রোহিঙ্গাদের ফেরা অনিশ্চিত

প্রত্যাবাসনের ৯ বছর কাল

মিয়ানমারের চলমান সঙ্ঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসার কারণে রোহিঙ্গা সঙ্কট নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দিন যতই যাচ্ছে দেশে ফেরার অনিশ্চতায় হতাশায় ভূগছেন রোহিঙ্গারা। তবে দেশে ফেরা না হলেও এর নেপথ্যে আছে এক ভয়ঙ্কর তৎপরতা। ক্যাম্পে আধিপত্য, মাদক কারবার পরিচালনা, অপহরণ, অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ বেড়েই চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী গত ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ৩০০ জনের মতো খুন হয়েছেন। ক্যাম্পে প্রায় ১০টির বেশি সশস্ত্র ও অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত

এস এম মিন্টু
Printed Edition

বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নিরাপদে নিজভূমিতে ফেরার আশায় থাকলেও দীর্ঘ ৯ বছরে তাদের অপেক্ষার প্রহর কাটেনি। রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে ফেরার প্রত্যাশা এখনো অধরাই। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামিকাল ক্যাম্পের ভেতর মিলাদ মাহফিলসহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে।

একদিকে মিয়ানমারের চলমান সঙ্ঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসার কারণে রোহিঙ্গা সঙ্কট নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দিন যতই যাচ্ছে দেশে ফেরার অনিশ্চতায় হতাশায় ভূগছেন রোহিঙ্গারা। তবে দেশে ফেরা না হলেও এর নেপথ্যে আছে এক ভয়ঙ্কর তৎপরতা। ক্যাম্পে আধিপত্য, মাদক কারবার পরিচালনা, অপহরণ, অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ বেড়েই চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী গত ৯ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ৩০০ জনের মতো খুন হয়েছেন। ক্যাম্পে প্রায় ১০টির বেশি সশস্ত্র ও অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত। অস্ত্র-মাদক কারবার, অপহরণ, আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজিতে দিন দিন অস্থিরতা বেড়েই চলছে। অপরাধ দমনে পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) নিয়মিত অভিযান চালালেও ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে এবং বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা।

সরকারি তথ্যানুযায়ী বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র যুদ্ধের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছে আরো সাড়ে চার লাখ।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মো: মিজানুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবুও বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একইসাথে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না রোহিঙ্গারা : রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাস্টার জুবায়ের হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে আমরা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, আমাদের সন্তানদের অনেকেই মিয়ানমার দেখেনি। আমরা বাংলাদেশে নিরাপদে আছি, কিন্তু এটি আমাদের দেশ নয়। আমরা নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চাই। তবে, ফিরে গিয়ে যদি আবার নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তাহলে সেই প্রত্যাবাসনের কোনো অর্থ থাকবে না। আমাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের যুবক আবদুন নবী বলেন, শরণার্থী শিবিরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সবসময় তাড়া করে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হতাশায় ভুগছে।

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পের জমিলা খাতুন বলেন, নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে আছে। অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন, অনেকের পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবু আমরা আশা ছাড়িনি। আমরা আমাদের গ্রাম, আমাদের স্মৃতি, আমাদের শেকড়ে ফিরে যেতে চাই। সেই ফেরাটা হতে হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ। শুধু সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

চাপ বাড়ছে স্থানীয় জনপদে : স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ভারসাম্যহানি, শ্রমবাজারে মজুরি কমে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের বিষয়টি সমর্থন করেন, তবুও সঙ্কটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান দেখতে চান।

মানবাধিকার কর্মী জেসমিন আক্তার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। মাদক, মানবপাচার ও অপরাধচক্রের তৎপরতা নিয়ে আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।

নারী ও কিশোরীদের ঝুঁকি : মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগের কারণে বাল্যবিবাহ, মানবপাচার, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে কিশোরীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে পরিবারগুলোর মধ্যে।

নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, দালালচক্র এখনো নানাভাবে সক্রিয়। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক নারী ও তরুণকে পাচারের চেষ্টা করা হয়। সচেতনতা বাড়লেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি। এই বিষয়টিতে কঠোর নজরদারি দরকার। তিনি বলেন, সম্প্রতি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পরে জীবন দিয়েছেন শতশত নারী-পুরুষ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধের চিত্র : এপিবিএনসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বানিনী সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৩৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে মামলা হয়েছে ২০৮টি। এসব মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়েছে ৪৬৮ জন। হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩২৪টি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ২০২৫ সালে ২৪টি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এরমধ্যে মামলা হয়েছে ২২টি। গ্রেফতারের সংখ্যা মাত্র ২৩টি। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত্র ২০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৯টি। আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে ৪৭ জনকে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে তিন বছরে চার বছরের তুলনায় ২০২৪ সালের পর হত্যাকাণ্ড, অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড অনেকটা কমেছে।

এপিবিএনের চারটি ব্যাটালিয়নের মাত্র ৯০৫ জনবল নিয়ে প্রায় ১৮ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা গত দুই বছরে ভালো প্রশংসা পেয়েছে সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এপিবিএনের চারটি ব্যাটালিয়নের অভিযানে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮টি অস্ত্র, বোমা ২২টি, গ্রেনেড ১টি, গোলাবারুদ ৭৯ ও গুলির খোসা ৪৫টি উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ১৮টি মামলায় ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময়ে অভিযানে দুই লাখ ৯০ হাজার ৫২৪ পিস ইয়াবা, গাঁজা ৪৬ কেজি, সাড়ে ৫৬ কেজি স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ও সিগারেট জব্দ করা হয়। মাদক ও অন্যান্য ২৭৮ মামলায় ২০২৫ সালে ৩৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। চলতি বছরের আট মাসে এক লাখ ১৯ হাজার ৩৩১ পিস ইয়াবা জব্দ করে এপিবিএন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এপিবিএনের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ নয়া দিগন্তকে বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও তাদের যে কোনো সমস্যা সমাধানে এপিবিএন সদস্যরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। উখিয়া এবং টেকনাফসহ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে একটি ইউনিট গঠন প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শক্তিশালী এ ইউনিটটি তৈরি হচ্ছে যাতে এপিবিএনের তত্ত্বাবধানে থাকবে সিআইডি, এসবি, এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। এ ছাড়া ক্যাম্পগুলোতে যে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটার আগেই সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তাসহ বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছি।