২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আত্মহত্যার শিরোনামে বারবার কেন তারকারা?

তারকারা কেন বারবার আত্মহত্যা করেন - সংগৃহীত

ধর্ম এবং সমাজ উভয়ই আত্মহত্যাকে নিরুৎসাহিত করেছে। তারপরেও নিয়মিত বিরতিতে আত্মহত্যার খবর আসে। এই খবরটা সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় যখন আত্মহননের পথ বেঁছে নেন তারকারা। 

বিদেশের মেরিলিন মনরো থেকে শুরু করে সিল্ক স্মিতা, জিয়া খান যেমন এই তালিকায় নাম উঠিয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের ডলি আনোয়ার, সালমান শাহ, মিতা নূর, সুমাইয়া আজগর রাহা, নায়লা,  মঈনুল হক অলির-মর্মান্তিক পরিণতির খবর বার বার উঠে এসেছে শিরোনামে। এছাড়া ন্যান্সি, মম, ভারতের স্বস্তিকা ও শুভশ্রীর মতো তারকারা দুর্বল সময়ে আত্মহননের পথ বাছতে গিয়েছিলেন যাঁরা সেই তালিকাও নেহায়েত ছোট নয়। 

কেউ খ্যাতির শীর্ষে থেকেই বেছে নেয়েছেন আত্মহননের পথ, কেউ বা পেশাগত আর ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের খেলায় ব্যালান্স হারিয়েছেন। অনেকেই রুপোলি জগতের মোহে এগিয়ে এসে মাঝপথেই ঠোক্কর খেয়ে থমকে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেননি। নাম, অর্থ, স্টারডমের লড়াইয়ে তাই অনেকে হার মেনেছেন সময়ের অনেক আগেই। 

কিন্তু কেন হঠাৎ থেমে যাওয়া? বিগত কয়েক বছরে অভিনেত্রী বা মডেলের আত্মহত্যার ঘটনা উত্তরোত্তর বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজের পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনই কি বেড়েছে না-পাওয়ার মাত্রাও? ‘আসলে স্বপ্ন দেখাটা যত সহজ, তার বাস্তবায়নটা তত সহজ নয়, আর এখান থেকেই হতাশার জন্ম,’ মনে করেন ভারতের মনোবিদ অনিন্দিতা রায়চৌধুরি। 

অনিন্দিতার মতে, ‘একদিকে স্বপ্নভঙ্গ বা লড়াই করা মানসিকতার অভাব এবং অন্যদিকে লক্ষ্যে পৌঁছনোর শর্টকার্ট উপায় খুঁজে চলা নিরন্তর, এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বাড়তে থাকে অনিয়ন্ত্রিত ডিপ্রেশন। এই হতাশারই প্রভাব পড়ে ব্যক্তিগত জীবনে। আর তখনই খুব সহজ সম্পর্কগুলোও জটিল আকার নিতে শুরু করে। কারণ আবেগে তখন জট পড়তে থাকে। চূড়ান্ত অবসাদ এবং জীবনের জটিল জটগুলো ছাড়াতে না পেরেই একটা চটজলদি মুক্তির উপায় খুঁজে নেন তাঁরা।’

তবে কি এই রোগের দাওয়াই নেই? অনিন্দিতা জানালেন, ‘ডিজিটাল হাইটেক দুনিয়ায় হতাশা বয়ে আনার উপায় একশো আটটা, কিন্তু টিকে থাকার উপায় একটাই, আর তা হল মনের খবর রাখা। কেরিয়ার হোক বা সম্পর্ক, যে কোনও পথে পা বাড়ানোর আগে আবেগের পাশাপাশি মগজ দিয়ে ভাবা। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং করানো। কারণ মনও অসুস্থ হতে পারে, ক্লান্ত হতে পারে, তাই সে যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেই, তার কোনও গ্যারান্টি নেই কিন্তু।’

জীবনের কঠিন যুদ্ধকে ভয় পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নেয়া কয়েকজন বাংলাদেশী তারকার কথা এখানে উল্লেখ করা হলো। 

ডলি আনোয়ার
মনে আছে বাংলাদেশের এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের কথা? তার পিতা একজন চিকিৎসক, মাতা বিখ্যাত নারী নেত্রী ডঃ নীলিমা ইব্রাহিম। চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন এর সাথে ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ চলচ্চিত্র তৈরির সময় ডলি ইব্রাহিমের পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে তারা বিয়ে করেন। পরিবার, সম্পদ, যশ, খ্যাতির কমতি ছিলনা, তবুও ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে ডলি আনোয়ার বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পর নানা রকম গুজব শোনা যায়। বলা হয়, ডলি আনোয়ারের স্বামী আনোয়ার হোসেন তাকে তালাকনামা প্রেরণ করেন যা সহ্য করতে না পেরে ডলি আনোয়ার বিষপান করেন। এই গুজবের কোন সত্যতা প্রমাণিত হয় নি, ফলে আরও অনেকের মতই ডলি আনোয়ারের এই মৃত্যু রহস্যই থেকে যায়।

