বদলে যাচ্ছে গ্রাম-নগরের চিত্র

সড়ক, খাল, সেতু ও অবকাঠামোয় এলজিইডির বড় কর্মযজ্ঞ

সরকারের ১৮০ দিন

একটি সড়ক শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয় না, এর সাথে বদলে যায় একটি গ্রামের অর্থনীতি, কৃষকের বাজারে যাওয়ার পথ, পণ্যের দাম, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মানুষের জীবনযাত্রা। আবার একটি খাল পুনঃখনন শুধু পানি সরানোর কাজ নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে সেচ, কৃষি, মাছ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশের ভারসাম্য। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনায় গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)।

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition

একটি সড়ক শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয় না, এর সাথে বদলে যায় একটি গ্রামের অর্থনীতি, কৃষকের বাজারে যাওয়ার পথ, পণ্যের দাম, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মানুষের জীবনযাত্রা। আবার একটি খাল পুনঃখনন শুধু পানি সরানোর কাজ নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে সেচ, কৃষি, মাছ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিবেশের ভারসাম্য। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মপরিকল্পনায় গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ চালিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)।

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এলজিইডি নিয়েছে একাধিক উদ্যোগ। শূন্য পদে ১৮১ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ৬৫৬ জন উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। একই সময়ে ৯৮ হাজার ৫৭.৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫০টি প্রকল্প মূল্যায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে তিন হাজার ৬১৩.৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ের চারটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

কাঁচাসড়ক থেকে পাকা পথে

গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে সড়ক অবকাঠামোয়। ১৮০ দিনের এই কর্মপরিকল্পনায় দুই হাজার ৯৫ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচাসড়ক পাকাকরণ করা হয়েছে। একই সময়ে এক হাজার ৬৬৪ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।

শুধু সড়ক নির্মাণ নয়, সড়কের সাথে প্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়কে ১৩ হাজার ২৬৫ মিটার সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং ১২ হাজার ৯০০ মিটার সেতু ও কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।

গ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টার। এ সময় ৫৯টি হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের নিরাপত্তার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ১১টি সাইক্লোন শেল্টার। পাশাপাশি ১৫টি উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

খাল ফিরছে, ফিরছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ

গ্রামীণ উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পানি ব্যবস্থাপনা। ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে ৩৩৩.৬ কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে। আরো ৮৩.৪ কিলোমিটার খাল খননের কাজ চলমান রয়েছে।

খাল পুনঃখননের ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ ও সেচসুবিধা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও মৎস্যসম্পদেও।

অন্য দিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে পাঁচ লাখ ২৭ হাজার বৃক্ষরোপণ সম্পন্ন হয়েছে। সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি সবুজ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যও রয়েছে।

কৃষি থেকে স্থানীয় ব্যবসা এক অবকাঠামোয় বহু প্রভাব

এলজিইডির কার্যক্রমের প্রভাব শুধু নির্মিত অবকাঠামোর হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নত সড়ক যোগাযোগের ফলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টার উন্নত হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের সম্ভাবনাও বাড়ছে।

খাল পুনঃখননের ফলে সেচসুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন এবং মৎস্যসম্পদের বিকাশে সহায়তা পাওয়ার কথা জানিয়েছে এলজিইডি। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করায় গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অর্থাৎ একটি সড়ক, একটি খাল কিংবা একটি বাজার প্রতিটি অবকাঠামোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত। উন্নত যোগাযোগ কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছায়, পানি ব্যবস্থাপনা কৃষিকে সহায়তা করে, আর বাজার উন্নয়ন স্থানীয় ব্যবসাকে সচল করে। এলজিইডির সমন্বিত অবকাঠামো, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম এভাবেই গ্রামীণ কর্মসংস্থান, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ভূমিকা রাখছে।

শহরেও বদলের ছোঁয়া

গ্রামের পাশাপাশি পৌর ও নগর এলাকাতেও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ হয়েছে। ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় পৌর ও নগর এলাকায় ৩১৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে এক হাজার ২০০ কিলোমিটার ফুটপাথ এবং ২৫ হাজার ৭৮৬ মিটার ড্রেন।

