আট বছর পর একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে যাচ্ছে। টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর একরামুল হককে ২০১৮ সালে খুন করান তখনকার আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি আবদুর রহমান বদি। র্যাবের একদল সদস্য মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ঠাণ্ডামাথায় গুলি করে হত্যা করে তাকে। এমনভাবে হত্যা করা হয়, যখন একরামের মোবাইল ফোন চালু ছিল। স্ত্রী-মেয়ের সাথে কথা বলছিলেন। হত্যার পর প্রকাশিত অডিওতে শোনা যায় তাকে গুলি করার শব্দ। সে শব্দ শোনানো হয় পরিবারের সদস্যদের। এমন নৃশংসতা আওয়ামী ফ্যাসিবাদী জমানায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়; কিন্তু প্রতিকারের কোনো উপায় ছিল না। কেউ টুঁ শব্দ করতে পারতেন না।
এই হত্যার বিচারের দাবি জানালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল একরামের স্ত্রীকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে কোনো রকম বাড়াবাড়ি না করার নির্দেশ দেন। সান্ত্বনা হিসেবে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেন। শেষ পর্যন্ত এই খুনের সাথে জড়িত ও খুনিদের বিরুদ্ধে তদন্ত সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তা দাখিল করা হয়েছে। আদালত সে রিপোর্ট আমলে নিয়েছেন।
১১ আসামির নামে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করা হয়। আসামিদের অন্যতম ভারতে পালিয়ে যাওয়া পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যরা হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন (সেনাবাহিনীতে কর্মরত), কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), মেজর রুহুল আমিন, সেনা কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও সেনা কর্মকর্তা আশিকুর রহমান। এর মধ্যে আবদুর রহমান বদিসহ তিনজন অন্য মামলায় গ্রেফতার আছেন।
ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রহমান বদিই পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার ছক কষেন। কারণ একরাম ছিলেন বদির প্রতিপক্ষ। তাকে হত্যার পর বদি বিভিন্ন কৌশলে একরামের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন।
শুধু এই একটি ঘটনা নয়, আওয়ামী দুঃশাসনে এমন অসংখ্য নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটে। অনেক ঘটনা ঘটানো হয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের দিয়ে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা যার অন্যতম। একজন মন্ত্রীর মেয়ের জামাই র্যাবের কর্মকর্তা এ খুনের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। মূলত শেখ হাসিনা পুরো দেশকে গুম, খুন, হত্যা ও নির্যাতনের এক জ্বলন্ত নরকে পরিণত করেন; যার তুলনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে কমই আছে। কিন্তু পাপ কখনো চাপা থাকে না। একসময় প্রকাশিত হয়। পাপীকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হয়। একরামের খুনিদের বিচার-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই চিরন্তন সত্য নতুন করে সামনে এসেছে। আট বছর পর আজ একরামের বিধবা স্ত্রী ও স্বজনরা ন্যায়বিচার পাবেন এমন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে শুধু একরামের একার নয়, দেশে এমন হাজারো হত্যার ঘটনা আছে, যার বিচার হয়নি। আমরা আশা করি, আওয়ামী লীগের সব খুনি ও খুনের সহযোগীদের বিচার হওয়া জরুরি। কারণ খুনের বিচার ছাড়া কোনো জাতি নিজেকে সভ্য বলে দাবি করতে পারে না।



