২০১০ সালে যখন বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশিক্ষিত কোনো বাংলাদেশী আইনজীবী ছিলেন না। সেটিই স্বাভাবিক, কারণ এর আগে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অধীনে কোনো বিচারকার্য পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না। মূলত জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিওয়াই) প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। যদিও বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক বা অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে এই আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পড়াশোনা হতো; কিন্তু বাস্তবে বিশেষায়িত এই আইনে আদালত কক্ষে মামলা লড়ার মতো ব্যবহারিক বা বিচারিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কোনো আইনজীবীর ছিল না।
ঠিক এই কারণে শুরু থেকে এই বিচারপ্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানে পরিচালনার লক্ষ্যে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হতে থাকে। এমনকি প্রথম ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও আগে, ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তৎকালীন কান্ট্রি অফিসের প্রধান রেনতা লোক-দেসালিয়েন বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের কয়েকজন খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞের নাম সুপারিশ করেছিলেন। তা ছাড়া যুদ্ধাপরাধ বিষয়ের জন্য নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিফেন জে. র্যাপ বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি দেশীয় আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সংশোধনের অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি সিয়েরা লিওনের বিশেষ আদালতের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি ডেসমন্ড ডি সিলভা কিউসি-কে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালকে সহায়তা করতে অনুরোধ করেছিলেন। ডি সিলভার স্পষ্ট মত ছিল, দেশের ভবিষ্যতের স্বার্থে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা উচিত। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি এ বিচারপ্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তার মনে হয়েছিল এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ‘নো পিস উইদাউট জাস্টিস’ নামের সংস্থায় লেখা এক নিবন্ধে ডি সিলভা কিউসি তার সেই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এসব প্রস্তাবের একটিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেনি; বরং ট্রাইব্যুনালের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি মো: নিজামুল হক (নাসিম)-এর নিয়োগই স্পষ্ট করে দেয়, সরকার মোটেও চাইছিল না এ ক্ষেত্রে একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার নিশ্চিত হোক। তিনি ছিলেন একজন দ্বিতীয় সারির আইনজীবী, যিনি পরবর্তী সময়ে তৃতীয় সারির বিচারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ‘স্কাইপ কেলেঙ্কারি’ প্রকাশ্যে আসার পর বিচারক হিসেবে তার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ওই কেলেঙ্কারিতে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, রায়ের খসড়া প্রস্তুতে তিনি বেলজিয়ামপ্রবাসী বাংলাদেশী আইনবিদ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দীনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল ছিলেন। দু’জনের মধ্যকার স্কাইপ কথোপকথন থেকে আরো প্রতীয়মান হয়, ড. জিয়াউদ্দীন রায়ের খসড়া পাঠাতে সামান্য বিলম্ব করলেও বিচারপতি নিজামুল হক উদ্বিগ্ন ও অস্থির হয়ে পড়তেন। বিচারপতি নিজামুল হককে চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই যে, জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হলে সরকারের চাহিদা অনুসারে তিনি তাদের দোষী সাব্যস্ত করবেন, এ বিষয়ে সরকারের কোনো সংশয় ছিল না। কারণ অধিকাংশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ ছিল দুর্বল; অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যত অস্তিত্বহীন ছিল, যেমনটি আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় দেখা গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা থাকলে এমন দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডাদেশ নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ত।
অন্য দিকে আসামিপক্ষ শুরু থেকে এ বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততার পক্ষে অবস্থান নেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (কার্যপ্রণালী) বিধিমালা, ২০১০-এর ৪২ নম্বর বিধিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুমোদন সাপেক্ষে বিদেশী আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সেই বিধানের আলোকে ২০১১ সালের ১৭ জুলাই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযুক্তদের পক্ষে লন্ডনের ৯ বেডফোর্ড রো চেম্বারের প্রখ্যাত আইনি বিশেষজ্ঞ স্টিফেন কে কেসি, জন ক্যামেগ কেসি এবং টোবি ক্যাডম্যানকে নিয়োগের অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের কাছে আবেদন করেন; কিন্তু তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাহবুবে আলম সেই আবেদন নাকচ করে দেন। তার যুক্তি ছিল, প্রচলিত আইনের অধীনে বার কাউন্সিল বিদেশী আইনজীবীদের অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। ফলে কার্যত ৪২ নম্বর বিধিটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়; বাস্তবে এর কোনো কার্যকারিতা অবশিষ্ট থাকেনি।
বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে না পারার ব্যর্থতা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারপ্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; বরং ট্রাইব্যুনালের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সুনামকেও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে প্রায় সর্বসম্মত মত হলো— বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল যে বিচারিক নজির ও আইনি ব্যাখ্যা সৃষ্টি করেছে, তা দেশের সীমানার বাইরে আন্তর্জাতিক আইনচর্চায় কার্যত কোনো প্রভাব ফেলবে না। এর প্রধান কারণ, ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রসিকিউটরদের আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন সম্পর্কে সীমিত দক্ষতা এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। দুঃখজনকভাবে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি সরকারও ট্রাইব্যুনাল কিংবা প্রসিকিউশন টিমে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ আমলের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে যে সমালোচনাগুলো উত্থাপিত হয়েছিল, তার অনেকগুলো পরবর্তী সরকারগুলোর আমলেও পরিচালিত বিচারকার্যের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হয়ে আছে।
এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কারণ বাংলাদেশের বিচারক ও প্রসিকিউটররা যদি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসারে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতেন, তবে তারা কেবল দেশের বিচারপ্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করতেন না; আন্তর্জাতিক আইন বিকাশ ও তার কার্যকর প্রয়োগেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতেন। শুধু তাই নয়, নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে জনমত গড়ে তুলে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও তারা আরো কার্যকরভাবে উত্থাপন করতে পারতেন। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার প্রশ্নে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ওপর আগের মতো নির্ভরের সুযোগ আর নেই। ফিলিস্তিনে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়ে পূর্ণ অবগত থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলকে রাজনৈতিক সমর্থন, অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যে এই অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে, তার প্রামাণ্য দলিলও আজ নথিভুক্ত। এমন বাস্তবতায় পশ্চিমা বলয়ের বাইরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে প্রশিক্ষিত আইনজীবীদের সামনে এটি একটি অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ ছিল যেন তারা বিশ্বমঞ্চে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের একনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগে সোচ্চার হতে পারেন। দুঃখের বিষয়— বাংলাদেশের প্রসিকিউটররা সেই বিরল ও মূল্যবান সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেননি।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



