সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা— এই তিনটি অনুভূতি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের চিরন্তন কামনা। এই অনুভূতিগুলোর অর্থ কী? সন্দেহ নেই, পণ্ডিতরা খটমটে কিছু শব্দের সমন্বয়ে দুর্বোধ্য একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়ে দিতে পারবেন। তবে বিশ্বের প্রতিটি মানুষই এই তিন শব্দের একটি সাধারণ ধারণা হৃদয়ে লালন করেন। তাদের সেই অনুভূতি সম্ভবত সৃষ্টির শুরু থেকেই সবার হৃদয়ে প্রতি মুহূর্তে দোলা দিয়ে যায়। তার বিন্যাসটা সাধারণ বাংলাদেশীর বিচারে হয়তো এভাবে করা যায়— মাথা গোঁজার একটুখানি ঠাঁই, এক থালা ভাত, দু’টি কাঁচা লঙ্কা, একটি পেঁয়াজ, সামান্য ডাল, খানিকটা শাক। সপ্তাহে দুই বা তিনবার পাতে পড়ুক ছোট কোনো মাছ। কালেভদ্রে অতিথি আপ্যায়নে কখনো থালায় দেখা যাক ছোট দু-এক টুকরো গোশত। আর তারাভরা রাতের আকাশ, ধীরে বয়ে যাওয়া নির্মল বাতাস, সাথে ফুলের সুবাস। সকাল, বিকাল বা সন্ধ্যায় কিংবা রাতে কোনো নদীর তীরে বা বনবনানীর ধারে হোক নিরাপদ ভ্রমণবিলাস। এ দেশের সাধারণ মানুষের এতটুকুই সুখের আধার, তাতেই তাদের সুখ আনন্দ অপার। এর চেয়ে বেশি কিছু চায় না কেউ আর।
আমাদের এখনকার বাস্তবতায় কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে যাওয়া কারো পক্ষে নিরাপদে ঘরে ফেরাও কি খুব সহজ! এই নিরাপত্তার প্রশ্ন এখন প্রতিদিনের আলাপ আলোচনায় মুখ্য। সেই আলোচনা নিয়েই হবে এ নিবন্ধের আলাপচারিতা।
অবাক হওয়ার কথা, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যাওয়ার পরও মানুষের জন্য এতটুকু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া গেল না? এই সামান্য আয়োজনটুকু অতীতের কোনো সরকারই কেন করেনি? আদৌ এর প্রয়োজন তারা বোধ করেছিল কি না, এ প্রশ্ন এখন সবার। এর একটা পটভূমি আছে। আজও অসংখ্য মানুষ আধাপেট খেয়ে বা খালি পেটে ঘুমাতে যায়, দিন যাপন করে।
পথে পথে যে হকার সর্বরোগের মহৌষধ ফেরি করে, পীড়িত মানুষ সেটিই খায়। সেটি রোগ সারায় না বাড়ায়, সে জানে না। তার ধারণা, রাজপথে তথাকথিত যেসব ওষুধ কেনাবেচা হয়, অবশ্যই সেটি সরকারের অনুমোদিত। তাহলে এবার ওষুধ প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন, বলুন এসব সত্যিই রোগ সারায় কি! বাংলাদেশে মন্ত্রণালয়ের কোনো শেষ নেই। আর নতুন হোক বা পুরনো, সবই জনসেবার নিমিত্তে, তা হলে সেবাটা কোথায়? মানুষের উদর পূরণের খাদ্য, গতরের বস্ত্র, শিক্ষা-দীক্ষা, স্বাস্থ্য এসব কেন এখনো মানুষের কাছে অধরা?
