০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯,
`

বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না

-

‘ফরেন পলিসি’, ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান পত্রিকা; দীর্ঘ দিন ধরে এটি মূলত ডিপ্লোমেসি ও রাজনীতিক ইস্যু নিয়ে চর্চার এক ম্যাগাজিন। আর বলাবাহুল্য, এ কাজ তারা আমেরিকান স্বার্থের দিক থেকে দেখে করে থাকে। বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে এই ম্যাগাজিনের অনুসৃত লাইন যাই থাক, চলতি বছর থেকে এটি এখন বাইডেনের বড় সাপোর্টিং পত্রিকা; বিশেষ করে সাউথ এশিয়ার জন্য আর তা কাভার করার দিক থেকে। মাইকেল কুগেলম্যান ‘উড্রো উইলসন সেন্টার’ থিংকট্যাংকের ডেপুটি প্রোগাম ডিরেক্টর ও সিনিয়র ফেলো। তিনি এখন এই পত্রিকায় নিয়মিত এক সাপ্তাহিক ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ লেখা তত্ত্বাবধান ও প্রকাশ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যেটা আসলে বাইডেনের সাউথ এশিয়া নীতির ছাপে ও পক্ষে এ অঞ্চলের বার্নিং ইস্যুগুলোতে তুলে ধরা। আর তাতে এ অঞ্চলের খুঁটিনাটি ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মনোভাব সম্পর্কেও আঁচ পাওয়া যায়। এ ছাড়া অনেক সময় এ অঞ্চলের মিডিয়াগুলো কী লিখেছে তার ছোটখাটো রিভিউও দেখতে পাওয়া যায় এই ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’। অর্থাৎ বাইডেনের পক্ষেরই যেন এটি একটা আলাদা ভার্সন কিন্তু যারা বাইডেন প্রশাসনের সাথে অ-সরকারিভাবে ও ইনফরমালি যুক্ত।

এ দিকে চলতি শতক থেকে প্রায়ই আমেরিকান প্রশাসনকে অনেকে ‘বুড়া সিংহ’ বলে থাকে। পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা দুনিয়াকে ভালো-মন্দ যাই হোক একভাবে দাবড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু তার সেসব বহু সক্ষমতাই আজ আর নেই; বিগত যৌবন হয়ে গেছে। ফলে যেন এটি এখনো সিংহ তবে চামড়া ঢলে পড়া বুড়া সিংহ হয়ে গেছে।

গত ১৯৪৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে একটা ভালো ‘জংশনের বছর’ বলা যায়। এই জংশন হলো, এক দিকে দুনিয়ায় বিশ্বযুদ্ধে ভেঙে পড়া পুরনো রাজনৈতিক অর্ডার মানে ওর অবশিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো ক্রমেই সে ত্যাগ করছে আর অন্য দিকে নতুন এক অর্ডারে দুনিয়া নিজে চলতে শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার বা এই নয়াবিধি ‘ব্যবস্থা’ শুরু হচ্ছে জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্রে রেখে মূলত এবং অন্তত তিনটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে। এই বিগত অর্ডারটাকে যদি বলি কলোনি যুগ বা কলোনি ক্যাপিটালিজমের কাল তবে, নতুন যা গড়ে উঠছে তা আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম যদিও কমিউনিজম এটি সরাসরি স্বীকার করতে চায়নি। কেবল জাতিসঙ্ঘ গঠনের সময়ে নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক বুঝে নিয়ে বাকি ব্যাপারে পরোক্ষে আমেরিকা যা করে করুক, মেনে নিয়েছিল। আর অন্য দিকে এক বিশাল গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এদের জন্ম হোক; তা আমেরিকা গড়ে তুলুক এটি ইউরোপ মনেপ্রাণে চেয়েছে।

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের টানা ২২ দিনের জন্মসভার হোটেলে বসবাসে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থেকেছে; অংশ নিয়েছে। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে এরা কার্যকর হয়ে গেলে তখন আর সদস্যপদ রাখেনি। আবার কোনো বাধাও দেয়নি। কেন কী হয়েছিল, কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন সিদ্ধান্ত তা প্রকাশ্যে, স্টালিন তখনো জীবিত ও ক্ষমতাসীন- তা সত্ত্বেও কোথাও তিনি জানাননি। লিখিত কিচ্ছু নেই। তবে আমেরিকা তার নয়া গ্লোবাল অর্ডার নিয়ে ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তর বছর পরে আমেরিকা এখন এক বুড়া সিংহ যার যৌবন কেটেছে ‘রুস্তমি’ করে। সে চেয়েছে জানলেই তখন অনেক কিছু হয়ে যেত।

চলতি শতক বা দুই হাজার সাল থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে ঢলে পড়ছে তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। আর এর বিপরীতে চীনের উত্থান এবং সমৃদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন সেই নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসা, সেটিও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।

মজার কথা হলো, ওবামা আমল পর্যন্ত যত প্রেসিডেন্ট তারা কেউ স্বীকার করেননি, চীন উঠে আসছে, আমেরিকা বুড়া সিংহ হচ্ছে। এই বাস্তব সত্যটা স্বীকার না করাটাই যেন আমেরিকান সব প্রশাসনের অফিসিয়াল অবস্থান। একমাত্র ব্যতিক্রম দেখা যায় জিবিগনিউ ব্রেজনিস্কি যিনি চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে প্রথম (১৯৭৮) পারস্পরিক স্বীকৃতির রূপ দিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন, তার বেলায়। যখন তিনি ছিলেন (১৯৭৭-৮১) প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA)। তিনি খোলাখুলি চীনা উত্থান প্রসঙ্গে নিজের বইয়ে লিখেছেন। এমনকি ওবামাও আমেরিকান নেতৃত্ব আরো বজায় থাকবে কি না এ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠে গেছে তা স্বীকার করে সেবার উলটা দাবি করে বেড়াতেন যে, আমেরিকাই আরো নেতৃত্বে থেকে যাবে। এই প্রসঙ্গে বিশেষ করে ২০১১ সালে ওবামার আয়ারল্যান্ড সফরে দেয়া বক্তৃতায় এমন জোরদার দাবি উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু কেন চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা আমেরিকান বুড়া সিংহ হয়ে যাওয়ার স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে কথা তুলছি?

কারণ উপরে উল্লিখিত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে এবারের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’ কুগেলম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। ওতে সহলেখকের নাম আনু আনোয়ার, জনস হপকিন্স ইউনির যিনি পিএইচডি প্রার্থী। আর লেখার শিরোনাম ‘আমেরিকার বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরা উচিত।’ আর এ লেখায় চীনের চেয়ে আমেরিকা অক্ষম হয়ে পড়েছে এর স্বীকারোক্তি করা হয়েছে। সেসব প্রসঙ্গে ঢুকব এখন।

কিন্তু লেখার প্রসঙ্গ কেন এমন?
গত মাসে, মানে নভেম্বরের মাঝমাঝি এক আমেরিকান ডেপুটি সহকারী মন্ত্রী (সাউথ এশিয়া) কেলি কেইডারলিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোনো এক বহুরাষ্ট্রীয় সভায় যোগ দিতে। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দেন যার প্রসঙ্গ হলো, তিনি দাবি করেন, আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব লাভ করেছে, যে কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখন থেকে আর ভারতের সাথে একই ডেস্ক থেকে দেখাশোনা করা হবে না। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে আর ‘ভারতের চোখ দিয়ে’ আমেরিকা দেখা বন্ধ করেছে। তাই কুগেলম্যান ও আনু আনোয়ারের যৌথ লেখাটা হলো, সেই বক্তব্যের গুরুত্ব আরো বিস্তারে তুলে ধরার লক্ষ্যে আরো বিস্তারিত একটি সাফাই।

ওই যৌথ লেখা নিয়ে সেন্সিবল বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া হবে সবার আগে তা শিরোনাম আকারে বলে রাখি। বাস্তবে এ আর্টিকেলে ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকার দেখার অভ্যাস ত্যাগ করা দূরে থাক, বরং আরো পোক্তভাবে ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখেছে। ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশ কতটা দেখবে বা না, সেই আলোচনাই করা হয়েছে।

আগাম অনুমান
লেখা শুরু করার আগে লেখকের কিছু আগাম অনুমান সেখানে থাকে। সেই অনুমানটা আমরা এখানে দেখব। যেমন আনু লিখছেন, ‘ভবিষ্যতের কোনো সঙ্কটে বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে কোনো নিজের ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়, তা সামরিক অথবা কূটনীতিক যাই হোক না কেন, তাহলে তা এ অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে।’

এখানে একটি কথা বলে রাখি। এ লেখাটায় জিও-পলিটিক্স সবটা যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। যারা ‘জিও-পলিটিক্স’ কথাটা ব্যবহার করে তাদের ওপর ভীষণ বিরক্তি লাগে। মনে হয় এসব মানুষের যখন কোনো কিছু বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে অক্ষমতা দেখা দেয়, তখন এরা সেখানে জিও-পলিটিক্স শব্দটা ব্যবহার করে। ফলে এক অর্থহীনতা তৈরি করে। অথচ তারা রাষ্ট্রের (কূটনৈতিক) সিদ্ধান্তগুলোর কারণে যখন স্থানীয় পড়শি রাষ্ট্রের উপরে প্রভাব পড়া শুধু নয়, আঞ্চলিকও নয় একেবারে গ্লোবাল প্রভাব পড়ে- এরা সেই গ্লোবাল প্রভাব কথাটাকে সম্ভবত জিও-পলিটিক্স বলে চালাতে চেয়েছে।

এর পেছনের মূল কারণ দুনিয়ায় ক্রমেই গ্লোবাল হয়ে ওঠা অর্থনীতি। এতে সব কিছুই এখন গ্লোবাল; মানে কোনো কিছুই আর স্থানীয় থাকছে না যেহেতু বাণিজ্য এখন গ্লোব-জুড়ে মানে গ্লোবাল হয়ে উঠেছে; ফলে পণ্য-বিনিময়ও গ্লোবাল রূপ নিয়েছে। তাই একটি ভূগোলে (জিও) কিছু একটা ঘটলে এর প্রভাব-পরিণতি স্থানীয় থাকছে না, বরং স্বতঃই গ্লোবাল হয়ে উঠছে।

তা হলে লেখক কী নিয়ে উদ্বিগ্ন? বাংলাদেশের সামর্থ্যবান হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন? সেটিই বা কেন? কারণ প্রধান প্রশ্ন, তা হলে এর মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী?

আসলে এখানে আমেরিকার সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থটা মূলত ভারতের আর এটিই আমেরিকার উদ্বেগের কারণ। এই হলো আমেরিকার ধরে নেয়া অনুমান বা নিজের স্বার্থসংক্রান্ত বুঝ। মানে আবার বোঝা যাচ্ছে তা হলে, আমেরিকার বাংলাদেশের জন্যও কোনো উদ্বেগ নেই।

নিজের নয়, কিন্তু ভারতের স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন কেন? জবাব হলো, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে যা কিছু ভারতীয় স্বার্থ, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তা হলে দাঁড়াল যে, এই আর্টিকেলটা বাংলাদেশ নিয়ে মনে হলেও আসলে এটি ভারতের স্বার্থরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকার পক্ষে লেখা এক আর্টিকেল। তার মানে, সেই একই কথাই হলো, এখানেও আসলে আমেরিকার ভারতীয় প্রিজমের ভেতর দিয়ে দেখা বাংলাদেশ- সেই পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। সেই ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকার পুরনো কায়দাটাই।

তা হলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়,... ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে’- এর মধ্যে সার কথা হলো, বাংলাদেশ যদি চীনের পক্ষ নেয় আর নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়- এসব ক্ষেত্রে এক উদ্বিগ্ন আমেরিকাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ইস্যুতে এমন দুটোর মধ্যে বাংলাদেশ কী করবে সেটি তো বাংলাদেশের একান্ত সিদ্ধান্ত এবং স্বভাবতই বাংলাদেশ চাইবে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রেখে দিতে। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হবে কারো বিবাদে কোনো পক্ষ না নেয়া; এ বিষয়ে সবার থেকে দূরে থাকা।

আর এখানে আবার আমেরিকা চাচ্ছে আমরা যেন ভারতের পক্ষে থাকি, যেটা অ্যাবসার্ড ও অলীক। আর সেটি কোন ভারত বা কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে? সত্যি এ এক অদ্ভুত আবদার!

