জ্বালানি সঙ্কটে থমকে আছে শিল্প

দেশে গ্যাসসঙ্কট এখন আর শুধু আবাসিক গ্রাহক কিংবা সিএনজি স্টেশনের সমস্যা নয়; এর সরাসরি অভিঘাত পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, রফতানি এবং বিনিয়োগে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, অন্য দিকে শিল্প কারখানাগুলোকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের ঘাটতির প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে উৎপাদক, শ্রমিক, রফতানিকারক এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তারা।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশে গ্যাসসঙ্কট এখন আর শুধু আবাসিক গ্রাহক কিংবা সিএনজি স্টেশনের সমস্যা নয়; এর সরাসরি অভিঘাত পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, রফতানি এবং বিনিয়োগে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, অন্য দিকে শিল্প কারখানাগুলোকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের ঘাটতির প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে উৎপাদক, শ্রমিক, রফতানিকারক এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তারা।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটিতে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ ছিল। সাধারণ সময়ে এই টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতো। ৬ আগস্ট এটি আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছিল। কিন্তু ১৯ আগস্ট আবার এলএনজি মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি বিপুল : বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সাম্প্রতিক সঙ্কটের সময় সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ একপর্যায়ে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। ১১ আগস্ট দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা রাত ১২টার দিকে ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াটে উঠলেও সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট। ফলে সর্বোচ্চ ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। এর আগে রাত ৯টায় চাহিদা ১৮ হাজার ৪৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৩৬ মেগাওয়াট। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমে যায়। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক দু’টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক হিসাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় যেখানে প্রতি ইউনিট প্রায় ৩ টাকা ৪৮ পয়সা, সেখানে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যয় প্রায় ১৮ টাকা ৫৯ পয়সা অর্থাৎ পাঁচ গুণেরও বেশি।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দায়ও পড়ছে ব্যবসায়ীদের ওপর : গ্যাস ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়েছে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করা, বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা বিদ্যুতের চাহিদা কমালেও শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় না। বরং উৎপাদনের সময় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো কঠিন। গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কটে কোথাও ১০-১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। জুলাইয়ের শেষ দিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে ২০-৫০ শতাংশে নেমে আসে বলে শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলো জানিয়েছিল।

ক্যাপটিভ বিদ্যুৎও এখন অনিশ্চিত : বাংলাদেশের শিল্প খাতের বড় একটি অংশ জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান জ্বালানি গ্যাস। ফলে গ্যাসের চাপ কমে গেলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ থাকলেও কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে শিল্পে মাসিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ৪৩৩ কোটি ঘনফুট; ২০২৫ সালে তা কমে হয় প্রায় ৩৭৪ কোটি ঘনফুট। একই সময়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাসিক সরবরাহ প্রায় ৪৬৭ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৩৯৯ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প ও ক্যাপটিভ খাতে সরবরাহ আরো কমেছে বলে তিতাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ অবস্থায় শিল্পকারখানাকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ প্রতি লিটার ডিজেলের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত খরচ করার কথা জানিয়েছেন।

উৎপাদন ঘণ্টা কমছে, যন্ত্রপাতি বন্ধ : নরসিংদীর চিত্রটি সঙ্কটের ভয়াবহতা বোঝার জন্য যথেষ্ট। শিল্প উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, সেখানে ২০ আগস্ট পর্যন্ত শতাধিক ছোট-বড় বস্ত্র কারখানার উৎপাদন বন্ধ অথবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেছে। ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চলেও একই চিত্র। ২৯৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। কয়েকটি স্পিনিং কারখানায় অর্ধেক বা তার বেশি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কারখানায় ৫০টির মধ্যে ৪৩টি মেশিন বন্ধ, আবার কোনো কারখানার সব মেশিনই বন্ধ রাখতে হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলের বড় কারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমেছে। নারায়ণগঞ্জেও অন্তত ৮৫টি ডাইং ও ৬৫টি পোশাক কারখানা সরাসরি গ্যাস সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতি শুধু কারখানার নয় : গ্যাসসঙ্কট দীর্ঘ হলে ক্ষতির বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। উৎপাদন কমলে কারখানার বিক্রি কমবে, কিন্তু শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের কিস্তি, সুদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকবে। ফলে নগদ অর্থের সঙ্কট সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে শিল্প খাতে গ্যাসসঙ্কটের কারণে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক অর্থায়ন ঝুঁকিতে পড়েছে বলে ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। এ দিকে রফতানিমুখী শিল্পে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশী ক্রেতা বিকল্প দেশে চলে যেতে পারে। জুলাইয়ের শেষ দিকে শিল্পমালিকরা জানিয়েছিলেন, কিছু বিদেশী ক্রেতা ইতোমধ্যে অর্ডার সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গতকাল ২২ আগস্ট পর্যন্ত শিল্প খাতের পরিস্থিতিতেও দেখা যাচ্ছে, অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, আবার কেউ কেউ ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছে।

এলএনজি নির্ভরতার ঝুঁকি সামনে : বর্তমান সঙ্কটের আরেকটি শিক্ষা হলো- শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে কমছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে স্থানীয় উৎসের গ্যাস উৎপাদন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট দৈনিক থেকে বর্তমানে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। অন্য দিকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ২০১৮ সালে আমদানি শুরু হওয়ার পর মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৩৬.৪৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি হয়েছে। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়া, এলএনজি কার্গো বিলম্বিত হওয়া বা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সাথে দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।

আসল মূল্য দিচ্ছে উৎপাদনশীল অর্থনীতি : গ্যাসসঙ্কটের তাৎক্ষণিক মূল্য দিচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতিকে। উৎপাদন কমবে, রফতানি ঝুঁকিতে পড়বে, ব্যাংকের ঋণ আদায় ব্যাহত হবে, কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পণ্যের দাম বাড়বে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে যদি নিয়মিত ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভর্তুকি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে। আর শিল্প যদি বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে, সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত হবে। অর্থাৎ ‘গ্যাস নেই’-এই একটি বাক্যের আড়ালে আসলে উৎপাদনঘণ্টা কমছে, যন্ত্রপাতি বন্ধ হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, ব্যাংকঋণ ঝুঁকিতে পড়ছে এবং রফতানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হচ্ছে। তাই বর্তমান সঙ্কটকে শুধু এলএনজি সরবরাহের সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সরাসরি ঝুঁকি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সমাধানের জন্য এক দিকে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ ও টার্মিনাল সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্য দিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সাথে শিল্পে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, ক্যাপটিভ বিদ্যুতের জন্য গ্যাস এবং দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়-কারখানা, রফতানি ও কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।