বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সন্ধিক্ষণে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা ও জনজীবনের বহুমুখী সঙ্কটের পটভূমিতে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের শাসনভার গ্রহণ করে এই সরকার। ১৭১তম দিন পার করে ১৬ আগস্টে এসে সরকার তার ১৮০ দিন বা প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করেছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস মূলত নীতি নির্ধারণ, প্রাথমিক স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের গতিপথ ঠিক করার সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকার নিজেও দায়িত্ব গ্রহণের সূচনালগ্নে প্রথম ১৮০ দিনকে তাদের কর্মদক্ষতা ও প্রাথমিক সাফল্য মূল্যায়নের সময়সীমা হিসেবে ঘোষণা করে। অর্থনৈতিক সঙ্কট নিরসন, মূল্যস্ফীতি কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার যে বিশাল রূপরেখা দেয়া হয়েছিল ছয় মাস শেষে তা কতটুকু বাস্তবে রূপ নিয়েছে, আর কতটুকু কাগজের প্রতিশ্রুতিতে আটকে আছে, তা নিয়ে এখন সার্বিক হিসাব-নিকাশের সময় এসেছে।
সরকারের সমর্থক ও নীতিনির্ধারকদের দাবি- অর্থনৈতিক ধস ঠেকানো, রিজার্ভ পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং প্রশাসনে নতুন গতি আনার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিরোধী শিবির এবং সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মতে-বাজারমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দূরে। ১৮০ দিনের এই যাত্রায় অর্জনের আলো কতটুকু উজ্জ্বল এবং ব্যর্থতার ছায়া কতটা গভীর তার একটি বিস্তারিত ও পর্যালোচনা নিচে উপস্থাপন করা হলো।
অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি : স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বনাম ভঙ্গুর পুনরুদ্ধার
দায়িত্ব গ্রহণের সময় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতি। অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সঙ্কট, ব্যাংক খাতের বিশাল খেলাপি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা- সব মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক সূচক ও মুদ্রানীতি : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ১১.৭ শতাংশে পৌঁছে, ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে ৯.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা গতি এসেছে এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সপ্রবাহ ধারাবাহিক ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ঘাটতিও আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে।
সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবনায় ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বাজেটে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সেলারেশন’ (৩আর) কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়িক সহজীকরণের লক্ষ্যে ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রক্রিয়ায় অনুমোদন পাওয়ার সময়সূচি এক বছর থেকে কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে আনার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রাক্কলন ও বাস্তবতার অমিল : যদিও সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দাবি করা হচ্ছে, তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে সতর্কবার্তা রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪.৫ শতাংশে নামিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ৮.৮ শতাংশে অবস্থান করার পূর্বাভাস দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও তাদের মুদ্রানীতি নথিতে বর্তমান অবস্থাকে ‘ভঙ্গুর পুনরুদ্ধার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে মাত্র ৫ শতাংশের নি¤œমুখী ঋণ প্রবৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ইঙ্গিত দেয় যে, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে কিছুটা স্থায়িত্ব এলেও তার সুফল সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছাতে আরো সময় লাগবে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ : প্রতিশ্রুতি ও মাঠপর্যায়ের চিত্র
ক. দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি : সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের পরীক্ষা : সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের সাফল্যের একমাত্র গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি হলো চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি, মাছ- গোশত ও ওষুধপত্রের বাজারদর। পরিসংখ্যানের খাতায় মূল্যস্ফীতি ৯.৪ শতাংশে নামার কথা বলা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটে স্বস্তি ফেরেনি।
সরকার আমদানিতে শুল্ক ছাড়, বাজার মনিটরিং ও কারসাজি বন্ধে সিন্ডিকেটবিরোধী অভিযানের কথা বললেও শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা এখনো দেখা যায়নি। সঙ্কুচিত মুদ্রানীতির কারণে সুদের হার বাড়ানো হলেও সরবরাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং বাজার অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উচ্চমূল্যেই থমকে আছে।
খ. ব্যাংক খাত সংস্কার ও খেলাপি ঋণের চাপ : ব্যাংকিং খাত সংস্কার ছিল নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, মূলধন ঘাটতি এবং বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম করেছিল। সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্রীকরণ, পুনর্গঠন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
শক্তিশালী প্রভাবশালীদের কাছ থেকে ঋণ খেলাপি টাকা উদ্ধারে দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে এখনো বৈপ্লবিক কোনো ফল পাওয়া যায়নি। আর্থিক খাতে গ্রাহকের সম্পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বেনামী ঋণ বন্ধ করা সরকারের সবচেয়ে জটিল অর্থনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে।
