১৫ নভেম্বর ২০১৮

বিশ্বব্যাপী আস্থা হারাচ্ছে ইভিএম

মতবিরোধ খোদ ইসিতেও
-

পৃথিবীর শতকরা ৯০ ভাগ দেশে ই-ভোটিং পদ্ধতি নেই। যে কয়েকটি দেশ এটি চালু করেছিল, তারাও ইতোমধ্যে তা নিষিদ্ধ করেছে। ২০০৬ সালে আয়ারল্যান্ড ই-ভোটিং পরিত্যাগ করে। ২০০৯ সালের মার্চ মাসে জার্মানির ফেডারেল কোর্ট ইভিএমকে অসাংবিধানিক ঘোষণা দেয়। একই বছর ফিনল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট ইভিএমে সম্পন্ন তিনটি মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের ফলাফল অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

ড. অ্যালেক্স হালডারমেন নামে এক প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএমের ওপর গবেষণা করে প্রমাণ পেয়েছিলেন, আমেরিকায় ভোট কারচুপির প্রতিরোধক (টেম্পার প্রুফ) নয় ইভিএম। ফলে সেই অঙ্গরাজ্যেও ইভিএম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আমেরিকার ২২টির বেশি অঙ্গরাজ্যে এটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যগুলোতেও তা নিষিদ্ধ হওয়ার পথে।

সম্প্রতি ইভিএম তথা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপি সম্ভব বলে অভিযোগ তুলে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ফের ব্যালট পেপারে ভোটের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে। তারা একযোগে নির্বাচন কমিশনের কাছে ইভিএমের মাধ্যমে কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছে। এভাবে বিশ্বব্যাপী আস্থা হারাচ্ছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)।

অথচ ঠিক এমনই সময়ে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেড় লাখ ভোটিং মেশিন কেনার পথে হাঁটছে। এ জন্য ৩৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে তারা। তবে মতবিরোধ রয়েছে খোদ ইসিতেও। একজন কমিশনার ভিন্নমত দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। আরো দুই কমিশনার জানেনই না ইভিএম ক্রয়ের খবর।

এ দিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে পুরোপুরি বিপরীত মেরুতে রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নির্বাচনে ইভিএম বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সংসদ নির্বাচনে ই-ভোটিংয়ের প্রবর্তন বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করতে নির্বাচনে সরকার ই-ভোটিং রাখতে চায়, যা দুরভিসন্ধিমূলক।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশনারদের মধেও। পাঁচ কমিশনারের তিনজন এ প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। তাদের একজন আরপিও সংশোধনের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেছেন, সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার নতুন যে প্রকল্প পাঠানো হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি; আপনাদের কাছে জানতে পারলাম।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, আমি ইভিএমের প্রকল্পের বিষয়ে কিছু জানি না; ইসি সচিব ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানেন। যখন এগুলো ব্যবহার করার জন্য কমিশন সভায় আলোচনা হবে, তখন বলব। এর আগে বিষয়টি নিয়ে বলার কিছু নেই, আমি বলতেও চাই না। কমিশনার কবিতা খানম বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে তা আরপিওতে সংযুক্ত করতে হবে। তারপর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে ইভিএম ব্যবহার করবে কি না। ইভিএম কেনার নতুন প্রকল্পের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।

সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে আরপিও সংশোধন করা হচ্ছে- সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে একজন কমিশনার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনি এটি প্রস্তুত করেছেন।

এতে বলা হয়েছে, গত ২৬ আগস্ট আরপিও সংশোধনের জন্য কমিশন সভায় তিন ধরনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। ওই দিন দু’টি প্রস্তাব বাদ দিয়ে শুধু একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনার জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং ৩০ আগস্ট পর্যন্ত কমিশন সভা মুলতবি করা হয়। স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় এরই মধ্যে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও ভোটারের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রথম থেকে বলে আসছেন- রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে। সরকারে প থেকে স্বাগত জানালেও বিরোধী রাজনৈতিক প থেকে এর বিরোধিতা করা হয়েছে। তাই একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অধিকতর আলোচনা প্রয়োজন ছিল।

২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডে ভোট গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইভিএমের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেখানকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সময় ইভিএম বন্ধ হয়ে যায়। তার পর এটি সারানো আর সম্ভব হয়নি। ফলে ওই কেন্দ্রে আবার ভোট গ্রহণ করতে বাধ্য হয় নির্বাচন কমিশন। এসব সমস্যা চিহ্নিত করতে নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান বুয়েটকে একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও তারা সমস্যা চিহ্নিত করেনি, বরং ইসি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ তোলে বুয়েট।

ইভিএম নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল আগের কমিশনেও। সাবেক নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক সিইসির কাছে এক ইউও (আনঅফিশিয়াল) নোটে লেখেন, কমিশনে যে ইভিএম রয়েছে তাতে ভোট সংখ্যার কাগজ রেকর্ডের ব্যবস্থা নেই; ভোটারের পরিচিতি শনাক্তকরণেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে এ যন্ত্র দিয়ে ভোটে কারচুপি রোধ করা সম্ভব নয়।

এ দিকে পাশের দেশ ভারতে ইভিএমের বিরোধিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিজেপি অবশ্য ইভিএম বজায় রাখারই পক্ষপাতী, তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন সব দলেরই মতামত খতিয়ে দেখবে বলে কথা দিয়েছে।

গত চার বছরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ইভিএম নিয়ে কারসাজির অজস্র অভিযোগ তুলেছে একাধিক বিরোধী দল। এবারে নির্বাচন কমিশনের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠকে গিয়ে কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল দাবি জানিয়েছে ইভিএম পদ্ধতিটাই বাতিল করে দেয়া হোক।

কংগ্রেস মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলেছেন, শুধু আমরাই নই। দেশের অন্তত ৭০ শতাংশ রাজনৈতিক দলই মনে করে যত দ্রুত সম্ভব কাগজের ব্যালট আবার ফিরিয়ে আনা উচিত। এই দাবিতে আমরা অনড় থাকব। কারণ ইভিএমের ওপর আমাদের বিশ্বাস টলে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জালিয়াতির সুযোগ থাকায় ইভিএমে এক চাপে ৫০টি ভোট দেয়া সম্ভব। বিদেশের মাটিতে বসেও ইভিএম হ্যাকিং করা যায় এবং একটি ইভিএম হ্যাকিং করতে এক মিনিটের বেশি সময় লাগে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, কোনো প্রযুক্তি গ্রহণের আগে তার ভালো-মন্দ খতিয়ে দেখা উচিত। আর নির্বাচনের অন্যতম স্টেক হোল্ডার হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। যে প্রযুক্তিই গ্রহণ করা হোক না কেন তা রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নিয়েই করা উচিত।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জে. (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ছোট পরিসরের নির্বাচনে ইভিএম যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু সংসদ নির্বাচনের মতো ক্ষমতা বদলের নির্বাচনে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারেনি কমিশন নির্বাচন। এ ছাড়া, খোদ ইভিএম উদ্ভাবনকারী দেশগুলোও এই প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।


আরো সংবাদ