সিলেটে ২৭ দিনে ১৭ হত্যাকাণ্ড

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ : স্বজনদের হাতেই খুন-খারাবি হচ্ছে বলে দাবি পুলিশের

Printed Edition

এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো

সিলেট বিভাগে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে প্রাণঘাতী সহিংসতা। মাত্র ২৭ দিনে অন্তত ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ গেছে বিভিন্ন বয়সী মানুষের। পারিবারিক বিরোধ থেকে জমিজমা, তুচ্ছ কথাকাটাকাটি, খেলাধুলা ও পূর্বশত্রুতার জেরে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অনেক ঘটনাতেই ঘাতক হিসেবে উঠে এসেছে স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজনের নাম। বেডরুম থেকে খেলার মাঠ-কোথাও যেন নিরাপদ নয় মানুষ। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় জনমনে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ।

গত ২৭ দিনে (২৭ জুলাই থেকে ২৩ আগস্ট) সিলেট বিভাগে অন্তত ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সিলেট নগরীর রায়নগরে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মীর ট্রিপল মার্ডার, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে দুই শিশুকে হত্যা, আপন ভাইয়ের হাতে ভাই খুন, স্ত্রী হত্যা, খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি এবং সর্বশেষ শাহপরাণ এলাকায় নিজ বাসার সামনে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। কোথাও পারিবারিক বিরোধ, কোথাও প্রেমঘটিত বিষয়, আবার কোথাও সামান্য কথাকাটাকাটি কিংবা খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

বাসার সামনে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা : সর্বশেষ রোববার দিবাগত মধ্যরাতে নগরীর শাহপরান (রহ:) থানার ইসলামাবাদ এলাকায় নিজ বাসার সামনে শাহাব উদ্দিন (৬৫) নামে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তার ঘাড়ে তিনটি কোপসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

নিহত শাহাব উদ্দিন বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই এলাকার বাসিন্দা। পরিবার নিয়ে তিনি শাহপরাণ ইসলামাবাদ এলাকায় নিজস্ব বাসায় বসবাস করতেন। চারখাই বাজারে তার ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা রয়েছে। নিহতের ছোট ছেলে রেদোয়ান আহমদ জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি তার বাবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখেন। হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। নিহতের পরিবারের দাবি, কারো সাথে শাহাব উদ্দিনের কোনো বিরোধ ছিল না। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।

এ দিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটে গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা ‘নিকুঞ্জ ভিলা’য়। ওইদিন সকালে নিজ বাসায় খুন হন প্রবীণ ব্যবসায়ী ও সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক এম এ সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম।

লোমহর্ষক এ হত্যাকাণ্ডের পর রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়া নামে এক শ্রমজীবীকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে সম্পর্কের দ্বন্দ্বকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আনে। পরে বাবুল মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একই দিন ১২ আগস্ট সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে দুই শিশুসন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগে কামরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া গ্রামের মধুপুর এলাকার আব্দুল কাদিরের ছেলে। দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, কামরুল ইসলাম তার দুই শিশুসন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যা করেন। পরে পৃথক হাওর এলাকা থেকে শিশু দু’টির লাশ উদ্ধার করা হয়।

একই দিনে সিলেট নগরীতে তিনজন এবং দিরাইয়ে দুই শিশুর হত্যাকাণ্ড পুরো বিভাগে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরপর এমন হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি বড় অংশেই জড়িয়ে আছে স্বজন বা পরিচিত জনের নাম। ১৫ আগস্ট সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের লাফনাউট দিঘিরপাড় গ্রামে ধর্ষণের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করাকে কেন্দ্র করে কলিম উল্লাহ (৫৩) নামে এক বৃদ্ধ খুন হন। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তের বাবা ছয়ফুল্লাহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। নিহত ও অভিযুক্ত আপন ভাই।

১৪ আগস্ট সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে নিজ ঘরে খুন হন মোহাম্মদ আলী (৭৫)। পুলিশের দাবি, বিদেশে থাকা ছেলে ইসমাইল মিয়া তার স্ত্রীর মাধ্যমে ভাড়াটে লোক দিয়ে বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ ঘটনায় পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

১১ আগস্ট সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের নয়াগাত্তি গ্রামে স্ত্রী জেসমিন বেগমকে (২৩) হত্যার অভিযোগ ওঠে গোলাম রফিকের বিরুদ্ধে। ১৫ আগস্ট মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দাসের বাজার ইউনিয়নের পূর্ব শংকরপুর এলাকায় ইউপি সদস্য আবদুল হক (৫০) খুন হন। একই দিন বিকেলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালিয়াঘাটে শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আলআমিন (৩৮) নামে এক যুবককে।

এর আগে ২৮ জুলাই রাতে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম মুক্তারপুর এলাকায় ঘর থেকে ডেকে নিয়ে বাতির আলী (৩০) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতিবেশীরাই তাকে হত্যা করে।

২৭ জুলাই রাতে নগরীর কাজিরবাজার সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে স্কুলছাত্র রিফাত আহমেদ (১৫) খুন হয়। একই দিন সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলায় জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে আব্দুল্লাহ (২৫) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। ওই দিনই বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের পাঠানেরগাঁও গ্রামের মকরম আলীর (৬৮) লাশ বাড়ির অদূরে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো: মনজুরুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, এসএমপির আওতাধীন এলাকায় যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেগুলোকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হিসেবে পুলিশ মনে করে না। কারণ প্রায় সব হত্যাকাণ্ডই ব্যক্তিগত বিরোধসহ হঠাৎ করে ঘটেছে। তিনি বলেন, পুলিশ সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ করছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।

এ দিকে গত ২২ আগস্ট সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সাথে মতবিনিময় করেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি। সভায় নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দেন তিনি।

এ ব্যাপারে সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো: আনোয়ারুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, বিভাগে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, কোনোটিই পূর্বপরিকল্পিত নয়। হঠাৎ করেই হত্যাকাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্বজনদের দ্বারাই খুন-খারাবি হচ্ছে। তিনি বলেন, সামাজিক সম্পর্ক জোরদারে পুলিশ কাজ করছে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনসম্পৃক্ত হয়ে পুলিশ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সচেতন মহলের দাবি-প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর অভিযান এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। একই সাথে পরিবার ও সমাজে সহনশীলতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে বিচ্ছিন্ন এসব হত্যাকাণ্ড একসময় সিলেটের সামগ্রিক জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।