জাতি হিসেবে আমরা কথায় পটু; কিন্তু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। এসব সঙ্কটের বেশ খানিকটা নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। তারপরও, বিএনপি এবার বিপুল গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। মানুষ তার ওপর আশাবাদী।
এখন দেখা যাক, এই সঙ্কটের গোড়াটা কোথায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তার কারণ ছিল। গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল রাহাজানি, মজুদদারি সাথে প্রশাসনের সীমাহীন অদক্ষতা। এসব ছিল জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ। গ্রামগঞ্জে, শহর-নগরে অবাধে চলে চুরি, ডাকাতি, দখলবাজি। যে যার মতো স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। সাধারণের অধিকার কিভাবে খর্ব হয়েছিল তার চিত্রটা ছিল এমন। তদানীন্তন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান শীতেকাতর হাজার হাজার মানুষের এক সমাবেশে, সে সময়কার রেডক্রসের প্রধান ও আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফাকে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বলেছিলেন, গাজী আমার কম্বলটা কোথায়! (উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর ত্রাণ সাহায্য সামগ্রী এসেছিল। সেখানে সাত কোটিরও বেশি কম্বল রিলিফ হিসেবে এসেছিল। সেই কম্বলগুলোর প্রতি প্রধানমন্ত্রী অঙ্গুলি নির্দেশ করেছিলেন।) তিনি জানতে পেরেছিলেন, সেই ভরা শীতে অসংখ্য মানুষ রাতের বেলা গায়ে কম্বল চড়াতে পারেনি। অপর এক সমাবেশে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে শেখ মুজিবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বুভুক্ষু মানুষের জন্য আমি সারা বিশ্ব থেকে ভিক্ষা করে টাকাপয়সা আনছি। আর চাটার দল (এরা খোদ তার দলের নেতাকর্মী) চেটেপুটে খেয়ে ফেলছে। ফলে দেশে সৃষ্টি হলো ভয়াবহ মন্বন্তর।
তা ছাড়া স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেলে যাওয়া যত শিল্প-প্রতিষ্ঠান, দোকানপটে প্রশাসক হিসেবে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল লীগ নেতাদের। মাস কয়েক যেতে না যেতেই সব প্রতিষ্ঠানে লালবাতি জ্বলে উঠেছিল। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসকরা যন্ত্রপাতি ও মালামাল যে যার মতো লুটেপুটে নিয়েছিল। অনেকটা প্রবাদবাক্যের মতোই, শিল্পগুলো শৃগালের কাছে মুরগি বাগি দেয়ার মতো লীগের নেতাদের হাতে দেয়া হয়। ফলে তার অস্থিমজ্জা কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। ওই সব প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারী-কর্মকর্তার জীবন বেকারত্বের অভিশাপে তছনছ হয়ে যায়। লীগের এমন কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষায় সৃষ্টি হলো নতুন এক শব্দের। সংযোজন হলো ‘চোরতন্ত্র’ বা লুটপাটের ইতিহাস। দ্রুতই সেই চোরতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল, যা তাদের দেশকে গ্রাস করেছিল।
২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত ঠিক একই শৈলী অনুসরণ করে লীগের নেতাকর্মীরা চোরতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে দুদার্ন্ত বেগে। এভাবে আওয়ামী যুগ ছিল, অন্ধকারে ডুবে থাকা ভয়ঙ্কর এক কৃষ্ণকাল। লীগের নতুন তন্ত্রমন্ত্র দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিল। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের শেষার্ধ পর্যন্ত বিকশিত চোরতন্ত্রের সাথে আরো যোগ হয়েছে, গুমতন্ত্র, অর্থ লোপাটতন্ত্র, দখলতন্ত্র ও সিন্ডিকেটের জমজমাট আসর। দুর্ভাগ্যের হলেও এটাই সত্য, সেই তন্ত্রমন্ত্রের অপছায়া এখনো পেছনে পেছনে আসছে। এখনই হুঁশিয়ার হওয়ার সময়। যে আলাপচারিতার কথা বলেছিলাম, চলুন এবার সে আলাপচারিতায় ঢোকা যাক।
