চীনা বিনিয়োগে নতুন এলএনজি টার্মিনাল

গ্যাসসঙ্কট মোকাবেলায় নতুন উদ্যোগ, তবে বাড়বে আমদানিনির্ভরতার প্রশ্ন

দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। একই বৈঠকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দরপত্র প্রস্তুত ও জমা দেয়ার সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। একই বৈঠকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দরপত্র প্রস্তুত ও জমা দেয়ার সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দু’টি সিদ্ধান্তই সরকারের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাকে আরো দ্রুত, নমনীয় ও বাজার-সক্ষম করার প্রচেষ্টার অংশ। তবে একই সাথে এগুলো বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্প

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহেশখালীর কুতুবজোমে এফএসআরইউ নির্মাণের জন্য চীনের চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইই) প্রস্তাব সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে। এটি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫-এর ৯২(২) ও ১০৭(২) বিধি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় জি-টু-জি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সময় কম লাগে, সিদ্ধান্ত দ্রুত নেয়া যায় এবং অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সহজ হয়। বিশেষ করে জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে এ ধরনের ব্যবস্থা অনেক দেশই অনুসরণ করে।

কেন প্রয়োজন নতুন টার্মিনাল?

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, পরিবহন এবং নগরায়ণের কারণে প্রতিদিন গ্যাসের প্রয়োজন বাড়লেও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে।

বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি হলেও দেশীয় উৎপাদন প্রায় অর্ধেক। এই ঘাটতি পূরণে সরকার কয়েক বছর ধরে এলএনজি আমদানি করছে।

বর্তমানে মহেশখালীতে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু রয়েছে, যেগুলো মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে। নতুন কুতুবজোম এফএসআরইউ চালু হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ আরো বাড়বে। এর ফলে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত?

তবে নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণকে ঘিরে অর্থনৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে অস্থির। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন কিংবা মৌসুমি চাহিদার কারণে এলএনজির দাম দ্রুত ওঠানামা করে।

ফলে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়লে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও বাড়বে। একই সাথে গ্যাসের ভর্তুকি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকিও থেকে যায়। অন্য দিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা, বিনিয়োগ ধরে রাখা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ঘাটতি কমানোর জন্য আপাতত এলএনজি আমদানির বিকল্প সীমিত। তাই নতুন টার্মিনালকে তারা অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবেই দেখছেন।

দেশীয় অনুসন্ধানেও জোরের পরামর্শ

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লক, অনাবিষ্কৃত অনশোর গ্যাসক্ষেত্র এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, কেবল আমদানিনির্ভর নীতি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। একই সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গ্যাস অপচয় কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি কাঠামোতে আমদানিকৃত এলএনজি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। নিচে বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র দেয়া হলো।

সহজ তুলনা : স্থানীয় অনশোর গ্যাস (বিবিয়ানা, তিতাস, হবিগঞ্জ ইত্যাদি): ১-৩ ডলার/এমএমবিটিইউ; নতুন অনশোর/জটিল ক্ষেত্র : ৩-৫ ডলার/ এমএমবিটিইউ; গভীর সমুদ্রের নতুন গ্যাস : ৫-৭ ডলার/ এমএমবিটিইউ (চুক্তি ও উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল); দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি : ৯.৫-১৩.৫ ডলার/ এমএমবিটিইউ; স্পট এলএনজি (২০২৬ সালের সঙ্কটকাল) : ২০-২৮ ডলার/ এমএমবিটিইউ।

পুরনো দেশীয় গ্যাসের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এলএনজি প্রায় চার-আট গুণ বেশি ব্যয়বহুল। স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজি কখনো কখনো ১০-২০ গুণ পর্যন্ত বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়- বাংলাদেশ বর্তমানে দৈনিক গ্যাস চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এলএনজি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাস আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে একই পরিমাণ গ্যাস তুলনামূলকভাবে অনেক কম ব্যয়ে পাওয়া সম্ভব। এজন্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান, দ্রুত কূপ খনন এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তবে গভীর সমুদ্রের নতুন গ্যাসও এলএনজির তুলনায় সাধারণত সস্তা হলেও, তা পুরনো অনশোর গ্যাসের মতো কম খরচে পাওয়া যাবে না।

জ্বালানি তেল আমদানিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত : একই বৈঠকে বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে দরপত্র প্রস্তুত ও দাখিলের সময় ৪২ দিনের পরিবর্তে ১০ দিন নির্ধারণের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্থির। দীর্ঘ দরপত্র প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় দরপত্র মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়। ফলে সরকার প্রতিযোগিতামূলক মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাজার পরিস্থিতির সাথে দ্রুত সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করা সহজ হবে। একই সাথে জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বিশ্লেষকদের মতে, কুতুবজোম এফএসআরইউ প্রকল্প এবং দ্রুত দরপত্র ব্যবস্থা- দু’টি সিদ্ধান্তই স্বল্পমেয়াদে দেশের জ্বালানি সরবরাহকে আরো নির্ভরযোগ্য করতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, এলএনজি সরবরাহের স্থায়িত্ব, বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের বিনিয়োগের ওপর।

তাদের ভাষায়, নতুন টার্মিনাল গ্যাস সঙ্কটের তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে পারে; কিন্তু টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমদানি, দেশীয় অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই।