২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০, ১২ শাবান ১৪৪৫
`

লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন

লেখক : জয়নুল আবেদীন - ফাইল ছবি

২০ এপ্রিল ২০২২ মল্লিকা আমাকে লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। মল্লিকা এশিয়া স্পেসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মাসিতে স্নাতক, অ্যাংলিয়া র‌্যাস্কিন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ, কিংস্টোন ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রাপ্তির পরও সুইডিশ ভাষা শিক্ষাসহ লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কারণটা ভিন্ন। কিছু দেশ আছে যারা নিজের ভাষাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই বাধ্য হয়ে ইউনিভার্সিটিসহ সুইডিশ ভাষা শিক্ষা কোর্সেও ভর্তি হতে হয়েছিল। আমাদের তৃতীয় বিশ্বের অনেকে এরকম বাধ্য হয়েই এডুকেশন ভিসা নিয়ে থাকেন। লিনিয়াস বিশ্ব বিদ্যালয়ের চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন গলদঘর্ম হওয়ার কথা।

ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান (১৯৮১ থেকে ১৯৮৪) তখন আমি পরীক্ষার্থী। আমার সম্পর্কিত ভাগিনাও বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। ভাগিনা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায়য়ে ক্লাস করত, আর ভাগিনাকে অনুসরণ করতাম আমি। মাস্টার্স চূড়ান্ত পর্বের ভাইভা পরীক্ষা হয়েছিল কলা ভবন দ্বিতীয় তলায়। ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় যখন প্রবেশ করি তখনই প্রথম দেখি ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ স্যারকে। শ্মশ্রুশোভিত সুন্দর মুখমণ্ডলের দিকে চোখ পড়তেই ভয় কমতে থাকে। আমার পরিচয় নিয়ে তিনিই প্রথম প্রশ্ন শুরু করেন। প্রথমেই অমিত্রাক্ষর ছন্দ। সংজ্ঞাসহ উদাহরণ দিতে বলেন। উত্তর দিতে গিয়েই দ্বন্দ্ব শুরু। দ্বন্দ্ব, অমৃত (অমরত্ব), অমৃত (অতিশয় সুস্বাদু খাদ্য) ও অমিত্র (পৃথক) এই তিন শব্দের মধ্যে। আমার কণ্ঠ থেকে শুদ্ধ উচ্চারণ বের হওয়ার আগেই চুলের গোড়া দিয়ে লোনা পানি বের হতে শুরু করে। শব্দ তিনটি পৃথকভাবে লিখতে দিলেন। জগাখিচুড়ি লেখতে গিয়েও।

জগাখিচুড়ি যখন তুঙ্গে তখনই ধরে নিয়েছিলাম, আমি শেষ। আমার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে জানতে চাইলেন, আমি সরব (স্বশব্দ) পাঠ করি করি, না নীরব (নিঃশব্দ) পাঠ করি। উত্তরে আমি কারণসহ জানাই, আমি নীরব পাঠ করি। বুঝতে পারলেন, গলদ শিক্ষায় নয়, গলদ নীরব পাঠে। নীরব পাঠের কারণে উচ্চারণ জড়তাসহ বানান ভুলের সম্ভাবনা বেশি।

ভাইভায় টিকে গেলাম। যে সপ্তায় ভাইভা ঠিক পরের সপ্তায় অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষা। ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ স্যার গোড়ায় গলদ বুঝতে পেরেছিলেন বলে রক্ষা। সেদিন থেকেই তার স্বর্গীয় মুখচ্ছবি হৃদয়ের পর্দায় স্থায়ী দাগ রেখে যায়, মনে করলেই চোখের সামনে চলে আসে। জীবনসায়াহ্নে পৌঁছেও যে শিক্ষকের মুখচ্ছবি শিক্ষার্থীর মানসপটে দোলা দেয় তিনিই সুশিক্ষক। সুশিক্ষা ছাড়া কখনো সুশিক্ষক হয় না। সুশিক্ষা বলতে সেই শিক্ষাকে বোঝায় যে, মানুষ বাস্তব ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগাতে পারে। অর্থাৎ বইয়ে যা পড়েছেন ‘সদা সত্য কথা বলিও, ঈশ্বরকে বন্দনা করো, অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো’-এসবের অর্থ বাস্তজীবনে যিনি প্রয়োগ করবেন তিনিই সুশিক্ষিত। একজন সুশিক্ষক থেকেই বের হয়ে আসে অজস্র সুশিক্ষিত।

