পানির দেশে পানি নেই

আমরা যদি অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা করি, তাহলে কোন এলাকায় কী কারণে পানির সমস্যা হচ্ছে, সেটি বেরিয়ে আসবে। ঢাকায় কেন পানির সঙ্কট হচ্ছে, তার সাথে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্কটের কারণ মিলিয়ে ফেলা ভুল হবে। ঢাকা ও সাতক্ষীরা নিয়ে প্রয়োজন ভিন্ন গবেষণা। সঙ্কট চিহ্নিত করে তারপর সমাধানের দিকে যাওয়া। সেটি না করে, সারা দেশকে এক ছাঁচে ফেলে দেয়া হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে মাটির নিচের পানি তোলা বন্ধ করে নদীগুলো আবার খনন করা দরকার। সেখানে কম পানির শস্য চাষের মডেলও দরকার; কিন্তু দক্ষিণের উপকূলে জোর দিতে হবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ওপর।

কারো যদি সোনার খনি থাকে, আর তিনি যদি ফুটপাথে বসে ভিক্ষা করেন একটি কয়েন পাওয়ার আশায়, তখন তাকে কপালপোড়াই বলা যায়। কারণ সোনার খনি আছে ঠিক; কিন্তু খনি থেকে সোনা তোলার সামর্থ্য নেই তার।

আমাদেরও কপাল পোড়া। নিজেদের কপাল নিজেরাই পুড়িয়েছি। এই নদী-নালা, খাল-বিলের দেশের পরিচয় ছিল ‘পানির দেশ’ হিসেবে; কিন্তু এখন পানির দেশে পানি নেই! সোনার খনির মালিক হয়েও হাত পেতে আছি এক টাকার কয়েনের জন্য!

বাংলাদেশের উত্তর এলাকা পানির অভাবে খাঁ খাঁ করছে। দক্ষিণে মিঠা পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে সাগরের লবণ। মাঝখানের নদীগুলো দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত। কিছু নদী হারিয়ে গেছে। উজান থেকে ভাটিতে পানি আসে না, পানি না এলে নদীর প্রবাহও ঠিক থাকে না।

ভাটির প্রবাহ আটকে দিতে ফারাক্কা আর গজলডোবার মতো বাঁধ দিয়ে রেখেছে উজানের দেশ। পানিকে তারা শাসন করে। অথচ জাতিসঙ্ঘের পানি প্রবাহ আইন বলছে, উজান বা ভাটিÑ কোনো দেশই একতরফাভাবে নদীর গতি পরিবর্তন করতে পারে না; কিন্তু এই আইনের তোয়াক্কা করছে না তারা।

এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষ থেকেও কখনো জোরালো প্রতিবাদ বা কার্যকর কূটনৈতিক গরজ দেখা যায়নি। শেখ হাসিনা রেজিম যখন ছিল, তখন পাশের দেশের জন্য ছিল ‘উদার’ নীতি। তারা পানি দিক বা না দিক, তাদেরকে দেয়ার বেলায় কৃপণতা ছিল না! এসব কারণেই এখনো ঝুলে আছে তিস্তা চুক্তি। ৫৪টি নদীর হিস্যা আদায়ে সফলতা নেই।

গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারাজ বানিয়ে শুকনো মৌসুমে পানির প্রবাহ নিয়ে যাওয়া হয় হুগলি নদীতে। এ দিকে শুকিয়ে কাঠ হয় বাংলাদেশ। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণের লবণাক্ততা চলে আসে নদীতেÑ ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার ভেতরে। আর তিস্তায় গজলডোবা ব্যারাজের কারণে বরেন্দ্র ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে পাওয়া যায় না সেচের পানি।