নগর সড়কের আলোকায়নেও এসেছে অগ্রগতি। পৌর সড়কে দুই হাজার ১৩২টি সড়কবাতি স্থাপন করা হয়েছে। ফলে নগর অবকাঠামো উন্নয়নের আওতা শুধু সড়ক নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; হাঁটার পথ, পানি নিষ্কাশন ও আলোকায়নও এর সাথে যুক্ত হয়েছে।

কৃষি ও সামাজিক অবকাঠামোতেও বিনিয়োগ

কৃষি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে ৩.১৫ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আটটি রেগুলেটর নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে। সামাজিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় কর্মসূচি। মসজিদ, মন্দির, ঈদগাহ, কবরস্থান ও শ্মশান মিলিয়ে দুই হাজার ১৭১টি স্থাপনা নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে।

নতুন চার প্রকল্পে ৩,৬১৩ কোটি টাকা:

১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় অনুমোদিত চারটি নতুন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের গ্রামীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এ প্রকল্পের লক্ষ্য।

আরেকটি হলো পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প। এর মাধ্যমে দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

তৃতীয় প্রকল্প এলজিইডিতে ইলেকট্রনিক চুক্তি ব্যবস্থাপনা (ই-সিএমএস) প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং টেকসই ক্রয় বিষয়ক দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ। এর আওতায় কর্মকর্তাদের ই-জিপি, পিপিআরসহ বিভিন্ন ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি ২২টি ই-জিপি ল্যাব আধুনিকায়ন করা হবে।

চতুর্থ প্রকল্প পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এ সমীক্ষা নেয়া হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়নেও আট প্রকল্প

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়নের জন্য আটটি বিভাগে আটটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন প্রকল্প প্রণয়নের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজও অব্যাহত রয়েছে।

দুর্নীতি ঠেকাতে অডিটে নজর:

উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ ও জবাবদিহিতার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এলজিইডির অডিট ইউনিটের মাধ্যমে ১৮০ দিনে ৫৮৮টি এসএফআই (এসএফআই) ও নন-এসএফআই অনুচ্ছেদের ড্রাফট জবাব মন্ত্রণালয় ও অডিট অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে।

বিভিন্ন জেলা ও বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের ২৭৮টি অডিট আপত্তি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। একই সাথে ১৩টি জেলায় ত্রিপক্ষীয় সভা আয়োজনের মাধ্যমে ১১২টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

সামনে চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের মান

১৮০ দিনের হিসাব বলছে, এলজিইডির কর্মপরিকল্পনার পরিধি বেশ বিস্তৃত গ্রামের কাঁচারাস্তা পাকা করা থেকে শুরু করে নগরের ফুটপাথ, খাল পুনঃখনন থেকে বৃক্ষরোপণ, সেতু-কালভার্ট থেকে হাট-বাজার, কৃষি অবকাঠামো থেকে সামাজিক স্থাপনা সবখানেই রয়েছে কর্মযজ্ঞ।

তবে প্রকল্পের সংখ্যা কিংবা নির্মিত কিলোমিটারের হিসাবই শেষ কথা নয়। এসব অবকাঠামো কতটা টেকসই হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে কি না, ব্যয় কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ঠেকানো যাচ্ছে কি না সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। কারণ শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের সাফল্য কাগজে থাকা প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে নয়, সড়কে মানুষের চলাচল কতটা সহজ হলো, কৃষকের পণ্য কত দ্রুত বাজারে গেল, জলাবদ্ধতা কতটা কমল, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং স্থানীয় অর্থনীতি কতটা সচল হলো তার ওপরই নির্ভর করবে।

স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাতে নেয়া প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, অল্প কিছুদিন প্রধান প্রকৌশলী থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিছু ভুলত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে। আমার পিআরএলের মাত্র ১০-১৫ দিন বাকি আছে অল্পদিনে সব কাজ সম্ভব না, তবে আমার উপর সরকার আস্থা রাখলে আমি অসম্পূর্ণ সব কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

এ বিষয় জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের জনগণের জীবন-যাত্রার মানোন্নয়নের কথা চিন্তা করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ইতোমধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনেক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং অনেক কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার যে অগ্রযাত্রা শুরু করেছে ইনশাআল্লাহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে।