২১ মে ২০২৪, ০৭ জৈষ্ঠ ১৪৩১, ১২ জিলকদ ১৪৪৫
`


সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপ্রধান ইতিহাসের কাঠগড়ায়

পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল (অব:) পারভেজ মোশাররফ। - ছবি : নয়া দিগন্ত

পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল (অব:) পারভেজ মোশাররফ (৭৯) অ্যামাইলয়েডোসিস নামে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে দুবাইয়ে মারা গেছেন ৫ ফেরুয়ারি-২০২৩। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করুন। এ রোগে মানব শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যেতে থাকে। ২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অ্যামেরিকান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি ৯ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করেন। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে পাকিস্তানে যারা সামরিক শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। এর আগে ইস্কান্দার মির্জা, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও জিয়াউল হক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে স্বৈরশাসন চালু করেন। কোনো সামরিক শাসককে তাদের অপরাধের জন্য জবাবদিহি করতে হয়নি। এককালের প্রতাপশালী সেনাশাসক মোশাররফ এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিস্মৃত ব্যক্তি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই ৭৫ বছরের ইতিহাসে দেশটির ক্ষমতা ৩৪ বছরই কুক্ষিগত করে রাখে সেনাবাহিনীর জেনারেলরা।

১৯৯৮ সাল পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিয়া নওয়াজ শরিফ দু’জন জেনারেলকে ডিঙ্গিয়ে দেশটির সেনাপ্রধান হিসেবে পারভেজ মোশাররফকে নিয়োগ দেয়ার এক বছরের মাথায় তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নওয়াজ শরিফের সরকারকে উৎখাত করে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। পারভেজ মোশাররফকে সেনাপ্রধান করা ছিল নওয়াজ শরিফের মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল। মিয়া মুহাম্মদ শরিফ, নওয়াজ শরিফ, শাহবাজ শরিফসহ পরিবারের সব সদস্যকে সৌদি আরবে নির্বাসনে পাঠান মোশাররফ। তিনি শরিফ পরিবারের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেন এবং দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেন।

তিনি দু’বার সংবিধান স্থগিত করেন এবং দেশটির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন। ২০০১ সালের জুনে পাকিস্তানের দশম প্রেসিডেন্ট হন এই সেনাশাসক। তার শাসনামলে পাকিস্তানে কর্তৃত্ববাদী শাসন বাড়তে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করা হয়। ঘটনাটি আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মোশাররফের চেয়ার নড়বড়ে হয়ে ওঠে। ওই বছরের ২০ জুন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি ইফতিখার মুহাম্মদ চৌধুরীকে তার পদে পুনর্বহাল করেন এবং মোশাররফের বরখাস্তের আদেশ বাতিল করেন। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি পরমাণুবিজ্ঞানী ড. আবদুল কাদির খানকে গৃহবন্দী করে রাখেন এবং বেলুচিস্তানের সাবেক গভর্নর নওয়াব আকবর খান বুগতির হত্যাকাণ্ড তার নির্দেশে সংঘটিত হয়।

২০০৭ সালের শেষ দিকে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো নিহত হলে তিনি কিছুটা বেকায়দায় পড়েন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এতে তার হাত রয়েছে। দেশব্যাপী সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে পারভেজ মোশাররফ জাতীয় নির্বাচন স্থগিত করে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে কঠোর হাতে প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের দমন করা ছিল তার শাসনের বৈশিষ্ট্য। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর আতঙ্কিত হয়ে পড়া পশ্চিমা দেশগুলোকে শর্তহীন সমর্থন দেয়ায় ওইসব দেশে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ঘনিষ্ঠ মিত্রে’ পরিণত হন। আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানে সমর্থন ও সহযোগিতা করার জন্য পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার মুখে পড়েছিলেন পারভেজ মোশাররফ। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল পাকিস্তানের আদালত, যদিও পরে সেটি বাতিল হয়ে যায়। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর পেশোয়ার হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ওয়াকার আহমদ শেঠ তার প্রদত্ত রায়ের ৬৬ অনুচ্ছেদে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে পলাতক অপরাধী পারভেজ মোশাররফকে গ্রেফতার করে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং মৃত পাওয়া গেলে তার মৃতদেহ ইসলামাবাদের ডি-চকে টেনে এনে তিন দিন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেন।

