২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮ ফাল্গুন ১৪৩০, ১০ শাবান ১৪৪৫
`

ইউক্রেন যুদ্ধমঞ্চে চীনের আবির্ভাব

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। - ছবি : সংগৃহীত

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রথম বার্ষিকীতে, প্রেসিডেন্ট পুতিন ভাষণ দিয়েছেন, আক্রমণও জোরদার করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ভাষণ দিয়েছেন, বিপুল সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি আকস্মিকভাবে ইউক্রেনে জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, পোল্যান্ড সফর করেছেন। বিশ্ববাসী দুজনের বক্তব্য এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

গুরুত্বপূর্ণ হলো ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তৃতীয় কণ্ঠস্বরের উত্থান যা ইউক্রেন যুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ- সেটি হলো- পুতিনের প্রধান মিত্র এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্যিকারের পরাশক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের যুদ্ধের মঞ্চে আবির্ভূত হওয়া। রাশিয়ার সেনাপ্রধান এবং পুতিন বলেছেন যেভাবে পশ্চিমা ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে আসা শুরু হয়েছে তা প্রতিহত করতে পরমাণু হামলা চালাতে বাধ্য হবে। এই বক্তব্যের পরই পুতিন পরমাণু হ্রাস চুক্তির শর্তাবলী স্থগিত করেছেন।

বলতে গেলে একটি বছর সাইডলাইনে কাটানোর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইউক্রেন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তিনি মস্কো সফরেরও ঘোষণা দিয়েছেন। মি. শি কিভাবে এগিয়ে যেতে চান তা সঙ্ঘাতের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলবে বিশ্ব রাজনীতিতে যা কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক গতিপথ পাল্টে দিতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে শি, পুতিনকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করবে। পশ্চিমা শক্তি একত্রিত হয়ে মস্কোকে সামরিক ও আর্থিকভাবে নিঃশেষ করতে পারলে পরবর্তী টার্গেট হবে চীন। এটা চীনের বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

তুরস্কের এরদোগানের পর, বেইজিং চূড়ান্ত আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিজেকে মূল খেলোয়াড় হিসাবে উপস্থাপন করতে চাইছে অথবা রাশিয়ার মিত্র হিসাবে যুদ্ধের গতি প্রকৃতি ঘুরিয়ে দিতে চাইছে। চীন একটি বছর দেখেছে পশ্চিমারা কতটুকু করতে পেরেছে এবং রাশিয়াও যুদ্ধক্ষেত্রে কেমন খেলেছে। যা চিন্তা করেছিল মস্কো যে অল্প দিনের মধ্যে যুদ্ধের ফায়সালা হবে তা হয়নি। এবার চীনের গুটি চালানোর প্রকৃতি অল্প কিছু দিনের মধ্যে আরো পরিষ্কার হয়ে উঠবে। চীন রাশিয়ার সামরিক চুক্তি, সীমান্ত বিরোধ সাসপেন্ড, জাপান ও ইন্দো প্যাসিফিক নিয়ে একই পরিভাষা ব্যবহার করে বহু পূর্বেই পশ্চিমাদের এক প্রকার সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় কূটনৈতিক ও অত্যন্ত কৌশলী ভাষায় চীন শান্তি প্রস্তাব দাখিল করেছে।

শি যে দৃষ্টিকোণ থেকে এই আহ্বান জানিয়েছেন তা স্পষ্ট। তার নিজের দেশের স্বার্থ, এবং বিশেষত একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান চীনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি যা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আধিপত্যের অবস্থান থেকে সরিয়ে দিতে পারে।

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে এসে ইউরোপের সাথে যথারীতি অর্থনৈতিক বাণিজ্যে ফিরে আসার কথা বলেন এবং ইউরোপীয়দের ইউক্রেনের বিষয়ে মার্কিন ছায়া যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখার আহ্বান জানান। ঝানু ক‚টনীতিক জোসেপ বোরেল চীনকে উদ্দেশ বলেন যে, পুতিনকে সামরিক সহায়তা দেয়া হবে ‘আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি রেড লাইন’।

