২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ‘জানতেন না’ দাবি করে কোনো প্রকার আইনি মার্জনা বা তামাদি মওকুফ (বিলম্ব মার্জনা) পেতে পারেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
একই দিনে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের গণসমাবেশে পরিকল্পিত হামলা, বাতি বন্ধ করে ‘ব্ল্যাকআউট’ অভিযান পরিচালনা ও গণহত্যার মাধ্যমে একটি ইসলামী গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ও সাবেক দুই সাংবাদিকসহ আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
গতকাল রোববার দু’টি পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর আদালত চত্বরে আয়োজিত পৃথক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
রোববার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়া এড়াতে যারা দীর্ঘদিন পলাতক থাকেন, তারা আদালতে ফিরে এসে সাধারণত দাবি করেন যে, পুরো প্রক্রিয়াটি তাদের অগোচরে হয়েছে এবং এই যুক্তিতে লম্বা সময় বিলম্বের তামাদি মওকুফ চান; কিন্তু শেখ হাসিনাসহ এই মামলার পলাতক আসামিরা কোনোভাবেই এই অজুহাত দেয়ার আইনি সুযোগ পাবেন না। কারণ তারা মামলাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত আছেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন এবং মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের ডিফেন্ড করার চেষ্টা করছেন। তিনি আরো জানান, আসামিরা ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে অজ্ঞতার সুযোগ নিতে চাইলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রমাণ করা হবে যে, তারা শুরু থেকেই মামলাটি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। প্রসিকিউটর তামীম প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি ভিত্তি তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা বা দণ্ডাদেশের পরোয়ানা থাকলে ভারত আইনগতভাবেই পলাতক আসামিকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য।
মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর থেকে সম্পূর্ণ আইনি নিয়ম মেনেই দ্রুত ও উপযুক্ত সময় দিয়ে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল, যার জবাবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন তিনি মৃত্যুদণ্ডাদেশ থাকা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে দেশে ফিরে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করবেন।
শাপলা চত্বর মামলা
অপর দিকে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর চালানো গণহত্যার মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর গতকাল রোববার প্রথমবারের মতো আসামিদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ হাজির করা হয়। মামলাটির মোট ৪১ জন আসামির মধ্যে কারাগারে আটক থাকা সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীসহ ৯ জনকে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক আটজনকে এ মামলায় নতুন করে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
গ্রেফতার দেখানো আট আসামি হলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো: শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, এনটিএমসির সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু, সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি মোহা: আবদুল জলিল মণ্ডল।
এই আসামিরা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যান্য মামলায় আগেই কারাগারে ছিলেন। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, নিয়মানুযায়ী প্রথমে মিস কেসে আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হয় এবং পরবর্তীকালে মূল মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে গ্রেফতার দেখানোর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এ মামলার অন্য দুই আসামি সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক কারাগারে থাকলেও রোববার তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি; ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী ধার্য তারিখে তাদের উপস্থিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা ছাড়াও মামলার অন্য আসামিরা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা: দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা: ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো: মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো: মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দফতর ও প্রশাসন) মো: আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এস এম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো: আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বি এম ফরমান আলী।
এর আগে ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম একটি ভয়ঙ্কর ও সুপরিকল্পিত অভিযানের বিবরণ তুলে ধরে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের সহযোগিতায় একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, বিজিবির তৎকালীন ডিজি জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং র্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার নীল নকশা তৈরি করা হয় এবং সেই অনুযায়ী গভীর রাতে পুরো শাপলা চত্বরের বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ করে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর যৌথ আক্রমণ চালানো হয়।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, অভিযানের তাণ্ডব লুকাতে একেক বাহিনী একেক নাম ব্যবহার করেছিল; পুলিশ একে ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, র্যাব ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বিজিবি ‘অপারেশন ক্যাপচারড শাপলা’ নাম দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং পরবর্তী সময়ে গণহত্যার সব চিহ্ন ও আলামত মোচনের অপচেষ্টা করে। শুনানি শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম বর্বরোচিত হামলা ও গণহত্যার নজির নেই। একটি নির্দিষ্ট ইসলামী গোষ্ঠীকে নির্মূল করতে তৎকালীন সরকার কিছু লেফটিস্ট ও নাস্তিক অ্যাক্টিভিস্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই গণহত্যা সংঘটিত করেছিল, যার মধ্যে তৎকালীন শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠক ডা: ইমরান এইচ সরকার শাহবাগে দাঁড়িয়ে হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে কুৎসা রটনা ও উসকানি দিয়েছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটর আরো জানান, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫ মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে অন্তত ৩২ জন এবং পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে আরো ২০ জনকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণমাধ্যমের সামনে দম্ভোক্তি করে সত্য গোপন করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি, হেফাজত কর্মীরা গায়ে রঙ মেখে নাটকের আয়োজন করেছিল। এ ছাড়া সত্য প্রকাশ রোধ করতে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু লিখিত আদেশ দিয়ে ঘটনার সরাসরি সম্প্রচারকারী দু’টি গণমাধ্যম- ‘ইসলামিক টিভি’ ও ‘দিগন্ত টিভি’র সম্প্রচার বন্ধ ও লাইসেন্স বাতিল করেছিলেন।
পরে সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেন যে, আসামি সাংবাদিক ফারজানা রুপা ‘সমীকরণ’ নামক অনুষ্ঠানে শাপলা চত্বরের ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করে সত্য বিকৃত ও ঘটনা আড়াল করার অপরাধে অভিযুক্ত। চিফ প্রসিকিউটর আরো জানান, তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক তার আত্মজীবনীমূলক বইতেও কিভাবে বলপ্রয়োগ করে হেফাজতকে দমন করা হয়েছে তার বিবরণ রেখে গেছেন।
ট্রাইব্যুনাল পলাতক আসামিদের গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়ে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন।



