জিরো টলারেন্স নীতি ও বাস্তবতা

মাদক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ চীনের অনন্য সাধারণ নজির গ্রহণ করতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে (১৮০০ সালে দশকে) চীনে ব্রিটিশ বণিকদের দ্বারা চোরাচালানকৃত আফিমের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল; যা চীনের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সে সময়কালকে চীনের ইতিহাসে এক অন্ধকার যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়; যাকে প্রায়ই শতবর্ষের অপমান হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯০৬ সাল নাগাদ চীনে ১৩ দশমিক ৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ আফিমে আসক্ত ছিল; যা তৎকালীন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। ফলে চীনের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাময়িক দুর্বলতা এবং শ্রমিকদের কৃষিও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যহৃত হয়

মনীষীদের অভিজ্ঞানজনিত অভিমত প্রধানত পাঁচ কারণে। কোনো জাতি একসময় গভীর খাদের মুখোমুখি হতে পারে- ১. যখন সে তার বিকাশ ও বিনাশের ইতিহাস অবলীলাক্রমে ভুলে যায়। ২. স্বার্থান্বেষী নেতৃত্ব যখন কোনো দেশে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। ৩. সমাজ যখন নৈতিকতার দেউলিয়াত্বে পৌঁছে যায়। ৪. যখন সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পায়। ৫. সমাজে যখন নেশাগ্রস্তদের সংখ্যা অপ্রতিহত গতিতে বাড়ে। এখন বিচার করা যেতে পারে, আসলে কেউ কি এখন পলাশী প্রান্তরে সিরাজের দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কারণটা মনে রেখেছে? স্বার্থান্বেষী নেতৃত্বের প্রতিভূ ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি কি জননন্দিত ছিলেন? তার ভূমিকা কি জনবান্ধব ছিল? তার জমানায় চোরতন্ত্রের এক ক্রান্তিকাল ছিল। তিনি কি বৈধভাবে ক্ষমতা পেয়েছিলেন? ইদানীং যে হারে শিশুকন্যা, তরুণী, বিবাহিতা নারী ও বৃদ্ধারা গণহারে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে; তাহলে নীতি-নৈতিকতার বলাইটা কোথায়। বিচারের বাণী এখন কাঁদে কেন। এখন খুঁজলে ঘরে ঘরে মাদকের হাট দেখা যাবে। ইতোমধ্যে প্রথম চার কলা ঘট পূর্ণতা পেয়েছে। মাদকও একাদশীতে পৌঁছে গেছে। তার পরও কিছু অবকাশ হয়তো আছে। তাই আসুন অন্তত মাদক নিয়ে কিছু মিথষ্ক্রিয়া (ইন্টার অ্যাকশন) করা যাক।

এ অধ্যায়ের সূচনাটা হয়তো হেঁয়ালিপূর্ণ মনে হতে পারে। তবে অবোধগম্য হবে না।

‘পার্কে বসে মাদকের হাট, মাঠে সারি সারি দোকানপাট।’ এই দুই বাক্য, নয় কোনো কাব্যের ছন্দ। সহযোগী এক দৈনিকের সম্প্রতি প্রকাশিত দ্বিতীয় শীর্ষ সংবাদের শিরোনাম। সেখানে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের মাদকের ব্যাপক প্রসার নিয়ে প্রকাশিত এক ইনডেপথ স্টোরি। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘রাজধানীর পার্ক ও খেলার মাঠগুলো একসময় ছিল শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ আর বয়স্কদের বিকেলে অবকাশের জায়গা। এখন সেখানে মাদকের কারবার, হকারের উৎপাত আর বখাটের আড্ডাখানা। এটি শুধু রাজধানীর এক খবর, তবে এটি নিছক কোনো খবর নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক বার্তা। মাদকের নীল দংশনে সারা দেশের শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের নৈতিকতার সর্বনাশা এক দলিল। বোদ্ধাদের ধারণা- নিকট ভবিষ্যতে সুস্থ, সবল, দক্ষ, ধীমান, যুবশক্তি খুঁজে পেতে দূরবিন যন্ত্রের সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন অনিবার্য। ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। দেশের পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ সব প্রান্ত থেকে এখন মাদক ঢুকছে অবাধে, বাঁধভাঙা স্র্রোতের মতো। মাদকের এমন অবাধ প্রবাহ, আগে যা ছিল প্রায় অসম্ভব, অকল্পনীয়। অথচ এখন তা সমাজের গা সওয়া হয়ে উঠছে।

অনলাইনে-অফলাইনে অর্ডার করলে মুহূর্তে চাহিদামতো মাদক ঘরের দুয়ারে কড়া নাড়ে। মোদ্দা কথা, জাতি এখন ভয়াবহ এক ভবিষ্যতের দিকে ছুটছে। প্রবল এ স্রোত রুখে দিতে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে কে? প্রথমে জেনে নিতে পারি রাজধানীর কোথায় কোথায় এখন মাদকের হটস্পট; সেগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও গণমাধ্যম সূত্রে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকার প্রধান মাদক বিক্রির কেন্দ্রগুলো- ওপেন মার্কেট স্পট, মোহাম্মদপুর : জেনেভা ক্যাম্প (বিশেষ করে বিহারি ক্যাম্পের ভেতরের এবং পেছনের গেটের গলি), বাবর রোডের মসজিদ গলি ও হুমায়ুন রোড এলাকা। কাওরানবাজার : কাওরানবাজার রেললাইনসংলগ্ন বস্তি এলাকা (চলন্ত ট্রেনের শব্দ ও ভিড়কে কাজে লাগিয়ে এখানে হেরোইন ও ফেনসিডিল বেশি বিক্রি হয়। মহাখালী ও বনানী : কড়াইল বস্তির বনানী লেক প্রবেশপথ এবং বস্তির ‘বউ বাজার’ এলাকা (এখান থেকে গুলশান ও বনানীতে মাদক সরবরাহ করা হয়)।

ঢাকা উত্তর ও মিরপুর অঞ্চল : মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বরের মুসলিম ক্যাম্প, থার্টিন হার্টস ক্যাম্প ও ওয়াপদা বিল্ডিং এলাকা। উত্তর ও তুরাগ : উত্তরা বিভাগের ছয়টি থানায় দুই শতাধিক ছোট-বড় স্পট রয়েছে। যার মধ্যে আবদুল্লাহপুর, হাউজ বিল্ডিং এবং এয়ারপোর্টসংলগ্ন রেলস্টেশন এলাকা উল্লেখযোগ্য। বাড্ডা ও রামপুরা : পূর্ব মেরুল বাড্ডার ফুলকলির কাছের সরু গলি (যা গুটি গুলি নামে পরিচিত)। আফতাবনগর আয়রন ব্রিজ এবং রামপুরা টিভি রোড এলাকা। ঢাকা দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চল : মালিবাগ ও মগবাজার- মালিবাগ আবুল হোটেলের পাশের ফ্লাইওভারের নিচের অংশ। মধুবাগ ও হাতিরঝিলসংলগ্ন বস্তি এলাকা। সন্ধ্যা নামলে এসব স্থানে আইস ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদকের বেচাকেনা বাড়ে। যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ : সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, ধলপুর সিটি পল্লী। কুতুবখালী ও ডেমরা-শ্যামপুরসংলগ্ন বিভিন্ন পকেট রোড। এ অঞ্চলে ঢাকা দক্ষিণের সবচেয়ে বেশি মাদক স্পট আছে। পুরান ঢাকা : বাবুবাজার ব্রিজের আশপাশ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকা। অনলাইন ও হোম ডেলিভারি ট্রেন্ড : বর্তমান সময়ে সরাসরি স্পটে কেনাবেচার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অ্যাপসভিত্তিক গোপন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, ইয়াবা ও আইস ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।

গত ১৭ বছরে খুলে দেয়া হয়েছিল মাদকের বন্ধ যত দুয়ার। দেশের সীমান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ফেনসিডিল আর ইয়াবার কারখানা। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারে সৃষ্টি হয়েছে শত শত ইয়াবার হাটবাজার। সেখান থেকে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার ইয়াবা বাংলাদেশে স্রোতের মতো ঢুকছে। পশ্চিম দিক থেকে ফেনসিডিল নিয়ত আসছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কারখানায় তৈরি হয় ফেন্সিডিল। এসব অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বাংলাদেশের বাজারে আসছে এই মাদক। যার অর্থমূল্য শতকোটি টাকার উপর। অবাধ ও মোহময় জাতি বিনাশী এই এক বাণিজ্য। মাদকের এমন অনুপ্রবেশের, কোনো লক্ষ্য নেই বলে যারা ভাবছেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এ দেশের আগামী প্রজন্মকে যদি নেশায় ‘বুঁদ’ করে রাখা যায়- তা হলে সীমান্ত থাক, না থাক; ওপারের কথায় সীমান্তের এপারে নতুন প্রজন্ম তাদের হয়ে হাঁটবে-নাচবে-গাইবে। লাভের ষোলোআনা গুড় ওপারে জমবে। উত্তাল ঢেউয়ের মাথায় ভর করে সমুদ্রপথে আসছে নাম জানা-অজানা মাদক।

সরকারি তথ্য মতে, দেশের ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার ১৬২টি রুট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক ঢুকানো হয়। মিয়ানমার সীমান্তে (সবচেয়ে সক্রিয় রুট) দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) অনুপ্রবেশের প্রধান পথ কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্তে। নাফ নদ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। ভারত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজা আসে। পশ্চিমের প্রধান পয়েন্টগুলোর মধ্যে আছে রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জ, এ পথে হেরোইন ও গাঁজা আসে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদক সেবনে অভ্যস্ত; যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপের তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মোট মাদকাসক্তের ৮০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী, অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের। অন্য এক গবেষণা অনুযায়ী, তরুণসমাজ অল্প বয়সে এখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, তরুণসমাজ খুব অল্প বয়সে প্রথমবার মাদক সেবন শুরু করে। ১৮-২৫ বছর বয়সের মধ্যে দেশের ৩৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী। প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী ১৮ বছরের নিচে থাকাবস্থায় মাদক সেবন শুরু করে। মাদকের ব্যাপকতা এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করায় দেশে এক ভয়াবহ ও বহুমুখী সঙ্কট সৃষ্টি করছে।