আল-কায়েদার সাথে যোগাযোগ থাকার কথিত অভিযোগে ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. আফিয়া সিদ্দিকাকে মার্কিন বাহিনীর হাতে তুলে দেন পারভেজ মোশাররফ। অসামান্য ধীসম্পন্ন পিএইচডিধারী এ মহিলার সম্মানসূচক ডিগ্রি ও সার্টিফিকেট রয়েছে প্রায় ১৪৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিউরোলজি বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। তিনি হাফিজে কুরআন ও আলিমা। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে পারদর্শিনী এ নারী ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত দ্বীনদার। ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে তার দৃঢ় অঙ্গীকার। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই মোশাররফের সহযোগিতায় ড. আফিয়াকে তার তিন সন্তান আহমদ, সুলায়মান ও মরিয়মসহ করাচির রাজপথ থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাকে আফগানিস্তানের কুখ্যাত বাগরাম সামরিক ঘাঁটিতে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এরপর চলে তার ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। বাগরামে মার্কিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা বলেছেন, নির্যাতনের সময় একজন নারী বন্দীর আর্তচিৎকার অন্য বন্দীদের সহ্য করা কষ্টকর ছিল। ওই নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে অন্য বন্দীরা অনশন পর্যন্ত করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে আফিয়াকে আমেরিকায় স্থানান্তরিত করে নিউ ইয়র্কের এক গোপন কারাগারে রাখা হয়। এখন তিনি আছেন টেক্সাস স্টেটের এক কারাগারে। অব্যাহত নির্যাতনের ধকল সইতে না পেরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। প্রথম থেকেই তিন সন্তানকে তার থেকে পৃথক রাখা হয়েছে। আজো তিনি জানেন না তার সন্তানরা কোথায়? তারা আদৌ বেঁচে আছেন কি না। তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের চেয়ারম্যান ইমরান খান এক সময় দাবি করে বলেছিলেন, তার দুই সন্তান মার্কিননিয়ন্ত্রিত আফগান কারাগারে অত্যাচারে মারা গেছে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা ড. আফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’

২০০৭ সালের ৩ জুলাই জেনারেল মোশাররফের নির্দেশে সেনা কমান্ডোরা করাচির লাল মসজিদ চত্বরে জামিয়া হাফছার প্রিন্সিপাল, শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের দমনের উদ্দেশে ব্যাপক আকারে ফসফরাস বোমা নিক্ষেপ করে। এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কারণে পাকিস্তানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ বীভৎস ও নিষ্ঠুরতম ঘটনা পারভেজ মোশাররফের শাসনামলের কালো অধ্যায়। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারবেন না। সেনা হামলার ফলে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের দেহ কেমিক্যালের বিক্রিয়ায় পুড়ে ও ঝলসে কালো আকার ধারণ করে কিন্তু পরিধেয় বস্ত্র রয়ে গেছে অক্ষত। আহতদের দেহে নতুন নতুন ব্যাধির উপসর্গ দেখা দেয়। শ্বাসকষ্ট, অন্ত্রজ্বালা, ত্বকপ্রদাহ, বৃক্ক ও যকৃৎ সমস্যা এবং নানা অজানা রোগে তারা আক্রান্ত হন। নিহত ব্যক্তির মরদেহে যে সব মাছি বসেছিল তাৎক্ষণিকভাবে তাও মারা গেছে। সরকারি-বেসরকারি আলোকচিত্রীদের তোলা ছবিতে তা স্পষ্ট। গোলার প্রচণ্ড আঘাতে যেসব মৃতদেহ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে, পরিচয় বের করা সম্ভব হয়নি, পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আত্মীয় স্বজনদের লাশ হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু লাশের প্যাকেট খুলে দেখা গেল, বহু মরা মাছি। জামিয়া হাফছার বিভিন্ন দেয়ালে এক বিশেষ ধরনের কালো দাগ বহুদিন যাবৎ দৃষ্টিগোচর হতো। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শহর ও আবাসিক এলাকায় ফসফরাস বোমা নিক্ষেপ দণ্ডনীয় অপরাধ। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জামশিদ গুলযার কিয়ানি তখন লাল মসজিদ পরিদর্শন শেষে বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, লাল মসজিদ অপারেশনে ফসফরাস বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল। জেনারেল জামশিদ ছিলেন পারভেজ মোশাররফের ঘনিষ্ঠজন (দৈনিক উম্মত, করাচি, ১৩ জুন, ২০০৮)।

লাল মসজিদে রক্তাক্ত অভিযানের পর আত্মঘাতী বোমা হামলায় পুরো পাকিস্তানে ৭৪০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ চার হাজার ৩০০ মানুষ প্রাণ হারান। সে সময়ের সাবেক কেন্দ্রীয় ধর্মমন্ত্রী ইজাজ-উল-হক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘লাল মসজিদ অভিযানের সময় যে ষড়যন্ত্র দানা বেঁধেছিল তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ছাত্রছাত্রী কর্তৃক লাইব্রেরি দখলের সময়ই লাল মসজিদ সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন ছিল। এ দুর্ঘটনা ছিল একটি ষড়যন্ত্র এবং এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য-প্রকৃতি উন্মোচিত হওয়া দরকার। আমি লাল মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও সরকারের মধ্যে একটি সেতুবন্ধের চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু দুর্ঘটনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে দেয়।’ (The International News, Saturday, July 05 & May 07, 2008, Islamabad (APP).

পারভেজ মোশাররফ নিরপেক্ষ কোনো কমিশন দিয়ে বেদনাদায়ক এ হত্যাযজ্ঞের অনুপুঙ্খ তদন্তের ব্যবস্থা করেননি। এ সংঘর্ষে আসলে কতজন মারা গেল, কতজন আহত হলো, তা এখনো জানা যায়নি। অভিযানের পর পাকিস্তান সরকার কোনো বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধি ও সাংবাদিককে মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে দেয়নি। বিবিসির মতে, মৃতের সংখ্যা ১৭৩। বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা এক হাজার। মসজিদ কমপ্লেক্স পুনরায় খুলে দেয়ার পর বহু শিশুর বিচ্ছিন্ন হাড়গোড় পাওয়া গেছে।

লাল মসজিদের সঙ্কট নিরসনে সেনা অভিযান কি অপরিহার্য ছিল? আলোচনার মাধ্যমে কি ঘটনার নিষ্পত্তি করা যেত না? এমনতরো প্রশ্ন ওয়াকিবহাল মহলের। মাওলানা আবদুর রশিদ গাজি প্রথম দিকে নিজের অবস্থানে অনড় থাকলেও শেষ পর্যায়ে সমঝোতা করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু জেনারেল মোশাররফ তাকে বাঁচতে দেননি। আলোচনা অসমাপ্ত রেখে কেবল তাকে হত্যা করার জন্য গভীর রাতে সেনা অভিযানের নির্দেশ দেন। এতে বিদেশী প্রভুরা বেজায় খুশি হয়। গাজিসহ জামিয়া হাফছায় অধ্যয়নরতা বহু ছাত্রীর তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেল। এ ঘটনায় পাকিস্তানের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অথচ অতীতে ভারত সরকার এর চেয়েও মারাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। সমঝোতা ও চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় নেতারা সমস্যা নিরসনে বিজ্ঞতার পরিচয় দেন ও সফলতা লাভ করেন। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুফতি সাঈদের মেডিক্যাল কলেজপড়ুয়া মেয়ের অপহরণ, হজরতবাল মসজিদ অবরোধ ও পাকিস্তানের মাওলানা মাসউদ আজহারের ভারতীয় জেল থেকে মুক্তির প্রসঙ্গ এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

লাল মসজিদ ও জামিয়া হাফছার পরিচালক গাজি ভ্রাতৃদ্বয়ের ভূমিকা কতটুকু যৌক্তিক, হিকমতপূর্ণ ও শরিয়তসম্মত এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। কিন্তু আমরা নির্দ্বিধায় এ কথা বলতে পারি, প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ ঠাণ্ডা মাথায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতেন। নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সেনা অভিযান চালানোতে কোনো কৃতিত্ব নেই, পাকিস্তানি জেনারেলদের এখনো এ উপলব্ধি আসেনি। ২৫ মার্চ অন্ধকার রাতে জেনারেলদের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের নিরীহ জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নিজ দেশের জনগণকে তারা শত্রুতে পরিণত করে দেয়। পরিণতিতে ১৬ ডিসেম্বর তাদের এক লাখ সেনাসদস্যকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়। লাল মসজিদ ও জামিয়া হাফছায় সশস্ত্র সেনা অভিযানের খেসারত একদিন পাকিস্তানি জেনারেলদের দিতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলে এ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়তো রোধ করা যেত।

লাল মসজিদ সন্নিহিত এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ প্রকাশ্যে অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যক্রম চলে আসছিল। বেশ্যালয়, ম্যাসেজ পার্লার, পর্নো সিডির দোকান গড়ে উঠে। শরিয়তবিরোধী এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের দাবিতে আন্দোলন চাঙ্গা হয়। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে অনাকাক্সিক্ষত এ ঘটনা এড়ানো যেত। কিন্তু সরকারের নির্লিপ্ত ভূমিকায় বিক্ষুব্ধ জামেয়া হাফছার ছাত্রীরা লাঠি হাতে রাজপথে নেমে আসে এবং এক পর্যায়ে বেশ্যালয়ে হামলা চালিয়ে চীনা মহিলাদের মারধর করে। বেশ্যালয়ের ম্যানেজারসহ কয়েকজন যৌনকর্মীকে ধরে নিয়ে আসে। নারী-পুরুষের নগ্ন ছবি বিক্রির একটি সিডির দোকান ভাঙচুর করে। পুলিশ বাড়াবাড়ি করলে তাদের কিছু সদস্যদের ধরে নিয়ে আসা হয়। সরকারের অনুরোধে পুলিশসহ আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেয়া হয়। এর পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। সরকার হার্ডলাইনে চলে যায়। (http://islamabad.metblogs.com/2007/03/29/the-lal-masjid-controversy.)।
মোশাররফ লিখিত ‘ইন দ্য লাইন অব ফায়ার’ আত্মজীবনীটি বেশ বিতর্ক তৈরি করে দেশে-বিদেশে। তার পরিবেশিত তথ্য অনেক ভুলে ভরা বলে মন্তব্য করেছেন বিদগ্ধজনরা। জনৈক পাকিস্তানি আমলার ছেলে হুমায়ুন গওহর হচ্ছেন এ গ্রন্থের নেপথ্য লেখক। তথ্য-উপাত্ত ভুল থাকায় দায়িত্বে থাকা সম্পাদককে এগুলো পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল (Ved, Mahendra (22 Sept, 2096) Pen that fires, The Times of India, 24 Dec,2011)।

ইসলামী কৃষ্টি ও মূল্যবোধ প্রভাবিত পাকিস্তানি সমাজকে ‘আলোকিত মধ্যপন্থার’ জীবনধারা গ্রহণের নামে পাশ্চাত্যকরণের পারভেজ মোশাররফের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সিগারেট ও আমদানি করা হুইস্কির প্রতি তার ঝোঁক ছিল (রয়টার্স, ইসলামাবাদ, ৬ ফেব্রুয়ারি-২০২৩)। তার শাসনামলের নেতিবাচক দিকগুলো তার ইতিবাচক দিকগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে। তার কর্মকাণ্ডের আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করলে ইতিহাসের রায় তার বিপক্ষে যাবে। পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বিপন্ন করার দায়ভার তাকে বহন করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক
drkhalid09@gmail.com


আরো সংবাদ



premium cement