শি জিনপিংয়ের সামনে এখন রাশিয়ার সঙ্গে তার দেশের সম্পর্ক নির্ধারণের দায়িত্ব রয়েছে। চীনের শীতকালীন অলিম্পিকে পুতিন গিয়েছিলেন। দুই নেতা ‘সীমাহীন বন্ধুত্বের’ অঙ্গীকার করেছিলেন। উভয় দেশ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধারণার এবং অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্বকে পদদলিত করার সমালোচনা করেছিলেন। আমেরিকান ‘সামরিক ব্লকগুলো’ অন্যান্য দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে নিন্দা করেছিলেন। চীনের ১২ দফার মধ্যে এই বিষয়গুলো একাধারে উঠে এসেছে।

চীনা নেতা এটা বুঝেন যে পুতিনকে অস্ত্র সরবরাহ করলে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্কের আরো অবনতি হবে, এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথেও একটি বড় ফাটল সৃষ্টি করবে। বেইজিং আরো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হবে এবং তার প্রধান বাজারব্যবস্থাপনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতদসত্ত্বেও চীনকে এবার ক‚টনৈতিক কার্ড খেলতে হবে।

২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প প্রথম বিদেশী কোনো কর্মকর্তা হিসাবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট ওয়েনের সাথে ফোনালাপ করেন। তখন থেকে মার্কিন সম্পর্ক বিভাজিত হয়। এই বিভাজনে ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্য যুদ্ধ, মহামারী এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ছিল। তিনটি বিভাজন ক্ষেত্রে চীনকে কোণঠাসা করা সম্ভব হয়নি। তথাপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন যে কোনো সময় একটি উত্তপ্ত যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে।

চীন এবং রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের আরো অতীত থেকে বন্ধু হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা না হয়ে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিল এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার কথা বলেছিল। তখন সীমান্তে উভয় দেশের সেনারা অসহায় অবস্থায় মরেছিল। অন্য দিকে, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ান যুদ্ধের সময় একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল; আবার পরবর্তীকালে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের’ বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিল!

বেইজিং ও মস্কোর প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে বিবেচিত পশ্চিমা জোটগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে বলে চীন ঘোষণা দেয়ার পর এই প্রস্তাব দেয়। চীন নিরপেক্ষ থাকার দাবি পুনর্ব্যক্ত করছে। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির ইউক্রেনে আগ্রাসনের জন্য পশ্চিমা সরকারগুলো দায়ী বলে রাশিয়া যে দাবি করেছে চীনও তাতে প্রতিধ্বনি করেছে, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করেছে চীন।
মিউনিখের বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন পরিকল্পনা প্রকাশের আগে বেইজিংয়ের অবস্থান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চীন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে সহায়তা প্রদান করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে বেইজিং ‘প্রাণঘাতী সহায়তা দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে’। চীন এই অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। কেন পশ্চিমারা চীনের আবির্ভাবে উদ্বিগ্ন? কি আছে চীনের ১২ দফা প্রস্তাবে? চীনা ১২ পয়েন্ট হলো : ১. সব দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা, ২. স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা পরিত্যাগ করা, ৩. শত্রæতা বন্ধ করা, ৪. শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা, ৫. মানবিক সঙ্কট সমাধান, ৬. বেসামরিক ও যুদ্ধবন্দীদের সুরক্ষা, ৭. পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সুরক্ষিত রাখা, ৮. কৌশলগত ঝুঁকি হ্রাস করা, ৯. শস্য রফতানি সহজতর করা, ১০. একতরফা নিষেধাজ্ঞা বন্ধ করা, ১১. শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখা এবং ১২. সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠনকে উৎসাহিত করা।

চীনের প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি রয়েছে। চীনের পয়েন্টের মধ্যে অনেকগুলো খুব সাধারণ বরং বলা যায় কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নেই। তবে চীনের প্রস্তাবের মধ্যে সব দেশের সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখার বিষয়টি জটিল। কেননা এখানে ক্রাইমিয়া যেমন রয়েছে তেমনি রাশিয়ার অধিকৃত অন্যান্য নতুন এলাকা ও রাজ্য রয়েছে। আরো জটিল হলো যুক্তরাষ্ট্র চীনের একক সার্বভৌত্বকে স্বীকার করে তাইওয়ানে সম্পর্ক রাখার চুক্তিতে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন হিসাবে বিবেচনা করে এখন তার পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালিত করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় থেকে এটি মারাত্মক পরিণতির দিকে ধাবমান হয়। বাইডেনের আমলেও তা বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বেড়ে চলেছে। চীনের সার্বভৌমত্ব প্রস্তাবের ভিতর সেটিও লুকিয়ে রয়েছে। সুতরাং ধরে নেয়া যায় চীনের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরিসীমায় অর্থহীন হয়ে পড়বে।