মাদক একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে সক্ষম। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে মাদকাসক্তির ফলে প্রধানত যেসব সামাজিক সঙ্কট তৈরি হয় তা অনেকটা নিম্নরূপ : মাদক সেবনে তরুণ প্রজন্মের মেধা ও সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হওয়ার আগে ধ্বংস হয়ে যায়। মাদকাসক্তরা কর্মশীলতা ও উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। নিঃশেষ হয় যৌনশক্তি। মাদকাসক্তরা নেশার অর্থের জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর শারীরিক মানসিক নির্যাতন চালায়। তারা মাদকের অর্থ জোগাড় করতে চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি ও ছিনতাইয় পর্যন্ত করে।

মাদক ও নেশা নিরোধ সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মাদকের পেছনে প্রায় এক লাখ কোটি ব্যয় হচ্ছে। একজন মাদকাসক্ত মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করে; অথচ বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থায়, তদারকি ও সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব বিদ্যমান। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আইনি দুর্বলতায় মাদকবিরোধী অভিযান অনেকটা অকার্যকর। ভৌগোলিক অবস্থান, দুর্বল সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ মাদক পাচারকে সহজতর করে।

মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনার মানসিকতা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার ঘাটতি প্রতিরোধের প্রধান অন্তরায়। দেশে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার মূল কারণগুলো আলোচনায় বেরিয়ে আসছে অবাক করা সব তথ্য। যেমন- রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্নীতি : মাঠপর্যায়ে অনেক মাদক কারবারি ও সিন্ডিকেট রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়। ফলে মূল হোতা প্রায়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বাহকদের গ্রেফতার করা হয়। সীমান্ত সুরক্ষা ও নজরদারি : গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিদের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আইন প্রয়োগে ঘাটতি : অনেক সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের দুর্নীতি ও সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়; যা মাদকবিরোধী অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করে। বিপুল মাদকের একটি ক্ষুদ্র অংশ উদ্ধার হলেও বেশির ভাগ বাজারে থেকে যায়।

পুনর্বাসন ও সচেতনতার অভাব : মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে জোর দেয়া হলেও সেই অনুযায়ী সরকারি পুনর্বাসনকেন্দ্র ও চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল। পারিবারিকভাবে সচেতনতা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর কাউন্সেলিংয়ের অভাবও এর বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

মাদকের বিরুদ্ধে স্থায়ী সমাধানে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন দুর্নীতি দমন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। মাদকের বিস্তার রুখতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও এর বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে নানামুখী বিতর্ক রয়েছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে বড় চালান জব্দ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে গডফাদারদের সুরক্ষা পাওয়া ও দুর্নীতির কারণে এ প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মাদক নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতার দিকগুলো হচ্ছে- মাদক কারবারের মূল হোতারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় অধরা থেকে যায়। দুর্নীতি ও যোগসাজশ : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের সাথে মাদক কারবারিদের যোগসাজশের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। সীমান্তবর্তী চ্যালেঞ্জ : পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বিভিন্ন কৌশলে মাদকের অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাদক রুখতে শুধু ব্যাপকভিত্তিক অভিযান যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন দুর্নীতি দমন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো। সর্বোপরি মাদকবিরোধী স্থায়ী একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে নেশাগ্রস্ত তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

মাদক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ চীনের অনন্য সাধারণ নজির গ্রহণ করতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে (১৮০০ সালে দশকে) চীনে ব্রিটিশ বণিকদের দ্বারা চোরাচালানকৃত আফিমের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল; যা চীনের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সে সময়কালকে চীনের ইতিহাসে এক অন্ধকার যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়; যাকে প্রায়ই শতবর্ষের অপমান হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯০৬ সাল নাগাদ চীনে ১৩ দশমিক ৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ আফিমে আসক্ত ছিল; যা তৎকালীন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ।

ফলে চীনের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাময়িক দুর্বলতা এবং শ্রমিকদের কৃষিও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যহৃত হয়। ১৯৪৯ সালে গণতান্ত্রিক চীন প্রতিষ্ঠার পর, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি খুবই কঠোর পদক্ষেপ নেয়। ফলে চীনের ১৫০ বছরের মাদক যুগের অবসান ঘটে। অভিযানটি ইতিহাসের অন্যতম সফল মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৩ সালের মধ্যে চীন প্রায় মাদকমুক্ত দেশ হিসেবে পরিচিতি পায়।

শেষকথা, মাদকের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, একই সাথে মাদক গ্রহণকারীদের স্বাস্থ্যসঙ্কটসহ হাজারো সমস্যার এক বৃত্তের মধ্যে জাতি ঢুকে পড়েছে। এ থেকে মুক্তি কোথায়।

লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]