এ ছাড়া এই প্রসঙ্গে আরেকটা মজার দৃশ্যপট পরীক্ষা করা যাক। আসলেই কি চীন-ভারত কোনো সঙ্ঘাতে খোদ আমেরিকাই ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে? যুদ্ধ করবে? দুই বছর আগে লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়েছিল (যখনিকার ভারতীয় সৈন্যদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা কান্নার দৃশ্যের ভিডিও প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখি), সেই উত্তেজনার সময়েও কি আমেরিকা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নই আসেনি। আমেরিকা আসেনি। এমনকি আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে কোনো সান্ত¡নাবাণী দানের কথাও আমরা জানি না। তা হলে? আমেরিকা আসলে কার পক্ষে?

এ নিয়ে ইদানীংকালের প্রশাসন, বাইডেন প্রশাসনের দুর্গতি আরো ভয়াবহ। এটি সব ব্যাপারে আসলে লিম্ব মানে ঝুলে থাকে, পরিস্থিতি কোনো দিকে নড়ে না। যেমন আমেরিকান ঈঅঅঞঝঅ আইনে কেউ রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইল কিনলে সেই রাষ্ট্রের ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হবে। সে বিচারে এমন মিসাইল কেনায় ভারতের উপরে অবরোধ আরোপের কথা। কিন্তু তা কী অবস্থায় আছে কেউ ঠিক জানে না- ব্যাপারটা ‘লিম্ব’ হয়ে ঝুলে আছে।

আবার ওদিকে তাইওয়ান নিয়ে অযথা খোঁচাখুঁচি ব্যাপারটা আবারো একেবারে ছেচড়ামোর পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। ‘এক চীননীতি’ মানে তাইওয়ান আলাদা দেশ নয়; একই চীনা ভূখণ্ডের অংশ- এটি না মানলে সে রাষ্ট্রের সাথে চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করে না। সেই বিচারে ১৯৭১-৭৭ সাল পর্যন্ত নানান ইস্যুতে দীর্ঘ আপস আলোচনার পরে আমেরিকার এক চীননীতি মেনে নিয়েই চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে। ট্রাম্পের আমলে এসে প্রথম মানি-মানি না টাইপের লিম্ব তৈরি হতে শুরু হয়। শেষে গত মাসে অক্টোবরে এসে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে বাইডেন এবার তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলেভানিকে দ্রুত চীনের সাথে বৈঠকে বসেই সোজা ১৯৭৮ সালের এক চীননীতিটাই বাইডেনের আমেরিকা এখনো বজায় রেখেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এভাবে চীনের সব ক্ষোভ মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার দুই সপ্তাহ ধরে পুরনো চুলকানি! বাইডেন তার গণতন্ত্র সম্মেলনে এবার তাইওয়ানকেও রাষ্ট্র হিসেবে দাওয়াত করেছেন। তাই আবার খামোখা টেনশন! অর্থাৎ এ কালের আমেরিকা বারবার ঝুলে থাকতে সবচেয়ে ভালো পারে!

বাংলাদেশ কেন চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে আনু বলছেন, ‘চীনের অল্প সময়ের ভেতর বিপুল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানো বা জোগাড়ের ক্ষমতা এবং তাও আবার তুলনামূলক অল্প কিছু শর্তে। যেটা নয়াদিল্লি তো বটেই ওয়াশিংটনেরও কম্ম নয়, তাদের এমন মুরোদ নেই।’

আমার মনে হয়, এত খোলাখুলিভাবে চীনের চেয়ে আমেরিকার অক্ষমতার কথা এই কঠিন সত্যকে প্রকাশ করা, কোনো আমেরিকান লেখায় আগে আসেনি। এটিই বুড়া সিংহের স্বীকারোক্তি!