স্বশিক্ষিতের সংজ্ঞা আলাদা। যিনি নিজ আগ্রহে লেখাপড়া করেন তিনি স্বশিক্ষিত। নিজ আগ্রহে লেখাপড়া না করে কেউ বড় হতে পারে না। যারা বড় হয়েছেন তাদের অনেকেই স্বশিক্ষিত। স্বশিক্ষিত ব্যক্তিরা শুধু শীর্ষেই ওঠেননি, সাহিত্যে নোবেলও পেয়েছেন। আমাদের কাছের মানুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বশিক্ষিত। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যা রবীন্দ্র প্রতিভায় সমৃদ্ধ হয়নি। সুদীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনে লিখেছেন বিরামহীন। রবি ঠাকুরের বয়স যখন ১৩ বছর, সে সময় থেকেই শুরু হয় তার লেখালেখি। পারিবারিক পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের পড়াশোনা শুরু হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়ে। সে সময় বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ থেকে ‘করখল’, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ পড়ার সময় প্রথম কাব্যানুভূতি লাভ করেন তিনি। উৎসাহ দানসহ উসকানি দিয়ে কৈশোর মনে ঘুমিয়ে থাকা শৈল্পিক সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছেন নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবী। রবীন্দ্রনাথ স্কুলে না গেলেও প্রচুর পড়তেন, খুব কম বয়সেই তিনি পড়ে ফেলেন নীলমনি বসাক অনূদিত আরব্য উপন্যাস, পারস্য উপন্যাস, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত বেতালপঞ্চবিংশতি, ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রুশো, মধুসূদন মুখোপাধ্যায় রচিত সুশীলার উপাখ্যান, মৎস্যনারীর কথা, উমাচরণ মিত্রের গোলেবকাওলি, হরিনাথ মজুমদারের লেখা বিজয় বসন্ত, হরিশ্চন্দ্র তর্কালঙ্কারের রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বোধোদয়, সীতার বনবাস, অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ, পদার্থবিদ্যা, সাতকড়ি দত্তের প্রাণী-বৃত্তান্ত, লোহারাম শিরোরতের বাঙ্গালা ব্যাকরণ, হরিশ্চন্দ্র নিয়োগীর দুঃখ সঙ্গিনী, বিহারীলাল চক্রবর্তীর সারদামঙ্গল, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের পালামৌ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মন্দ্রা, আষাঢ়ে, দীনেশচন্দ্র সেনের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র সিরাজউদ্দৌলা, সরযুবালা দাশগুপ্তের বসন্ত প্রয়াণের মতো আলোচিত বই। পড়া থেকেই লেখার বীজ রোপিত হয়। শুর হয় লেখালেখিও। ১৯১২ সালে প্রকাশিত গীতাঞ্জলি ১২১৩ সালে কবি নিজে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন- ১৯১৩ সালেই গীতাঞ্জলি কাব্যের ওপর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আরো একজন স্বশিক্ষিত সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তার নাম Harry Edmund Martinson হ্যারি এডমুন্ড মার্টিনসন। In October 1974 it was announced that the Nobel Prize in Literature for the year had been awarded to Harry Martinson and Eyvind Jhnson যিনি ছোটতেই এতিম হয়ে অন্যের কাছে প্রতিপালিত হন। সামান্য লেখাপড়া। ১৬ বছর বয়সেই পালিয়ে সমুদ্রে গেছেন।

এরপর যার নাম আসবে তাকে সবাই চেনেন। বাংলা এক অক্ষরে যার নাম, তিনি ‘শ’। পুরো নাম জর্জ বার্নার্ড শ, George Bernard Shaw.-ও নোবেল পান সাহিত্যে। কলেজে থাকার সময় লেখাপড়া ছাড়েন এবং সারাজীবন স্কুল-কলেজ ও শিক্ষকদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছেন। তার কথায় ÔSchools and schoolmasters, as we have them today, are not popular as places of education and teachers, but rather prisons and turnkeys in which children are kept to prevent them disturbing and chaperoning their parentsÕ শ-এর মতে স্কুল এবং স্কুলমাস্টাররা, যেমনটি আজ আমাদের কাছে রয়েছে, শিক্ষার স্থান এবং শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয় নয়; বরং কারাগার এবং যেখানে শিশুদের রাখা হয়, তাদের তত্ত্বাবধানসহ বাবা-মাকে বিরক্ত করা থেকে বিরত করতে। ‘সেন্ট জোহান’ গ্রন্থের জন্য ১৯২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পান জর্জ বার্নাড শ। লন্ডন ইউনিভার্সিটি তাকে ডক্টরেট ও স্বয়ং রাজা তাকে দিতে চেয়েছিলেন। শেকসপিয়রের পরই শ-এর স্থান।

পরিশেষে ডোরিস লেসিং একজন ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার, জীবনীলেখক ও ছোটগল্পকার। ২০০৭ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়িনী। ৮৮ বছর বয়সে এই পুরস্কার জিতে সাহিত্যে তিনি প্রবীণতম। এই লেখিকার জন্ম ইরানের কেরমান শহরে, ১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর। বাবা-মা দু’জনই ব্রিটিশ। মা ছিলেন নার্স আর বাবা চাকরি করতেন ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব পার্সিয়াতে, কেরানি হিসেবে। পরবর্তী সময়ে ভাগ্যান্বেষণে তিনি চলে যান দক্ষিণ রোডেশিয়ায়। সেখানেই কাটে শৈশব। ১৪ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিলেও নিজেকে স্বশিক্ষিত করে তোলেন লেসিং। শৈশবেই তার পরিচয় ঘটে ডিকেন্স, স্কট, স্টিভেনশন ও কিপলিংয়ের মতো সাহিত্যিকদের রচনার সাথে। পরে তিনি পাঠ করেন ডিএইচ লরেন্স, টলস্টয় ও দস্তয়েভস্কি যা তার চিন্তা ও কল্পনাকে সুবিন্যস্ত করে।

১৯৯৮ সালে আমেরিকায় প্রকাশিত তার বই ‘ওয়াকিং ইন দ্য শেড’ গ্রন্থের প্রচারণা উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনিই বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বে কাজ করে বেড়ায় এমন অনেক লোককে আমি জানি। আমার এক বন্ধু সেখানকার প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়েছিল। সে তার জুতা জড়ানো খবরের কাগজ ফেলে দিলে কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেটি ছিল এক সপ্তাহের পুরনো। তাদের কাছে সেটিই ছিল সম্পদ। মূল্যবান সম্পদ। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে একই অবস্থা। এটি অবাক হওয়ার ব্যাপার এই যে, লোকেরা কদাচিৎ একটি বই হাতে পেলে যেন চাঁদ হাতে পায়। আশ্চর্যের বিষয় এই, বই ও সাহিত্যের দিকে তাদের এত শ্রদ্ধা। একবার একটি চিঠি এসেছে গোকুই নামক এলাকা থেকে। সেখানে তারা দুই বাক্স বই নিয়ে গিয়েছিল। বইগুলো রাখা হয়েছিল একটি গাছের নিচে সেলফের ওপর। সেটিই তাদের লাইব্রেরি। বই ছিল বড়জোর ৪০টির মতো। চিঠিতে লেখা ছিল ‘বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে লোক লাইব্রেরিতে আসে পান করতে ও গিলতে। আমাদের লাইব্রেরিকে তুলনা করতে পারি জীবনের উৎস হিসেবে। একজন মানুষ পানি ছাড়া যেমন বাঁচতে পারে না তেমন বই ছাড়াও বাঁচতে পারে না। বই তাদের কাছে বৃষ্টির পানির মতো।’

তৃতীয় বিশ্বের প্রত্যন্ত এলাকার লোকজন যারা এখনো ধনের সন্ধান পায়নি তারা তাদের ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করে জ্ঞান পান করে। সস্তায় জ্ঞান বিতরণের সংবাদ শুনলেই ছুটে আসে। তৃতীয় বিশ্বের অপ্রাচুর্যহীন মানুষ যতদিন অপ্রাচুর্যের গন্ধ না পাবে ততদিনই জোতা মোড়ানো পুরোনো পত্রিকার কাগজ পড়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে। একবার অপ্রাচুর্যের গন্ধ পেয়ে গেলে ঘরে ঘরে ও মোড়ে মোড়ে বই সাজিয়ে রাখা হবে, তবে সেসব বই পড়ার জন্য নয়, শোভাবর্ধনের জন্য।’

‘বইপড়ার কেউ থাকবে না’ শিরোনামে ফেব্রুয়ারি-২০২২ জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধে আমার বক্তব্যের সাথে মল্লিকা দ্বিমত প্রকাশ করেছিল। মল্লিকার ভাষায়, পাঠক বাড়ছে। একসময় বই কিনে পাঠ করত সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষ। এখন পাঠ করে বিশ্বজুড়ে। একেকটি প্রবন্ধ লেখার সময় প্রতিদিন কত লেখকের কত লেখা পড়তে হয়, একবার মনে করে দেখুন। গুগলের কল্যাণে আপনার লেখাও ছড়িয়ে পড়ে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত। বই পাঠের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রবেশ করি লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যায় পাঠাগারে।

পাঠাগারে প্রবেশকালে-
-আব্বা, এই লাইব্রেরিতেই কেটেছে দিনের বেশির ভাগ সময়। নাশতা খেয়ে দুপুরের খাবার নিয়ে চলে আসতাম। শেকসপিয়রসহ বিশ্বের খ্যাতিমান লেখকদের বই এই লাইব্রেরিতে আছে। অল্প সময়ে বই বের করাসহ জমার পদ্ধতিও সহজ।

-এখানে বাংলাদেশের কোনো লেখকের বই আছে?
-স্টকহোম পাওয়া যাবে। এই লাইব্রেরিতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে সুইডিশ লেখিকার একটি বই আমি পড়তে নিয়েছি। বইটি বাসায় গেলে দেখতে পাবেন।

পাঠাগারের মোড়ে মোড়ে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই পাঠক। কখনো একা আবার কয়েকজন মিলে সবাই পাঠরত। খানাপিনা-বিশ্রাম, আরাম-আয়াশ সবই যেন পাঠাগারে। তা দেখে, -আমরা পাঠ ছেড়েছি, আর ওরা ধরেছে। সুইডেন ধনাঢ্য দেশ। ওদের তো বই পড়ার কথা নয়।

-ওই যে বললেন, লাইব্রেরিকে তুলনা করা হয় জীবনের উৎস হিসেবে। একজন মানুষ পানি ছাড়া যেমন বাঁচতে পারে না তেমন বই ছাড়াও মানুষ বাঁচতে পারে না। এখানে আসে জীবনের তৃপ্তি নিবারণের জন্য।
- তোমার দুই মহাদেশের চার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠে অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ রয়েছে শতাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। কয়েক দিন আগেও (৯ এপ্রিল ২০২২) এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। এ বিষয়ে তোমার মতামত কী?

-প্রশ্নটি ছোট উত্তরটি অনেক বড়। তার পরও সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করছি।
প্রথমত, বাংলাদেশ ও সুইডেনের শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য। ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য ছিল মাস্টার্স করা, চাকরি পাওয়া বা আরো ভালো করতে চাইলে পিএইচডি করা। এই মনোবৃত্তি ব্রিটিশ আমল থেকে। এক সময় আমরা ব্রিটিশদের তথাকথিত সভ্যতার স্তরে পৌঁছানোর জন্য সিঁড়ি খুঁজতাম। এসব ডিগ্রি ব্রিটিশদের বানানো সিঁড়ি যে সিঁড়ি বেয়ে সাধারণ চাকর থেকে অসাধারণ চাকর হওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, আমরা বেশির ভাগ সময় আসল এবং নতুন কিছু করার পরিবর্তে অন্যদের অনুকরণ করি। এর জন্য সমাজও দায়ী। কেউ ভিন্ন কিছু করতে চাইলে আমরা তাকে উপহাস করি। উপহাস করি যদি কেউ কলেজ থেকে ঝরে পড়তে চায় এবং ব্যবসায় শুরু করতে চায়। আমি একজনকে চিনতাম যে নিকেতনে চা-বিক্রি করে মাসিক ৫০ হাজার টাকা লাভ করত, যেখানে বাংলাদেশে একজন নতুন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শুধু ১৮ হাজার টাকায় চাকরি শুরু করেছিল।

তৃতীয়ত, একজন ব্যক্তি তার জীবনে কী অর্জন করতে চায় এবং দেশ এটি থেকে কী অর্জন করছে। সুতরাং অর্থনীতি, উন্নয়ন, উদ্ভাবন, অধ্যয়ন সব কিছুই পরস্পর সম্পর্কিত। বাংলাদেশের এসএসসি শিক্ষার্থী সমতুল্য বয়স পর্যন্ত বয়সেই তাদের ক্যারিয়ারের পথ বেছে নেয়। তারা জীবনে কতটুকু অর্জন করতে চায়? কেউ যদি শুধু একটি ভালো জীবনযাপন করতে চায়, তারা একটি পলিটেকনিক্যাল কোর্স করতে পারে এবং একটি ভালো জীবনযাপন করতে পারে। একটি পলিটেকনিক্যাল কোর্স ছয় মাস থেকে দুই বছর দীর্ঘ হতে পারে। কেউ যদি আরো ভালো উপার্জন করতে চায়, তারা তিন বছরের একটি স্নাতক কোর্স সম্পন্ন করার জন্য এগিয়ে যায়। শুধু ভালো বেতনের চাকরি করতে হলে তিন বছরের স্নাতক ডিগ্রিই যথেষ্ট। তার পর রয়েছে মাস্টার্স কোর্স।

-ব্রিটিশদের সৃষ্টি করে যাওয়া সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তন করা হয়েছে।
-টেকনোলজি যেভাবে কমিয়ে দিয়েছে কায়িক শ্রম সেভাবে বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি কমিয়ে দিয়েছে মানসিক শ্রম। এখন যে হারে পাসের হার বাড়ছে সে হারে কমছে মেধার হার। অর্থাৎ এসি চলছে, ঠাণ্ডা বের হচ্ছে না। বিদেশে প্রোগ্রাম পদ্ধতিকে অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা হয়। পুরো প্রোগ্রামটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, এটি শিক্ষার্থীকে নতুন ধারণা এবং চিন্তাভাবনা তৈরি করতে উৎসাহিত করবে এবং বাধ্য করবে।

এখানে একটিও লিখিত পরীক্ষা হয় না। পরিবর্তে এখানে প্রচুর সেমিনার, গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট, সাহিত্য পর্যালোচনা ইত্যাদি হয়। আমি আপনাকে ‘ব্যবসায়’ নিয়ে একটি কোর্সের উদাহরণ দিই। একটি কোর্সের শুরুতে, আমরা একটি ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে আসার জন্য একটি প্রকল্প পাই এবং গ্রুপে এটি নিয়ে কাজ শুরু করি। কোর্সের অধীনে আমরা একটি ব্যবসায় শুরু করার মূল উপাদানগুলো কী তা নিয়ে বেশ কয়েকটি বক্তৃতা করি। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাকাউন্ট, ইনভেন্টরি, এইচআর, মূল কর্মক্ষমতা সূচক, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা ইত্যাদি। সুতরাং আমরা এটির ধারণা পেতে পারি এবং সেই তাত্ত্বিক জ্ঞানকে আমাদের প্রকল্পে বাস্তবায়ন করতে হবে। চূড়ান্ত জমা দেয়ার আগে বেশ কয়েকটি উপস্থাপনা ছিল।

প্রতিটি উপস্থাপনা শেষে, প্রশ্ন-উত্তর ও প্রতিক্রিয়ার সময় ছিল। প্রতিটি গ্রুপ ও কোর্স শিক্ষক এবং একজন অতিথি শিক্ষক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনা সম্পর্কিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল। তারপরে প্রতিটি দল কোনটি ভালো, কোনটি খারাপ এবং ধারণাটিকে কিভাবে আরো উন্নত করা যেতে পারে সে সম্পর্কে আইআর উপস্থাপনার ওপর লিখিত ও মৌখিক প্রতিক্রিয়া। সুতরাং প্রতিটি দল তাদের শিক্ষক এবং সহ-ছাত্রদের প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে সেই ধারণাটিকে আবার উন্নত করতে শুরু করে। কোর্স শেষে, প্রতিটি গ্রুপ লিখিত পরীক্ষা দেয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন ধারণার একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দেয়। এখানে শুধু একটি প্রোগ্রাম, একটি উদাহরণ, দেয়া হলো। এই উদাহরণ সর্বত্র প্রযোজ্য। এরকম গ্রুপ প্রোগ্রামে একেকজন শিক্ষার্থী একেক বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে।

আমরা ১০০ বছর আগে ব্রিটিশদের কাছ থেকে যা শিখেছি তা আমরা অন্ধভাবে অনুসরণ করছি। ব্রিটিশরাও সেই কৌশল অনুসরণ করে নিজেদের দেশ চালায় না, তারা সবচেয়ে প্রগতিশীল চিন্তাশীল জাতিদের মধ্যে অন্যতম। আমাদের উপমহাদেশ শাসন সহজ করার জন্য তারা কেবল সেই কৌশল নিয়ে এসেছে। তারা একটি রাস্তা তৈরি করেছে, যাতে তারা তাদের গন্তব্যে যেতে পারে। আমি মনে করি এবং আমরা এখনো সেই পুরনো অপ্রচলিত কৌশলটি অন্ধভাবে অনুসরণ করে ব্রিটিশদের তৈরি করা রাস্তা ধরে হাঁটছি। যে রাস্তায় নতুন কোনো গন্তব্য নেই। যে রাস্তায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান, চাকরি পান এবং জীবনের দাস হয়ে যান। আমাদের এমন কিছু দরকার যা আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের জন্য বিশেষভাবে কাজ করবে ঠিক যেমন আপনি নিজেও আদালতে কালো গাউন সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে পরেন না।

পরিশেষে : আমি মনে করি, সুইডিশ শিক্ষাব্যবস্থা তাদের অর্থনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। যারা দ্রুত কাজ বেছে নেন, তারা দেশের বর্তমান অর্থনীতিতে অবদান বেশি রাখেন। কেউ কাজ শুরু করলে কর ও ব্যয়ের চাকাও ঘুরতে থাকে। এটি বর্তমান অর্থনীতিতে অবদান রাখে। কিন্তু একটি দেশের ক্রমাগত উন্নতির জন্য উদ্ভাবনী ধারণাও লালন করতে হবে। একটি ডিগ্রি পাওয়া লোক একটি চাকরি পেতে পারে, যা জীবিকা নির্বাহের জন্য ভালো, তবে চাকরি দেশের ভাগ্য তৈরি করতে পারে না। আলফ্রেড নোবেল এ ধরনের উদাহরণের মধ্যে একটি। ডিনামাইট আবিষ্কার করে তিনি যে সৌভাগ্য তৈরি করেছিলেন তা তার মৃত্যুর পরও আরো অনেক অসামান্য আবিষ্কারের অর্থ জোগাচ্ছে। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, কেউ আমাদের ঐতিহ্যগত শিক্ষা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে কেউ এরকম সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবে?

Ericsson, IKEA, H&M, Spotify এগুলো হলো সুইডিশ কোম্পানি, কিছু সুন্দর মনের বুদ্ধিমত্তা। কিছু সাধারণ উদ্ভাবন যেমন থ্রি-পয়েন্ট সিট বেল্ট, পেসমেকার ইত্যাদি কিছু জীবন রক্ষাকারী সুইডিশ উদ্ভাবনের উদাহরণ। এমন কিছু ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশ আছে যারা কেবল উদ্ভাবন বা খাঁটি ধারণার প্যাটেন্ট অধিকার নিয়ে ভাগ্য তৈরি করতে পারে। এ কারণেই উন্নত দেশগুলো গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ডিজাইন করে। আর আমি মনে করি, এর জন্য শুধু শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, আমাদের সমাজের পুরনো ও বিচার-বুদ্ধিও এর জন্য দায়ী। আমি এটি দেখে খুশি যে, অল্প পরিমাণে মানুষ কিছু পরিবর্তন আনছে। আজকাল আমি অনেক বাংলাদেশীকে তাদের পণ্য অনলাইনে বিক্রি করতে দেখি এবং আমি মনে করি এটি একটি খুব ভালো লক্ষণ এবং এটি পরিবর্তনের সূচনা। আমরা এখানে বসেই চাঁদপুরের তাজা ইলিশ ও ধানমন্ডির খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনে আপনাদের জন্য পাঠাতে পারি।

লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
E-mail : adv.zainulabedin@gmail.com


আরো সংবাদ



premium cement

সকল