সালমান শাহ
জনপ্রিয় এই নায়ক নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে সাড়া জাগানো অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অকালে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। অভিযোগ উঠে যে, তাকে হত্যা করা হয়; কিন্তু তার সিলিং ফ্যানে ফাঁসিতে হত্যাকাণ্ডের কোনো আইনী সুরাহা শেষ পর্যন্ত হয়নি। তুমুল জনপ্রিয়তায় থাকা একজন অভিনেতা কেনো এভাবে হুট করে আত্মহত্যা করলেন সে প্রশ্নের এখনো কোনো সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি।

 মিতা নূর
মিষ্টি মেয়ে মিতা নূরের কথা নিশ্চই মনে আছে সবার। এক সকালে খবর পাওয়া গেলো এই অভিনেত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে নিজ ফ্ল্যাটেই আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক কলহের কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেন বলে খবর রটে সে সময়। তবে অনেকেই ধারণা করেন, ক্যারিয়ারের প্রতি হতাশ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি।

সুমাইয়া আজগর রাহা
প্রেমিক চলচ্চিত্র নায়ক অনন্ত জলিল, বয়ফ্রেন্ড শাকিব ও নিজ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে লাক্স তারকা সুমাইয়া আজগর রাহা আত্মহত্যা করেছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল মিডিয়াপাড়ায়। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া নায়ক অনন্তর ‘খোঁজ দ্য সার্চ’ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেন রাহা। তখন থেকেই অনন্তর সঙ্গে রাহার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ছবিরই নায়িকা বর্ষাকে ২০১১ সালে বিয়ে করেন অনন্ত। এতে রাহার সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা ভাটা পড়ে। পাশাপাশি মিডিয়ারই এক ছেলের সঙ্গেও রাহা প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। স্বামীর প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি বর্ষা জানার পর তাদের দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। রাহার ঘনিষ্ঠজনরা বলেছেন, রাহার পরিবার ধর্মভীরু। তার বাবা-মা ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলেছেন। কিন্তু রাহা ছিলেন ঠিক এর উল্টো। তার উগ্র চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডে কখনোই সায় দেননি তারা। বরং এ বিষয়ে মেয়েকে অনেকবারই সাবধান হতে বলেন। মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু কোনো কিছুই রাহাকে দমাতে পারেনি। নিজ ফ্ল্যাটে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন রাহা। কিন্তু এখনো এই আত্মহত্যার কেনো কারণ পাওয়া যায়নি।

নায়লা
মূলত অভিনেত্রীই হতে চেয়েছিলেন নায়লা। সেই লক্ষ্য নিয়েই মিডিয়ায় তার পথচলা শুরু হয়েছিল। কিন্তু নায়লা তখনো জানেনি এই রঙিন দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া খুব একটা সহজ না। শিল্প আর শিল্পীর মূল্যায়ন খুব কমই হয় এখানে। তারপরেও চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন নবাগতা নায়লা। লোকনাট্য দল বনানীর একজন সদস্য ছিলেন তিনি। মঞ্চে কাজ করে নিজের অভিনয়ের দক্ষতাও বাড়াতে থাকেন। ‘ললিতা’, ‘পা রেখেছি যৌবনে’, ‘অ-এর গল্প’ ও ‘মুম্বাসা’সহ বেশ কিছু টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই হতাশায় পেয়ে বসে তাকে। সম্প্রতি তার মা মারা যাবার পর তিনি আরো বেশি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি তার ফেসবুকে হতাশামূলক স্ট্যাটাস দিতেন বলে জানান তার সহকর্মীরা। কি কারণে তার এই হতাশা, সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই এ বছরের ২০ মার্চ তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। শ্যামলীর বাসা থেকে নায়লার সিলিং ফেনে ঝুলানো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শনিবারে তাকে দাফন করা হয় মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

মঈনুল হক অলি
বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী, থিয়েটার-কর্মী, মডেল ও অভিনেতা মঈনুল হক অলি তার বাসায় আত্মহত্যা করেছিলেন। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পারিবারিকভাবে অলি বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকে তার দাম্পত্য জীবন ভালো যাচ্ছিলো না বলে অলির ঘনিষ্ঠজনরা জানান। আর নিজের ক্যারিয়ার নিয়েও হতাশ ভুগছিলেন এ অভিনেতা। এসব কারণেই অলি আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে করেন অনেকেই।

 

 

 


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme