২০ আগস্ট ২০১৯

শূন্য থেকে শীর্ষে উত্থানের নজির

-

ছোট্ট একটি দ্বীপ রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর; তিন দিকে সমুদ্র ও একদিকে নদী দ্বারা মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। আয়তনে চট্টগ্রামের চেয়েও ছোট দেশটিতে লোকসংখ্যা মাত্র ৫৬ লাখ। ছবির মতোই সাজানো চমৎকার সবুজ ও সুন্দর রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশের মাত্র ছয় বছর আগে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং সমুদ্রবন্দর ও পর্যটনকে পুঁজি করে অসাধারণ অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন তারা। বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম। এটাকে বিশ্বের অন্যতম ‘নিরাপদ রাষ্ট্রও বলা হয়। এমন উন্নত দেশ দেখার প্রচণ্ড আকাক্সক্ষা ছিল। বিশ্বের ব্যয়বহুল দেশগুলোর মধ্যেও এটি অন্যতম। বাংলাদেশের জবমবহঃ অরৎষরহবং এর ৫০ শতাংশ উরংপড়ঁহঃ অফারটি আমাদের মতো মধ্যবিত্তের বিদেশ ভ্রমণের আকাক্সক্ষা পূরণকে সহজ করে দেয়। তাদের কেবিন ক্রুদের আন্তরিক সেবা ও আতিথেয়তাও মুগ্ধ করে।

১৮১৯ সালের আগে ‘সিঙ্গাপুর’ দেশটির নাম ছিল তেমাসেক। পরে হয় ‘সিঙ্গাপুর’ যার অর্থ সংস্কৃতে ‘সিংহ শহর’ এবং তামিলে ‘সিংহের শহর’। জানা যায়, সাং-নিলা উতামা নামীয় সুমাত্রার যুবরাজ ১৬ শতাব্দীতে ঝড়ের কবল থেকে বেঁচে আসেন এবং দেশটিতে এসে একটি সিংহের দর্শন লাভ করেন যাকে মালয়ে ‘সিংগা’ বলা হয়। তার দেয়া ‘সিংগা’ নাম থেকে ‘সিঙ্গাপুর’। এখানে তৃতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হিসেবে তামিলদের বসবাস। লি কুয়ান ইউ কে সিঙ্গাপুরের ‘জাতির জনক’ বলা হয়। কারণ তিনি ক্ষুদ্র দেশটিকে এশিয়ার অন্যতম ধনী এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশে পরিণত করেছেন। তিনি এ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৫ সালের ২২ মার্চ ৯১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৫০ বছর আগে সিঙ্গাপুর একটি অনুন্নত রাষ্ট্র ছিল যার জিডিপি ছিল টঝ$৩২০ এর নিচে।

কিন্তু আজ এটি পৃথিবীর অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র যার জিডিপি টঝ$৬০,০০০ যা’ পৃথিবীতে ষষ্ঠ। প্রাকৃতিক সম্পদে দুর্বল হলেও দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এই উত্থান তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্ববাণিজ্যিকরণ, উন্মুক্ত বিনিয়োগ, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রসার এবং সময়োপযোগী ব্যবস্থা সমস্যার উত্তরণ ঘটিয়ে দেশটিকে বিশ্ববাণিজ্যের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত করেছে। সিঙ্গাপুর ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট স্বাধীনতা লাভ করেছে। ইউসুফ বিন ইসহাক প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। স্বাধীনতার পরপর ৪৩৩ বর্গমাইলের এ রাষ্ট্রটি নানা সমস্যায় ছিল জর্জরিত। সে সময় প্রায় তিন মিলিয়ন মানুষ বেকার ছিল এবং জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই বস্তিতে বসবাস করত। তদুপরি, দুই প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার অবন্ধুসুলভ আচরণে স্যান্ডউইচের মতো মধ্যে পিষ্ট হতো। তার না ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ, না ছিল যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত পানি। দেশের উন্নয়নের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করে সাড়া পাননি। তারা জানতেন অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য তাদের গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্ব বাণিজ্যের সাথে নিজেদের সংযুক্ত করতে হবে এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে তাদের দেশে উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য সরকার দেশে বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্নত ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে মনোযোগী হলো। ফলে ক্ষমতাধর শাসক সৃষ্টি করে চোরাচালানকারী এবং দুর্নীতিবাজদের মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজা প্রদান করা হলো।

এ ছাড়া, অন্য যেকোনো রাজনীতিক বা দল বা জোট জাতীয়, রাজনৈতিক বা যেকোনো হুমকির কারণ হলে তাদের কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে অত্যন্ত কড়া শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন লি। এটা আন্তর্জাতিকভাবে খুবই সমাদৃত হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল হওয়ায় সিঙ্গাপুরের স্থিতিশীলতা এ সুযোগকে কাজে লাগায়। তা ছাড়া সিঙ্গাপুরের যথার্থ সুবিধা ছিল পোর্ট স্থাপনের জন্য এবং তা করা হলো। ফলে স্বাধীনতার মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে ১৯৭২ সালে সিঙ্গাপুরের এক-চতুর্থাংশ উৎপাদনশীল ফার্ম বিদেশী বা যৌথ বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। বিদেশী বিনিয়োগে সিঙ্গাপুরের জিডিপি দ্রুত বাড়তে থাকে। অতঃপর সরকার দেশটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, টেকনিক্যাল শিক্ষা, পেট্রোকেমিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, আইসিটি প্রভৃতিতে একের পর এক সমৃদ্ধি সাধনে তৎপর হয় এবং সবার জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে।

আধুনিক সিঙ্গাপুর একটি আল্ট্রা ইন্ডাস্ট্রিলাইজড সমাজ এবং এর পোর্ট ট্রান্সশিপমেন্ট পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যস্ততম। এর ওপরে আছে শুধু চীনের সাংহাই। প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন পর্যটক সিঙ্গাপুর ভ্রমণে আসে। সুইস ব্যাংকে ট্যাক্স আরোপ করায় বর্তমানে সিঙ্গাপুরের ব্যাংকগুলোকে সুইস ক্লায়েন্টরা ‘নিরাপদ’ মনে করেন। এ দেশে মানুষের গড় আয়ু ৮৩.৭৫ বছর যা পৃথিবীতে তৃতীয়। দুর্নীতিমুক্ত, কড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কারণে এটাকে ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ বলা হলেও পৃথিবীতে সর্বোত্তম পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ বসবাসের বাসস্থান হিসেবেই সিঙ্গাপুরকে পরিগণিত করা হয়।

শটি ভ্রমণের আগে এমন চমকপ্রদ ইতিহাস জেনে আমরা পুলকিত হলাম এবং এ দেশকে জানার এবং এর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখার আগ্রহ অনেক বেড়ে গেল। গত ১১ এপ্রিল আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমরা আল্লাহর অশেষ রহমতে যথাসময়ে সিঙ্গাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দরে পৌঁছি। তখন রাত প্রায় ২টা। নির্ঝঞ্ঝাটভাবে ইমিগ্রেশন সমাপ্ত করে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে গাইডের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। যথাসময়ে গাইড এসে আমাদেরকে নিয়ে হোটেলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পথে আলো ঝলমলে সিঙ্গাপুরের নাইট সিটি আমরা উপভোগ করতে থাকি। গাইড জানান, এ দেশে কখন লোডশেডিং হয়েছে, তা তার মনে নেই। তিনি জন্মসূত্রে সিঙ্গাপুরী। বাবা ভারতীয়। যা হোক, তখন যে রাতের শেষ ভাগ ছিল তা বোঝার উপায় নেই। বিশাল উঁচু উঁচু দালান। প্রত্যেকটির মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান।

ফ্লাইওভার বা ফুটওভার ব্রিজ যেদিকে দৃষ্টি যায়, ফুলে ফুলে ভরা। বিশাল দালানগুলোর প্রতিটি ব্যালকনিতে গাছের সমাহার। কোথাও বিলবোর্ড নজরে আসেনি। সবুজ প্রকৃতির মাঝে বিশাল বিশাল ইমারত সজ্জিত। সম্পূর্ণ দেশটি সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই কোথাও অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেই। আমরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হোটেলে পৌঁছি। সেরাংপুন রোডে (মোস্তফা সেন্টারের বিপরীতে) অবস্থিত Claremont Hotel Singapore -এ আমাদের জন্য আগে থেকেই বুকিং ছিল। অল্প সময় পরই ফজরের ওয়াক্ত হয়। আমরা সালাত আদায় করে এমন সুন্দর দেশে আমাদের যাত্রা সুখময় ও নিরাপদ হওয়ার জন্য পরম করুণাময়ের কাছে দোয়া করে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিলাম। সিঙ্গাপুরের নাইট সাফারি, সন্তোষা দ্বীপ, চায়না টাউন, গার্ডেন বাই দ্য বে, স্কাই পার্ক ইত্যাদি নিয়ে অর্জিত চমৎকার অভিজ্ঞতা পর্যায়ক্রমে তুলে ধরার আশা রাখি।

লেখক : প্রিন্সিপ্যাল, চিটাগং ভিক্টোরী ন্যাশনাল স্কুল


আরো সংবাদ




bedava internet