শুকনো মৌসুমে নিজেদের মতো করে পানি আটকে রাখে উজানের দেশ। আমাদের পাওনা পানি দিয়ে সজীব করে তাদের কৃষি। বর্ষা এলে সেই পানি উপচেপড়ে তাদের দেশে। এতে বন্যার শঙ্কা দেখা দেয়। ঠিক তখনি বাঁধ খুলে দেয়া হয়। বাংলাদেশে নেমে আসে পানির ঢল। এই ঢলে ভেসে যায় বাড়িঘর, ভিটামাটি। মানুষের মৃত্যু হয়। ত্রাণ দেয়ার জন্য রাজনীতিবিদরা ব্যস্ত হন। বন্যার্তদের কাছে ত্রাণ যায়। দুর্গম এলাকায় যারা থাকেন, তাদের অনেকে ত্রাণও পান না।

এই চক্রটা বাংলাদেশের জন্য নিয়মিত, প্রতি বছরের চিত্র। কোনো বছর বন্যা হয় বেশি, কোনো বছর কম। প্রতি বছরই দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকে সরকার। দোষ চাপিয়ে দেয়া হয় প্রকৃতির ওপর; কিন্তু প্রকৃতি কি সত্যিই এত দুর্যোগ তৈরি করছে? নাকি আমরাই এসবের পেছনে দায়ী?

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীগুলোর একসময় ‘প্রাণ’ ছিল। এঁকে-বেঁকে বয়ে যেত প্রাণবন্ত নদী। আর সেই নদীগুলোর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল শহর-নগর- বন্দর। নদী ছিল মানুষের জীবিকার উৎস, যোগাযোগের মাধ্যম। আর ছিল টিকে থাকার শিরা-উপশিরা। এখনো নদী আছে; কিন্তু আগের মতো নেই। কেন? এখনো বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি কেন এলোমেলো ঝরে? একটু বৃষ্টি হলেই ঢল নামে। সেই ঢলের পানি ‘তেড়ে’ যেতে থাকে বঙ্গোপসাগরের দিকে। যেতে যেতে ভাসিয়ে নেয় বসতি।

বন্যায় বসতি কেন ভেসে যায়, সেই কারণটিও আমরা জানি; কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ নেই। বর্ষায় যখন পানি উপচেপড়ে, সেগুলো ধরে রাখার মতো গভীর জলাধার নেই। নদীগুলোর পেট নেই, পলিতে ভরে গেছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ আর বালু নদীতে পানির বদলে প্রবাহিত হয় কটু গন্ধের রাসায়নিক। এগুলো এখন বিষের নালা।

এখন মাটির নিচে খুঁড়েও পানি মেলে না। পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। উপরের লেয়ারের পানি চুষে নিয়েছে সাবমার্সিবল পাম্প আর ডিপটিউবওয়েল। মাটি থেকে যে হারে পানি তোলা হচ্ছে, সে হারে মাটির নিচে গিয়ে পানি জমা হতে পারছে না। দেশের দক্ষিণ এলাকায় সাবমার্সিবল পাম্প থেকে যে পানি ওঠে সেই পানিতেও লবণ। নোনা পানিতে বিপর্যস্ত উপকূলের জীবন। বিরূপ প্রভাব পড়ছে নারীর জরায়ুতে। উপকূলের প্রায় প্রতিটি নারী জরায়ু জটিলতায় ভুগছেন। অনিয়মিত বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাদের। চুলকানি হচ্ছে। দীর্ঘদিনের সংক্রমণে টিকতে না পেরে অনেককে কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে জরায়ু। তা ছাড়া নোনা পানির কারণে উপকূলের মানুষের কিডনি বিকল হওয়ার খবরও আসছে।

পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা এলাকায় লবণাক্ত হচ্ছে চাষের জমি। মিঠা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের সুন্দরী গাছগুলো রোগাক্রান্ত। ধ্বংসের মুখে শ্বাসমূলীয় বন। ধ্বংস হচ্ছে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র। এতে বেকার হচ্ছে জেলেরা। এসব সঙ্কট সমাধানে চার দিকে চোখ কান খোলা রাখার দরকার ছিল।

চোখ ও কান আমাদের খোলাই আছে। সঙ্কট যে ঘন হচ্ছে, সেটিও বুঝতে পারি; কিন্তু মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছি না। কেন পারছি না?