চীনের প্রস্তাবে আরো একটি বিষয় জটিলতর হয়েছে। সেটি ন্যাটো জোটের পূর্বদিকে অগ্রসরমান স্পৃহা। ন্যাটো মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় সামরিক জোট। ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশ যুদ্ধে জড়ালে সেটি জোটের ওপর প্রভাব পড়বে। ইউক্রেন জোটে যোগ দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যোগদান না করলেও সব কাজকর্ম ন্যাটোর সদস্যের মতো। ইউক্রেন ইতঃপূর্বে ন্যাটোর বিভিন্ন যুদ্ধে সেনা পাঠিয়েছিল। এমনকি আফগানিস্তান যুদ্ধে ইউক্রেন সেনারা ন্যাটোর পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। আজ তারই ফলশ্রুতিতে আফগানিস্তানের বেসরকারি সেনাবাহিনী রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছে।

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির চীনা পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিভাগের অধ্যাপক লি মিংজিয়াং বলেন, ‘চীনা নীতির মৌলিক সুর ও মৌলিক বার্তা রাশিয়াপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে চীন তার অবস্থান সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, রাশিয়ার হামলার আগে শি এবং পুতিন গত বছর বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন এবং একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন- তাদের সরকারের বন্ধুত্বের ‘কোনো সীমা নেই’। চীন যে সেদিকেই মোড় নিয়েছে সেজন্য পশ্চিমারা চিন্তিত বৈ কি।

বলা যায়, রাশিয়ার প্রতি চীনের সমর্থন মূলত রাজনৈতিক। বেইজিং জাতিসংঘে মস্কোর নিন্দা করার প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে সহায়তা করেছে। বর্তমানে রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, চীন ইতোমধ্যে অ-প্রাণঘাতী সহায়তা দিচ্ছে এবং আরো কিছু করতে পারে। উল্লেখ্য, আগ্রাসনের পর থেকে রাশিয়া ও চীনা বাহিনী যৌথ মহড়া চালিয়েছে। ব্লিঙ্কেন মিউনিখ বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূত ওয়াং ই’র কাছে বলেছেন, ‘এটি একটি গুরুতর সমস্যা হবে।’

ওই আলোচনার কয়দিন পর তাইওয়ানে হঠাৎ ৩০০ জন সেনা পাঠিয়ে আরেকটি ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, আগে সেখানে মাত্র ১২ জন মার্কিন প্রশিক্ষক কাজ করতেন। একই সাথে প্রচুর যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হয়েছে যা আগে কখনো করা হয়নি। এর আগে ২০১৯ সালের ৩০ মে তাইওয়ানের সেনারা হান কুয়াং মিলিটারি অনুশীলনের সময় মার্কিন লাইভ হুইটজার নিক্ষেপ করলে চীনের সেনাবাহিনী উত্তেজিত হয়ে তাইওয়ানের পিয়াংটুং আক্রমণ করতে রওয়ানা দেয়। তখন মহড়া বন্ধ করে তাইওয়ানি সেনারা ফিরে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন টুইট বার্তায় জানান, ৩০ হাজার মার্কিন সেনা তাইওয়ানে অবস্থান করছে।

চীনারা তখন তাইওয়ান ঘিরে ফেলার উদ্যোগ নিলে টুইট বার্তাটি মুছে ফেলা হয়। অবশ্য এই বিপুল সংখ্যক সেনা প্রসঙ্গে কোনো মার্কিন সরকারি ভাষ্য নেই। যদি এমন ঘটনা ঘটতেই থাকে তবে চীন তাইওয়ান আক্রমণ করবে। চীনের কাছে ইউক্রেন ইস্যুর চাইতে তাইওয়ান ইস্যু বড়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইউক্রেন, ক্রাইমিয়া ইস্যু দিয়ে মস্কোকে নাজেহাল ও দুর্বল করা যাবে এবং তাইওয়ান দিয়ে চীনকে নাজেহাল করা যাবে।

ন্যাটো প্রধান বলেছেন যে, চীন মস্কোতে অস্ত্র সরবরাহ করলে সেটি হবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। তবে তাইওয়ানে পশ্চিমারা যে অস্ত্র ও সেনা প্রেরণ করছে তাতে কোনো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে কিনা সে সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