গ. বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি : সবচেয়ে বড় ধাক্কা : ছয় মাসের মূল্যায়নে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জ্বালানি সঙ্কট। মার্চ-এপ্রিল মাসে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর জুলাই মাসে এসে দেশজুড়ে গ্যাস সরবরাহে অভূতপূর্ব ঘাটতি দেখা দেয়।
উৎপাদনে স্থবিরতা : গ্যাস সঙ্কটের কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। গাজীপুর, সাভার, নারায়াণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শত শত পোশাক কারখানা, সার কারখানা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিকল্প সমাধান ও সীমাবদ্ধতা : সরকার ২০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিং সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু কেবল জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানি করে বা সাময়িক তাপবিদ্যুৎ চালিয়ে শিল্পের বিশাল চাহিদা মেটানো অসম্ভব। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বন্ধ কূপ পুনখনন এবং পাইপলাইন অবকাঠামো সংস্কার না করা পর্যন্ত এই সঙ্কট শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতাকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘ. সামাজিক সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত : ফ্যামিলি ও ফারমার্স কার্ড : সরকারের অন্যতম বড় ইতিবাচক সাফল্য ফুটে উঠেছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আধুনিকায়নে। নির্বাচনী ইশতেহারের মূল অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’ চালু করা হয়েছে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা : প্রান্তিক কৃষকদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও বকেয়া সুদ মওকুফ করা হয়েছে, যার ফলে দেশের প্রায় ১৪ লাখ ৩৪ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ রেকর্ড ২২ থেকে ২৪ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে।
টিসিবি ও সামাজিক সহায়তা : ৬৭ লাখের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে প্রতি মাসে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল ও নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ড : পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম ধাপে প্রায় ৬৭ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ৪১ লাখ নারী এবং ৪৩ লাখ কৃষককে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা। তবে এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে এটি কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হয় তার ওপর।
ঙ. কর্মসংস্থান ও তরুণ প্রজন্ম : তরুণ সমাজকে আকর্ষণ করতে ২০২৬-৩১ মেয়াদে দেশে ও বিদেশে মোট ৯৩ লাখ ২৭ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ঘোষণা করেছে সরকার। শিল্পায়ন, স্টার্টআপ ফান্ড, তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে এজন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে বাস্তবচিত্র হলো, গত ছয় মাসে নতুন বড় কোনো দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ না আসায় এবং নতুন শিল্পকারখানা গড়ে না ওঠায় কর্মসংস্থান খাতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এক কোটি কর্মসংস্থানের স্বপ্নপূরণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত।
প্রশাসন, শাসন ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার খতিয়ান
ক. প্রতীকী পরিবর্তন বনাম নতুন বিতর্ক : তারেক রহমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ভিআইপি সংস্কৃতি বিলোপ, সরকারি অফিসে দলীয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিকৃতি তুলে দেয়া, প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব মূল বেতনের ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারের মতো কিছু ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় রূপক পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ ছাড়া সংসদীয় কার্যক্রমে গতি এনে ৫২ কার্যদিবসে ১০৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করার রেকর্ড তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু একই সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার ও দলীয়করণের বিষয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে : সরকারি ১১টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এক বছরের চুক্তিতে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়োগ; ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে নিজস্ব দলের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বসানো; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেয়ার অভিযোগ। এসব ঘটনা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের সরকারের রাজনৈতিক বার্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
খ. আইনশৃঙ্খলা : দ্রুত বিচার বনাম মাঠের বাস্তবতা : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সরকার কিছু তাৎক্ষণিক সফলতার পরিচয় দিয়েছে। কয়েকটি আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিচার ও রায় ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর সফল অভিযান পরিচালনা এবং কারাগারগুলোতে মানবাধিকার নিশ্চিত করতে জাতীয় প্রতিরোধমূলক কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।
তবে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, জায়গা দখল এবং মব-সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির রুট পরিবর্তন হয়েছে বলে যে অভিযোগ রয়েছে, তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ. দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহি : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে অতীতের আর্থিক অনিয়ম ও অবৈধ সম্পত্তি অনুসন্ধানে ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। তবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন মুক্ত থাকা আবশ্যক। দুর্নীতি দমনের মানদণ্ড যদি কেবল অতীত সরকারের সংশ্লিষ্টদের ওপর প্রয়োগ হয় এবং বর্তমানের অনিয়মের ক্ষেত্রে শিথিল থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত করবে।
পররাষ্ট্রনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতিতে হেঁটে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
চীন ও এশীয় সম্পর্ক : জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ২০টির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শ্রমবাজার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি : মালয়েশিয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘সিন্ডিকেট’ প্রথা বিলুপ্তির উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচিত হওয়াকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
ভারত ও প্রতিবেশী নীতি : ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের অংশ হিসেবে আগস্ট মাসে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকার একদিকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ সৃষ্টির কথা বলছে, অন্য দিকে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের রাজনৈতিক দাবিও স্পষ্ট ভাষায় বজায় রেখেছে।
অর্জনের আলো ও ব্যর্থতার ছায়া : এক নজরে ১৮০ দিন
ছয় মাসের পুরো সময়সূচি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, সরকারের সূচনা পুরোপুরি ব্যর্থতা বা একক সাফল্যে ঘেরা নয় বরং এটি একটি অসম্পূর্ণ ও রূপান্তরকালীন চিত্র।
ক. প্রধান প্রধান সাফল্য-
১. বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা : রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন রোধ করা ও প্রবাসী আয়ে রেকর্ড বৃদ্ধি। ২. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী : ফ্যামিলি ও ফারমার্স কার্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা এবং ১.৪ মিলিয়নের বেশি কৃষকের ঋণ মওকুফ। ৩. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : ২৪ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ করে যেকোনো জাতীয় জরুরি অবস্থা মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন। ৪. প্রশাসনিক ব্যয়ে সাশ্রয় : ভিআইপি সংস্কৃতি কমানো এবং সরকারি ব্যয় হ্রাসের ইতিবাচক বার্তা। ৫. ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য : চীন, মালয়েশিয়া ও জাতিসঙ্ঘের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন।
খ. প্রধান প্রধান সীমাবদ্ধতা
১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা : বাজারে সাধারণ মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়া। ২. তীব্র জ্বালানি সঙ্কট : গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা। ৩. ধীরগতির বেসরকারি বিনিয়োগ : ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে স্থবিরতা। ৪. প্রশাসনে দলীয়করণের পুনরাবৃত্তি : স্থানীয় সরকার ও চুক্তভিত্তিক নিয়োগে দলীয় ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়ায় আস্থার ঘাটতি। ৫. আইনশৃঙ্খলার পূর্ণ স্বস্তি না আসা : মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব শতভাগ বন্ধ করতে না পারা।
সামনে পরবর্তী ১৮০ দিন : অগ্রাধিকার ও শেষ কথা
১৮০ দিনের প্রাথমিক সময় পেরিয়ে সরকার এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছে। রাজনীতির প্রথম ছয় মাস থাকে নীতি প্রণয়ন ও পরিকল্পনার; কিন্তু পরবর্তী ছয় মাস হয় সরাসরি ফলাফল দেখানোর সময়। আগামী দিনগুলোতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রাখতে প্রধান পাঁচটি অগ্রাধিকারের দিকে কঠোর নজর দিতে হবে :
১. দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা : পরিসংখ্যানের অজুহাত না দিয়ে সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সরাসরি সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনা। ২. জ্বালানি নিরাপত্তার স্থায়ী সমাধান : এলএনজি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। ৩. ব্যাংক খাতের শক্ত সংস্কার : প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা। ৪. বিনিয়োগকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান : তরুণদের জন্য কার্যকর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দেশী-বিদেশী বেসরকারি বিনিয়োগে আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করা। ৫. প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা : বিচার বিভাগ, দুদক, পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে ‘নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র বার্তা বাস্তবে প্রমাণ করা।
ছয় মাস কোনো সরকারের পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদের চূড়ান্ত বিচার করার জন্য পর্যাপ্ত সময় নয়, তবে এটি সরকারের ভবিষ্যৎ যাত্রার সঠিক দিকনির্দেশনা বোঝার জন্য যথেষ্ট। তারেক রহমান সরকারের খাতা এই ছয় মাসে কোনোভাবেই শূন্য নয়; আবার পূর্ণ সাফল্যের ফেস্টিভ্যাল করার মতো অবস্থাও সৃষ্টি হয়নি। অর্জনের চেয়ে এখন দিন দিন বড় হয়ে উঠছে বাস্তবায়নের প্রশ্ন। কারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত হিসাব কষবে- কয়টি নতুন কমিটি হলো বা কয়টি প্রস্তাব পাস হলো তা দিয়ে নয়; বরং বাজারের ব্যাগ সস্তা হলো কিনা, ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস এলো কিনা, যুবকের চাকরি হলো কিনা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যি স্বাধীন হলো কিনা। পরবর্তী ১৮০ দিনেই নির্ধারিত হবে- এই সরকার কেবল পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি নাকি এক নতুন ভোরের বাস্তব দিগন্ত।



