ে, শ্রেণী পরিবর্তনের নামে ঘাটকে আঘাট করা হচ্ছে, সাইলকে সিকস্তী, সিকস্তীকে জলাবন্দী সাব্যস্ত করা চলছে হরহামেশা। আর এর ফলে সাধারণ রায়ত পড়ছে নানান বিপাকে, ভূমিদস্যুরা সে সুযোগে জমি দখল বেদখল করেই চলছে। ভূমিহীনদের খাসজমি বাড়িঘর পাইয়ে দিতে গিয়ে ভূমি কর্তাদের নীলচাষি জমিদারি মনোভাব দেখার মতো। রানীমাতার নামে আরো জমি চাই। আরো ঘর বর ও বাড়ি দেয়া চাই। পক্ষ বিপক্ষের কাছ থেকে টাকা হাতানোর এই স্বাধীন ও অবাধ সুযোগ হাতছাড়া করতে কেউ চায় না।

মানিকখালীর হরেন মণ্ডলের এক দাগে পাঁচ বিঘা জমি ছিল শোরা মৌজায়। এসএ খতিয়ান থেকে আরএস খতিয়ানে তোলার সময় তার পাঁচ শরিকের নাম সেখানে ঢুকে পড়ে। হালে বিএস খতিয়ান ও জরিপকালে পাঁচ বিঘার জমি রেকর্ড হয়েছে মোট বারোজনের নামে। কার কোন অংশ তার চৌহদ্দি বণ্টননামা খতিয়ানে নির্দিষ্ট করা যায়নি। এখন এই ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের কাছ থেকে রমজান নগরের নরিম শেখ সাড়ে চার বিঘা জমি লিখে নেয়। বাকি আধা বিঘা জমি নেয় হরিনগরের নগেন মাঝি। এখন বাকি শরিকদের একজন সুরেন মণ্ডলের থেকে একই দাগে ষোলো শতক জমি কিনতে চায় বংশীপুরের শশিভূষণ কাপালী। চতুর এবং চালাক নায়েব পয়সা খেয়ে যাকে তাকে জমির হালনাগাদ খাজনা রসিদ কেটে দিয়েছে। বারো শরিকের এক শরিক পরানপুরের পরিমল কয়েক শতক জমি বিক্রি করার সময় মামলাবাজ মনসুর মাদবর ফারাজ অংশ হারাহারি সবকিছু মেলাতে গিয়ে দেখে, জোতে আসলে জমি নেই। এখন নামজারির মোকদ্দমা (মিস আপিল কেস) আপত্তি দেয়া লাগবে একজনের জমি আরেকজন কিভাবে লিখে দেয়।

খগেন সুশীলাদের বড় মেয়ে নবনীতা বিষয়টা একটু বড় পরিসরে ভাবতে বা দেখতে চায়। নবনীতা আইন ও সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। ব্যানার্জি পরিবারের সম্পদ ও সৌভাগ্য বণ্টন প্রক্রিয়াকে সে একটি গোটা পরগনার সৌভাগ্যকে প্রতিপক্ষের কাছে নানা ফন্দিফিকিরে বিলিবণ্টন বন্দোবস্ত দেয়ার শামিল বলে উচ্চকণ্ঠ হতে চায়। তবে তার এই উচ্চারণ যেন পারিবারিক নিবর্তনমূলক কোনো আচারবিচার নীতিনিয়মের পরিপন্থী বা সাংঘর্ষিক না হয়; সে ব্যাপারে তাকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। এত কড়াকড়ির মধ্যে ন্যায় ন্যায্যতার সপক্ষে স্বাধীন চিন্তা বা মুক্তবুদ্ধি বিবেক কিভাবে বিকাশ লাভ করবে- নবনীতা ভেবে কূল পায় না।

ব্যানার্জিদের চার পাশে এক বা একাধিক শক্তিশালী প্রতিবেশী পরিবার। তারা খগেনদের দুর্বল করতে নিত্য নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলেছে। ভেতরের শরিকদের ক্ষোভ যন্ত্রণা যত বেড়ে ওঠে খগেন তত শক্তিশালী প্রতিবেশী পরান সরকারের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ও স্বার্থ নিজেদের ভাইবোনের দিকে না তাকিয়ে সে একসময় চরম শত্রু ও প্রতিপক্ষ পরান বাবুকে আজ একটু কাল একটু করে দেয়। ব্যানার্জিদের দক্ষিণ সীমানা উন্মুক্ত , বিশাল বনরাজি। এ বনের অংশ ব্যানার্জিদের ভাগে বেশি আর পরান এর অংশেও কিছু আছে। পরানের বনের অংশে ক্ষতিকর কিছু না করে ব্যানার্জিদের বন উজাড় করার এক ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ে দুই পরিবার। ভেতর থেকে সমস্যা যত গজায় পরাণের সাথে দরকষাকষির শর্ত তত শিথিল হয়ে পড়ে, খগেন পরানের পুতুলে পরিণত হয়। ব্যানার্জিদের পরিবারের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব যত জিইয়ে থাকে পরান বাবুদের তত পোয়াবারো। পরাণ বাবুর কূটবুদ্ধিও শিস্যরা ভিতরে ভিতরে খগেনের প্রতিপক্ষকে অনুকম্পা দেখানোর নাম করে তাদের আরো মারমুখি হতে উৎসাহিত করে। একদিকে বিরোধীদের সহায়তার নাম করে। আবার অন্যদিকে খগেনকে সাহস জোগায়। দু’টি ক্ষেত্রে পরাণের দখল দারিত্বের ইচ্ছা বেগবান হয়। তবে এ দখল দারিত্ব এখন ভৌতিক নয় , ভুরাজনীতির।

যৌথ সংসারের সবার মতামত না নিয়ে, আদৌ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো কাজে আসবে কিনা, তার অগ্রপশ্চাত না ভেবে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে খগেন পরিবারের লাঠিয়াল সর্দার বা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের কেনাকাটার দায়িত্ব দিলো। এ কাজে কাগজ কলম ঠিক করে যারা দিল তাদের হাতে রাখতে বড় বড় পদবিতে এনাম দিয়ে দিলো খগেন-সুশীলারা। এক ঢিলে দুই পাখি মারার এই বুদ্ধিটা সে নিয়েছে পাশের বাড়ির পক্বকেশ পণ্ডিতের কাছ থেকে। পাশের বাড়ির লোকেরা সবসময় চেয়েছে খগেনের সংসার তাদের অনুগত থাকুক। কেননা খগেনের সংসারে আগুন জ্বললে তার আঁচ তাদের ঘরে লাগতে পারে। গ্রাম্য রাজনীতি এমনই মজাদার যে, শত্রু মিত্র হতে আর মিত্র শত্রুতে ভোল পাল্টাতে সময় লাগে না। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গের কৌশল সেখানে প্রায়শ প্রয়োগ হয়। খগেন সংসারের সব সম্পদ সুযোগ সুবিধা নামে বেনামে পরিবারের চরম শত্রুদের এমনভাবে দিচ্ছে যে, একসময় দেখা যাবে; তাদের জোতে ভোগ বা বিক্রি করার মতো আর কোনো জমি অবশিষ্ট নেই। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার মতলব নিয়ে সে গোটা সংসার বা পরিবারকে ফতুর করে ফেলছে। পরশ্রী কাতর প্রতিবেশীদের দাবার ঘুঁটি হয়ে খগেন সুশীলাগংরা তাদের জন্য স্বস্তির কিছুই রেখে যায়নি। খগেন এবং তার সাগরেদরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে হয়তো বাঁচবে। কিন্তু যারা ভেতরে থাকবে সেই ব্যানার্জিদের বনেদি পরিবারের দুঃখ দুর্দশা বেড়ে যাবে। যেমনটি তারা ঠাকুদাদের আমলে ছিল। সময়ের অবসরে অনেক স্রোত গড়িয়েছে তাদের খোলপেটুয়া-মাউন্দো নদীতে।

খগেনদের বাড়ির দু’পাশে পড়শি পরান সরকারের কিছু জমি আছে। এধারের জমি থেকে ওধারের জমিতে যাওয়ার বাধা ব্যানার্জিদের ঘরবাড়ি পথঘাট। একবার দু’পরিবারের মধ্যে দারুণ হাঙ্গামা বাধে দু’ধারের জমিতে যাওয়া আসা নিয়ে। পরান সরকারের ভয়— খগেনরা কখন তার পূর্বের জমি জবরদখল নিয়ে নেয়। অদল-বদল করে নেয়ার প্রস্তাব মাঝে মাঝে দু’দিক থেকে ওঠে; কিন্তু কৌশলগত কারণে তা বাস্তবায়নের মুখ তো দেখে না বরং এ রেষারেষি মাঝে মাঝে বেকায়দা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটায়। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে । লাঠিয়াল বাহিনী দু’পক্ষের আছে। তারা তেড়ে আসে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে। দু-একটা খুনোখুনিও হয়েছে এর মধ্যে। এ ধরনের প্রায়শ পরিস্থিতিতে নিজের কর্তৃত্ব ঠিক রাখতে, ভাই বোনদের অন্ধকারে রেখে খগেন পরান সরকারের সাথে দহরম মহরম বাড়িয়ে দেয়। পরান সরকারের জমিজমা লোকবল বেশি। খগেনকে কাবু বা করায়ত্ত করতে পারলে তার বাড়ির ওপর দিয়ে পশ্চিমের জমিতে যাওয়া আসা কোনো ব্যাপার নয়। খগেনের আপন শরিকরা পরান সরকারের এ আচরণকে ভালো চোখে দেখে না। তারা পরান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নেয়। খগেনের এতে পোয়াবারো। সে পরান সরকারকে খেপিয়ে তোলে তার পরিবারের অপরাপর সদস্যদের বিরুদ্ধে। খগেনের জ্ঞাতি গোষ্ঠীর ওজর আপত্তি পরান সরকার তাদের পথে বসাবার মতলবে তার সাথে হাত মিলিয়েছে। খগেন তাদের বাড়ির আঙিনা দিয়ে পরান সরকারের লোকলস্কর জিনিসপত্তর পরিবহনের সুযোগ দিচ্ছে বা নিচ্ছে। কিন্তু ব্যানার্জি পরিবারের খাল বিলে পানি পাওয়ার পথ আটকিয়ে দিয়েছে। আর ব্যানার্জিদের পক্ষে খগেন পরান বাবুর সাথে এ ধরনের আঁতাত করায় অন্যান্য শরিকরা পঞ্চায়েতে আর বিচার দিতে পারে না। পানির ভাগ চাইতে পারে না। সবাই এখন মনে করে, খগেন বাবু তার সব দিয়ে খুয়ে নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য দেউলিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক