০৩ এপ্রিল ২০২০

পরোয়ানা সত্ত্বেও অধরা এমপি কাজিমের দ্বিতীয় স্ত্রী পুতুল

জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার দু’টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের এমপি কাজিম উদ্দীন আহমেদ ধনুর দ্বিতীয় স্ত্রী জেসমিন এরশাদ পুতুলের বিরুদ্ধে। পরোয়ানা জারির পর তিনি লন্ডনে চলে গেলেও দুই দিন আগে আবার দেশে এসেছেন।

পরোয়ানা মাথায় নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রভাবশালী এই নারী। দেশে ফিরে তিনি নানা ধরনের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছেন মামলার বাদিকে।

জানা গেছে, এমপি কাজিম উদ্দিন ধনুর সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সূত্র ধরে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয় জেসমিন এরশাদ পুতুলের। ১৯ বছর ও ১২ বছর বয়সী দুই ছেলে এবং স্বামী রেখে পুতুল এই বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ওই সময় তিন মাসের পেছনের তারিখ উল্লেখ করে আগের স্বামী ব্যারিস্টার শফিকুল কবির খানকে ডিভোর্স পাঠান।

এমপির স্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর মারমুখী হয়ে ওঠেন পুতুল। বিপুল সম্পদ অর্জনের লোভে অবৈধভাবে হস্তপে শুরু করেন অসহায় মানুষের ওপর। এমনই অভিযোগ মিলেছে পুতুলের বিরুদ্ধে। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি মানুষের জায়গা-জমি দখলে নেন। কেউ প্রতিবাদ করলেই এমপির ক্যাডার বাহিনীর অত্যাচারের মুখে পড়েন। ধর্ষণসহ নানা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয় তাদের।

শুধু এলাকাবাসীই নন, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখলে নেন লন্ডন প্রবাসী আপন ভাই এস এ এম খালেদ ইবনে এরশাদের সম্পত্তি। খবর পেয়ে দেশে ফিরে আসেন ভাই খালেদ। সম্পত্তি দখলের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি পড়েন বিপাকে। রাজধানীর বেইলি রোডে খালেদের বাসায় এসে হামলা-ভাঙচুর করে এমপির ক্যাডার বাহিনী। এ সময় মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলে তারা। এ বিষয়ে রাজধানীর রমনা মডেল থানায় ছয়টি জিডি করেন খালেদ ইবনে এরশাদ।

এতে আরও বেশি ক্ষেপে যান এমপি কাজিম উদ্দিন ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী পুতুল। প্রকাশ্যে রাস্তায় খালেদকে জীবন নাশের হুমকি দিতে থাকেন এমপির লোকজন। ভুক্তভোগী খালেদ জানান, ‘দ্বিতীয় স্বামী এমপি কাজিম উদ্দিনের প্রকাশ্য মদদে জালজালিয়াতির মাধ্যমে বোন পুতুল তাকে সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছে। এমপির লোকজন মাঝে মাঝেই দেখা করতে আসে। কোলাকুলির ছলে কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলের বাঁট স্পর্শ করিয়ে বলে, দেশ ছেড়ে চলে যান। দেশে কত মানুষ মারা যায়, দেখেন না?’

তিনি জানান, তাকে মাদকাসক্ত, বিকৃত মস্তিষ্ক ও পাগল সাজানোর চেষ্টাও করেছেন তারা। এ বিষয়গুলো উল্লেখ করে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাব মহাপরিচালক, ডিসি রমনা, এসি রমনা, অধিনায়ক র‌্যাব-৩ এর বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। র‌্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্তও করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট খালেদের পক্ষেইে গেছে বলেও জানা গেছে।

এ দিকে, জাল জালিয়াতি ও হামলা-ভাঙচুরের বিষয়ে আদালতে মামলা করেন খালেদ। এর মধ্যে আটটি ধারায় দায়ের করা একটি মামলায় গত ২৬/১১/২০১৯ তারিখে জেসমিন এরশাদ পুতুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। রাজধানীর পল্টন থানাকে এই ওয়ারেন্ট তামিল করার নির্দেশ দেয়া হয়।
এরপর গ্রেফতার এড়াতে এ বছরের ১৬ জানুয়ারি লন্ডন চলে যান পুতুল। প্রায় এক মাস পর আবার দেশে ফিরে এসেছেন।

এ দিকে সাভারে জালিয়াতির আরেক মামলায় চলতি মাসের ৪ তারিখ পুতুলের বিরুদ্ধে আরেকটি ওয়ারেন্ট জারি করেছেন আদালত। এ মামলায়ও জালিয়াতি-প্রতারণাসহ আটটি ধারা উল্লেখ রয়েছে। ভুক্তভোগী খালেদ জানান, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মাধ্যমে এমপির লোকজন তাকে হুমকি দিচ্ছে। মামলা তুলে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দেয়া হচ্ছে।

এ দিকে কাজিম উদ্দিন ধনুর নির্বাচনী এলাকায় অনুসন্ধানে গিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে এই প্রতিবেদকের কাছে এমপি ও তার লোকজন ও দ্বিতীয় স্ত্রীর জালজালিয়াতি, প্রতারণা ও অত্যাচারের বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। এমনকি স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও তার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তার কুকর্মের হাত থেকে এলাকাসীকে রা করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তপে কামনা করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ধনু স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোনো পদে নেই বর্তমানে। তার স্ত্রী পুতুল এলাকার একটি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে এমপির স্ত্রী জেসমিন এরশাদ পুতুলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে এমপি কাজিম উদ্দিন ধনুকে মোবাইলে ফোন দেয়া হলে প্রথম দফায় ফোনটি রিসিভ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় এমপি সাহেব ওয়াশরুমে আছেন। ১০ মিনিট পরে ফোন দিতে বলা হয়। এরপর ফোনে আর তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা দিয়েও তার সাথে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।


আরো সংবাদ