ভারতে অনুষ্ঠিত চলতি ২ মার্চ জি২০ বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে ওঠেন, জি২০ কি কখনো তার নথিতে ইরাকের ঘটনার প্রতিফলন ঘটিয়েছে? জি২০ তৈরিই হয়েছিল অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। আজ সবাই ইউক্রেন নিয়ে কথা বলছে। রাশিয়ার মন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি কখনো আমেরিকা বা ন্যাটোর কাছে জানতে চেয়েছেন তারা আফগানিস্তান, ইরাক বা ইরানে কী করেছে? ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ায় কখন বোমা ফেলা হয় তা তাদের কি মনে নেই। আমরা আসলে একটা যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য লড়াই করছি। ইউক্রেনে যখন রাশিয়ার ভাষা বাতিল হলো, কেউ তো আঙুল তোলেননি। আপনারা কি ভাবতে পারেন আয়ারল্যান্ড থেকে ইংরেজি উঠে যাচ্ছে?’ ব্লিঙ্কেনসহ কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার কথার কোনো জবাব দেননি।

সমালোচকরা বলছেন, চীনের প্রস্তাব নাটকীয় কূটনৈতিক অগ্রগতি যা শান্তির পথ দেখায়, তা সত্ত্বেও প্রচ্ছন্নভাবে ইঙ্গিত দেয় যে বেইজিং রাশিয়ার আরো নিকটবর্তী হয়েছে। চীনের ১২ পয়েন্টের মধ্যে প্রথম তিনটি বিষয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে তারা মন্তব্য করেছেন যেখানে চীন সব দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার কথা তুলেছেন, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের কথা যেমন বুঝা যায় তেমনি আমেরিকার ইরাক, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশ আক্রমণ করার বিষয়গুলোও প্রচ্ছন্ন রয়েছে। তারা মনে করেন দ্বৈত মানদণ্ড প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

চীন স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা পরিত্যাগের কথা বলেছে। এটি ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও পূর্ব ইউরোপে তাদের মোতায়েনকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব পূর্বদিকে প্রসারিত হওয়া বন্ধ করতে পারে। শত্রুতা বন্ধ করা মানে পশ্চিমাদের ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করা এবং রাশিয়ার জন্যও যুদ্ধবিরতির আহ্বান। চীনের এই প্রস্তাব ও অবস্থানে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না বলে তারা মনে করেন।

ওয়াশিংটনের জন্য, পুতিনের জয় বা পরাজয় উভয় পরিস্থিতিই সমান মাত্রার সমস্যায় ভরা : পুতিন যদি জয়ী হন, তবে যুক্তরাষ্ট্র লজ্জিত বোধ করতে পারে এবং ইউরোপে পুতিনের আরো প্রভাব সম্পর্কে ভয় পেতে পারে, অন্যদিকে পরাজিত পুতিন পরাজয়ের লজ্জা ঢাকতে পারমাণবিক বিকল্পের আশ্রয় নিতে পারে- দুটি দৃশ্যই সমান ভয়ঙ্কর। রাশিয়া এখন পর্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে সফলভাবে নিজেকে রক্ষা করেছে এবং জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি বড় প্রতিবেশীর তুলনায় তার অর্থনীতি ভালো প্রবৃদ্ধির হার দেখিয়েছে। পশ্চিমারা যে হিসাব করেছিল রাশিয়ায় বরং তার উল্টোটা হয়েছে।

সুতরাং, ইউক্রেনকে অত্যন্ত উদার আর্থিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে এবং জেলেনস্কিকে একটি শান্তি চুক্তির টেবিলে না বসিয়ে ওয়াশিংটনের কাছে এই সঙ্ঘাতকে লালন-পালন করার বিকল্প কী? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের সাথে দ্বিধা হলো যে তারা রাশিয়ার সামরিক শক্তির সামনে ইউক্রেনকে গলে যেতে দেয়ার জন্য তাদের সহায়তা কেড়ে নিতে পারে না বা ন্যাটো এই মুহূর্তে রাশিয়ার সাথে সরাসরি সংঘর্ষের অবস্থানে নেই। চীনের উপস্থিতি যুদ্ধ বা শান্তির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ভূরাজনীতি ও ব্লক রাজনীতিতেও পরিবর্তন আনবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ



premium cement