স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রভাব

হকদাররা সুবিধাবঞ্চিত

স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করায় তৃণমূলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত দাবিদাররা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র, বিধবা ও নিম্নবিত্ত নারী, যারা প্রকৃতপক্ষে এই কার্ডের দাবিদার, তারা তদারকির অভাবে বাদ পড়ছেন। নিরপেক্ষ ও পেশাদারের মাধ্যমে তথ্য যাচাই না করে স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকা ব্যবহার করায় এই অনিয়ম এখন অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়, গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর উদ্বেগের।

স্থানীয় সরকার একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সবচেয়ে জনঘনিষ্ঠ। এগুলো পরিচালিত হওয়ার কথা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দিয়ে। তবে বর্তমানে অনির্বাচিত লোকজনকে প্রশাসক নিয়োগ করায় স্থানীয় সরকারের সব স্তর এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে জনপ্রতিনিধিত্বশীল হতে পারছে না। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার দলীয় লোকজনকে প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বেড়েছে। পরিণামে সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সবিধা এবং পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত হকদাররা। তাদের বঞ্চিত করে দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

স্মরণযোগ্য যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ৩১ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করবে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হবে। এগুলো এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়নকার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বাস্তবতা হলো, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ সেই ইশতেহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি কি প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের চেষ্টা, নাকি রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে? লক্ষণীয়, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দলীয় প্রশাসকদের একচ্ছত্র আধিপত্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ, টিসিবি বা ত্রাণসুবিধা বিতরণে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠছে। অভাবীদের বদলে দলীয় নেতাকর্মীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি দলীয় সম্পদশালীরাও সুবিধা নিচ্ছেন।

স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের প্রত্যক্ষ জবাবদিহি। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি জানেন, পরবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছে যেতে হবে। কিন্তু নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জবাবদিহির কাঠামো অনুপস্থিত। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনপ্রত্যাশার পরিবর্তে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। এর বড় প্রভাব পড়েছে সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।

স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করায় তৃণমূলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত দাবিদাররা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র, বিধবা ও নিম্নবিত্ত নারী, যারা প্রকৃতপক্ষে এই কার্ডের দাবিদার, তারা তদারকির অভাবে বাদ পড়ছেন। নিরপেক্ষ ও পেশাদারের মাধ্যমে তথ্য যাচাই না করে স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকা ব্যবহার করায় এই অনিয়ম এখন অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক নয়, গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গভীর উদ্বেগের।

আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকারকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের স্বার্থ নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বার্থ। প্রশাসনিক প্রয়োজন থাকলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, তবে তা হতে হবে সীমিত সময়ের জন্য। সেটা হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সেই সাথে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়াই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক পথ। তা হলে মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে এবং অনেকাংশে বঞ্চনার অবসান ঘটবে।