১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তার দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য, তা অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে আর একবার হারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখেছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন করেই হোক, বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ছিল খুবই স্বাভাবিক। আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। এ ছাড়া রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এ ছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হলো, আসামের এনআরসি ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির সভাপতি, এখন মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন- এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিচ্ছেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে গত ৭ আগস্ট এক মিটিং রেখেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক অ্যাজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু ভারতের কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও সরকারকে সতর্ক করায় দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। তাই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১০ দিনের মাথায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এটা এই ইস্যুতে আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

৩১ আগস্ট আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু সেক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করলে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি আমাদের হাতে এলো, যা আমাদের যে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন। উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া গেল যে, আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ নই।

দুঃখের কথা হলো, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া ‘এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু’- এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার অনেকেই ধরতে পারেনি, বা ছাপেনি। অথচ আগামী ৩১ আগস্টের পর থেকে পাল্টা বয়ান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। কেমন গুরুত্ব দিতে হতো এ ব্যাপারটা বোঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এমন কোনো মিডিয়া রিপোর্ট প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।

বিবিসি লিখেছে- ‘সংবাদ সম্মেলনে তাকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে- ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান ...’ এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বোঝানো যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হলো, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হলো, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে ক্যাম্পে রাখবে তারা; যদিও পরে তাদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মতো নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ করতে চান।

অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হলো এখন ভারতের আরেক বড় ইস্যু হলো কাশ্মির, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক আছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদি দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যুতে কথা বলার জন্য। মোদি যোগ দিতে রাজি হয়েছেন।

এর অর্থ কাশ্মির আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তো নয়ই, তা প্রকারান্তরে মেনে নেয়া হয়েছে এখানে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত থেকে ১০ দিন তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভার শুরু হয়ে যাবে; যেখানে কাশ্মির হবে সবচেয়ে বড় ইস্যু। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে- ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর।

তাহলে কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। কেন?

কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তো নয়ই; এ ছাড়া কাশ্মির সমস্যা আসলে ইউএন-এর (জাতিসঙ্ঘের) চার্টারের আলোকে মেটাতে হবে। কারণ, কাশ্মির শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসঙ্ঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হলো, কোনো রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরিতে কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কায়েম অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মিরের কেউ নয়। বরং কাশ্মিরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়াও হয়ে যেতেও পারে।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হলো, অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করা। এই ভিত্তিতে গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রস্বার্থ গত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। কাজেই জাতিসঙ্ঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

তাই কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মির সমস্যা জাতিসঙ্ঘের চার্টার, জাতিসঙ্ঘের গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসঙ্ঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগ নেই যে, কাশ্মির সমস্যা জাতিসঙ্ঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মেটাতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ

দৃশ্যমান হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের (২২০৭১)মাংস রান্নার গন্ধ পেয়ে বাঘের হানা, জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে জ্যান্ত খেল নারীকে (২০৯৩০)ব্রিটেনের প্রথম হিজাব পরিহিতা এমপি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আপসানা (১৫৪৬৮)ব্রিটেনে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের যারা নির্বাচিত হলেন (১৪৪৪৫)ইসরাইলি জাহাজকে ধাওয়া তুর্কি নৌবাহিনীর (১৩৯২৭)চিকিৎসার নামে নারীর গোপনাঙ্গে হাত দিতেন ভারতীয় এই চিকিৎসক (১২৫২৯)৪ বোনের জন্ম-বিয়ে একই দিনে! (১০৯৩৯)বিক্ষোভের আগুন আসামে এতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়াবে, ভাবেননি অমিত শাহেরা (১০৮৩৪)কোন রীতিতে বিয়ে করলেন সৃজিত-মিথিলা? (১০১৬৬)নির্দেশনার অপেক্ষায় বিএনপির তৃণমূল (৯৮৩৯)



hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik