রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসার ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আদালত রায় দিয়েছেন। চার কার্যদিবসের মধ্যে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা দেশে অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করেছে। উপর্যুপরি ভয়াবহ শিশু নির্যাতন জনপরিসরে আগে থেকে ক্ষোভ বিরাজ করছে। নৃশংস ওই ঘটনার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভুক্তভোগীর পরিবারে হাজির হন, দ্রুততার সাথে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার তাগিদ দেন। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও তাই বিপুল সাড়া পড়ে যায়। ত্বরিত গতিতে আসামিদের ধরা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেই কারণে এই রায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার চেয়েও বেশি কিছু।
ধর্ষকের ডিএনএ টেস্ট এবং উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতের সামনে হাজির করা হয়েছে। সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের কারণে পুলিশি তদন্তে কোনো পক্ষপাতিত্ব কিংবা ঘাপলা থাকার সুযোগ নেই। এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার বিষয়টি প্রমাণিত। এই রায়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশাপাশি সবাই সন্তুষ্ট। একই সাথে অপরাধীদের প্রতি একটি শক্ত বার্তা গেছে।
উপযুক্ত শাস্তির বিধান কার্যকর না থাকলে অপরাধের লাগামহীন বিস্তৃতি ঘটে। আমাদের সমাজে এর স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশিত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি খুন, ২০৯টি নারী-শিশু ধর্ষণ এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিংবা অন্য কোনোভাবে রেকর্ড হয়েছে। এ ধরনের ঘোরতর অপরাধের অনেক ঘটনাই গণমাধ্যমে আসে না কিংবা কোনো রেকর্ড থাকে না। বিশেষ করে নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলো আড়ালে থেকে যায়। তারপরও যে সংখ্যা সামনে এসেছে, একে একটি উচ্চ অপরাধ সংঘটন-প্রবণ সমাজ বলতে হবে।
অপরাধীদের উপযুক্ত বিচার না হওয়ায় একই অপরাধ বারবার সংঘটিত হচ্ছে। রামিসার ওপর নৃশংসতার অত্যন্ত দ্রুত বিচারের পর তাই এ বিষয়টি এখন সামনে এসেছে। কেন আমাদের সমাজে উচ্চ অপরাধ-প্রবণতা বিরাজ করছে। শিশু নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলে এর কারণ আমরা বুঝতে পারব। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটিও নৃশংস ছিল। ওই সময় সরকার একই ধরনের আন্তরিকতা দেখিয়েছে। বিচারিক আদালতে আসামির বিরুদ্ধে শাস্তি হওয়ার পর সেটি উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের তালিকায় ঝুলে আছে। সিলেটের শিশু রাজন, খুলনার রাকিবকে বীভৎস নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে রায় কার্যকর উচ্চ আদালতের দীর্ঘ তালিকার মধ্যে পড়ে গেছে।
প্রতি বছর এ ধরনের ডজন ডজন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থাকে, সেগুলোর বিচার দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে আটকে যায়। রামিসার মামলায় শাস্তি নিম্ন আদালতে যেমন দ্রুততায় দেয়া হয়েছে, এখন দেখার বিষয়— উচ্চ আদালতে কিভাবে এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পরিণতি পায়। তা না হলে আগের নৃশংস ঘটনাগুলোর মতোই সময়মতো বিচার না পাওয়ার হতাশায় পড়তে হবে।
রামিসার মামলায় বিচারের ত্বরিত গতি আলোচনায় এসেছে। একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণে দরকার শক্তিশালী একটি বিচারকাঠামো। যেখানে কেউ যেন আঙুল তুলতে না পারে বিচারটি দ্রুত হয়েছে; বরং সবাই যেন বলতে পারে— অপরাধীর উপযুক্ত বিচার হয়েছে। বাছাই করে শুধু একটি মামলার উপযুক্ত বিচার নয়; দেশবাসী চায় প্রত্যেকটি অপরাধের সঠিক বিচার।