দেখা যায়, পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা থাকেন, নদী রক্ষার দায়িত্ব তাদের নয়। সে দায়িত্ব অন্যদের। দায়িত্ব আলাদা থাকা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। এতে প্রয়োগের বেলায় ভজঘট পেকে যায়। একটা সংস্থা নিজেদের ভালোর জন্য একটি কাজ করে; কিন্তু সেটি অন্য সংস্থার জন্য বিপদ ডেকে আনে। এই জটিলতা শিগগির দূর হবে, এমন আশারও আলো দেখা যাচ্ছে না।

অথচ সমাধানের প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা যায়। পানির অপচয় কমাতে কৃষিতে ঐতিহ্যগত প্লাবন সেচ না দিয়ে ‘ডিপ ইরিগেশন’ বেছে নেয়া যায়। এর মাধ্যমে চিকন পাইপ দিয়ে সরাসরি গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় পানি সরবরাহ করা যায়। ঘরের কাজে ব্যবহার করা কম ময়লা হওয়া পানি শোধন করে আবার ব্যবহার করা যায়।

বর্ষায় গ্রামে গ্রামে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। উপকূলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারলে, লবণাক্ততার সমস্যা কিছুটা হলেও কাটিয়ে তোলা সম্ভব হবে।

আমরা চাইলে নতুন করে নদীদখল বন্ধ করে দিতে পারি। তারপর ধীরে ধীরে দখল হওয়া নদী উদ্ধারের দিকে পা বাড়াতে পারি। এর মাধ্যমে প্রকৃতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না; কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের গতি তো মন্থর করা সম্ভব।

আমরা যদি অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা করি, তাহলে কোন এলাকায় কী কারণে পানির সমস্যা হচ্ছে, সেটি বেরিয়ে আসবে। ঢাকায় কেন পানির সঙ্কট হচ্ছে, তার সাথে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্কটের কারণ মিলিয়ে ফেলা ভুল হবে। ঢাকা ও সাতক্ষীরা নিয়ে প্রয়োজন ভিন্ন গবেষণা। সঙ্কট চিহ্নিত করে তারপর সমাধানের দিকে যাওয়া। সেটি না করে, সারা দেশকে এক ছাঁচে ফেলে দেয়া হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে মাটির নিচের পানি তোলা বন্ধ করে নদীগুলো আবার খনন করা দরকার। সেখানে কম পানির শস্য চাষের মডেলও দরকার; কিন্তু দক্ষিণের উপকূলে জোর দিতে হবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ওপর। আবার শিল্পপ্রধান ও নগর এলাকার জন্য অভ্যস্ত হতে হবে পানির চক্রব্যবহারে।

এই যে পানির চক্রব্যবহার, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা অথবা ডিপ ইরিগেশনের উপায় নিয়ে এখন মাথা ঘামাতে হচ্ছে, এসবের কিছুই করতে হতো না, যদি নদী বাঁচাতে পারতাম। নদী বেঁচে নেই বলেই এখন সোনার খনির মালিক হয়েও আমাদের এখন পথে বসে তাকিয়ে থাকতে হয় এক টাকার কয়েনের দিকে। ভিক্ষুকের মতো এক টাকার কয়েন কুড়িয়ে সাময়িকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করা যায়; কিন্তু সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। সঙ্কট দূর করতে হলে হাত দিতে হবে নিজেদের ‘খনি’তে। আমাদের ভূখণ্ড ও আমাদের নদীগুলোই সেই খনি। কার্যকর ও জোরালো কূটনীতির মাধ্যমে খনি উদ্ধার অসম্ভব নয়।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]