এই মুহূর্তে দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তার পরিবারের স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকায় হতাশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে এখন, তার একটি চিত্র তুলে ধরেছে জাতীয় এক দৈনিক। সেখান থেকে তার সূচনাটা উদ্ধৃতি করা যাক। গৃহকোণে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা আবাসিক এলাকা— কোথাও পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না সাধারণ মানুষ। ভোরে রিকশা থেকে ব্যাগ টানতে গিয়ে নারীর মৃত্যু, দিনদুপুরে ব্যাংকের টাকা ছিনতাই, প্রকাশ্যে গুলি, সশস্ত্র মহড়া, পরিত্যক্ত অবস্থায় লাশ উদ্ধার। সম্প্রতি একের পর এক এমন ধরনের ঘটনায় সারা দেশে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও তার বাহিনীগুলোর সক্ষমতা নিয়ে ঘরে-বাইরে প্রশ্নটা উঠেছে। চলছে তীব্র সমালোচনা। সেই আওয়ামী জমানায় প্রায় এমন অবস্থায় বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মল সেন তৎকালীন সরকারের কাছে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েছিলেন’। আজ কি কেউ সেই একই কথা উচ্চারণের জন্য তৈরি হচ্ছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা এখন কেবল কিছু মানুষের ঘরদুয়ার ছুঁয়ে যাচ্ছে না। এর প্রতিক্রিয়া অনেক জায়গায় আঘাত করবে। শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগসহ আরো কত স্থানে আছড়ে পড়বে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিশেষত এটি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে? তার পরও কবি কেন নীরব। সবাই এর দ্রুত অবসান চায়।
সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্স যদি ইতিবাচক হয়, তাহলেই সরকার ও সরকারি দলের নেতারা সফল। সেই পারফরম্যান্স দিতে হলে সম্মিলিত প্রয়াসই একমাত্র ভরসা। অথচ এখনো সবার একসাথে, সমানতালে চলার শৈলীটা অবর্তমান। এই অসঙ্গতি দূর করতে মুহূর্তকাল আর বিলম্ব নয়। সবাই জানে, নবীন সরকারের কর্মে যোগদান খুব বেশি আগে নয়। তারপরও কেবল মন্দ দিকটাই স্মরণ করা কেন! কিছু ভালো দিকও তো আছে। সেটি নিয়ে চোখ বন্ধ রাখা কেন। এমন জিজ্ঞাসা অনেকের।
যাই হোক, পূর্ব প্রসঙ্গে ফেরা যাক। সব মন্ত্রণালয়ের এক লয়ে চলার প্রয়াস এখনো দৃশ্যমান নয়। তাহলে বিপদ কার? সরকার ও দেশ জাতির।
একই সাথে আরো একটি কথা বাতাসে ভাসছে। সঙ্কটটা স্বাভাবিক নাকি এর পেছনে আছে কোনো কূটকৌশল। কোনো কূটকৌশল আছে কি নেই সেটি তো আমাদের মতো ছাপোষা সাংবাদিকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে বিশেষ মহল থেকে এমনটাই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। নিকট অতীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন ছিল, তার থেকে কি পরিবর্তন এসেছে? না এসে থাকলে অযথা অতীতকে দোষারোপ করার যুক্তি কী? এসব প্রশ্ন সবে শুরু। বলা হচ্ছে, আমরা অতীতে ভারতের রেল চলতে দিয়েছি। এখন সে ব্যবস্থা হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দোষটা কী ছিল। ধীরে ধীরে আরো কত কী হবে। তারা বলছে, অপেক্ষায় থাকা যাক।
তবে এমন আলামত কি শুধু ইঙ্গিত নাকি পালিয়ে যাওয়া কাউকে প্রাসঙ্গিক করার যত প্রয়াস। আমরা সবাই অতীতের পাপাচার যা কিছ্ইু সব ভুলে যেতে বড় বেশি ভালোবাসি। আর বেভোলা জাতি কখনো নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে না। ইতিহাসের পাতায় সেটি স্পষ্ট করা আছে। সেখান থেকে সবাইকে পাঠ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



