২০ নভেম্বর ২০১৮

প্রত্যাবাসনের ভয়ে ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা!

পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের বৈঠকে চীনের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ
-

দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য চীনের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
বেইজিংয়ে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-চীন পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের (এফওসি) ১১তম বৈঠকে এ সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে স্বরাষ্ট্র, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও রেলওয়ে মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা ছিলেন। আর চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কং জুয়াংইউ।
এদিকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা। বুধবার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল থেকে একটি নৌকা যাত্রা শুরু করলে তাদের আটক করে কোস্টগার্ড। এ ছাড়া রাখাইন থেকেও কয়েকটি নৌকায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রোহিঙ্গারা রওনা দিয়েছে বলে জানিয়েছে রোহিঙ্গা নেতা, ত্রাণকর্মী ও পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো। প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরুর তারিখ সামনে চলে আসায় মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম চ্যানেল নিউজ এশিয়ার এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
গত বছরের আগস্টে নিরাপত্তাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই অভিযানে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আলামত পেয়েছে। সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ মিয়ানমারের মানবাধিকার নিয়ে এক তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে। মিয়ানমার সরকার বারবারই দাবি করে এসেছে যে, নিরাপত্তার স্বার্থে এই অভিযান চালিয়েছে সেনাবাহিনী। কোনো নিধনযজ্ঞ চালানো হয়নি। তবে জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যাখ্যানের মাত্রায় তারা হতবাক। সামরিক অভিযানে কখনোই হত্যা, সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন ও গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
টেকনাফ উপজেলায় কোস্টগার্ড প্রধান ফয়জুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় ৩৩ জন রোহিঙ্গা ও ছয় বাংলাদেশীকে গ্রেফতার করেছে কোস্টগার্ড। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রাখাইনের উপপরিচালক কিয়াও সোয়ার তুন বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পার্সন্স ফ্রম রাখাইন স্টেট’ নামে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়ার সুনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ বলছে, এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে দুই দেশ।
তবে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হলে যেতে চায় না। জাতিসঙ্ঘও জানিয়েছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াং লি বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। বৌদ্ধরা প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনও করেছে।
আরাকান প্রকল্পের পরিচালক ক্রিস লেওয়া বলেন, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তে অনেক রোহিঙ্গা পাচারকারী চক্রের শরণাপন্ন হতে পারে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা ফাঁদে আটকে গেছে। তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাদের কেউ আশ্রয় দিতে চায় না। আর এখন প্রত্যাবাসনের ঝুঁকিতে পড়েছে তারা।
চীনের সহযোগিতা চাইল বাংলাদেশ
দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য চীনের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
বেইজিংয়ে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-চীন পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ের (এফওসি) ১১তম বৈঠকে এ সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে স্বরাষ্ট্র, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও রেলওয়ে মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা ছিলেন। আর চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী কং জুয়াংইউ।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানিয়ে জুয়াংইউ বলেন, এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে চীন ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শহীদুল হক বলেন, মিয়ানমার সরকার ও তাদের মানুষের মধ্যে সঙ্ঘাত থেকে এ সঙ্কটের সৃষ্টি। সম্প্রতি ঢাকায় দুই দেশের যৌথ কার্যকর গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন শুরু করা উচিত। এ ব্যাপারে চীনের সহযোগিতা চান পররাষ্ট্র সচিব।
চীনের সাথে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য বৈষম্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন শহীদুল হক। তিনি বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, ফল ও সবজি এবং অন্যান্য অপ্রচলিত খাত থেকে আমদানি বাড়ানোর জন্য চীনের প্রতি আহ্বান জানান। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও উচ্চপ্রযুক্তির পার্কে বিনিয়োগ বাড়ানো জন্য তিনি চীনের প্রতি অনুরোধ করেন। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে পররাষ্ট্র সচিবকে আশ্বস্ত করেন জুয়াংইউ। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রথম কন্স্যুলার কনসালটেশন ঢাকায় আয়োজনের ব্যাপারে এফওসিতে সিদ্ধান্ত হয়। শহীদুল হক গতকাল চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সাথে সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলোয় চীন অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে বলে ওয়াং ই জানান।


আরো সংবাদ