তবু লেখক এখানেই থামেননি। পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকাকে আবার তার যৌবন কালের মতো নয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে। সবাই জানে, আমেরিকার সে ব্যবসা মানে যোগ্যতা চলে গেছে বহু বছর আগেই। তবু ‘গপ্প ফলিয়ে বেড়ানো’ আমেরিকা ত্যাগ করেনি। গত জি-৭’কে বৈঠকে সবাইকে সাথে নিতে নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগ আনবেন, যেটা নাকি আবার চীনা বেল্ট-রোডেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু এসবই গল্প যা এখন পর্যন্ত কোনো রকমের বাস্তব প্রকল্প হিসেবে শোনা যায়নি। তাই শেষে আনু নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘চীনের মতো দ্রুত আর বিশাল বিনিয়োগ আনার মুরোদ আমেরিকার নেই।’

তাই সার কথায় এ আর্টিকেলটা লেখা অথবা বাংলাদেশের আলাদা ডেস্কের কথা বলে লোভ দেখানো- এসবই আসলে লিপ সার্ভিস বা কথার কথা। সিংহ বুড়া হয়ে গেলে তবু এসব চাপাবাজি করেই চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নাকি পরাশক্তি বলেই পরিচয় করিয়ে দিতে হয় আমেরিকাকে।

খামোখা কূটনৈতিক শোডাউন
গত মাসের শেষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ দিকে আরেক চাপাবাজি চলবে, একই কারণে। মানে ফরেন পলিসির আর্টিকেলের সাথে ঢাকায় ভারতের কূটনৈতিক নড়াচড়া সম্পর্কিত।

দোরাইস্বামীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধনের ৭ ডিসেম্বরে ঢাকা সফর- এসবই আগামী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে।

‘বাংলাদেশ ভারতের সৃষ্টি, ভারতেরই ফসল, কাজেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে যায় কী করে’- ভারত যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করে তখন অলক্ষ্যে এ খামোখা বয়ানটাই তার কূটনীতিকরা তাই মনে মনে আওড়াতে থাকেন। অতএব চীন-ভারতের কোনো সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ তো ভারতেরই, ভারতের প্রভাব বলয়ের জবাইযোগ্য এক নধর খাসি যেন! কাজেই বাংলাদেশ আর যাবে কোথায়! এই দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় স্বার্থগুলো এসব বয়ানেরই জপ করতে থাকবে।

কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, মানে রিটার্ন কী আসবে? না, আসবে না। বরং ফলাফল হবে শূন্য। এমনকি বর্তমান বাংলাদেশও ভারতের পক্ষে যাবে না, মুভ করার সে সুযোগটুকুও নেই। বাস্তবতা এমনই। কিন্তু তাই বলে সে বাস্তবতার কথা আবার ভারতের কাছে মুখে উচ্চারণও করা হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফর উপলক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়াকে বলছেন, ‘আমি ঢাকায় থাকলে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে।’ কাজেই কী পরিমাণ প্রাণহীনভাবে এ দুই সপ্তাহ কাটবে, এখান থেকে অনুমেয়; অর্থাৎ কেবল মুখেই বলা হবে না যে, বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে নেই। তা হলে ভারত চীনের কাছে তার ‘হবু ও কথিত’ শিলিগুড়ি করিডোর অথবা সাত রাজ্য হারানোর কথা যে লেখক আনু তুলেছেন, তার কী হবে?

আমেরিকান থিংকট্যাংকের দিগগজেরা আর কথিত ‘পরাশক্তি’ ভারত কী করে নিজেদের রক্ষা করবে, তা তো তাদেরই বিষয়। সাধারণভাবে বললে, এটি জবরদস্তিতে তোলা ইস্যুতে এক ভীষণ উত্তেজনা মাত্র। বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এর ভেতরে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এটি মৃত এক উদ্বেগ যাকে চাবুক মেরে জাগানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। এমনকি তার শেখ হাসিনা সরকারের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সত্য নয়।

তবুও ঢাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লি-ঢাকা কত কাছাকাছি, কত নিকটাত্মীয় ও প্রভাবাধীন তা প্রদর্শনের এ ধরনের কিছু ইমেজ ফাঁপা ডেকোরেটেড উত্তেজনা তৈরি করা হতে দেখব অবশ্যই!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ


premium cement