২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ফেনীতে উপাধ্যক্ষকে চাকুরী ছাড়তে ভয়ভীতির অভিযোগ

আলহাজ্ব আবদুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ। ছবি - নয়া দিগন্ত।

ফেনীর ছাগলনাইয়ায় আলহাজ্ব আবদুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিককে অনৈতিকভাবে সাময়িক বরখান্ত করে আর্থিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে চাকুরী ছেড়ে চলে যেতে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমোতাবেক সাময়িক বরখাস্তকালীন জীবন ধারণের ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ৫০ ভাগ প্রদান করার কথা থাকলেও গত জুলাই ২০১৮ থেকে সম্পূর্ণ বেতন বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষক। আর্থিক ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে স্বজনদের নিয়ে স্বাভাবিক জীবন বিপন্ন হওয়ার মুখে প্রতিকারে আশায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকদের ধারে ধারে ঘুরছেন ওই শিক্ষক।

সোমবার সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিদা ফাতেমা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত ছাগলনাইয়া উপজেলা আইন শৃঙ্খলা বৈঠকে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সামছুদ্দিন আহমেদ বুলু মজুমদার কলেজের গভনিং বডির সভাপতি ও ফেনী ১ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন আখতারের বিরুদ্ধে উপাধ্যক্ষ মাহতাব হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত ও নির্যাতনের অভিযোগ করে বক্তব্য প্রদান করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বৈঠকের উপদেষ্ঠা উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল ।

কলেজের গভনিং বডির সভাপতি ও ফেনী ১ আসনের সংসদ সদস্য জাসদের কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের নির্দেশের কথা বলে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুমিত্র কুমার মজুমদার উপাধ্যক্ষের অফিস না খোলা, অফিসে ঝাড়– না দেয়া, পানি না দেয়া ও টয়লেটের চাবি দিতেও পিয়নদের নিষেধ করা হয়েছে বলে লিখিত অভিযোগ করেছেন উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিক।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিক গত ৬ সেপ্টেম্বর ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিদা ফাতেমা চৌধুরী, ফেনী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন ভিন্ন জেলার অধিবাসী হওয়ায় তাকে চাকুরী ছেড়ে চলে যেতে বিভিন্নভাবে একটি প্রভাবশালী মহল ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। অনিয়মের মাধ্যমে ওই উপাধ্যক্ষকে বরখাস্তসহ কলেজের গভণিং বডির সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি বহির্ভূত নানা অনিয়মের কথা জানিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বরাবরেও অভিযোগ দিয়েছেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিক।

অপরদিকে, কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাবকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিয়ে নাহেজাল করার প্রতিবাদে ও কলেজে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতে কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিক্ষক ও গভনিং বডির সদস্যদের মধ্যে বিরাজমান দ্বন্ধের কারণে অনার্স-মাষ্টার্স পর্যায়ের ওই কলেজের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে বলে জানাগেছে।

আলহাজ্ব আবদুল হক চৌধুরী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কবির আহম্মদের অবসরের পর গত ৯ মার্চ,২০১৮ তারিখ থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে গভনিং বডি কলেজের উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিককে দায়িত্ব দিয়েছিল । তিনি আগষ্ট,২০০৬ সাল থেকে ওই কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বিগত অধ্যক্ষের কার্যকালে কলেজের গভনিং বডির সদস্য এনামুল হক চৌধুরী ১১টি সভায়,আজিজুল হক চৌধুরী ৮টি, একেএম ফজলুল হক চৌধুরী, ৮টি সামছুল হুদা ৮টি মাজহার উল্যাহ ভূইয়া ৭টি গভনিং বডির সভায় টানা অনুপস্থিত ছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গভনিং বডির( সংশোধিত) সংবিধি-২০১৫ এর বিধি১৪(গ) মোতাবেক টানা অনুপস্থিতির কারণে গভনিং বডির সদস্য থাকার যোগ্যতা হারানোয় সাবেক অধ্যক্ষ কবির আহম্মদ বিষয়টি রেজ্যুলেশান করে যান।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মাহতাব প্রশাসনিক কারণে বিষয়টি লিখিতভাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করলে গভনিং বডির কিছু সদস্যের সঙ্গে তার বিরোধ সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধের জের ধরে গত ১০ মে ২০১৮ তারিখে গভনিং বডির সভাপতি ঢাকায় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে নিজের বাসায় কোরামবিহীন সভা করে কোন কারণ দর্শানো ছাড়াই ড. মাহতাব হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তারই জুনিয়র শিক্ষক সুমিত্র কুমার মজুমাদারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়ার অভিযোগ করা হয়।

ওই সভাকে চ্যালেন্ঞ্জ করে ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিক মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন (৭৩৮৪/২০১৮)। হাইকোর্ট বিভাগ গভনিং বডির সভা স্থগিত করে নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে কলেজের সভাপতি চেম্বার জজ আদালতে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং-২৫০৭/২০১৮ দায়ের করেন। চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনে শুনানীর জন্য প্রেরণ করেন। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টর অ্যাপিলেট ডিভিশন হাইকোর্টের রায় স্থগিত বহাল রেখে নিম্পত্তির জন্য হাইকোর্ট ডিভিশনে পাঠান। মামলাটি বর্তমানে হাইকোট ডিভিশনে চলমান রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুমিত্র কুমার মজুমদার দায়িত্ব নেয়ার পর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কবির আহম্মদের সময়ের কয়েকটি মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামাণিককে শোকজ ও সাময়িক বরখাস্ত করার অভিযোগ করা হয়েছে। বরখাস্তের পর থেকে সরকারি বিধিমোতাবেক ৫০ ভাগ বেতন বিল করার কথা থাকলেও গত দুই মাস ধরে উপাধ্যক্ষের নামে কোন বিল করেনি কলেজ কর্র্তৃপক্ষ। নিয়মিত কলেজে উপস্থিত হয়ে হাজিরা দিলেও বরখাস্তের পর থেকে কলেজে অবস্থানকালীন সময়ে পানি, টয়লেটের চাবিসহ দৈনন্দিন চাহিদা কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বন্ধ রেখেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অপরদিকে, ভিন্ন জেলার বাসিন্দা হওয়ায় আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি ওই শিক্ষককে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে এলাকা ছাড়তে একটি মহল ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে বলেও অফিযোগ করেছেন কলেজের বরখাস্তকৃত উপাধ্যক্ষ ড. মাহতাব হোসেন প্রামানিক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুমিত্র কুমার মজুমদার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, কলেজের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না থাকায় বরখাস্তকৃত উপাধ্যক্ষের বেতন বিল করা হয়নি ।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিদা ফাতেমা চৌধুরী জানান, তিনি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিবেন ।

ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী জানান, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের পাশাপাশি সরকারি বিধি মোতাবেক বরখাস্তকৃত উপাধ্যক্ষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


আরো সংবাদ